Amardesh
আজঃঢাকা, মঙ্গলবার ৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২৫ পৌষ ১৪১৯, ২৫ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

দলবাজদের দৌরাত্ম্যে প্রশাসন তছনছ

কাদের গনি চৌধুরী
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
মহাজোট সরকারের চার বছরে নিষ্পিষ্ট হতে হয়েছে জনপ্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তাকে। তবে দলবাজ কর্মকর্তাদের ছিল পোয়াবারো। একটানা চার বছর শাস্তিমূলক ওএসডি রাখা যেমন হয়েছে, তেমনি দেড় বছরের মাথায় সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সচিব পদোন্নতি পাওয়ার মতো তুঘলকি কাণ্ডও ঘটেছে। ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী অফিসারটি পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে যখন উপসচিব হিসেবে কাজ করছেন তখন তার দলবাজ বন্ধুটি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ক্ষমতা এনজয় করছেন। এভাবে একচক্ষু প্রশাসনের কারণে হতাশা ও স্থবিরতা বিরাজ করছে জনপ্রশাসনে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দলীয়করণমুক্ত, অরাজনৈতিক ও গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে বলা হয়েছিল, যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে। গত চার বছরে এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটিই রক্ষা হয়নি। বরং জনপ্রশাসনের দলীয়করণ ও পদোন্নতি বঞ্চনা অতীতের সব রেকর্ড ছেড়ে গেছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পাশাপাশি এখনও বাড়ছে ওএসডি কর্মকর্তার সংখ্যা।
সরকারের চার বছরের আলোচিত ছিল প্রশাসনের গতি বাড়াতে সরকারের ঊর্ধ্বতনদের দফায় দফায় তাগাদা, সিনিয়র সচিবের পদ সৃষ্টি, রেকর্ড পদোন্নতি ও সুপারসিড বঞ্চনা, নিয়োগ নিয়ে হাঙ্গামা, কর্মকর্তাদের নতুন সংগঠন, সিভিল সার্ভিস আইন বাতিল, সাবেক ৫০ আমলাকে সচিবালয়ে নিষিদ্ধ,ওএসডি ন্যস্ত’র নামে বেতন বন্ধ করে দেয়া এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের ঘটনা। এর মধ্যে ২০১০ সালে পাবনায় নিয়োগ নিয়ে হাঙ্গামার ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তোলে। এছাড়া আমলাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর জাল হচ্ছে সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনেকটা নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। একই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের এক রায় পুরো প্রশাসনকে নাড়িয়ে দেয়। ওই দিনের রায়ে বলা হয়, বর্তমান ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অবৈধ, বেআইনি ও বাতিল করা হলো। তিন বাহিনীর প্রধান ও সচিবদের উপরে জেলা জজদের পদমর্যাদা দিতে হবে। এ রায় নিয়ে ওই সময় প্রশাসনে বিভিন্ন ধরনের আলোচনার জন্ম হয়। পরে অবশ্য সরকারপক্ষ আপিল করলে রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে। একই বছরের ১ এপ্রিল নিজের নিরাপত্তা চেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দেন বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. সা’দত হুসাইন। দেশের ইতিহাসে এ প্রথম সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা বাড়াতে চিঠি দেন।
স্থবির, হতাশা আর ক্ষোভ : স্থবির, হতাশা আর ক্ষোভের মধ্য দিয়েই ২০১২ সাল অতিবাহিত করেছেন জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে রেকর্ড সংখ্যক সাড়ে ছয়শ’ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হলেও গতি আসেনি মাঠ প্রশাসনে। জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সততা বিবেচনায় না নিয়ে কেবল দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি ও পদায়ন করায় এমন স্থবিরতা দেখা দেয় বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়।
বর্তমান সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত প্রশাসনে মোট ১,৯০৬ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। এর মধ্যে ৬০ জন সচিব, ২৯৩ জন অতিরিক্ত সচিব, ৬৮৮ জন যুগ্ম সচিব এবং ৮৬৫ জন উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি পান।
