Amardesh
আজঃ শনিবার ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ৬ মাঘ ১৪১৯, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 বিশেষ আয়োজন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

গতি নেই ঢাকা-চট্টগ্রাম বার লেনে : ৮৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ হয়েছে ২৪ দশমিক ৪৫ ভাগ : প্রকল্প ব্যয় আরেক দফায় ৫৭১ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব : নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখায় প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে

কাজী জেবেল
পরের সংবাদ»
গতি নেই ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পে। চলতি বছরই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ হওয়া তো দূরের কথা, কাজ হয়েছে সিকিভাগেরও কম। কবে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে তা কেউ জানেন না। এদিকে প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি না হওয়ায় সময় আরও এক বছর বাড়ানো হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বার বার বাড়ানো হচ্ছে প্রকল্প ব্যয়। সর্বশেষ ৫৭১ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ডিপিপি সংশোধন করতে যাচ্ছে সড়ক বিভাগ। আজ পিইসির (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। এ নিয়ে এ প্রকল্পের ব্যয় মোট ৮১৪ কোটি টাকা বাড়ছে। বার বার এ ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সড়ক বিভাগের এডিপি বাস্তবায়ন অগ্রগতি বৈঠকে দেয়া রিপোর্ট অনুযায়ী এ পর্যন্ত প্রকল্পে কাজ হয়েছে মাত্র ২৪ দশমিক ৪৫ ভাগ। এ কাজে ব্যয় হয়েছে ৮৪৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৫ ভাগ। প্রকল্পের কাজ ও ব্যয় নিয়ে এরই মধ্যে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে এ প্রকল্পের দুর্নীতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রকল্পের প্রয়োজনীয় নথি তলব করা হয়েছে। নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে এর সঙ্গে জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদকে ডাকা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সড়ক বিভাগ ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এদিকে রাস্তার ওপর প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখায় প্রায়ই ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। সাধারণত ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে ৫-৬ ঘণ্টা লাগে। যানজটের কারণে সেখানে ১৫-১৬ ঘণ্টা সময় ব্যয় হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। আর আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। যানজট নিরসনের লক্ষ্যে এ প্রকল্প নেয়া হলেও বর্তমানে কোনো কোনো স্থানে স্থায়ী যানজট সৃষ্টি হয়েছে। পথেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কাঁচা তরকারি ও মাছ-মাংস।
ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প সম্পর্কে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত মঙ্গলবার সড়ক বিভাগের এডিপি বাস্তবায়ন অগ্রগতি সম্পর্কিত বৈঠকে বলেন, প্রকল্পের কাজ দ্রুত চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় সমস্যা হচ্ছে মাজার, মসজিদ, বাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এসব স্থাপনা সরাতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে সমঝোতা করেছেন। স্থাপনা সরানোর পর সেখানে কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে কাজের অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে। ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রকল্পে টাকা কোনো সমস্যা নয়। সরকারের ফান্ডে ৫০০ কোটি টাকা রয়েছে। এ বৈঠকে সড়ক বিভাগের সব প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বক্তব্য জানতে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের পরিচালক ইবনে আলম হাসানের সঙ্গে কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, দেশের আমদানি-রফতানির সিংহভাগ পণ্য আনা-নেয়ার এ সড়কটি পরিবহন ও মানুষ চলাচলের চাপ কুলাতে না পারায় এটি চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে নেয়া হয়। মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হয় ২০১০-এর ডিসেম্বরে। প্রকল্পের আওতায় ২৬৪ কিলোমিটার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত ১৯২ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময়মত সেটি হচ্ছে না। এ পর্যন্ত ৫০ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবায়ন হয়েছে ২৪ দশমিক ৪৫ ভাগ। এতেই ব্যয় হয়েছে ৮৪৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া গত ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাট কাজ এখনও শেষ হয়নি। এসব কাজ চলমান রয়েছে। ১০৭ লাখ ৮৬ ঘনমিটার মাটি দিয়ে ১৭৩ কিলোমিটার রাস্তা ভরাট করা হয়েছে। সূত্র জানায়, প্রকল্পের এসব কাজ তিনটি কোম্পানি করছে। সেগুলো হচ্ছে চায়নার সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড, বাংলাদেশের রেজা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও তাহের ব্রাদার্স-আল-আমিন কনস্ট্রাকশন জয়েন্ট ভেনচার। মোট কাজের ১০ ভাগের ৭ ভাগ পেয়েছে চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দু’ভাগ কাজ পেয়েছে রেজা কনস্ট্রাকশন এবং বাকি এক ভাগ কাজ পেয়েছে তাহের ব্রাদার্স। বর্তমানে এ তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
