Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২৩ পৌষ ১৪১৯, ২৩ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

আশাভঙ্গের বেদনায় জনমনে ক্ষোভ

মাহাবুবুর রহমান/হাসান শান্তনু
পরের সংবাদ»
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের চার বছরের শাসনে আশাভঙ্গের বেদনায় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। তাদের মতে, পরিবর্তনের স্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় এলেও সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যাপক ব্যর্থতা দেখিয়েছে। দুর্নীতি, লুটপাট, দলীয়করণ, সন্ত্রাস, হত্যা, গুমসহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যায় জনগণ অতিষ্ঠ। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে সরকার দেশকে সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়েছে। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণই দেশ ও জাতির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশিষ্টজনরা বলেন, জিনিসপত্রের দাম কমানোর অঙ্গীকার থাকলেও লাগামহীনভাবে বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। এ সরকার দুর্নীতির আন্তর্জাতিকীকরণ করেছে। বাগাড়ম্বর কূটনীতিতে আন্তর্জাতিক বন্ধু কমেছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে বিশেষ কোনো সাফল্য নেই। জনশক্তি রফতানিতে ধস নেমেছে আশঙ্কাজনক হারে। পদ্মা সেতু নির্মাণ, ঘরে ঘরে চাকরি, বিনামূল্যে সার এবং সুশাসন ও মানবাধিকারের আশার আলো দেখা যায়নি। রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগ অবকাঠামোতে সরকারের সাফল্য খুবই সীমিত।
আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে গুপ্তহত্যা ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিপীড়নে জনমনে চরম নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিতে চলমান অস্থিরতা সরকার নিরসন করতে পারছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা কাটাতে না পারলে রাষ্ট্রব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
সরকারের চার বছরের শাসনের মূল্যায়নে আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা বলেছেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এরা হলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, রাজনীতিক ও গবেষক বদরুদ্দীন উমর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, নিউজ টুডে সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।
প্রথিতযশা আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, মহাজোট সরকারের নির্বাচনী অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল। এগুলোর মধ্যে বেশকিছু তারা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে অধিকাংশই পূরণে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। আমার মতে, সরকারের ব্যর্থতার পাশাপাশি সাফল্যও রয়েছে। বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেয়া নিঃসন্দেহে সরকারের একটি বড় সাফল্য। এসব সাফল্য ম্লান হয়ে গেছে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনিসহ অন্যান্য কেলেঙ্কারির কাছে। পদ্মা সেতু না হওয়া সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সবার ভেতরেই ভীতি সঞ্চারের পাশাপাশি সরকারের সব অর্জনকেই ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সরকারের অনেকেই এটা স্বীকার করেছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি জনজীবনকে দুর্বিষহ করেছে। দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
সরকারের শেষ বছরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি আরও সংঘাতময় রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও এটা কারোরই কাম্য নয়। অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা জরুরি যা নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া সম্ভব নয়। দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। বিষয়টির সমাধানে দুই দলের দুই শীর্ষ নেত্রীকে এগিয়ে আসতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামটির প্রতি কারও যদি অনীহা থাকে, তাহলে অন্য কোনো নামে সরকারটি হতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল উভয়ের দায়িত্ব রয়েছে।
প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও গবেষক বদরুদ্দীন উমর বলেন, যে কোনো সরকার চার বছর ক্ষমতায় থাকলে তথাকথিত সাফল্যের ফিরিস্তি তুলে ধরতে পারে। মহাজোট সরকারের চার বছরের অর্জনের নামে নানা ফিরিস্তি তুলে ধরা হচ্ছে। সফলতার পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তথাকথিত এসব সফলতার মধ্য দিয়ে শাসকশ্রেণী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের লাভ হয়েছে। দেশের সাধারণ জনগণের কোনো লাভ হয়নি। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, চুরি বেড়েছে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রেলের টাকা দুর্নীতি, বিশ্বব্যাংক থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের লুটপাট সরকার ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। ডেসটিনি কেলেঙ্কারির সঙ্গেও আওয়ামী লীগ নেতারা জড়িত।