সরকার দায়িত্ব নেয়ার এক মাসের মধ্যেই ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সচিব পদে সাতজন পদোন্নতি পান। পছন্দের সাত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন মেধাবী অফিসারকে বাদ দেয়া হয়। ওই পদোন্নতির দু’দিন পর ২৭ জানুয়ারি অতিরিক্ত সচিব পদে ৭২ জনকে পদোন্নতি দেয়ার সময়ও অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করা হয়। তখনও দলীয়করণের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালে উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে ৫০৩ জনকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে ৫৫৩ জনকে বঞ্চিত করা হয়। বঞ্চিত কর্মকর্তারা বেশিরভাগই পদোন্নতির যোগ্য ও মেধা তালিকায় এগিয়ে ছিলেন। একই বছরের অক্টোবরে সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন জনপ্রশাসনের ৪৩ জন কর্মকর্তা। এদের মধ্যে সচিব হন অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ১২ জন ও অতিরিক্ত সচিব হন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের ৩১ জন কর্মকর্তা। এ পদোন্নতিতেও আগের মতোই বঞ্চিত হন বেশকিছু কর্মকর্তা। সর্বশেষ গত বছরের প্রশাসনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল প্রশাসন কাঁপানো পদোন্নতি ও বঞ্চনা। পদ ছাড়াই পদোন্নতি দেয়া হয় অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদে ৬৪৯ কর্মকর্তাকে। পাশাপাশি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত করা হয় প্রায় হাজার খানেক কর্মকর্তাকে। এ পদোন্নতিতে ১২৭ জন যুগ্ম সচিবকে অতিরিক্ত সচিব, ২৬৪ জন উপসচিবকে যুগ্ম-সচিব এবং ২৫৮ জন সিনিয়র সহকারী সচিবকে উপসচিব করা হয়। এ পদোন্নতিতে সব ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত করা হয় ৯০০’র বেশি কর্মকর্তাকে। এদের মধ্যে অনেকে তৃতীয় ও চতুর্থবারের মতো বঞ্চিত হন।
শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় পদ না থাকায় এক বছর ধরে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আগের পদে ইনসিটু অবস্থায় দায়িত্ব পালন করছেন। এতে পদোন্নতি পেয়েও অনেক কর্মকর্তা এখন হতাশায় ভুগছেন। পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে যেমন হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে, তেমনি পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তারা দায়িত্বপালনে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অসংখ্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এখন কনিষ্ঠ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে চাকরি করছেন।
২৪ বছরের সিনিয়র জুনিয়র একই পদে : সরকারের একচোখা নীতির কারণে জনপ্রশাসনে পদোন্নতিবন্ধ্যত্ব কাটছে না। শুধু সিনিয়র সহকারী সচিব পদে কাজ করছেন ১৬টি ব্যাচের কর্মকর্তারা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ২৪ বছরের সিনিয়র ও জুনিয়র কর্মকর্তারা একই পদে কাজ করছেন। একই ব্যাচের কোনো কোনো কর্মকর্তা যখন সচিব হিসেবে ক্ষমতা এনজয় করছেন, তখন সিনিয়র সহকারী সচিব পদে কাজ করছেন ওই ব্যাচেরই অনেকে। দলীয় কালার না থাকায় এসব কর্মকর্তা বারবার পদোন্নতিবঞ্চিত হন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও এমন নজির নেই।
উপ-সচিব পদেও একইভাবে ৯টি ব্যাচের ১ হাজার ৫৪০ কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। চাকরিজীবনের ১২ বছরের জুনিয়র ও সিনিয়র কর্মকর্তাকে একই পদে কাজ করতে হচ্ছে। ফলে প্রশাসনজুড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। কাজের ক্ষেত্রে চেইন অব কমান্ড থাকছে না। বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সময়মত পদোন্নতি দিতে না পারা এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত সুস্থ ধারা না থাকায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সিনিয়র সহকারী সচিব পদে ২০০৬ সালের ২৫তম বিসিএসের কর্মকর্তারা যেমন রয়েছেন, তেমনি আছেন ২৪ বছর আগের ’৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারা। ’৮২ ব্যাচের ৯ জন, ’৮৪ ব্যাচের ১১, ’৮৫ ব্যাচের ১৭, ’৮৬ ব্যাচের ৪০, ’৯১ (জানুয়ারি) ব্যাচের ৪৮, ’৯১ (ডিসেম্বর) ব্যাচের ৫৩, ১১তম ব্যাচের ৬৮, ১৩তম ব্যাচের ১১০, ১৫তম ব্যাচের ১০৮, ১৭তম ব্যাচের ৬৩, ১৮তম ব্যাচের ৯১, ২০তম ব্যাচের ২৭৪, ২১তম ব্যাচের ১৭০, ২২তম ব্যাচের ২৬৮, ২৪তম ব্যাচের ২৯১ এবং সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া ২৫তম ব্যাচের ৭৫ কর্মকর্তা একই পদে কাজ করছেন।
