Amardesh
আজঃ শনিবার ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ৬ মাঘ ১৪১৯, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 বিশেষ আয়োজন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

পিপার স্প্রে : এখন রাজনীতির আলোচিত চরিত্র

নেসার উদ্দিন আহাম্মদ
পরের সংবাদ»
রাজনীতিতে এখন আলোচিত বিষয় পিপার স্প্রে। রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে নতুন এই অস্ত্রটিই ব্যবহার করছে সরকার। বিরোধী দলের একটি মিছিলে প্রথম এটি ব্যবহৃত হলেও আলোচনায় আসে শিক্ষকদের ওপর মারার পর। এতে আহত হয়ে একজন শিক্ষক মারাও গেছেন। হাইকোর্ট পিপার স্প্রে কেন বন্ধ হবে না জানতে চেয়ে সরকারের প্রতি রুলও জারি করেছে। কিন্তু সরকার হাইকোর্টের রুলকে পাত্তাই দেয়নি। গতকালই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, বিক্ষোভ ঠেকাতে ফুল নয়, পিপার স্প্রেই মারা হবে।
কি এই পিপার স্প্রে? এর ক্ষতিকর দিক কি? এ নিয়ে আমার দেশকে বলেছেন চিকিত্সকরা।
দেশে পুলিশের নতুন অস্ত্র পিপার (মরিচের গুঁড়া) স্প্রে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। কারণ, এই স্প্রেতে অনিয়ন্ত্রিত কাশি শুরু হয় এবং হেঁচকি ওঠে। ফলে শ্বাসকষ্টের রোগীরা এ সময় মারা যেতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তিরা অস্থায়ী অন্ধ হয়ে যায় এবং প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে।
এদিকে রাজধানীতে পিপার স্প্রেতে আক্রান্ত হয়ে সেকান্দর আলী নামে এক শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে গত মঙ্গলবার। চিকিত্সকদের ধারণা, ওই শিক্ষকের শ্বাসকষ্টজনিত কোনো রোগ থাকতে পারে। অপরদিকে ২০১১ সালে আমেরিকায় ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী ছাত্রদের ওপর পুলিশ পিপার স্প্রে ছিটায়। এ ঘটনার দায়ে আদালতের আদেশে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২১ ছাত্রকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০ লাখ ডলার দিতে সম্মত হয়।
ইন্টারনেট থেকে জানা গেছে, পিপার স্প্রে বা ওলিওরেজিন ক্যাপসিকাম একটি অশ্রু নির্গমনকারী যৌগ। যা চোখের অশ্রুসজল করে তোলে। এর সক্রিয় উপাদান একটি প্রদাহ সৃষ্টিকারী পদার্থ যা চোখ এবং শ্বাসতন্ত্রে ঝিল্লি ফুলে যাওয়ার জন্য দায়ী। এটা তীব্র ব্যথা সৃষ্টি করে এবং সাময়িক অন্ধত্ব এনে দেয়। পিপার স্প্রে সাধারণত মানুষ ও জীবজন্তুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহার হয়। এছাড়া দাঙ্গা দমনকারীদের নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার করা হতো।
পিপার স্প্রে বা ওলিওরেজিন ক্যাপসিকাম মূলত মরিচের ঝাল সৃষ্টিকারী যৌগটির উচ্চ ঘনত্বসম্পন্ন দ্রবণ। প্রস্তুতকারক কোম্পানি এই ঘন তৈল সদৃশ যৌগটির সঙ্গে পানি, গ্লাইকল ও নির্গমক পদার্থ যেমন নাইট্রোজেন মিশ্রিত করে থাকে। এটা শুধু আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা আইনগত কারণে ব্যবহার করতে পারেন।
উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটু পিপার স্প্রে সম্পর্কে জানান, চিকিত্সা বিজ্ঞানে যতদূর জানা যায়, শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি রোগীদের ক্ষেত্রে পিপার স্প্রে ভীষণভাবে ক্ষতিকর এবং এ ধরনের ব্যক্তিদের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। শ্বাসতন্ত্রের ভেতরে এই স্প্রে প্রবেশ করলে শ্বাসতন্ত্র এলাকা ফুলে যায়। শ্বাসকষ্টজনিত রোগীরা মারাও যেতে পারে। তিনি বলেন, যেহেতু এই স্প্রের প্বার্শপ্রতিক্রিয়া রয়েছে সেহেতু এই স্প্রে ব্যবহার না করে কাঁদানো গ্যাস ব্যবহার করা উচিত।
