Amardesh
আজঃ শনিবার ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ৬ মাঘ ১৪১৯, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 বিশেষ আয়োজন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বিরোধী দমনে সরকারের মামলা-কৌশল : হাতিয়ার পুলিশ, দুদক ও আদালত

মাহাবুবুর রহমান
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
বিরোধী দল ও মত দমনে চূড়ান্ত অস্ত্র হিসেবে মামলাকে ব্যবহার করছে সরকার। আন্দোলন-প্রতিবাদরোধে এটিই সরকারের প্রধান কৌশল। আর এতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আদালত। তৃণমূল থেকে শীর্ষপর্যায় পর্যন্ত সবাইকে আটকে ফেলা হচ্ছে মামলার জালে। এ ইস্যুতে আদালত সরকারের চাহিদা পূরণ করেই চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জামিন নাকচ ও রিমান্ডের অনুমতি প্রদানের পরিসংখ্যান এমন প্রমাণই রাখছে। আর মামলা দায়েরে ভূমিকা রাখছে দুদক ও পুলিশ। খারাপ কাজের সমালোচকরাও একইভাবে সরকারের মামলা-হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
ক্ষমতার শেষ বছরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের বড় কোনো আন্দোলনের আগেই সরকার আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াত ইসলামীকে পর্যুদস্ত করার পর বিরোধী জোটের আন্দোলনে নেতৃত্বে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। এবার সরকারের নজর জিয়া পরিবারের দিকে। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মামলাগুলো সচল করা হচ্ছে। এ সরকারের আমলে গত ২০১১ সালের ৮ আগস্ট খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা জিয়া চ্যারিটেবল দুর্নীতি মামলায় এরই মধ্যে চার্জশিট গ্রহণ করেছে আদালত। উদ্দেশ্যমূলক মামলা দিয়ে আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে মাসাধিককাল ধরে পত্রিকা কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আর বিএনপির যুগ্ম মহাসিচব রুহুল কবির রিজভীও দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ রয়েছেন। একদিকে সাদা পোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি চালাচ্ছে সরকার, অন্যদিকে আদালতও তাদের জামিন দিচ্ছে না। ৩৪ দিন ধরে অফিসে অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন করছেন মাহমুদুর রহমান ও রুহুল কবির রিজভী।
চার বছরে ধরে বিরোধী দল ও মত দমনে সরকার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে পুলিশ, দুদক ও আদালত। ‘ন্যায়বিচার, দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা’ রাষ্ট্রের এ গুরুত্বপূর্ণ তিন প্রতিষ্ঠানের কাজ হলেও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলীয় ব্যক্তিদের ঢালাও নিয়োগ দেয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে এখন জনকল্যাণ উপেক্ষিত। দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করায় দিন দিন গ্রহণযোগ্যতা কমছে প্রতিষ্ঠানগুলোর।
কাগজে-কলমে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হলেও গত চার বছরে ডজনের বেশি আলোচিত ইস্যুতে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে আদালত। প্রধানমন্ত্রীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও প্রতিনিয়ত বিরোধী দল হয়রানির অভিযোগ উঠছে এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক ইস্যুতেও আদালত এখন সরকারের হাতিয়ার। নিয়মিত আদালতের পাশাপাশি রাজপথে বিরোধী দলের কর্মসূচি প্রতিরোধে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘মোবাইল কোর্ট’। আর প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক এজেন্ডা বস্তবায়ন করে পুলিশ পরিণত হয়েছে অনেকটা ক্ষমতাসীন দলের নিয়মিত বাহিনীতে।
সরকার ও বিরোধী জোটের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংঘাতের ইস্যুর দায়ও আদালতের ওপর চাপানো হচ্ছে। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে আদালতের রায়ে নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে ‘তত্ত্বাধায়ক ব্যবস্থা’ বাতিল হওয়ায় এ সংঘাত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। আদালতের নির্দেশনার একাংশ বাস্তবায়নের নামেই মহাজোট সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তুলে দিয়েছে। আর এ ইস্যু নিয়েই রাজনৈতিক অঙ্গনে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছে দেশের ভবিষ্যত্।