Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২৩ পৌষ ১৪১৯, ২৩ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

সিপিডির পর্যালোচনা : তেলের দাম বৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে : উত্পাদন, রফতানি, আয়, কর্মসংস্থান কমবে বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়

অর্থনৈতিক রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
বিশ্ববাজারে স্থিতিশীল থাকা সত্ত্বেও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় শিল্পখাতে উত্পাদন ব্যয় বাড়বে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে সেচের অভাবে কৃষিখাতে উত্পাদন কমে যেতে পারে। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্য আরেক দফা বেড়ে যাবে। এ অবস্থায় ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সামষ্টিক অর্থনীতির পর্যালোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে।
সিপিডি’র হিসাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জাতীয় উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে পোশাক খাতে। এ খাতের উত্পাদন কমে আসবে প্রায় আড়াই শতাংশ। একই কারণে রফতানি আয় কমে যাবে ১ দশমিক ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। একই কারণে কর্মসংস্থান আধা শতাংশ থেকে দশমিক ৭ শতাংশ কমতে পারে। এর ফলে পরিবারগুলোর আয় দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়ে পণ্য ও সেবার ব্যবহার কমে আসবে প্রায় ১ শতাংশ। তাছাড়া শিল্প প্রতিষ্ঠানের আয়ও কমে যাবে দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত।
সিপিডি’র নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গতকাল অর্থবছরের প্রথম ছয়মাসের পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ খাতে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও নভেম্বর পর্যন্ত ৫ মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে প্রত্যাশার চাইতে রাজস্ব ব্যয় বেশি হয়েছে। এ হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাবে। ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিতে হবে। এ হিসাবে চলতি অর্থবছর সরকারের ব্যাংকঋণ হবে ৩৩ হাজার কোটি টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে পদ্মা সেতু, হলমার্ক কেলেঙ্কারিসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়েও কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার প্রবণতা বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ন্যূনতম পেশাগত দক্ষতা নেই এমন ব্যক্তিরা রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা এসব কর্মকাণ্ডের বহিঃপ্রকাশ। পদ্মা সেতুর দুর্নীতিতে তত্কালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের জড়িত থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মন্ত্রীর অগোচরে মন্ত্রণালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত হতে পারে না। পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন সবচেয়ে ভালো বিকল্প বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, গত অর্থবছরের বিদ্যমান বেশকিছু ঝুঁকি নিয়ে চলতি অর্থবছর যাত্রা শুরু করে। সাময়িকভাবে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেলেও তা ছিল নড়বড়ে। যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশলীতা এ প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। আগামী মাসগুলোতে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপরই নির্ভর করছে প্রবৃদ্ধির ধারা। এ সমস্যা সমাধানে সরকার ও বিরোধী উভয় দলকে অর্থনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছতে হবে।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছর নির্ধারিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ২ অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সামষ্টিক দুর্বলতার কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ অন্যান্য লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। চলতি অর্থবছর জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে।
বিদ্যমান সংকোচনশীল মুদ্রানীতির দ্বিমুখী প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এতে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা গেলেও প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে। এছাড়া বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে। এতে অর্থবছর শেষে ব্যাংকিং খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা হ্রাস পাবে। আমদানির বিল পরিশোধ ও এলসি খোলার হার কমে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
অবকাঠামো সুবিধার বিকাশ না হওয়া, নতুন গ্যাস ও বিদ্যুত্ সংযোগ পেতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা, এবং গ্যাস ও বিদ্যুত্ সঙ্কটের কারণে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান। সিপিডি’র সিনিয়র গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ব্যাংকঋণে ঊর্ধ্বসীমা উঠিয়ে দেয়ায় ব্যবসায়ীরা বেশি সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আমানত ও ঋণের ক্ষেত্রে সুদ ব্যবধানের পার্থক্যও মানছে না ব্যাংকগুলো। এতে ব্যবসায়ীদের লাভের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে সুদের পেছনে। এসব কিছুর কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে গেছে।
প্রতিবেদনে রফতানি আয়ের গতি ঠিক রাখতে দক্ষিণ-দক্ষিণ বাণিজ্য বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি কমলেও চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে চীনে ২৫ দশমিক ৭, মালয়েশিয়ায় ২৭ দশমিক ৯, মিয়ানমারে ৩৯ দশমিক ৪ ও থাইল্যান্ডে ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও সরবরাহ বাড়ানো গেলে নতুন এ বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধি করা সম্ভব।
দেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম উল্লেখ করে সিপিডি জানায়, গত বছর ভিয়েতনামে যেখানে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে ৭ বিলিয়ন ডলার, সেখানে এ দেশে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র এক বিলিয়ন ডলার। তাছাড়া সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ায় বাংলাদেশকে নতুন শ্রমবাজার খোঁজার পরামর্শ দেয়া হয়।
দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এখন কার্যত অচল হয়ে গেছে। বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এতটাই পিছিয়ে আছে যে, সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অর্জনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এগুলো সংশোধন করে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
সরকারের শেষ সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা দেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছে। এমনকি দেশের সীমানায় অর্থ রাখতেও অনেকে ভরসা পাচ্ছেন না। গবেষণার পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি বলেন, প্রতি বছর দেশ থেকে ১৪০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হচ্ছে। সরকার বদলের সময় বিনিয়োগ কমার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা দেশে অর্থ রাখতেও অস্বস্তি বোধ করেন।
অপর প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে এখনও নড়বড়ে অবস্থা রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা সামাজিক যে কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব এ অবস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে গত ছয় মাসের অর্জন আগামী ছয় মাসে হারিয়ে যেতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে দ্বিমত থাকলেও, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় দুই দলের মধ্যে ঐকমত্য থাকা দরকার।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা প্রধান ড. ফাহমিদা খাতুন, ডায়ালগ ও কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ প্রমুখ।