Amardesh
আজঃঢাকা, মঙ্গলবার ৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২৫ পৌষ ১৪১৯, ২৫ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

এলাকাভিত্তিক জনপ্রিয় নেতারা গুম ও হত্যার শিকার হচ্ছেন

নাছির উদ্দিন শোয়েব
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
এলাকাভিত্তিক জনপ্রিয় নেতারা গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে আটকের পর তাদের নির্মম পরিণতি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিরোধী জোটের আন্দোলন ঠেকাতে, দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।
কখনও র্যাব, কখনও ডিবি, পুলিশ আবার কখনও গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে সক্রিয় নেতাদের আটক করে গুম করা হচ্ছে। গত চার বছরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, ছাত্রদল, যুবদলসহ রাজনৈতিক নেতারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে আটক হওয়ার পর নির্মম পরিণতির শিকার হয়েছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, যশোরের নাজমুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম বাছা চেয়ারম্যানসহ বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতাকে আটক করে নেয়ার পর আর খোঁজ মেলেনি। গুম, গুপ্তহত্যা নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ-আতঙ্কের মধ্যে শনিবার রাতে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলামের হাতকড়া পরা লাশ উদ্ধার করা হয়। আত্মীয়স্বজনরা জানিয়েছেন, র্যাব পরিচয় তাকে আটক করে নেয়ার পর হাতকড়া লাশ পাওয়া যায়।
এ ব্যাপারে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান বলেন, কুষ্টিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে আটকের পর হাতকড়া পরা রফিকুল ইসলাম মজুমদারের লাশ উদ্ধার ও অধিকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে গুমের ঘটনা চলমান। প্রথমে ব্যক্তিকে আটক করে নেয়া হয় ও পরে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গুমের ব্যাপারে ভয়াবহ পরিণতি হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি অভিযোগ আসছে। এতেই প্রমাণ করে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি কোন পর্যায় আছে। তিনি বলেন, এ থেকে পরিত্রাণের জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলন, প্রতিরোধ গড়ে তোলা ও মানবাধিকার কর্মীদের সোচ্চার হতে হবে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী আ্যাাডভোকেট এলিনা খান বলেন, আমি মনে করি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অথবা অন্য কোনো সংস্থার নামে কোনো ব্যক্তি আটক করা হলে সরকারের উচিত ওই ব্যক্তির সন্ধান দেয়া। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে পুলিশ, র্যাব বা অন্য কোনো সংস্থার নামে আটক করার পর আর খোঁজ পাওয়া যায় না। এর দায়দায়িত্বও কোনো সংস্থা নেয় না। তাই সরকারেরর উচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে একটি সেল তৈরি করা। এ সেলের কাজ হবে কোনো ব্যক্তি আটক হলে তার সঠিক তথ্য আটক হওয়া ব্যক্তির স্বজনকে প্রদান করা। মামলার আসামি হিসেবে বা অন্য কোনো কারণে আটক হলেও তার স্বজনদের সঠিক তথ্য-প্রদান করা আইনের বিধান রয়েছে। আর যদি সরকারের কোনো সংস্থা আটক না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে অপরাধ থাকে তবে তারও রহস্য উন্মোচন বা ব্যক্তিকে উদ্ধার করার দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থারই। তিনি বলেন, ‘আটক করিনি, আমরা জানি না’ এসব কথা বলে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে যেহেতু বার বার এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, আর আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা অস্বীকার করে আসছে তাই এর একটি সুষ্ঠু সমাধান হওয়া উচিত। এটি সরকারেরই দায়িত্ব। কেন না এটি সরকার তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূতির বিষয়। আর কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।
অনুসন্ধন অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো। এর মধ্যে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও গাড়িচালক আনসার আলী বনানীর সিলেট হাউজ বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। গভীর রাতে বনানী ২ নম্বর রোডে সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তার ব্যবহৃত গাড়িটি উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। এ ব্যাপারে আদালতে একটি রিট করা হয়। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস ও আদালতের নির্দেশের পরও ইলিয়াস আলীকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারেনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। জানা গেছে, বিএনপির রাজনীতিতে সিলেটে ইলিয়াস আলীর বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। এ কারণে তাকে টার্গেট করা হতে পারে।
এদিকে, ২০১০ সালের ২৫ জুন রাতে রাজধানীর ইন্দিরা রোড থেকে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির সক্রিয় নেতা চৌধুরী আলম সাদা পোশাকধারীদের হাতে আটক হয়ে এখন পর্যন্ত নিখোঁজ। এ বিষয়ে আদালতে রিট এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবপর্যায় লিখিত আবেদন করা হয়। চৌধুরী আলমের ছেলে আবু সাইদ চৌধুরীর হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়েরের পরিপ্রেক্ষিতে চৌধুরী আলমকে দ্রুত খুঁজে বের করতে পুলিশের আইজি ও র্যাবের ডিজিকে দেড় বছর আগে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। পারিবারিক সূত্র জানায়, আদালতের নির্দেশের পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা চোখে পড়ছে না। এর আগে চৌধুরী আলম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু পুলিশ এ ঘটনা তদন্ত করছে না।