উপসচিব পদে ’৮২ ব্যাচের পাশাপাশি ১২ বছরের জুনিয়র ১৯৯৪ সালের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এদের মধ্যে ’৮২ ব্যাচের ৩৩, ’৮৪ ব্যাচের ১৯৬, ’৮৫ ব্যাচের ৫০৯, ’৮৬ সালের ২০৬, ৯১ (জানুয়ারি) ব্যাচের ৮১, ’৯১ (ডিসেম্বর) ব্যাচের ১৪৫, ১১তম ব্যাচের ১৫০ এবং ১৩তম ব্যাচের ১৪ কর্মকর্তা রয়েছেন। যুগ্ম সচিব পদে কাজ করছেন ’৮২ (রেগুলার), ’৮২ (স্পেশাল) ও ’৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তারা।
এদিকে প্রশাসনে ৯টি ব্যাচের ১ হাজার ৫৪০ কর্মকর্তা উপ-সচিব। উপ-সচিবের ৮৩০টি পদের বিপরীতে এখন অতিরিক্ত কর্মকর্তার সংখ্যা ৭১০ জন। এটিও প্রশাসনের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন রেকর্ড। পদের তুলনায় এত বেশিসংখ্যক কর্মকর্তা এর আগে কখনও দেখা যায়নি। বড় বড় ব্যাচের চাপ সামাল দেয়াসহ রাজনৈতিক পছন্দ ও অপছন্দকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে গত কয়েক বছরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পদের বাইরে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। অর্থাত্ পদ নেই, তবু পদোন্নতি দিতে হয়েছে। এসব অতিরিক্ত কর্মকর্তার চাপ সামাল দিতে গিয়ে ২০০৬ সাল থেকে প্রশাসনে উপ-সচিবের সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করা হয়। মোট ৪৫০ উপ-সচিবের পদকে সুপারনিউমারি দেখিয়ে বছর বছর সংরক্ষণ করে বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে। যারা সিনিয়র সহকারী সচিবের চেয়ারে (পূর্বপদ) বসেই কাজ করছেন।
একই পদে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার কারণে সিনিয়র ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। প্রশাসনে এটাই এখন বড় সঙ্কট। বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারাও সিনিয়র সহকারী সচিব এবং তার চেয়ে ১৬ ব্যাচ জুনিয়র ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও সিনিয়র সহকারী সচিব। দেখা গেছে, ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারা চাকরিতে প্রবেশ করেছেন ১৯৮৩ সালে। আর ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা চাকরিতে এসেছেন ২০০৬ সালে। অর্থাত্ ’৮২ ব্যাচ যখন সহকারী কমিশনার, তখন ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের কারও কারও জন্মও হয়নি। প্রায় সমসাময়িক চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ১৯৮৪ ও ’৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তারা। ’৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ১৯৮৬ সালে এবং ’৮৫ ব্যাচ ১৯৮৮ সালে। ৬৫০ কর্মকর্তার বড় ব্যাচ ’৮২ বিশেষ ব্যাচের কর্মকর্তারা উপ-সচিব হয়েছেন ২০০১ সাল থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে। সাড়ে চারশ’ সংখ্যার ’৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তারা ২০০৩ সাল থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে উপ-সচিব হন। ’৮৫ ব্যাচ ও ’৮৬ ব্যাচ ২০০৬ সালে। বর্তমান সরকারের সময় উপ-সচিব পদে দু’দফায় পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে ৩ শতাধিক কর্মকর্তাকে উপ-সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়, যেখানে ১৩তম ব্যাচের কয়েকজন পদোন্নতি পান। ’৮২ বিশেষ ব্যাচের কর্মকর্তাদের উপ-সচিব হতেই ২০ বছর পার হয়ে গেছে। এ ব্যাচের ৩১ কর্মকর্তা বর্তমানে উপ-সচিব পদে কর্মরত রয়েছেন। তারা তিন দফায় পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন। অনেকে প্রাপ্য পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে গেছেন। এ ব্যাচের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এখন সচিব। অথচ অন্যরা পদোন্নতি না পেয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব ও উপ-সচিবের চেয়ারে কাজ করছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে উপ-সচিবদের মধ্যে তিনটি সিনিয়র ব্যাচের ২৩১ কর্মকর্তা পদোন্নতিবঞ্চিত অবস্থায় পড়ে আছেন। এরা