Amardesh
আজঃঢাকা, মঙ্গলবার ৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২৫ পৌষ ১৪১৯, ২৫ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

রফিক গুমখুনের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ : মার্কেট বন্ধ, সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাংচুর

স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
রাজধানীর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সদস্য সচিব ও বঙ্গবাজার মার্কেটের ব্যবসায়ী নেতা হাজী রফিকুল ইসলাম মজুমদারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল বঙ্গবাজার মার্কেট বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করেছেন তারা। সকালে রফিকের লাশ বঙ্গবাজারে নিয়ে এলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা তখন রাস্তা অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর করেন তারা। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। সহকর্মী ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় পরিকল্পিতভাবে রফিককে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ইন্ধন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত রয়েছে বলেও ব্যবসায়ী ও স্বজনরা জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ী ও স্বজনরা জানান, ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির নেতৃত্বে চলে আসা, কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে কর্মকাণ্ড শুরু এবং বঙ্গবাজারে ৪ ব্যবসায়িক মার্কেট নিয়ে গঠিত বঙ্গবাজার শপিং কমপ্লেক্সের নেতৃত্বের কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতে পারে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে উদ্ধারের পর রোববার রাতে রফিকুলের লাশ ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। রাতেই লাশ নিয়ে যাওয়া হয় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ে। পরে সেখান থেকে রাতেই কদমতলীতে পলাশপুরের জিয়া সরণির ৯ নম্বর সড়কের ৭ নম্বর বাড়িতে রাখা হয়। সকালে ওই এলাকায় প্রথম জানাজা শেষে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নয়াপল্টনের বিএনপি দলীয় কার্যালয়ে। সেখানে জানাজায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা অংশ নেন। এরপর বঙ্গবাজার এলাকায় রেলওয়ে কলোনি জামে মসজিদের সামনে তৃতীয় জানাজা শেষে তার লাশ নিয়ে চাঁদপুরের শাহরাস্তি থানার চণ্ডিপুরে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন স্বজনরা। রাতেই গ্রামে শেষ জানাজা শেষে রফিকুলকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে।
এদিকে রফিক হত্যার প্রতিবাদে গতকাল বঙ্গবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ এবং ১৫ থেকে ২০টি বাস ভাঙচুর করেছে তার সমর্থক ও ব্যবসায়ীসহ স্থানীয়রা। এসময় তারা রফিক হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে। ওই এলাকায় সব মার্কেট ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয় নৃশংস এ গুম-হত্যার প্রতিবাদে।
বিক্ষোভ, বাস ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধ : বেলা ১১টায় বিএনপি কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের সামনে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামের লাশ পৌঁছার পর ব্যবসায়ী, বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ এলাকার শত শত লোক সমবেত হন। তারা এ হত্যার প্রতিবাদে মার্কেট বন্ধ রেখে রাস্তায় নেমে পড়েন। জানাজা শুরু হওয়ার আগ থেকে শুরু করে জানাজা শেষ হওয়ার পরও কয়েক ঘণ্টা সব রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ রাখেন ব্যবসায়ী ও রফিক সমর্থকরা। উত্তেজিত কর্মীরা ফুলবাড়িয়া মার্কেটের সামনে ১৫-২০টি বাস ভাঙচুর করে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সকাল থেকেই গুলিস্তান, বঙ্গমার্কেট, ফুলবাড়িয়া এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এক পর্যায়ে সড়ক অবরোধ করে রাখলে পুলিশ অবরোধকারীদের লাঠিচার্জ করার চেষ্টা করে। এ সময় কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরে ব্যবসায়ী নেতারা সবাইকে শান্ত করেন। রফিক মজুমদারের মৃত্যুর কারণে গতকাল ওই এলাকার বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স সমবায় সমিতি, মহানগর কমপ্লেক্স, এনেক্সো টাওয়ার, বঙ্গ হোমিও কমপ্লেক্সসহ আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট বন্ধ রাখেন ব্যবসায়ীরা।
বিএনপির বঙ্গবাজার ইউনিটের সহ-সভাপতি ও বঙ্গমার্কেট সমিতির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হাজী জাহাঙ্গীর আলম নান্নু জানান, দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে রফিকের সঙ্গে তার পরিচয়। প্রথমে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় হলেও ধীরে ধীরে রফিক নিজেকে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। রফিকের ব্যবসা ছিল মহানগর কমপ্লেক্সে। এরপর তিনি ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের গুম হওয়া ওয়ার্ড কমিশনার ও বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা চৌধুরী আলমের সঙ্গে বিএনপির দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। চৌধুরী আলম গুম হওয়ার পর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি নেতাকর্মীদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন রফিকুল ইসলাম মজুমদার। দলীয় কর্মসূচিতে ওই এলাকা থেকে রফিকের নেতৃত্বে কর্মীরা অংশ নিতেন। এনেক্সো ভবনের ৫ম তলায় রয়েছে রফিকের ব্যবসায়িক শোরুম। সেখানে বসেই তিনি ব্যবসায়িক কাজের পাশাপাশি দলীয় কর্মকাণ্ড চালাতেন। চৌধুরী আলম গুম হওয়ার পর বিএনপির নেতৃত্বে শূন্যতা সৃষ্টি হলে তা দূর করেন রফিক। রাজনীতির পাশাপাশি রফিক একজন ভালো ব্যবসায়ী-নেতা ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সবার মধ্যে আস্থার সৃষ্টি করেন।
