Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২৩ পৌষ ১৪১৯, ২৩ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে আজ সারাদেশে হরতাল, ১২ গাড়িতে আগুন

স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ১৮ দলীয় জোটের দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আজ। তেলের দাম বাড়লেই হরতাল—আগের এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই এ হরতাল ডাকল বিরোধী জোট। হরতালের আগের দিন রাজধানীর গুলশান, রমনা, আজিমপুর, তেজগাঁও, মিরপুরে পাঁচটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। হরতালের সমর্থনে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী এবং ১৮ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো বিক্ষোভ মিছিল করেছে। রাজধানীতে বিতরণ করা হয়েছে লিফলেট। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশে
অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
হরতালকে সামনে রেখে সারাদেশে পুলিশ বিরোধী দলের নেতাকর্মীর বাড়ি বাড়ি তল্লাশি ও ধরপাকড় করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। তারা দাবি করেছে, শনিবার বিকাল পর্যন্ত সারাদেশে গ্রেফতারের সংখ্যা দু’শতাধিক এবং আহত নেতাকর্মীর সংখ্যা ২১২ জনেরও বেশি। রামপুরা, ওয়ারী, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি, শেরপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর জেলায় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হরতালের সমর্থনে মিছিলে হামলা চালানো হয়েছে। পুলিশের এ কর্মকাণ্ডের জন্য একদিন তাদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে বলে সতর্ক করে দেয় দলটি।
গতকাল বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে দলের যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ওই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানাতে দেশের মানুষের স্বার্থে আমরা হরতালের ডাক দিয়েছি। এটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি হবে। সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বরাবরের মতো এবারও আমাদের নেতাকর্মীর বাসায় বাসায় তল্লাশি চালানোর নামে ভাংচুর ও গ্রেফতার শুরু করেছে।
তিনি সরকারকে হুশিয়ার করে দিয়ে বলেন, এভাবে ‘দমন-নির্যাতন’ চালিয়ে হরতাল থেকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নিবৃত করা যাবে না।
রিজভী আহমেদ অভিযোগ করেন, পুলিশ বাহিনী ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের মতো আচরণ করছে। তারা বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ধড়পাকড় করছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ডাকা হরতাল সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে আখ্যায়িত করে সাবেক এ ছাত্র নেতা বলেন, মানুষের আন্দোলনের প্রতি অর্থমন্ত্রী কদর্য ও কুিসত বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা এর প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই।
শুক্রবার সিলেটে এক অনুষ্ঠানের পর অর্থমন্ত্রী হরতাল কোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন। মুহিত আরও বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে খালেদা জিয়া হরতাল দিয়ে উন্মাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে দলের যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, মহানগর সদস্য সচিব আবদুস সালাম, সহ-তথ্য বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাঈদ খান খোকন, শ্রমিক দলের নেতা নুরুল ইসলাম খান নাসিম, দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে বিকাল থেকে নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাছে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর শুক্রবার সকালে ১৮ দলীয় জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক শেষে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে হরতালের ঘোষণা দিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম বলেন, আমরা হরতাল দিতে চাইনি। সাধারণ মানুষ, কৃষক ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্বার্থে আমরা সরকারের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আগামী রোববার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছি। আমরা সরকারের এহেন সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন। এর নিন্দা জানাই। রোববারের হরতাল সফল করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তরিকুল। বৃহস্পতিবার রাতে সরকারের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পরই গুলশানে রাত সোয়া এগারটায় দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন খালেদা জিয়া। প্রায় সাড়ে বারোটা পর্যন্ত চলে এ বৈঠক। বৈঠকেই রোববার হরতাল দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অবশ্য এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার ২৯ ডিসেম্বর দলের স্থায়ী কমিটি এবং পরদিন ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, যদি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, তার পরদিন হরতাল ডাকা হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে লিফলেট বিতরণ : হরতালের সমর্থনে শান্তিনগর ও কাকরাইলসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে গতকাল লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। শান্তিনগর ও কাকরাইলসহ আশপাশের এলাকায় পৃথকভাবে লিফলেট বিতরণ করেছেন বিএনপি নেতা ড. আসাদুজ্জামান রিপন, ফজলুল হক মিলন, খায়রুল কবির খোকন, হাবিবুর রহমান হাবিব, হাবিব-উন নবী খান সোহেল, মীর সরাফত আলী সপু, শফিউল বারী বাবু, আলী রেজাউর রহমান রিপন, মোস্তাফিজুর রহমান, রফিক হাওলাদার, রফিক শিকদার, ফরিদ উদ্দিন আহমদ প্রমুখ। এ সময় বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