সেতু ও ওভারপাস নির্মাণেও অগ্রগতি নেই। ইলিয়টগঞ্জে ২৮.৬০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ, কুমিল্লা রেলক্রসিংয়ের ওপর ৩৪৪.১৭ মিটার ও ফেনী রেলক্রসিংয়ের ওপর ৮৬.৪৯২ মিটার দীর্ঘ ওভারপাস নির্মাণ কাজের অগ্রগতি মাত্র ৬.২৫ ভাগ। লালপুরে ২২.৭৭ মিটার দীর্ঘ সেতু, লেমুয়ায় ৯৩.৩০ মিটার সেতু, মুহুরীতে ১৮৮.৬০ মিটার দীর্ঘ সেতু, ধুমঘাটে ২১৫.৭০ মিটার সেতু ও চট্টগ্রামে রেলক্রসিংয়ের ওপর ৩১.৯৩ মিটার দীর্ঘ ওভারপাস নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ৬. ২০ ভাগ। গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি এসব সেতু ও ওভারপাস নির্মাণে কার্যাদেশ দেয়া হয়। প্রায় দেড় বছর আগে মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১০৭ কিমিতে কুমিল্লার মিয়াবাজারে পিসি গার্ডার সেতুর কাজ এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। চলতি বছরের ২৬ এপ্রিলের মধ্যে এ কাজ শেষ করার সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।
দেশের লাইফ লাইন হিসেবে বিবেচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পে প্রথম থেকেই নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন অংশে মাটি ভরাট, স্থাপনা অপসারণ, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহে জটিলতা, সময়মত অর্থছাড় না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের শুরু থেকেই কাজে গতি আসেনি। এর মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানে ভীত হয়ে কর্মকর্তাদের কাজের গতি শ্লথ হয়ে যায়। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও কাজে গতি ফেরেনি।
কাজে গতি না থাকলেও নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির অজুহাতে এরই মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের ব্যয় বার বার বাড়ানো হচ্ছে। সর্বশেষ ৫৭১ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এ প্রস্তাব পাস হলে প্রকল্প দাঁড়াবে ২ হাজার ৯৮১ কোটি টাকায়। এর আগে ডিপিপি বিশেষভাবে সংশোধন করে প্রকল্প ব্যয় ২৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৪১০ কোটি ১৭ লাখ টাকা করা হয়েছিল। এছাড়া ২০১০ সালে প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই প্রকল্প ব্যয় ২১৫ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। সে সময় ডিপিপি সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। অথচ ২০০৬ সালে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। অর্থাত্ প্রকল্প ব্যয় ৮০০ কোটি টাকা বেড়েছে।
এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুদক সূত্র জানায়, ডিপিপি অনুযায়ী ঠিকাদারদের কাজ দেখাশোনার জন্য প্রথমে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কথা থাকলেও তা হয়নি। নিয়োগ ছাড়াই ঠিকাদাররা কিছু কাজ করে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা তুলে নিয়ে যায়। পরে পরামর্শক নিয়োগ না হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে প্রায় এক বছর কাজ বন্ধ থাকে। ২০১১ সালের নভেম্বরে প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ করে সরকার। এরপরও এ প্রকল্পে গতি আসেনি। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে এ প্রকল্পে দুর্নীতি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। দুদকের একজন উপ-পরিচালকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দল বর্তমানে এ প্রকল্পে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। এরই মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেন প্রকল্পের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে নথি তলব করেছে দুদক। নথিপত্র পাওয়ার পরই তা যাচাই-বাছাই শেষে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, আগামী ডিসেম্বরে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হচ্ছে না উল্লেখ করে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হচ্ছে।
সড়কের প্রকল্প অগ্রগতি বৈঠক : চলতি অর্থবছরের গত ছয় মাসে সড়ক বিভাগের প্রকল্পগুলোর এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে গত মঙ্গলবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে সভায় সড়ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব এমএএন ছিদ্দিক, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে যোগাযোগমন্ত্রী জানান, সড়ক বিভাগের ১৫৩টি প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ৫৬২ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব ২ হাজার ২২৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও প্রকল্প সাহায্য ৩৩৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৪৫ দশমিক ৭৫ ভাগ, যা জাতীয় গড়ের (২৮%) তুলনায় ১৮ ভাগ বেশি। আগামী জুনের মধ্যে ৩১টি প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত ২৬৬ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। মন্ত্রী বলেন, আগামী বর্ষার আগে সারাদেশে ৪ হাজার কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করা হবে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের আওতাধীন ফেরি ও পন্টুন নির্মাণ-পুনর্বাসন কাজ শুরু হয়েছে। ৮ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু, দ্বিতীয় মেঘনা সেতু ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু নির্মাণ এবং বিদ্যমান সেতুগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য জাইকার সঙ্গে ঋণ সমঝোতা হয়েছে।