Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২৩ পৌষ ১৪১৯, ২৩ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

আ. লীগের নির্বাচনী ইশতেহার : বাস্তবায়ন দাবি প্রধানমন্ত্রীর বাস্তবতা ভিন্ন

স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দাবি করেন, তার সরকার নির্বাচনী ওয়াদা একে একে সব পূরণ করেছে। শিক্ষা, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও বিদ্যুত্ খাতসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি করেছে বলে এর আগে একাধিক অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এ দাবির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের গত চার বছরের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন হিসাব কষে মেলানো যায়নি। প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যাপক গরমিল। সরকারি-বেসরকারি খাতের তথ্য-উপাত্ত, পরিসংখ্যান ও সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চার বছরে সরকারের ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী। রূপকল্প (ভিশন) অনুযায়ী, ২০১২ সালের মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও সরকার তা পূরণ করতে পারেনি।
ক্ষমতাসীন সরকার তাদের অগ্রাধিকারভুক্ত পাঁচটি খাত—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি রোধ, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পূরণ করতে পারেনি। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের দুর্নীতির কারণে ইশতেহারে অগ্রাধিকারভুক্ত পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে গেছে। এর বাইরে রাজধানীর যানজট নিরসন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত, প্রশাসনকে দলীয়করণ মুক্ত, পুঁজিবাজারের বিকাশ, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়সহ শত প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ঝরালেও ৪ বছরে তার আংশিকও পূরণ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাহোট সরকার। তবে রংপুরকে বিভাগ করা, প্রবাসীদের ভোটারাধিকার নিশ্চিত করা, জাতীয় শিক্ষানীতি ও নারীনীতি প্রণয়নসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হলেও এগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের তীব্র আপত্তি রয়েছে। এদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি না থাকলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার জোগাড়, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়োকে গুলশানের বাসা থেকে উত্খাত, এর আগের সরকারের লোকজনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব ধরনের মামলাকে ‘রাজনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহার, খালেদা জিয়া এবং তার দুই ছেলে তারেক জিয়া ও আরাফাত রহমান কোকোসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে বিরোধী মত দমন চলছে বিদ্যুত্ গতিতে। অবশ্য আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার বিশ্লেষণ করে সেখানে শুভঙ্করের ফাঁকি দেখা গেছে। ২০১৪ সালে জানুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেট পেলেও সরকার তার ইশহেতারের বেশিরভাগ প্রতিশ্রুতি ২০২১ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রায় সবাই নিরবচ্ছিন্ন বলে আসছেন প্রতিশ্রুত সময় নাগাদ তারা কী কী করতে চান। সরকারের প্রতিশ্রুতি ও তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে স্পষ্ট হওয়া দুষ্কর যে, সরকারের মেয়াদ ২০১৪ নাকি ২০২১ সাল পর্যন্ত।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার শেরাটন হোটেলে (বর্তমানে রূপসী বাংলা) বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তার দলের পক্ষে ‘দিন বদলের সনদ’ নামে ২৪ পৃষ্ঠার একটি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। ইশতেহারের লিখিত প্রতিশ্রুতির বাইরেও নির্বাচনী জনসভায় জনগণকে ১০ টাকা কেজিতে চাল খাওয়ানো, কৃষককে বিনামূল্যে সার প্রদানসহ বেশকিছু বিষয়ে ওয়াদা দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। নির্বাচনে জয়লাভের পরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলকে সংসদে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেয়ারও ঘোষণা দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সরকার মৌখিক ওয়াদা অস্বীকার করার পাশাপাশি ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।
নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে। ইশতেহারের অগ্রাধিকারের ৫টি বিষয়ের প্রথমটিতে বলা হয়, ‘চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা হবে।’ তারা তাদের প্রধান এ প্রতিশ্রুতি পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম কমানো তো দূরের কথা, এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। চার প্রতিটি জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে লাগামহীন। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময়ে নিত্যপণ্যের যে দাম পেয়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণে রাখা তো দূরের কথা প্রতিটি জিনিসপত্রের দাম ক্রমবর্ধমান।