১২ বাসে আগুন : হরতালের প্রাক্কালে গতকাল দিনে ও রাতে রাজধানীতে ওষুধ কোম্পানির একটি কভার্ড ভ্যান, একটি মাইক্রোবাস, তিনটি প্রাইভেটকার ও সাতটি যাত্রাবাহী বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।
বেলা সোয়া ৩টা থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রমনায় পিকআপ ভ্যান, গুলশান, মিরপুর, আরামবাগ, বাংলামোটর, পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক, গুলিস্তান, নিউমার্কেট ও আজিমপুরে যাত্রাবাহী ৮টি বাসে, উত্তর বাড্ডায় দুটি ও তেজগাঁও পলিটেকনিকের সামনে একটি প্রাইভেটকার ও মহাখালীতে একটি মাইক্রোবাসে আগুন দেয়া হয়েছে।
গতকাল বেলা সোয়া ৩টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের বিপরীত দিকে ওষুধ কোম্পানির কভার্ড ভ্যানে আগুন দেয়া হয়। এতে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের ওষুধবাহী গাড়িটি আগুনে পুড়ে যায়।
বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে আজিমপুরে ভিআইপি-২৭ (ঢাকা মেট্রো-জ-১১-১৭০৯) নামের একটি যাত্রাবাহী বাসেও আগুন ধরিয়ে দেয় কে বা কারা।
মিরপুরে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে মেট্রো সার্ভিসের একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। প্রায় একই সময়ে নিউমার্কেট এলাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সামনে ও গুলিস্তান এলাকায় আরও দুটি গাড়িতে আগুন লাগানো হয়।
এছাড়া নটর ডেম কলেজের সামনে এবং পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় পৌনে ছয়টায় ও সন্ধ্যার পরপরই বাংলামোটরে বিআরটিসির দ্বিতল বাস, রাতে বাড্ডায় দুটি প্রাইভেটকার, সন্ধ্যা সোয়া ৭টা দিকে তেজগাঁও পলিটেকনিকের সামনে একটি প্রাইভেটকারে ও মহাখালীর তিতুমীর কলেজের সামনে একটি মাইক্রোবাসে আগুন দেয়া হয়েছে। রাতে অভিজাত এলাকা গুলশানে একটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। এই প্রথম গুলশানের মতো জায়গায় গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটল।
এদিকে বড় মগবাজারের সেঞ্চুরি টাওয়ারের সামনে রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে।
তবে এসব ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। হরতালের আগে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এসব করা হয়েছে বলে ধারণা পুলিশের।
মোহাম্মদপুর থানা বিএনপির মিছিল : হরতালের সমর্থনে গতকাল মোহাম্মদপুর থানা বিএনপি মিছিল করেছে। মিছিলটি রাজধানীর শংকর থেকে বের হয়ে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা আতিকুল ইসলাম মতিন, ওসমান গণি শাহজাহান, নাসির আহমেদ, শাহাব উদ্দিন মুন্না, এনায়েতুল হাফিজ, সাইফুল ইসলাম সাজু, ফরিদ উদ্দিন ফরহাদ, শাহজাহান চৌধুরী, রাজু ভাণ্ডারী, হাজী বাবুল মৃধা, চৌধুরী বকশী, মিজানুর রহমান ইসহাক, জব্বার ভূঁইয়া, মোহাম্মদ মামুন, মাহাতাব উদ্দিন সবুজ প্রমুখ।
রাজধানীর ২২ পয়েন্টে জামায়াতের মিছিল : আজকের হরতালের সমর্থনে রাজধানীর ২২ পয়েন্টে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ঢাকা মহানগরী জামায়াত। মতিঝিল, মগবাজার, বাবুবাজার, বংশাল, লালবাগ, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, শ্যামপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানা জামায়াতের উদ্যোগে এসব মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। কাফরুলের ইব্রাহিমপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় মিছিলে পুলিশ ধাওয়া ও হামলা চালায়। এ সময় আটক করা হয় কয়েকজন জামায়াত কর্মীকে।
মগবাজার এলাকায় মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে আয়োজিত মিছিলে নেতৃত্ব দেন শাখার সহকারী সেক্রেটারি সেলিম উদ্দিন। এছাড়া অন্য মিছিলগুলোতে মহানগর ও থানা নেতারা নেতৃত্ব দেন।
হরতালকে সফল করতে জামায়াতসহ শরিক দলগুলোর আহ্বান : হরতাল সফল করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ১৮ দলীয় জোটের বিভিন্ন শরিক দলও পৃথক বিবৃতিতে হরতাল সফল করার আহ্বান জানিয়েছে।
গতকাল এক বিবৃতিতে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, হঠাত্ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর এ অন্যায় সিদ্ধান্তে প্রায় সব ক্ষেত্রেই মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যাবে। সরকারের এ অন্যায় ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে দেশের গোটা অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। দেশের জনগণের পক্ষে সরকারের এ অন্যায় ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া সম্ভব নয়। সরকার তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ শীর্ষ নেতাদের মিথ্যা মামলায় আটক করে রেখেছে। সরকার বিচারের নামে যে প্রহসনের নাটক করছে স্কাইপ কেলেঙ্কারি সংলাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে।
এছাড়া খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক, ইসলামী ঐক্যজোট মহাসচিব মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি শায়খ আবদুল মোমিন ও মহাসচিব মুফতি মো. ওয়াক্কাস, বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা আজকের হরতাল সফলের আহ্বান জানিয়েছেন।