হলেন ’৮২ নিয়মিত ব্যাচের ৩ জন, ’৮২ বিশেষ ব্যাচের ৩১ জন এবং ১৯৮৪ ব্যাচের ১৯৭ জন। ১৯৮৪ ব্যাচের যেসব কর্মকর্তা ২০০৩ সালে উপ-সচিব হয়েছেন, তারা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেন ২০০৬ সালে। অথচ পাঁচ বছরেও তাদের পদোন্নতি দেয়া হয়নি; দু’দফায় বঞ্চিত হয়েছেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত যুগ্ম সচিব ৃপদে পদোন্নতির তালিকায় রয়েছেন ’৮১ ব্যাচ ৯৫%, ’৮২ নিয়মিত ব্যাচ ৯৬%, ’৮২ বিশেষ ব্যাচ ৯০% ও ’৮৪ ব্যাচ ৫২%। এতে দেখা যায়, যুগ্ম সচিব পদে সবচেয়ে কম পদোন্নতি পেয়েছেন ’৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তারা। অপরদিকে ১৯৮৫ ব্যাচের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা ২০০৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ও ১৫ অক্টোবর উপ-সচিব হওয়ার তিন বছর পর ২০০৯ সালে এসে যুগ্ম সচিব হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। কিন্তু গত দু’বছরেও তারা পদোন্নতি পাননি। এরই মধ্যে ’৮৬ ব্যাচের কর্মকর্তারাও যুগ্ম সচিব হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। ভুক্তভোগীরা মনে করেন, যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতিবঞ্চিত ও নতুন করে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা গেলে ঢাউস উপ-সচিব পদসংখ্যার ভার কিছুটা হলেও লাঘব হবে। তা না হলে প্রশাসন ভারসাম্যহীন হয়ে আরও অচল ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ওএসডির বেহাল চিত্র : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের প্রায় ৬০০ কর্মকর্তা ওএসডি হয়ে আছেন। তাদের কোনো দফতর নেই, কাজও নেই। অথচ তাদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে রাষ্ট্রের খরচ হচ্ছে প্রায় তিন কোটি টাকা।
এদিকে নিয়মিত কর্মকর্তারা পদ না পেলেও প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক ও সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। চার বছরে সব সময়ই কমবেশি ২৫০ কর্মকর্তা চুক্তিতে ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ১০০ কর্মকর্তা প্রেষণে ছিলেন।
সরকারের চার বছরে ওএসডি হয়ে ওঠে ভিন্ন মতাদর্শের কর্মকর্তাদের শাস্তির হাতিয়ার। এ শাস্তির যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথেও ঝুঁকেন কেউ কেউ। পদোন্নতি বঞ্চনা ও দীর্ঘদিন ওএসডি থাকা যুগ্ম সচিব মো. মনোয়ার হোসেন যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে গত বছরের ১২ জুলাই নিজ বাসায় অত্মহত্যা করেন বলে অভিযোগ করেন তার ছেলে সাজ্জাদ হোসেন। এর আগে ২০১০ সালেন ১৬ আগস্ট একই কারণে ডিসিসির কর্মকর্তা শহিদুর রহমান একই পথ বেছে নেন। তার পারিবারিক সূত্রে বলা হয়, ২০০৮ সালের শেষের দিকে শহিদুর রহমান গুরুতর অসুস্থ হন। কর্তৃপক্ষ তার পাশে এসে না দাঁড়িয়ে তাকে ওএসডি করে। তিনি সুস্থ হলেও ওএসডি আদেশ বলবত্ রাখা হয়। ২২ মাস ধরে ওএসডি থাকা এ কর্মকর্তা ১৬ আগস্ট রাতে বনানীর বাসভবনে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করেন।
ক্যাডারে ক্যাডারে দ্বন্দ্ব : গত চার বছর ধরে পদোন্নতিসহ প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে অন্যান্য কাডারের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। এজন্য গত বছরের ৩ এপ্রিল প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সম্মেলন কক্ষে শতাধিক কর্মকর্তা গোপন বৈঠক করে গঠন করেন নতুন সংগঠন। প্রশাসন ক্যাডার বাদ দিয়ে ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ নামে নতুন সংগঠনের আহ্বায়ক করা হয় প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সদস্য সিনিয়র সচিব রোকেয়া সুলতানাকে। যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক কাজী আকতার উদ্দিন আহমেদ এবং মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শামসুল কিবরিয়াকে। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের যুগ্ম সচিব এএইচএম আবদুল্লাহ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সাইদুর রহমান সেলিমকে কমিটির সদস্য রাখা হয়।