ক্ষমতাসীন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক, রেল, নৌ, বিমান পরিবহন ব্যবস্থকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মা সেতুকে সরকার তার প্রধান অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প উল্লেখ করে কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় নিক্সন চৌধুরী, গত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীসহ সরকারের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজনের দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণ পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে গেছে। দুর্নীতির কারণে সেতু প্রকল্পের প্রধান অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক তাদের চুক্তি এরই মধ্যে বাতিল করেছে। সরকার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাড়ককে ৪ লেনে উন্নীত করার ৩৬ মাস মেয়াদি প্রকল্পের ৩০ মাস চলে গেলেও কজের অগ্রগতি তেমনটা হয়নি। সরকার নৌপথ ড্রেজিংয়ের বাহবা নেয়ার দাবি করলেও এ খাতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের ইশতেহারে রাজধানী ঢাকার যানজট নিরোসনে ডজনখানেক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। ইশতেহারে ঢাকায় পাতাল রেল-মনোরেল, সার্কুলার রেলপথ এবং এলিভেটেড (দোতলা) রাস্তা নির্মাণ করে গণপরিবহন সমস্যার সমাধান, ঢাকার চারদিকে বৃত্তাকার (অরবিটাল) জলপথ, বেড়িবাঁধ, সড়ক, রেলপথ নির্মাণ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাজধানীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও মেট্রোরেল স্থাপন প্রকল্পটির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। সম্প্রতি যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিয়েছেন, এ বছর অক্টোবরে মেট্রোরেলের কাজ শুরু হবে। অথচ ওই অক্টোবর মাসে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী বেশ আগেই জানিয়েছেন।
মহাজোট সরকার বিদ্যুত্ খাত সম্পর্কে প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে সফল বলে দাবি করলেও চার বছরে তার অর্ধেক বিদ্যুত্ও উত্পাদন করতে পারেনি। সরকারের দাবি মতে, গত ৪ বছরে তারা ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুত্ উত্পাদনে সক্ষম হয়েছে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১১ সালের মধ্যেই ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের কথা ছিল। এদিকে গত বেশ কিছুদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা বলে আসছেন, তারা ৪ বছরে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে সক্ষম হয়েছেন।
তথাকথিত সফলতার এ খাত এখন সরকারের গলায় কাঁটা হয়ে বিঁধেছে। দ্রুত বিদ্যুত্ উত্পাদনের নামে লুটপাটের সুযোগ করে দিতে বিনা টেন্ডারে দলীয় লোকজনকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের উচ্চমূল্যে বিদ্যুত্ কিনতে গিয়ে সরকারকে বড় অংকের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। এ অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তে মাশুল দিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। ভর্তুকি পোষাতে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রধান উপকরণ জ্বালানি তেলের দাম। সরকারের মেয়াদে বিদ্যুতের দাম বাড়নো হয়েছে ছয়বার। একই অবস্থা জ্বালানি খাতেও। গত চার বছরে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে সাতবার—যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। সর্বশেষ ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। এর প্রতিবাদে বিরোধী দল আজ রাজধানীতে হরতাল পালন করছে। ইশতেহারে আওয়ামী লীগ জাতীয় কয়লানীতি প্রণয়ন করার কথা বললেও এখন পর্যন্ত তা হয়নি।
আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বলা হয়েছে, ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই ঘোষিত ১৪ দলের ৩১-দফা সংস্কার কর্মসূচি এবং ২২ নভেম্বর গৃহীত ২৩-দফা অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির আলোকে এবং গত ৭ বছরের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে এই কর্মসূচি (ইশতেহার) প্রণীত হয়েছে। ১৪ দলের ৩১ দফার প্রধান দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশন সংস্কার। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে প্রণীত এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে সরকার। উচ্চ আদালতের একটি রায়ের ওপর ভর করে দেশের জনমত উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে এই সরকার। এমনকি সরকারের শরিকদের অনেকেই এ ব্যবস্থা বাতিলের বিরুদ্ধে ছিলেন। হাইকোর্ট আগামী দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার প্রতি মত দিলেও সরকার তা গ্রহণ করেনি। এ ক্ষেত্রে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের সময়টাও দেয়নি সরকার।
আওয়ামী লীগ তার ইশতেহারের অগ্রাধিকারের ২নং ধারায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী তদন্তের নামে বিরোধী মত হয়রানিতে বেশ ভূমিকা রাখছে। বিরোধীদলীয় মতের কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির নাম-গন্ধ পেলেই তার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে এ প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে সরকারের সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন জড়িত বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়ে দিলেও দুদক আবুল হোসেনকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এদিকে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ব্যাংকের চার পরিচালকসহ সরকারের বেশ কয়েকজন জড়িত বলে খবর প্রকাশ হলেও দুদক তাদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
ইশতেহারের অগ্রাধিকারের ৫নং ধারায় বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠন, ন্যায়পাল নিয়োগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন কঠোরভাবে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে নামকাওয়াস্তে মানবাধিকার কমিশন গঠন করলেও এ প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। বিচারবিভাগ স্বাধীনতার পরিবর্তে দলীয়করণে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে গুপ্তহত্যা। ন্যায়পাল নিয়োগ তো হয়ইনি বরং গত চারদলীয় জোট সরকার যে কর ন্যালপাল নিয়োগ দিয়েছিল এ সরকার তা বাতিল করেছে।
জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বললেও মহাজোট সরকার এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। সংসদ কার্যকর হওয়ার পরিবর্তে এটা পরিণত হয়েছে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও সরকারি দলের স্তুতিবন্দনার কেন্দ্রস্থলে। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত তথা সংসদে প্রত্যক্ষ ভোটে নারীর জন্য ১০০ আসন সংরক্ষিত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও গত জোট সরকার সংরক্ষিত যে ৪৫টি আসন করেছিল তার থেকে মাত্র ৫টি বাড়িয়ে ৫০টি করেছে এই সরকার। আর এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভোটের প্রতিশ্রুতি থাকলেও এ সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি।
আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উত্স প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও গত ৪ বছরে একবারও সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে, নানামুখী চাপে ২০১১ সালের শেষ দিকে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা জানার কোনো সুযোগ নেই।
ইশতেহারে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলার কথা বলা হলেও ঘটেছে উল্টোটা। বিরোধী দল থেকে কোনো কর্মসূচি দেয়া হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে তাদের কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হচ্ছে হরহামেশাই। বিরোধী দল দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সরকারদলীয় ক্যাডারদেরও মাঠে দেখা যাচ্ছে। অপরদিকে সরকারি দলের কর্মসূচি চলছে পুলিশি প্রটেকশনে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমন করতে সরকারের মন্ত্রীরাই ছাত্রলীগ-যুবলীগকে আহ্বান জানাচ্ছে।
ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এবং যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রশাসনে চলেছে নগ্ন দলীয়করণ। মেধা, যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়েছে পদোন্নতি ও বদলি। অপরদিকে সরকারি দলের আনুগত্যে বিশ্বাসী নয় এমন অজুহাতে অনেক মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাকে দিনের পর দিন ওএসডি করে রাখা হয়েছে। কাউকে কাউকে দেয়া হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসর। ইশতেহারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়েছে, অথচ চার বছরে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ ও পানিসম্পদ রক্ষায় কার্যকর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকার নিজের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতকে ট্রানজিটের নামে করিডোর দিয়েছে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও করতে পারেনি তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি। বাংলাদেশের প্রাপ্যতা, হিস্যা ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান পানি সঙ্কট মোকাবিলায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ একটি সমন্বিত পানিনীতি প্রণয়ন এবং আঞ্চলিক পানি নিরাপত্তা গড়ে তুলতে আওয়ামী লীগ উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করবে বলে ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিলেও এ বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করলেও এটা নিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর তীব্র আপত্তি। শিক্ষাঙ্গনকে দলীয়করণমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে, অথচ গত ৪ বছর ধরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলেছে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের দখলের মহোত্সব, সন্ত্রাস আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগে চলেছে চরম দলীয়করণ। স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করার প্রতিশ্রুতি এখন পর্যন্তও বাস্তবায়িত হয়নি। রাজধানী ঢাকার প্রতি থানায় সরকারি মাধ্যমিক হাইস্কুল ও প্রতি উপজেলায় সরকারি মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুুতিও পূরণ করতে পারেনি সরকার।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১২ সালের মধ্যে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। আধুনিক চাষাবাদ ও সরকারের কিছু পদক্ষেপে খাদ্য উত্পাদন বিশেষ করে ধান উত্পাদন কিছুটা বেড়েছে সত্য। কিন্তু পাশাপাশি বেড়েছে চাহিদাও। অপরদিকে গম উত্পাদন কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি। যার কারণে এ বছরও সরকারকে কয়ের লক্ষ টন গম আমদানি করতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। ইশতেহারের পরিশিষ্ট অংশে রূপকল্প (ভিশন) অনুযায়ী বাস্তবায়নের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে যে ২৩টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা হয়েছে অনেকটা প্রতারণার শামিল। আওয়ামী লীগ যে ২৩টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তার মধ্যে মাত্র ৭টি সরকারের মেয়াদে অর্থাত্ ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি শেষ হওয়ার কথা হলেও ইশতেহারে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই এই সরকারের মেয়াদের পরে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২১ সাল পর্যন্ত। যা বাস্তবায়নে আরও দু’টি সরকারের প্রয়োজন হবে। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রদান, রংপুরকে বিভাগে উন্নীতকরণ, সরকারের কয়েকটি সেক্টরকে জিডিটালাইজ ও গত আওয়ামী লীগ আমলের কমিউনিটি ক্লিনিক ফের চালু করেছে।