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে নিয়োজিত আদালত সরকারের উদ্দেশ্যমূলক মামলায় বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে জামিন দিতে টালবাহানা এবং আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের জামিন আবেদন নিয়ে সৃষ্ট হাস্যকর পরিস্থিতি সব মহলে নিন্দিত হচ্ছে। নির্বাহী বিভাগের চাহিদাই কেবল আদালতে প্রতিফলিত হতে দেখে জনমনে এর ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। গত ১১ জুনের সমাবেশের আগে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের জামিন না দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের চাহিদা পূরণ, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের রায়, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে বের করা, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাড়ানো, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে কারাদণ্ড প্রদানের ঘটনা আদালতে সরকারি এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রমাণস্বরূপ। উল্লেখিত ইস্যুগুলো মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত নেয়া কিংবা প্রকাশ্য জনসভায় আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের পরই আদালত তা বাস্তবায়ন করে।
একইভাবে ‘শান্তি শৃঙ্খলা নিরাপত্তা প্রগতি’ স্লোগানে পুলিশ বাহিনী প্রতিটি নাগরিককে সেবা প্রদান করে বসবাস ও কাজের জন্য সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করার ঘোষণা থাকলেও বাস্তব দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনগণের প্রহরী এ বাহিনীকে নিরাপদ মনে করে না সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক লাঠিয়াল আর ঘুষ নেয়ার বাহিনীতে পরিণত হয়েছে পুলিশ। বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য মিথ্যা মামলা দায়ের, একের পর এক রিমান্ড, বাসায় বাসায় তল্লাশি, রাজপথ দখলে রাখা ও সাংবাদিক নির্যাতনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে এ বাহিনী। সন্ত্রাসী, ডাকাত, চোরাচালান রোধসহ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক নিরাপত্তা নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই তাদের। এমন অপেশাদার কর্মকাণ্ডের জন্য সৃষ্ট পরিস্থিতিতে খোদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু গত বছর ২৯ মে পুলিশের কাছ থেকে দূরে থাকতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। আর ‘বাংলাদেশ আমার অহঙ্কার’ স্লোগানে র্যাব কাজ করলেও সম্প্রতি তাদের বিরোধী দল দমনে ব্যবহার করা হচ্ছে। শক্ত হাতে রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ করতে রাজপথে বেপরোয়া অবস্থানে থাকে তারা। গুম-খুনে র্যাবের জড়িয়ে পড়ার বিষয়েও অভিযোগ আছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার ঘটনায় র্যাব জড়িত বলে সরাসরি অভিযোগ তোলেন।
‘স্বাধীন’ দুর্নীতি দমন কমিশনও সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী সমালোচিত দুর্নীতিবাজ সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন ও সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সার্টিফিকেট দেয়ায় দুদকের গ্রহণযোগ্যতা সাধারণের কাছে কমছে। সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াসহ বিরোধী নেতাদের মামলাগুলো সরকারের নির্দেশে সচল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আন্দোলন দমাতে মামলা : আন্দোলন কর্মসূচি ঠেকাতে প্রথম তিন বছরে রাজপথের সাধারণ কর্মীদের বিরুদ্ধে সরকার মামলা-গ্রেফতার চালিয়েছে। চতুর্থ বছরে এসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশ্যমূলক মামলা দিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়। ক্ষমতার চার বছর পূর্তির দিনেও প্রধান বিরোধী দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কারারুদ্ধ রাখে মহাজোট সরকার। তিনি ৩৬ দিন ধরে কারাবন্দী আছেন। আর এবার বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার মামলাগুলো সচল করা হচ্ছে। এক-এগারোর জরুরি ও বর্তমান সরকারের আমলে দায়ের করা উদ্দেশ্যমূলক মামলাগুলো সচল করে বিরোধী আন্দোলনকে স্তব্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে। অবশ্য বেগম জিয়াকে আগামী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে সরকার এমন উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে কঠোরতা প্রদর্শনের হুমকি দিয়েছেন তারা।
জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে ২৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচটি, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ১৪টি, আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে পাঁচটি এবং তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এই সরকারের আমলে একটি করে মামলা দেয়া হয়েছে, অন্যগুলো জরুরি সরকারের আমলের।
বেগম জিয়া সব মামলায় জামিনে আছেন। তবে গত মঙ্গলবার তার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় চার্জশিট গ্রহণ করেছে আদালত। এই সরকারের আমলে দুদকের দায়ের করা এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ৩১ জানুয়ারি তারিখ ধার্য করা হয়।
