Amardesh
আজঃঢাকা, মঙ্গলবার ৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২৫ পৌষ ১৪১৯, ২৫ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

সরকারের চণ্ডনীতির সুযোগে পুলিশের আটকবাণিজ্য

মাহাবুবুর রহমান
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
বিরোধী দল ও মত দলনে সরকারের বেপরোয়া নীতির সুযোগ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রমরমা আটক বাণিজ্য। আর এতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মোটা অঙ্কের টাকার এ ঘুষ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছে এলিট ফোর্স র্যাবও। বিভিন্ন মামলায় অজ্ঞাত আসামির ফাঁদে ফেলে চলছে এ বাণিজ্য। হরতাল, গাড়ি ভাংচুর, বোমা বিস্ফোরণ ও সরকারি কাজে বাধাদানের মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে চলছে অর্থ আদায়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেফতারের নামেও চলে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন। এ গণগ্রেফতারে হয়রানির শিকার হন অসংখ্য সাধারণ মানুষ। মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে গিয়ে অনেকে হচ্ছেন সর্বস্বান্ত। পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে।
সম্প্রতি বিরোধী দল রুখতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ বাণিজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। থানায় মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েই বাসায় ফিরতে হচ্ছে বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের। রাজধানীতে বিরোধী নেতাকর্মীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসায় প্রতিনিয়ত চলছে র্যাব-পুলিশের তল্লাশি। প্রতিটি থানায় নিয়মিত টাকা দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অসংখ্য ভুক্তভোগী। টাকা না দিলে বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে ভাংচুর। এমনকি পরিবারের নারী ও শিশু সদস্যদের ওপরও চলে নিপীড়ন। গত কয়েক মাস ধরে পুলিশের এ আচরণ বেপরোয়া রূপ ধারণ করেছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এলিট ফোর্স র্যাব, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ডিবি এবং পুলিশের বর্তমানে প্রধান দায়িত্বই হলো বিরোধী দলের সক্রিয় নেতাকর্মীদের পর্যবেক্ষণে রাখা ও নির্দেশ পেলে গ্রেফতার করা। সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র রুখতে বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যু সামনে রেখে এ কার্যক্রম চলছে বলে জানান এনএসআই’র এক কর্মকর্তা। এজন্যই হরতাল, বিক্ষোভ বা যে কোনো কর্মসূচির আগে বিরোধী জোটের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতা এবং অঙ্গদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বাসায় তল্লাশি চালানো হয়। বিশেষ করে জামায়াত ইসলামীর নেতাকর্মীদের গ্রেফতারে র্যাব-ডিবির কয়েকটি টিম স্পেশাল দায়িত্ব পালন করছে।
বাস্তবেও সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান দায়িত্বই যেন বিরোধী দল দলন। আর এর মাধ্যমে চলে ঘুষ বাণিজ্য। এক্ষেত্রে তারা বাসায় অভিযান চালিয়ে কিংবা হরতালে রাজপথ থেকে অসংখ্য মানুষকে গ্রেফতার করে। মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। টাকা দিতে অসমর্থ হলে অনেক সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জোটে বোমা বিস্ফোরণের মামলা কিংবা সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগের মামলায় কারাগার।
গত রোববার হরতালে খিলগাঁও থেকে আটক করা হয় থানা বিএনপির সভাপতি ইউনুছ মৃধা, নজরুল, কিসমত, দেলোয়ারসহ পাঁচজনকে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের যোগসাজশে কিসমত, দেলোয়ারসহ তিনজন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছাড়া পান। কিন্তু ইউনূস মৃধা ও নজরুলকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
একই দিনের হরতালে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন জনৈক ব্যক্তি। কার্যালয়ের সামনে বসা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে দেখে সালাম দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ তাকে আটক করে প্রিজন ভ্যানে তোলে। পরে তাকে পল্টন থানায় নেয়া হয়। থানা থেকে ছাড়া পেতে তাকেও মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে বলে জানা গেছে। রোববারের হরতালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উল্টো দিকের গলি থেকে দুই কিশোরকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর অভিযোগ আনে পুলিশ। তবে তাদের পরে ছেড়ে দেয়া হয়। এ বিষয়ে মতিঝিল জোনের পুলিশের এডিসি মেহেদী হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরপর কয়েকটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আর ওই গলিতে কিশোর দুটিকে পাওয়া গেছে। এজন্য তাদের আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ছেড়ে দেয়া হবে।’