অন্যদিকে, অপহরণের পর গুপ্তহত্যার হত্যার শিকার যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলামের ঘটনায় করা মামলাটিও তদন্ত করছে না পুলিশ। ২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামটরে নিজ ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে বের হয়ে আর বাসায় ফিরে আসেননি। পরে গাজীপুরে তার লাশ পাওয়া যায়। তার স্ত্রী সাবিরা সুলতানা জানান, এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় করা মামলা পুলিশ তদন্ত করে অপহরণকারীদের শনাক্ত করছে না। এছাড়া অপহরণের পর র্যাব প্রধান কার্যালয়, র্যাব-২ এর কার্যালয়ে রাতভর অনুনয় বিনয় করা হয়েছে। পরে তারা জানতে পারেন গাজীপুরের দক্ষিণ সালানা নামক স্থানে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের পাশে লাশের সন্ধান পায় পরিবার। কারা তাকে অপহরণ করে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখেছে এক মাসেও পুলিশ সে তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি।
২০১০ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার গাজীপুর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বিএনপি নেতা ও চট্টগ্রামের করলডেঙ্গার ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বাঁচাকে সাদা পোশাকে অপহরণ করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর বাঁচা চেয়ারম্যানকে র্যাব কার্যালয়ে আনা হয়েছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বোয়ালখালীর কয়েকশ নারী পুরুষ র্যাব-৭ এর বহদ্দারহাট কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে। এখনও তার খোঁজ মেলেনি। এদিকে, বরিশালের উজিরপুরের বিএনপি নেতা হুমায়ুন খান ঢাকার মলিবাগ থেকে সাদা পোশাকধারীদের হাতে আটকের পর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ। ২০১০ সালের ২৩ নভেম্বর সকালে হুমায়ুন তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢাকার সূত্রাপুরের ৪৫/ক, ঢালকানগর ফরিদাবাদের বাসা থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় মফিজুলের বাসায় যান। সেখান থেকে সাদা পোশাকের একদল লোক নিজেদেরকে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে আটক করে। এ ঘটনায় হুমায়ুনের ছোট ভাই মঞ্জু খান বাদী হয়ে রামপুরা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। গত বছর ৪ ফেব্রুয়ারি র্যাব পরিচয়ে আটক করে নেয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী ছাত্র আল-মোকাদ্দেস ও ওয়ালিউল্লাহের খোঁজ মেলেনি ১১ মাসেও। ঢাকায় ব্যক্তিগত কাজ শেষে হানিফ এন্টারপ্রাইজের গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ১১টায় রাজধানীর কল্যাণপুর বাস কাউন্টার থেকে ঝিনাইদহ-৩৭৫০ নম্বর গাড়ির সি-১ ও সি-২ সিটে বসে ক্যাম্পাসে আসার পথে রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মাঝামাঝি সময়ে সাভারের নবীনগর পৌঁছলে র্যাব-৪ এর সদস্য পরিচয় দিয়ে গাড়িটি থামানো হয়। এ সময় র্যাবের পোশাক ও সাদা পোশাকধারী ৮-১০ জন ব্যক্তি গাড়িতে উঠে আল মোকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় বলে গাড়িতে অবস্থানকারী যাত্রী ও সুপার ভাইজার সুমন নিশ্চিত করেন। এরপর থেকে র্যাবের হাতে আটক দুই ছাত্রের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। র্যাব তাদের আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।
সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনারকে র্যাব আটক করে গুম করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গত বছর ৬ এপ্রিল স্থানীয় একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেন গত মঙ্গলবার গুম হওয়া কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সভাপতি এম ইলিয়াস আলীসহ জেলা ও মহানগর বিএনপি নেতারা এবং আটক দিনারের স্বজনরা।
২০১২ সালের ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায শ্রমিক নেতা আমিনুলের নিজ শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের (বিসিডাব্লিউএস) সাভার অফিসের কাছ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে তাকে অপহরণ করা হয়। পরদিন ৫ এপ্রিল সকালে টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার পুলিশ সদস্যরা টাঙ্গাইলের ব্রাহ্মণ শাসন মহিলা মহাবিদ্যালযরে প্রধান গেটের সামনের রাস্তা থেকে আমিনুলের লাশ উদ্ধার করে। এ সময় আমিনুলের দেহের ডান হাঁটুর নিচে একটি কাপড বাঁধা ছিল যেখানে জমাটবাঁধা রক্ত ছিল এবং তার দুই পায়ের আঙুল থেঁতলানো ছিল। মামলার তদন্ত করছে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে এ মামলার কোনো ক্লু পাচ্ছেন না তারা। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন, শ্রমিক আন্দোলনসহ যুক্তরাষ্ট্রের তাগাদা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না প্রশাসন। তাছাডা এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে সরকারের একটি নিরাপত্তা সংস্থার কিছু সদস্য জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের অভিযোগ-শ্রমিক সংগঠনের এই জনপ্রিয় নেতাকে পরিকল্পিতভাবে আটকের পর হত্যা করা হয়েছে।