তিনি বলেন, শুধু বই বিতরণ করলেই সরকারের সফলতা অর্জন হয় না। বই বিতরণের নামে বাবার ছবিও দেয়া হচ্ছে। বাজেটের হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা বেড়েছে বলে সরকার বলছে। অথচ প্রবাসীরা নানা রকম কষ্ট করছে। তাদের জন্য দূতাবাসগুলো কোনো কাজ করছে না। চারদিকে লুটতরাজ চলছে। মানুষের নিরাপত্তা নেই। মানুষ এখন বেডরুমে, রাস্তায় খুন হচ্ছে। র্যাব, পুলিশ মানুষ হত্যা করছে। সাংবাদিক সাগর-রুনি, বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডকে সরকার ধামাচাপা দিচ্ছে। এটা এদেশেই সম্ভব। অন্য কোনো দেশে এভাবে সম্ভব হতো না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মহাজোট সরকার চার বছরে নির্বাচনী ইশতেহারের লক্ষ্য অনেক ক্ষেত্রে অর্জন করতে পারেনি। অর্থনৈতিক খাতকে রক্ষা করতে সরকারের সাম্প্রতিক প্রবণতাও শুভ কিছু নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকারের উল্লেখ করার মতো কোনো সফলতা নেই। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারিসহ আলোচিত বিভিন্ন অর্থ কেলেঙ্কারির সঙ্গে আর্থিক খাতে বিভিন্ন সমস্যা বিরাজ করছে। ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা বেড়েছে, সরকার ঋণ নিয়েছে বেশি। ঋণের সুদ বেড়ে গেছে। সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এক্ষেত্রেও বড় কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি সরকার।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান বলেন, এক কথায় চার বছরের শাসনে সরকার জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। ইশতেহার ও স্লোগানে যে আশা জাগিয়ে তুলেছিল, শাসনকালে তার উল্টো ভূমিকা দেখা গেছে। যেসব ক্ষেত্রে সফলতা প্রচার করা হচ্ছে, তাতেও ব্যাপক দুর্নীতির ছোঁয়া লেগেছে। আর দুর্নীতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটেছে, যা দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। গুম-হত্যায় রাষ্ট্র জড়িত হয়ে পড়েছে, এটা চরম দুর্ভাগ্যজনক।
তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার বিবেচনায়ও সরকার অসফল। পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন, চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সারের দাম কমানো, বেকারত্ব নিরসন, সংসদ কার্যকর এবং আগামীতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আস্থাজনক পরিস্থিতির সুযোগ রাখতে পারলে সরকারের প্রতি জনগণের অবিশ্বাস এবং অনাস্থা কম থাকত। সাধারণ মানুষ দূরে থাক, সরকারের মন্ত্রীরাও নিজেদের দুর্নীতির বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পরিবর্তনের স্লোগান কেবল সরকারি দলের নেতাকর্মীদের অর্থ, চাকরি ও বিত্তবৈভবে ঘটেছে। নাগরিকদের জীবনে নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে।
তিনি বলেন, সরকার অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি। বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী নির্বাচনের সর্বসম্মত একটি পথ বের করার ওপরই নির্ভর করবে এ সরকারের চূড়ান্ত সাফল্য।
বার কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সর্বক্ষেত্রে সরকার চরম ব্যর্থ। পদ্মা সেতুসহ তারা অনেক দুর্নীতির ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এসবের কারণে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিরোধী দলের ওপর যে মামলা-হামলা করেছে, তার বিস্তৃতি পুরো জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো বিষয়কে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বিলীন করে তারা দেশকে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। দেশ ও জাতি এখন এক সংঘাতময় পরিস্থিতির মুখোমুখি। এর আশু সমাধান না হলে গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মোট কথা, সরকার বিগত চার বছরে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কোনো কল্যাণকর ব্যবস্থা আনতে পারেনি। তাই আমি মনে করি, অন্তত গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য সরকার বিরোধী দলের দাবি মেনে নিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন দিয়ে দেশে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে।