চূড়ান্ত হওয়া সিভিল সার্ভিস আইন বাতিল : বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরই সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ জন্য করা হয় একাধিক সভা-সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম। এসব কাজে এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। গত বছরের মার্চে প্রস্তাবিত খসড়া আইনে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি ও সংগঠন এটির ওপর মতামত দেয়। ৭ বিভাগে সেমিনার করে নেয়া হয় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত। এরপর গত অক্টোবরে প্রস্তাবটি প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে উত্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিতে পাঠানো হলে তা হিমাগারে চলে যায়। এরপর গত ৩ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম ঘোষণা করেন সরকার সিভিল সার্ভিস আইন না করে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সরকারি-কর্মচারী আইন প্রণয়ন করবে। এরপর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে ‘সরকারি কর্মচারী আইন’ নামে নতুন আরেকটি আইন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সেটিও চূড়ান্ত হয়নি। গত জুনে রাজধানীর পাঁচতারা হোটেলে দিনব্যাপী আলোচনার পর গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর আবারও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মতামত নেয়া হয়। কিন্তু ওই সভায় আইনের খসড়ায় থাকা ‘আউট সোর্সিংয়ের’ মাধ্যমে নিয়োগসহ কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন প্রশাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে এ সরকারের আমলে আইনটি আদৌ হবে কিনা, সংশয় আছে।
মাঠ প্রশাসনে অসন্তোষ : চার বছরজুড়েই বিক্ষুব্ধ ছিল মাঠ প্রশাসন। ফেনীতে ওসির হাতে এসিল্যান্ড এবং সোনাগাজীতে উপজেলা চেয়ারম্যানের হাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার লাঞ্ছিত হওয়া ছাড়া আরও অনেক এসিল্যান্ড ইউএনও মার খেয়েছেন ক্ষমতাসীনদের হাতে। ফলে উত্তাল ছিল প্রশাসন। এসব ঘটনায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করে এর প্রতিকার চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের কাছে। এ নিয়ে মামলাও হয়েছে একাধিক। গত বছরের ৩ মে ফেনী সদরের ইউএনও শাহীন আখতারের নেতৃত্বে ফেনী মডেল থানার সামনে সরকারি জায়গা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে মডেল থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল বাধা দেয়। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে এসিল্যান্ড (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) নজরুল ইসলাম ও সার্ভেয়ার খাদেমুল ইসলামের জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে থানার ভেতরে নিয়ে মারধর করে তারা। এছাড়া গত ১৬ অক্টোবর ফেনীর সোনাগাজীর ইউএনও মোহাম্মদ মাহবুব আলম ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. নাজিমউদ্দিনকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেড এম কামরুল আনাম মারধর করেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ইউএনও মো. নূরুজ্জামান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকদের হাতে গুরুতর আহত হন। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা চেয়ারম্যানের হাতে সেখানকার ইউএনও লাঞ্ছিত হন। উপজেলা চেয়ারম্যান তাকে অফিস ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র অফিস করার নির্দেশ দেন।
সচিবালয়ে নিষিদ্ধ বিএনপিমনা আমলারা : বিরোধী দল সমর্থক ৫০ সাবেক আমলাকে সচিবালয়ে নিষিদ্ধ করে বর্তমান সরকার। ‘রিটায়ার্ড সিভিল অফিসার্স ফাউন্ডেশন’ নামে সংগঠন করায় সাবেক এ সিনিয়র আমলাদের গত বছরের ২১ জুলাই দেশের প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় (কেপিআই) প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