মেডিসিন ও চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, পিপার স্প্রে ব্যবহারে সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করতে বাধ্য করে। চোখের জ্বালাপোড়া এত বেশি হয়, মনে হয় চোখের ভেতর বয়েলিং হচ্ছে। চোখের চিকন রক্তনালিগুলো ফুলে যায়। এর ফলে সাময়িকভাবে অন্ধ হয়ে যায়। শ্বাসকষ্ট ও অনিয়ন্ত্রিত কাশি শুরু হয়। নাক দিয়ে সর্দি ও চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে। এছাড়া চোখে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এটা ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট স্থায়ী হয়। তবে এই স্থায়ীত্বটা নির্ভর করে দ্রবণের (স্প্রে) ঘনত্বের ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, পিপার স্প্রে আক্রমণাত্মক আচরণসমৃদ্ধ প্রতিবাদকারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। কারণ ওই ব্যক্তিকে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরানোর জন্য। আটককৃত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যবহার হলে ওই ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত কাশি, হেঁচকি, শ্বাসকষ্ট হয়। শ্বাসকষ্ট ব্যক্তিদের জন্য মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এই স্প্রে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে।
রাজধানীতে শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর পুলিশের জলকামানের পানি ও পিপার স্প্রে মারার ফলে অসুস্থ মো. সেকান্দর আলী নামে পটুয়াখালীর এক মাদরাসা শিক্ষক গত মঙ্গলবার মারা যান। ৯ জানুয়ারি বুধবার প্রেস ক্লাবের সামনে ও বৃহস্পতিবার শহীদ মিনারে দু’দফায় পুলিশ ছোড়া পিপার স্প্রে সেকান্দর আলীর সরাসরি নাক, মুখ এবং চোখে প্রবেশ করলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৫ জানুয়ারি তিনি মারা যান।
জিজিএন টুয়েন্টিফোর ডট কম থেকে জানা যায়, ২০১১ সালের আমেরিকায় অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের দিনগুলোতে বিক্ষোভের সময় ছাত্রের ওপর পুলিশ পিপার স্প্রে ছিটিয়েছিল। স্যাক্রামান্টো আদালতে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগকারী ২১ ছাত্রের প্রত্যেককে ৩০ হাজার ডলার এবং তাদের আইনজীবীদের ৩০ হাজার ডলার দেয়। এছাড়া, এ ঘটনার সময় অন্য কোনো ছাত্র গ্রেফতার বা মরিচের গুঁড়া ছিটানোর শিকার হওয়ার প্রমাণ দিতে পারলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য আরও এক লাখ ডলার আলাদা করে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।
ইন্টারনেট থেকে আরও জানা যায়, সাময়িকভাবে আক্রমণাত্মক মানুষ এবং জীবজন্তুকে অক্ষম করতে ১৯৭৩ সালে আমেরিকায় এফবিআই পিপার স্প্রে ব্যবহার করত। ১৯৯১ সালে থেকে আমেরিকান আর্মি ব্যাপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন শুরু করে। জাপানের সামুরাই যোদ্ধারা তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য মরিচের গুঁড়া ব্যবহার করত। চীনারা লাল মরিচকে তেলে গরম করে ধোঁয়া সৃষ্টি করে সেই ধোঁয়া শত্রুদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করত।