ইংরেজি দৈনিক নিউজ টুডে সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মহাজোট সরকারের চার বছরে জনগণের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যেসব প্রতিশু্রতি দিয়েছিল, সরকার গঠনের পর গত চার বছরের মধ্যে সেসব প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই অপূর্ণ থেকে গেছে। সরকার সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। গত চার বছরের মধ্যে দেশে দুর্নীতি আরও বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের দোর্দণ্ড প্রতাপের শিকার হচ্ছে বিশ্বজিতের মতো নিরীহ মানুষরা। ডেসটিনি, হলমার্কসহ বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে পড়ায় সরকারের জন্যও গত চারটি বছর খুব ভালো ছিল না। গণমাধ্যম নিপীড়ন করছে সরকার ঘৃণ্য ও নিন্দনীয়ভাবে। এর অন্যতম শিকার হয়েছেন দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। আমি বলব, বিরোধী দলের আরও গঠনমূলক হওয়া উচিত। জাতীয় সংসদে গিয়ে তাদের এসব বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো উচিত।
সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ বলেন, চার বছরে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ভিন্নমত ও পথের ব্যক্তি এবং সংগঠনকে দমন। ক্ষমতায় আসার আগে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, গণতন্ত্রকে সংহত করার কথা বললেও গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত অর্থাত্ ভিন্নমত প্রকাশের ও পোষণের সব ধরনের পথকে সরকার রুদ্ধ করে দিয়েছে। এই তালিকা অনেক দীর্ঘ। এ সরকারকে মানুষ দীর্ঘদিন মনে রাখবে এই তালিকার কারণেই। সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে দু’একটি সাফল্য আছে, তাকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। এর একটি হলো চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। অপরটি হচ্ছে সরকারের নিজস্ব কিছু কর্মসূচি। চলমান কর্মসূচিগুলো সরকারি ধারাবাহিকতার বহিঃপ্রকাশ। যেমন, উদাহরণ হিসেবে আমরা হাতিরঝিল প্রকল্পের কথা বলতে পারি। সরকার যে ক’টি নতুন কর্মসূচি বিশেষ করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া, ঘরে ঘরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করা—এর কোনো ক্ষেত্রেই কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বরং এসব কাজ করতে গিয়ে নিজেই নিজের তৈরি ফাঁদে আটকে গেছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, এসব কোনো ক্ষেত্রেই সরকারের কোনো বক্তব্যকেই মানুষ আর বিশ্বাস করে না। আরেকটি বিষয় খুব জোর দিয়ে বলা উচিত আর তা হচ্ছে—বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীদের শিশুসুলভ চপলতা ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতার বহিঃপ্রকাশ। তারা সারাবছর ধরে এমনসব মন্তব্য করেছেন, যার ফলে সরকারের ভাবমর্যাদা তো উজ্জ্বল হয়ইনি, বরং তা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা মন্ত্রীরা অনভিজ্ঞতার কারণে করেছেন, না আগ বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য বলেছেন—তা অনুমান করা কঠিন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ সময়ে ঘটে গেছে, আর তা হচ্ছে সংবিধান সংশোধন। যে সংশোধনী সংবিধানের সমালোচনাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, সেই সংবিধান মানুষের কল্যাণ সাধন করে না। মূলত সরকার কতগুলো রাজনৈতিক প্রশ্নকে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করেছে। জনগণ এসব সমাধান গ্রহণ করবে কি-না, একমাত্র ইতিহাসই তার সাক্ষ্য দেবে। তবে ইতিহাস সম্পর্কে যারা জানেন, তারা এটা উপলব্ধি করবেন যে, রাজনৈতিক প্রশ্নের কখনও আদালতে সিদ্ধান্ত হয় না। আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়টিতে অর্থাত্ অতীত অভিজ্ঞতাকে ভুলে বসে আছে।
তিনি বলেন, সরকারের আরেকটি বড় সাফল্য হচ্ছে বাইরের পৃথিবীতে বন্ধুহীনতা! এখন একমাত্র প্রতিবেশী ভিন্ন অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক মধুর—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। সরকার নিজেই এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মোদ্দা কথায় বলা যায়, সরকারের গত চার বছরের কর্মকাণ্ড প্রায় সর্বক্ষেত্রেই ছিল জনস্বার্থবিরোধী, দলীয় আধিপত্য বিস্তারের উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষায় প্রবল এবং বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন।
অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন বলেন, এ সরকারের শাসনামলের মূল্যায়ন করতে গেলে বিভিন্ন খাত নিয়ে কথা বলতে হয়। আর এসবে শুধু সরকার নয়, বিরোধী দলগুলোসহ আমরা সবাই জড়িত। তবে সরকার পরিচালনা পদ্ধতি কেমন ছিল এবং তার বাস্তবায়ন-যোগ্যতা নিয়ে মূল্যায়ন হতে পারে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের বেশকিছু সফলতা আছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—এ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় ছিল। ইউরোপ ও আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দা এখনও কাটেনি। বাংলাদেশও কাটাতে পারেনি। তবে অনেক ক্ষেত্রে চেষ্টা করেছে। কৃষি ও খাদ্যে তা সফল হয়েছে। বিদেশে রফতানি বেড়েছে। চরম প্রতিকূলতায় জিডিপি ধরে রেখেছে। গত দু’বছরে খাদ্য আমদানি করতে হয়নি। মোটা চালের দাম কমেছে। নারী কর্মীরা আরও বেশি বেরিয়ে এসেছেন। ফুটওয়্যার কারখানায় নারীরা অংশ নিচ্ছেন। ডলারের বিনিময়ে টাকার অবমূল্যায়ন হচ্ছিল—সেটাও স্থিতিশীলতার দিকে এসেছে। নতুন বছরের বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থিতিশীলতা ধরে রাখা। নির্বাচনের আগের বছরে যা লাগামহীন ব্যয়ের দিকে চলে যেতে থাকে। সেই সংযত মুদ্রানীতি ধরে রাখতে পারলে অর্থনৈতিক গতি ইতিবাচক দিকে ধাবিত হবে। আমি ইতিবাচক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার কথা বলছি।