জনতার মঞ্চ কর্মকর্তাদের পোয়াবারো : প্রশাসনের সবকিছু চলছে জনতার মঞ্চ কর্মকর্তাদের নির্দেশনায়। ১৯৮২ থেকে একটানা ৮ বছর ৯ মাস সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসককে বিদায় দেয়ার পর ১৯৯১ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে উত্খাতের জন্য সুবিধাবাদী যেসব আমলা ও কর্মচারী সরকারি চাকরি শৃঙ্খলা বিধিমালা লঙ্ঘন করে ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চ তৈরি করেছিলেন, তারাই এখন প্রশাসনের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক বনে গেছেন। সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার এসব আসামিকে বসানো হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদে। সরকারিভাবে মামলা তুলে নিয়ে তাদের পদোন্নতিও দেয়া হয়েছে। নজিরবিহীনভাবে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা তুলে নিয়ে মাত্র ২ মাসের মাথায় জনতার মঞ্চের এক নেতাকে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। জনতার মঞ্চের যেসব নেতা অবসর, এমনকি অবসরকালীন সব সুবিধা বুঝে নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন, তাদেরও ডেকে এনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে বসিয়ে দেয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার শীর্ষপদে। এদের কারও কারও বয়স এখন ৬৫।
পদের চেয়ে কর্মকর্তা দ্বিগুণ : পদ নেই তারপরও প্রশাসনে রেকর্ডসংখ্যক পদোন্নতি দেয়ার ফলে নানামুখী সঙ্কট তৈরি হয়েছে। পদ খালি না থাকায় পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উন্নীত পদে পোস্টিং পাচ্ছেন না। এর ফলে তাদের পদোন্নতিপূর্ব ক্ষেত্রে (এক ধাপ নিচের পদ) কাজ করতে হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদে মঞ্জুরিকৃত পদের চেয়ে প্রায় এক হাজার বেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। দলীয় বিবেচনায় এত বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়ার ফলে তাদের যেমন পোস্টিং দেয়া যাচ্ছে না, তেমনি সিনিয়র সহকারী সচিব ও সহকারী সচিব পদে কাজ করার মতো অফিসার পাওয়া যাচ্ছে না। উপায় না থাকায় সিনিয়রদের দিয়েই জুনিয়রদের কাজ করানো হচ্ছে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি তিন স্তরে গণপদোন্নতির পর নির্ধারিত পদের বিপরীতে কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে সহস্রাধিক অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব তাদের নির্ধারিত পদের চেয়ারে বসতে পারছেন না। সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনে অতিরিক্ত সচিবের নির্ধারিত পদ রয়েছে ১০৭টি। অথচ এ পদে বর্তমানে কর্মরত আছেন ২৭১ জন কর্মকর্তা। এ স্তরে পদের চেয়ে অতিরিক্ত কর্মকর্তা রয়েছেন ১৬৪ জন। যা নির্ধারিত পদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। একইভাবে যুগ্ম সচিবের নির্ধারিত পদ রয়েছে ৪৩০টি। গণহারে পদোন্নতির ফলে এ পদে কর্মরত কর্মকর্তার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩০ জনে। এ স্তরে পদের চেয়ে ২০০ বেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। উপসচিবে নির্ধারিত পদ রয়েছে ৮৩০টি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এ স্তরে কর্মরত কর্মকর্তা রয়েছেন ১৫২৬ জন। যা পদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
এদিকে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেয়ায় প্রশাসনের নিচের স্তরে প্রায় এক হাজার সাতশ’ পদে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সিনিয়র সহকারী সচিবের পদ রয়েছে ১৭৭৪টি। অথচ এ পদে কর্মরত রয়েছেন ১৪০৩ জন। অর্থাত্ এ স্তরে পদের চেয়ে ৩৭১ জন কর্মকর্তা কম রয়েছে। সহকারী সচিব পদে আরও নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। এ স্তরে নির্ধারিত পদ রয়েছে ২০৯৫টি। কর্মরত আছেন মাত্র ৭৫৮ জন। এ স্তরে শূন্যপদ রয়েছে এক হাজার ৩৩৬টি। অর্থাত্ এ স্তরে দুই-তৃতীয়াংশ পদ খালি হয়ে গেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে কাজ করার মতো জুনিয়র কর্মকর্তার ব্যাপক সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