এছাড়া জরুরি সরকারের সময় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা চারটি মামলা স্থগিত ছিল। নাইকো দুর্নীতি মামলা বাতিলে ২০০৮ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্টের দেয়া রুল চূড়ান্ত শুনানির জন্য সম্প্রতি আদালতে উপস্থাপন করে দুদক। আর বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা ও বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি মামলা এক-এগারো সরকারের শেষ দিকে স্থগিত হলেও সম্প্রতি চালু করতে সরকার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে।
আর তারেক রহমানের ১৪টি মামলার মধ্যে চারটি স্থগিত রয়েছে। তিনি চিকিত্সার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকায় অনুপস্থিতি দেখিয়ে জামিন বাতিল করে আদালত। আর অর্থ পাচার মামলায় কোকোর ছয় বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। ডা. জোবাইদা রহমানের মামলাটি স্থগিত এবং তিনি এ মামলায় জামিনে আছেন।
এদিকে, সরকারের রোষানলে পড়ে কারারুদ্ধ হয়ে আছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সর্বমহলে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত এই নেতাকে গত ১০ ডিসেম্বর থেকে কারাবন্দি রেখেছে সরকার। ৯ ডিসেম্বর তার নেতৃত্বে সারাদেশে সফল রাজপথ অবরোধ কর্মসূচি পালনের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। আর ওই কর্মসূচিতে গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ এনে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের করা ৩৭টি মামলায় জড়ানো হয় তাকে।
এরপর শুরু হয় মির্জা ফখরুলকে নিয়ে সরকারের টানাহেঁচড়া। ১১ ডিসেম্বর পল্টন থানায় দায়ের করা সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি ভাংচুর এবং শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা অগ্নিসংযোগ ও বোমা বিস্ফোরণ মামলায় ৭ দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। রিমান্ড মঞ্জুর না করে আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। পরে জামিন আবেদন করলে ২৪ ডিসেম্বর মহানগর দায়রা জজ তাও নামঞ্জুর করে। গত ২ জানুয়ারি হাইকোর্ট থেকে এই দু’মামলায় জামিন পেলে পরেরদিন তাকে সূত্রাপুর ও মতিঝিল থানার দু’টি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ১৫ জানুয়ারি সূত্রাপুর থানার একটি মামলায় জামিন পেলে মির্জা ফখরুলকে কলাবাগান এবং পল্টন থানার অন্য দুই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আর এ মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে কলাবাগান থানায় পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা, মারধর, হত্যা চেষ্টা ও চুরি এবং পল্টন থানার সরকারি কাজে বাধা, হত্যা চেষ্টা ও ককটেল বিস্ফোরণ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ দু’মামলায় ১০ দিন করে ২০ দিন রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। রিমান্ড শুনানির জন্য আগামী ২৪ ও ২৭ জানুয়ারি তারিখ ধার্য করা হয়েছে। একই মামলায় আসামি করা হয়েছে বিএনপির দফতরের দায়িত্বে নিয়োজিত যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে। তিনি গত ১০ ডিসেম্বর থেকে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। একাধিকবার জামিন চাইলেও তাকে জামিন দিচ্ছে না আদালত।
এর আগে গত বছরের মে’তে পুলিশ ও আদালতকে ব্যবহার করে সরকার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের কারারুদ্ধ করে। একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মামলায় ৩০ এপ্রিল পুলিশের দায়ের করা উদ্দেশ্যমূলক মামলায় শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার এড়িয়ে ৭ মে হাইকোর্টে উপস্থিত হয়ে জামিন চান। শুনানির পর তাদের জামিনের বিষয়ে আদালত বিভক্ত রায় দেন। পরে একটি বেঞ্চে আসামিদের ১৬ মে’র মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দেশ অনুযায়ী তারা আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এত বেশি শীর্ষ নেতাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে রেকর্ড গড়ে আদালত। পরবর্তীতে তাদের জামিন নিয়ে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে আদালতে। বহুল আলোচিত ১১ জুনের সমাবেশের আগে তারা জামিন পাননি। ১২ জুন মুক্তি পান তারা।
মাহমুদুর রহমানের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা ও জামিন দিতে বিচারপতির অপারগতা : শুধু বিরোধী দল নয়, বিরোধী মত দলনেও সরকারের প্রধান হাতিয়ার মামলা, পুলিশ ও আদালত। দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়ে গত ৩৪ দিন ধরে পত্রিকা কার্যালয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। জামিন চাইতে গেলেও উচ্চ আদালত তাকে জামিন দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ পরিস্থিতিতে তিনি অনিশ্চিত ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। উচ্চ আদালতে জামিন না পেয়ে তিনি জনতার আদালতে বিচার চেয়েছেন। এর আগে গোয়েন্দা সংস্থার সাজানো মামলায় তাকে ২০১০ সালের ১ জুন পত্রিকা কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করা হয়। আদালত অবমাননার মামলায় তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়ে মোট ১০ মাসের অধিক সময় কারাবন্দি রাখা হয়।