তিনি বলেন, এসব সফলতার পরও জনগণ হতাশ। সবার আশা ছিল আরও আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও আরও মানবিক একটি সরকার উপহার পাবে। যে কোনো বিচারেই দেখুন না কেন, আমরা সে শাসনামল পাইনি। আমরা পেয়েছি ২০০০-০৬ সাল পর্যন্ত বহমান ধারার একটি অর্থনৈতিক বাংলাদেশ। মন্ত্রী-এমপিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরার কথা ছিল, তা হয়নি। চলমান প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের একটি কালো টাকার প্রভাব দেখেই যাব। আরেকটি হতাশা আছে, উপজেলা ব্যবস্থা বা স্থানীয় সরকার বলে যে একটি ব্যবস্থা আছে তা কার্যকর হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের যারা নির্বাচিত হলো তাদের ভুলে গেছি। পারফরম্যান্স বিচারে ইউপিতে পৃথক বরাদ্দের কথা বলেছিলাম। সরকার এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে নগর ও গ্রামের অর্থনৈতিক ব্যবধান বেড়েছে। অবশ্য নগরেও উল্লেখ করার মতো উন্নয়ন হয়নি। এজন্যই জিডিপি বাড়ছে না। অর্থনৈতিক সংস্কার হয়নি। একজন ব্যক্তিকে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা করা হলেও অর্থনৈতিক কাউন্সিল নেই। কাজ হবে কীভাবে? পুলিশ ও আইন ব্যবস্থা, নগর পরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত সামন্তবাদী। নগরভিত্তিক সমাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—মেট্রোরেল চলবে, ইন্টারসিটি কানেকটিভিটি থাকবে। এসব গড়ে তুলতে সরকার কোনো মনোযোগ দেয়নি। ঢাকা-চিটাগং ফোর লেন এবং চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দরকে আধুনিকীকরণের কোনো কাজ হয়নি।
গত চার বছরে রাজনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা হয়নি। বিশেষ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দ্বিতীয় বারের মতো গ্রেফতারের সিগন্যাল ভালো ফল বয়ে আনবে না। জনগণ এসব খেয়াল করছে। আমরা এক-এগারোর পরিবর্তে আরেকটি ঘটনা দেখতে চাই না। মধ্য আয়ের দেশের দিকে যাব, আর দেশ চলবে মধ্যযুগীয় কায়দায়, এটা হতে পারে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, সরকারের শুরুটা ভালো ছিল। শুরুর দিকে সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। সরকারের আচরণে সংযম ও শালীনতা ছিল। প্রথম এক বছর আইনশৃঙ্খলাও তুলনামূলক ভালো ছিল। পরে ক্রমান্বয়ে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব মানদণ্ড আছে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যর্থতা দেখি। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও গুমের যে বিস্তার ঘটে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নব্বইয়ের পরে এ ধরনের গুমের বিস্তার হবে, তা কেউ চিন্তা করতে পারেনি। ক্রসফায়ার চলছে। বিপ্লবের মতো খুনি-সন্ত্রাসীকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করেছেন। এটা নৈরাজ্যকর ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। দুর্নীতির বিষয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিস্তৃতি আশঙ্কাজনক। রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারে যেমন দলীয় সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তেমনি ব্যাপক ঘুষের ঘটনাও গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। বড় বড় আপরাধীকে আড়াল করার জন্য ছোট ছোট অপরাধীকে ধরা হয়েছে। দলীয়করণের মারাত্মক বিস্তার ঘটেছে।
তিনি বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারের যে সাফল্য ছিল, তাতেও দুর্নীতির ছোঁয়া লেগেছে। দুর্নীতি না হলে কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়ে সরকার জনগণের কাছে যেতে পারত। কিন্তু দুর্নীতি সবকিছু ঢেকে দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে উদ্যোগ ভালো ছিল, কিন্তু এরই মধ্যে এখানে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংবাদপত্র ও ভিন্নমত দমনের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক অসহিষ্ণুতা দেখিয়েছে সরকার। আমার দেশ ও মাহমুদুর রহমান যে কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এর অন্তর্নিহিত কারণ দেশের মানুষ জানে। এই যে বাজে নজির স্থাপিত হলো এটা আগামী দিনের স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য হুমকিস্বরূপ। আগামী নির্বাচন নিয়ে যে অসহিষ্ণুতা ও হরতালের মুখোমুখি হয়েছে জাতি, তা সরকারের সৃষ্ট। এ থেকে উত্তরণ জরুরি। আশা করব, শেষ বছরে এসে সরকার যেন তার ব্যর্থতাগুলো উপলব্ধি করে ভালো পারফর্ম করার চেষ্টা করে।