প্রশাসনের সর্বত্রই চলছে সীমাহীন দলীয়করণ : প্রশাসনের সব ক্ষেত্রেই এখন চলছে দলীয়করণ। প্রশাসনের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে দলীয়করণ হচ্ছে না। নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি এমনকি চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দলীয়করণ হচ্ছে। এক কথায় প্রশাসন এখন সম্পূর্ণরূপে দলীয়করণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জনপ্রশাসন দিবস উপলক্ষে গত বছর বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাত্কারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা ও এক সময়ের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ড. আকবর আলি খান ও এম হাফিজউদ্দিন খানও একই কথা বলেন। ওই সাক্ষাত্কারে এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, এখন প্রশাসন সম্পূর্ণরূপে দলীয়করণ করা হয়ে গেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপকমাত্রায় প্রশাসন দলীয়করণ শুরু করে। পরের মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই দলীয়করণ আরও বাড়িয়ে দেয়। আওয়ামী লীগের বর্তমান শাসনামলে দলীয়করণ সীমাহীন বেড়ে গেছে। এ দলীয়করণ যেমন সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, জুডিশিয়ারির ক্ষেত্রে হচ্ছে, এমনকি ডাক্তার সাহেবদের ব্যাপারেও হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের নিয়োগ থেকে শুরু করে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে দলীয়করণ হয়নি।
এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখতে বেশকিছু স্বচ্ছ নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে কর্মদক্ষতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পাচ্ছে বলেই প্রশাসনের এ করুণ অবস্থা। এটা দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই বদলানো দরকার।
সাবেক কেবিনেট সচিব ড. আকবর আলি খান বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় এখন রাজনীতি ছড়িয়ে পড়েছে। জনপ্রশাসনে রাজনীতিকীকরণের ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন এমনকি চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রাজনীতিকীকরণ হচ্ছে। এতে জনগণের কাছে সরকারি কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্নম্ন হচ্ছে। প্রশাসন দলীয়করণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিকর যে দিকটি, তা নিয়োগের ক্ষেত্রে। দলীয় লোক একচ্ছত্রভাবে নিয়োগ হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের যে আত্মসম্মানবোধ ছিল অর্থাত্ তারা বলতেন, আমি কারও দয়ায় নয়, প্রতিযোগিতা করে এখানে এসেছি-এটা অনেকাংশে ক্ষুণ্নম্ন হয়ে গেছে। আর অন্যদিকে জনসাধারণের কাছে তাদের সে ভাবমূর্তিটা আর আগের মতো নেই।
তিনি আরও বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) ভাবমূর্তিতে ধস নেমেছে। পিএসসি এখন সম্পূর্ণ রাজনীতিকীকরণ হয়ে গেছে। বিশেষ করে ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পিএসসিতে নিয়োগ দেয়ায় পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। তিনি এ পরিস্থিতির উন্নয়নে পিএসসি’র চেয়ারম্যান ও কমিশনের সদস্যসহ কর্মকর্তা পদে শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার পরামর্শ দেন।
অসন্তোষে কাজে ধীরগতি : ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের ওপর বছরজুড়ে চলেছে নানা ধরনের নিপীড়ন। ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে ভিন্নমতের ও দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। কাউকে করা হয় ওএসডি, কাউকে শাস্তিমূলক বদলি। অনেকের বিরুদ্ধে বিনা কারণে নেয়া হয় বিভাগীয় ব্যবস্থা। ভিত্তিহীন গোয়েন্দা রিপোর্ট এনে কোনো কোনো কর্মকর্তাকে করা হচ্ছে হয়রানি। মীমাংসিত অনেক বিষয় পুনঃতদন্তের নামে মেধাবী কর্মকর্তাদের ফাঁসানোরও চেষ্টা চলছে। আবার অনেক কর্মকর্তাকে আগে যে পদে ছিলেন, তার চেয়ে নিচের স্তরের পদে নিয়োগ দিয়ে মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এসব নিপীড়নের কারণে প্রশাসনজুড়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে। ঠিকমত চলছে না সরকারি কাজ।
অপছন্দের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকার গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের লেলিয়ে দিয়ে হয়রানি করছে। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা, যারা বিগত সরকারের সময় ডিসিসহ ভালো পদে ছিলেন, সে সময়ের বিভিন্ন বিষয় তদন্তের নামে অহেতুক তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।