প্রসঙ্গত, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ও তার প্রবাসী বন্ধু আহমেদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপ সংলাপের কিছু অংশ আমার দেশ-এ প্রকাশের পর সরকার তথ্য অধিকার আইন ভঙ্গ ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে গত ১৩ ডিসেম্বর পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও প্রকাশক আলহাজ হাসমত আলীর বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। এ মামলায় আগাম জামিন পেতে গত ৮ জানুয়ারি মাহমুদুর রহমান আবেদন করেন হাইকোর্টে। দু’টি বেঞ্চই তার আবেদন ফেরত দেয়। পরে তিনি তাত্ক্ষণিক হাইকোর্ট থেকে তার পত্রিকা কার্যালয়ে ফিরে আসেন। এখন তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে তিনি পত্রিকা কার্যালয়ে সম্পাদকের কক্ষেই থাকছেন। কার্যালয়ের সামনে সাদা পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোক ঘোরাফেরা করছে।
উল্লেখ্য, গ্রেফতারের পর কয়েক দফা রিমান্ডের অনুমতি দিয়ে সাংবাদিক ও সম্পাদক নির্যাতনে সহযোগিতাও করছে আদালত। এই সরকারের আমলে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ১৩ দিন, সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদ ও শীর্ষ নিউজ সম্পাদক একরামুল হককে কয়েক দফা রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
আলোচিত ইস্যুতে সরকারের আদালত ব্যবহার : আলোচিত সব ইস্যুতে আদালতকে ব্যবহার করে সরকার নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। বহুল আলোচিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাড়ানো এবং বেগম খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদে সরকারের সহায়ক ছিল আদালত।
চলমান রাজনৈতিক সংকটের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তটি প্রথম আসে আদালত থেকেই। বহুল সমালোচিত ও সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক এই রায় দেন।
২০১১ সালের ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ব্যাপক সমালোচনা শেষে এটি আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। এর কিছুদিন পরই ওই বছরের ১০ মে আদালত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা দেয়। আর আদালতের এ রায়ের একাংশকে অনুসরণ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে। সরকার এক্ষেত্রে দায় না নিয়ে আদালতের রায়কেই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক ও বেগম খালেদা জিয়াকে শহীদ মঈনুল রোডের বাড়িছাড়া করার ক্ষেত্রেও সরকার নির্দেশনা জারি করে। পরে তারা আদালতের শরণাপন্ন হলে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটান বিচারপতিরা।
বিশিষ্টজনের অভিমত : আদালত ও পুলিশে দলীয়করণ এবং সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বারবার অভিযোগ করছে। এমনকি বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া-ই একাধিক অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে মামলার রায় দেয়ার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, ‘বিচারপতি খায়রুল হক বিচার বিভাগের দলীয়করণ ও ধ্বংসের জন্যে দায়ী। তিনি টাকার বিনিময়ে কিছু মামলার রায় দিয়েছেন। যা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।’ বেগম খালেদা জিয়া পুলিশের বাড়াবাড়ি নিয়েও অধিকাংশ অনুষ্ঠানে কথা বলেন এবং অতিউত্সাহীদের ভবিষ্যতে বিচার করা হবে বলে একাধিকবার হুশিয়ার করে দিয়েছেন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এএসএম শাহজাহান সাংবাদিকদের বলেন, প্রচলিত আইনে পুলিশের জবাবদিহির সুযোগ কম। তা ছাড়া রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও আছে। এটা দিন দিন বাড়ছে। এখন যেসব ঘটনা ঘটছে, এটা তারই ফল। কিন্তু পুলিশ সংস্কারের জন্য যে আইনের প্রস্তাব করা হয়েছিল, তাতে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা ছিল। পুলিশ আইন সংস্কার না হলে এ পরিস্থিতি কোনো দিনই পাল্টাবে না।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট খন্দকার মাহবুব হোসেন আমার দেশ-কে বলেন, সরকার আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাজনৈতিক ইস্যু নিজেদের মতো করে ফয়সালা করছে। আদালত জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশ্রয়স্থল। এটা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হলে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে জনগণের আস্থা কমবে। তিনি বলেন, সরকারের সব স্পর্শকাতর ইস্যুতে আদালতের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত এসেছে। বেশরিভাগই সরকারের অনুকূলে গেছে। এর ফলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে যে, আদালত নিরপেক্ষ নয়। এটা দেশের জন্য কোনো অবস্থায়ই শুভ নয়।