বোরো চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক

কাজী জেবেল
পরের সংবাদ» ১৮ জানুয়ারী ২০১৩, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন

উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, শৈত্যপ্রবাহে বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ নানান কারণে বোরো চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা। অন্য ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন তারা। এতে অন্যতম প্রধান ফসল বোরো উত্পাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। অবশ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, শৈত্যপ্রবাহে বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব বোরো চাষে পড়বে। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমস্যা হবে না।
কৃষকরা জানান, আগের মৌসুমে বোরোর দাম না পেয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষীদের। এবার জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উত্পাদন খরচ আরও বাড়বে। বেশি খরচের উত্পাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে কীনা তার নিশ্চয়তা নেই। কোন ভরসায় বোরো চাষ করবেন চাষীরা। তারা আরও জানান, শৈত্যপ্রবাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোরো বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শীতের কারণে চারার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চারা মারাও যাচ্ছে। নতুন করে বীজতলা করতে হচ্ছে। শৈত্যপ্রবাহ হলে আবারও বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মাঠ পর্যায়ে খবর নিয়ে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় বোরো চাষীরা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। তারা বোরোর জমিতে বাদামসহ অন্য ফসল চাষ করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৪৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ ও ১ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার টন চাল উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। মোট জমির মধ্যে ৩১ লাখ ৪৭ হাজার হেক্টরে হাইব্রিড, ১৫ লাখ ৫২ হাজার হেক্টরে উফশী এবং ৮০ হাজার হেক্টরে স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করা হবে। বোরো আবাদের জন্য দেশে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। এবার ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী। এ অঞ্চলে ৮ লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৭ লাখ ৯৯ হাজার হেক্টর, রংপুরে ৭ লাখ ৬০ হাজার, সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ৪ লাখ ৭ হাজার হেক্টর, যশোরে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ও ঢাকা অঞ্চলে ৪ লাখ ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হবে।
সূত্র আরও জানায়, অন্যান্য বছর এ সময়ে দেশের ২০ শতাংশের বেশি জমিতে বোরো চারা রোপণ করা হলেও এ বছর হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ জমিতে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চারা রোপণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি রোপণ করা হয়েছে দেশের হাওর অঞ্চল, বিশেষ করে নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায়। আর বীজতলার ক্ষতির কারণে চারা রোপণে পিছিয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলা। তীব্র শীতের কারণে দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও পঞ্চগড় জেলার অধিকাংশ বীজতলার চারা এখনও রোপণ উপযোগী হয়নি। আবার বেশকিছু এলাকায় চারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুনরায় বীজতলা তৈরি করা হচ্ছে।
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) : আমাদের প্রতিনিধি জোয়ারদার আলমগীর জানান, চরাঞ্চলে বোরো আবাদ বাদ দিয়ে চিনাবাদাম চাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা। ডিজেল, শ্রম, সার, কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধি ও ধানের দাম কম থাকায় বোরো চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তারা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ২০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা থাকলেও কৃষকরা এবার ৪০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করছে। উপজেলার চরাঞ্চল জালালপুর, লোহাজুরী ও মসূয়া ইউনিয়নে সরেজমিনে দেখা যায়, যেসব জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বোরো চাষ হতো সেখানে এখন এ বছর কৃষকরা বাদাম চাষ করছে। জালালপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চরপুক্ষিয়া গ্রামের কৃষক তফুর উদ্দিন ও কাজী মিয়া জানান, এবার ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি মেশিন ভাড়া ও শ্রমিকের মূল্য বেড়ে গেছে। তাছাড়া প্রতি বছর বোরো মৌসুমে সারের জন্য নানা রকম হয়রানির শিকার হতে হয়। পক্ষান্তরে উত্পাদন খরচের চেয়ে ধানের মূল্য কম থাকায় বোরো চাষে প্রচুর লোকসান গুনতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে এ বছর জমিতে চিনাবাদাম চাষ করছি। লোহাজুরী ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হামিদ উদ্দিন শান্তু বলেন, এক একর জমিতে বাদাম চাষে ৪৩ কেজি বাদাম বীজ, ১৪ কেজি ইউরিয়া, ৬২ কেজি টিএসপি, এমওপি ৩৬ কেজি, জিপসাম ৬৪ কেজি, জিংক ৩ কেজি, বোরণ ৩ কেজি ব্যবহারে বাদাম চাষে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এর জন্য সেচের প্রয়োজন হয় না। এক একর জমিতে বাদাম চাষে উত্পাদন খরচ হয় ২০-২২ হাজার টাকা। উত্পাদন হয় ২১-২৪ মণ বাদাম। যার বাজারদর ২ হাজার ৪শ’ টাকা হারে বিক্রয়মূল্য হয় ৫৭-৫৮ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে কৃষক লাভবান হচ্ছে খরচের দ্বিগুণের চেয়ে বেশি। সরকারি হিসাব মতে বোরো ধানের একর প্রতি উত্পাদন খরচ ২৭ হাজার টাকা। উত্পাদন হয় ৫৫-৫৬ মণ। যার মূল্য আসে ২৬-২৭ হাজার টাকা। এতে কৃষকের উত্পাদন খরচ ওঠা ছাড়া কোনো লাভ হয় না। ফলে চরাঞ্চলের কৃষক বোরো চাষ বাদ দিয়ে বাদাম চাষে ঝুঁকছে।
কটিয়াদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার সাহা বলেন, চরাঞ্চলের জমিতে কৃষকদের ধান চাষ না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কারণ বেলে ও দোআঁশ মাটিতে বোরো ধান চাষ করলে ৩৫-৪০ বার সেচ দিতে হয়। এঁটেল মাটিতে ১৫-২০ বার সেচ দিলেই চলে। অধিক সেচের ফলে মাটির উর্বরা শক্তি হ্রাস পায়। ওইসব জমিতে গম, চিনাবাদাম, শীতকালীন সবজি চাষ করলে কৃষকরা অধিক লাভবান হতে পারবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যও রক্ষা পাবে।
জলঢাকা (নীলফামারী) : আমাদের প্রতিনিধি সেলিমুর রহমান জানান, বিগত চার বছরে বিদ্যুতের দাম প্রায় আড়াই গুণ, ডিজেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ ও ইউরিয়া সারের দাম তিনগুণ বাড়ায় বোরো চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন কৃষকরা। ঘন কুয়াশা আর শৈত্য প্রবাহের কারণে কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে বোরো বীজতলা নষ্ট হওয়ায় সঙ্কটে পড়েছেন তারা। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় মোট ১৩ হাজার ৪শ’ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৩ জানুয়ারি ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে চলতি বোরো মৌসুমে প্রতিমণ ধানের উত্পাদন ব্যয় ৭০০ টাকার বেশি পড়বে বলে মনে করছেন কৃষকরা। ফলে এবার জলঢাকা উপজেলায় ইরি-বোরো আবাদে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় গত মৌসুমে ১৫ হাজার ১শ’ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও মোট ১৬ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে কৃষকরা বোরো আবাদ করেছিল। কিন্তু চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪শ’ হেক্টর জমি। উপজেলার খুটামারা এলাকার কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘তেলের দাম বেশি হওয়ায় আগের বছর বোরো আবাদ করি লোকসান হইছে, এ বছর আরও দাম বাড়ি গেলো তাই অল্প জমিত ধান লাগামো চিন্তা করছি।’ গোলমুণ্ডা এলাকার বর্গাচাষী আলীম উদ্দিন জানান, বেশি ঠাণ্ডা হওয়ায় তার বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে আর হঠাত্ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি এ বছর বোরো আবাদ করবেন না।

সাপ্তাহিকী


উপরে

X