এছাড়াও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে রফিক কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের ঘোষণাও দেন। সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর রফিক মনোনয়ন ফরমও জমা দিয়েছেন দলীয়ভাবে। রফিক মনোনয়ন জমা দেয়ার কারণে বিএনপি থেকে আর কেউ মনোনয়ন ফরম জমা দেননি। কিন্তু হঠাত্ করে রফিককে এভাবে গুপ্তহত্যার শিকার হতে হবে—তা কল্পনাও করেননি তারা।
নিহত রফিকের ছোট ভাই মফিজুর রহমান জানান, রফিকের প্রথম জানাজা কদমতলীতে, দ্বিতীয় জানাজা নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং তৃতীয় জানাজা বঙ্গবাজারে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, এমকে আনোয়ার, সহ-সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আলহাজ্ব মোসাদ্দেক আলী ফালু, মহানগর সদস্য সচিব আবদুস সালাম, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল, জাসাস সভাপতি এমএ মালেক, যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুস সালাম আজাদ, শিশু সংগঠক সিরাজুল ইসলাম সেলিম, রমনা থানার আহ্বায়ক ননী তালুকদারসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মী ও বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা তার জানাজায় অংশ নেন। জানাজা শেষে লাশ চাঁদপুরের শাহরাস্তি থানার চণ্ডিপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। তিনি আরও জানান, তার ভাইকে হত্যার ঘটনায় এখনও মামলা করেননি। বর্তমানে পরিবারের সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। গ্রামের বাড়িতে দাফন শেষে কি করা যায়—তা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তিন কারণে হত্যাকাণ্ড : বিএনপি নেতা রফিক নিহত হওয়া তিন কারণে হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী রফিক সমর্থক ও পরিবারের সদস্যরা। গতকাল রফিকের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মহানগর কমপ্লেক্সে গেলে মার্কেট বন্ধ দেখা যায়। সেখানে আরও ৩টি মার্কেট রয়েছে; এর মধ্যে গুলিস্তান, আদর্শ ও বঙ্গবাজার মার্কেটসহ ৪টি মার্কেট নিয়ে বঙ্গ শপিং কমপ্লেক্স ব্যবসায়ী মালিক সমিতি তৈরি হয়েছে। গুম-হত্যার শিকার রফিকুল ইসলাম মজুমদার এ সমিতির ৪ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া মহানগর কমপ্লেক্সের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। পাশাপাশি তিনি ৫৬ নং ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব। একই ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার কথা ছিল তার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যবসায়ীরা জানান, সব সময় রফিক ব্যবসায়ীদের সুখে-দুঃখে খোঁজ-খবর নিতেন। পাশাপাশি তিনি ওই এলাকায় তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শক্তিশালী করে তোলেন। চৌধুরী আলমের পর বিএনপির নেতৃত্বে শূন্যতা সৃষ্টি হলে রফিকের নেতৃত্বের কারণে বিএনপি আবারও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। দলের কর্মসূচিতে এখান থেকে নেতাকর্মীরা অংশ নিতেন। ধীরে ধীরে রফিক ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেন। ভালো নেতৃত্বের কারণে রফিকের জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে। আর এ কারণেই রফিককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। দলীয়ভাবে ও ব্যবসায়িকভাবে তার কোনো শত্রু ছিল না। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই এসব কারণেই রফিককে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের পরিকল্পনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গতকালও একই ধরনের অভিযোগ করেন নিহতের স্বজনরা। তবে তারা এ মুহূূর্তে শোকার্ত থাকায় আইনি প্রক্রিয়ায় যাচ্ছেন না বলে জানান রফিকের ছোট ভাই মফিজুর রহমান।
উল্লেখ্য, শনিবার রাতে ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার আনন্দনগর গ্রামে শ্বশুরবাড়ি থেকে সাদা পোশাকধারী একদল লোক ঢাকার জনপ্রিয় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মজুমদারকে র্যাব পরিচয়ে অপহরণ করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। রাত ১০টার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাগুলাট ইউনিয়নের আদাবাড়িয়া গ্রামের মাঠ থেকে হাতকড়া লাগানো অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার হাতকড়ায় ‘পুলিশ’ শব্দটি খোদাই করে লেখা ছিল। সাদা পোশাকধারীরা মাইক্রোবাসে করে নেয়ার সময় লোকজন জড়ো হলে তারা ঝিনাইদহ র্যাব কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলে যায়। এই নৃশংস গুম-হত্যা সম্পর্কে ঢাকায় র্যাব ও পুলিশ বলছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সন্ত্রাসীরা এ কাজ করতে পারে।