এদিকে শনিবার রাতে বিএনপির ঢাকা মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের বাসায় পুলিশের একটি টিম তল্লাশি চালায়। তাকে না পেয়ে বাসার জিনিসপত্র ভাংচুর করা হয়। এভাবে আরও বেশকিছু নেতাকর্মীর বাসায় ভাংচুর চালানো হয়। হরতালের আগের রাতে ঢাকার আবাসিক মেসগুলোতে ব্যাপক তল্লাশি চালায় পুলিশ ও র্যাব। বেশ ক’জনকে আটকও করা হয়। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের আবাসিক মেসগুলোতে অভিযান চালানোর সময় ছাত্রদের একটি মেসে গিয়ে র্যাব সদস্যরা দুর্ব্যবহার করেন এবং জানতে চান, সেখানে অবস্থানরতদের কারও আত্মীয় সামরিক বাহিনীতে চাকরি করেন কিনা। তিন-চারজনের আত্মীয় সামরিক বাহিনীতে চাকরি করেন জানালে তাদের রেখে বাকিদের আটক করা হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীদের আত্মীয়রা।
বিরোধী দল দমনে সরকারের চণ্ডনীতির সুযোগে পুলিশ এভাবে অসংখ্য মানুষকে হয়রানি করছে। গত নভেম্বরে দারুসসালাম থানা ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য দ্বীন ইসলামকে আটকের পর ঘুষ না দেয়ায় জামায়াতের কর্মী বলে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ৫ নভেম্বর বিকালে ৩৮ ছোট দিয়াবাড়ির বাসা থেকে পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে চার হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন এক সাব ইন্সপেক্টর। টাকা দিতে রাজি হয়নি তার পরিবার। পরদিন পুলিশ তার পরিবারকে জানায়, শিবিরের ভাংচুর-অগ্নিসংযোগে দ্বীন ইসলাম জড়িত। পুলিশের ওপর হামলা ও ভাংচুর মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দ্বীন ইসলামের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল কালাম আজাদসহ নয়জনকে ১৪ নভেম্বর রাতে কলাবাগানের একটি মেস থেকে আটক করা হয়। পরে তাদের পুলিশের ওপর হামলার মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ডে নিয়ে তাদের ব্যাপক নির্যাতন করা হয়। রিমান্ডে নির্যাতন বন্ধ করার কথা বলে তাদের পরিবারের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকাও হাতিয়ে নেয় পুলিশ।
আবার কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকলে তাকে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে জড়িয়ে পুলিশে সোপর্দ করছে প্রতিপক্ষ। আর রাত হলেই থানাগুলোতে আটকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে স্বজনদের ভিড় ও তদবির বাণিজ্য। দাবিকৃত টাকা দিতে না পারলে পরদিন সন্দেহজনক ধারা কিংবা বিরোধী দলের মামলায় অজ্ঞাত আসামির কোটায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে আদালতে।
পুলিশের হিসাবমতে, সম্প্রতি সারা দেশ থেকে তিন হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার মধ্যে শিবিরের হামলায় ঢাকার ৪৮ থানায় প্রায় দুই ডজন মামলা হয়েছে। গত রোববারের হরতালে ১১টি এবং ৯ ডিসেম্বরের অবরোধে ৩৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় আট শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা ছাড়াও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষও গ্রেফতার হচ্ছেন।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, পুলিশ রাস্তা থেকে নিরীহ পথচারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে সারা দিন টহলগাড়িতে করে ঘুরিয়ে আটক ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে নগদ অর্থ আদায় করে ছেড়ে দেয়। উেকাচ আদায়ে পুলিশের এক পুরনো কৌশল আতঙ্কজনক রূপ নিয়েছে। পুলিশের দাবিকৃত অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেই ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫৪ ধারা কিংবা ডিএমপি অ্যাক্টে গ্রেফতার দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে।
এসব বিষয়ে ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, থানায় আটকে টাকা আদায়ের তথ্য সঠিক নয়। তারপরও আমরা নজরদারি রাখছি। কোনো পুলিশ সদস্যের অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।