Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২৩ পৌষ ১৪১৯, ২৩ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বিচার বিভাগের যেখানে হাত দেয়া হবে সেখানেই ক্যান্সার, সব অঙ্গে পচন ধরেছে : সেমিনারে বক্তারা

স্টাফ রিপোর্টার
পরের সংবাদ»
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস আয়োজিত ‘সাক্ষীর নিরাপত্তার অভাব এবং আদালতের প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে আইনের শাসন—লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে যোগ দিয়ে বক্তারা বলেছেন, বিচার ব্যবস্থা আজ এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তার প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পচন ধরেছে। বিচার বিভাগের যেখানে হাত দেয়া হবে সেখানেই ক্যান্সার। বিচার বিভাগে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে এমন মত দিয়ে এ থেকে উত্তরণ না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে বলে হুশিয়ারি করে দেন বক্তাদের কেউ কেউ। সেমিনার থেকে সাক্ষী সুরক্ষা আইন, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয়, মামলার আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
বক্তাদের কেউ কেউ বলেন, বিচার বিভাগের সব সেক্টরেই নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত নানা ধরনের কাজ চলার অভিযোগ উঠছে। বিচারকদের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশ এবং বেঞ্চ অফিসারদের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ দূষণ এখন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি মুহুরিদের আচরণ এবং সততা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তারা বিচার বিভাগে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে আমূল পরিবর্তন দরকার বলে মত দেন।
রাজধানীর ব্র্রেক ইন সেন্টারে গতকাল শনিবার বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ) এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. ইমান আলী। তিনি আমাদের দেশে অনেক ফলস্ কেস (হয়রানিমূলক মামলা) হয় স্বীকার করে বলেন, যারা সাক্ষী দিতে আসে তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি থেকেই যায়। তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সেমিনারে অন্যদের মধ্যে, ঢাকা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১-এর বিচারক সাদিকুল ইসলাম তালুকদার, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী মো. আসাদুজ্জামান, ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্র্রেট তাজুল ইসলাম, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফরোজা শিউলি, লুবনা জাহান, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমান, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক ও মেডিসিন বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক মো. বেলায়েত হোসেন খান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক (অধিকার) রিনা রায়, সাবেক পিপি আমিনুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন ও প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান। সহযোগী সংগঠন হিসেবে ছিলেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শান্তা মালিক মর্জিনা নামের একজন তার উপর স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজনের নির্যাতনের কাহিনী বর্ণনা করেন। সেমিনারে যোগ দিয়ে বক্তাদের একাংশ বলেন, র্যাব, পুলিশ ইচ্ছেমত মানুষ মারছে। মানবাধিকার তো দূরের কথা, দেশে আজ আইনের শাসনই নেই। ‘ডিবি পুলিশের নির্যাতনের পর জেলে আটক নিরপরাধ মানুষগুলোর কি হবে’ এ ব্যাপারে একজন প্যানেল বক্তা প্রধান অতিথির বক্তব্য জানতে চাইলে সেমিনারের সঞ্চালক এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব নয় বলে জানান। সেমিনারে বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের যে গোলক ধাঁধায় জাতি নিমজ্জিত হয়েছে, তা বিচার বিভাগকেও কলুষিত করছে। এর থেকে উত্তরণ না হলে বিপর্যয় ঘটবে। বিচারপতি মো. ইমান আলী বলেন, আমাদের দেশে অনেক ফলস্ কেস (হয়রানিমূলক মামলা) হয়, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলস্ কেস থাকেই। এর বাইরে বিভিন্ন মামলায় যারা সাক্ষী হিসেবে আসেন তাদের সিকিউরিটির (নিরাপত্তা) প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ জরুরি।
তিনি বলেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে চান না। দেখা গেল কোনো ঘটনায় একজন সাক্ষী পুলিশের কাছে যে জবানবন্দি দেয় আদালতে এসে তা বলে না। এটাও কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার কারণেই। আমরা দেখছি, কোর্ট চত্বরেই মারামারির ঘটনা ঘটছে। সাক্ষী দিয়ে আসার পর সাক্ষীকে প্রতিপক্ষের লোকজন মারধর করছে।
তিনি বলেন, সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্ষণের শিকার হলেও ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুরা আইনের আশ্রয় নেয় না। আবার আইনের আশ্রয় নিলে বারবার তাকে অভিযোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে সামাজিকভাবে নিগৃহীত হতে হচ্ছে। বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া ও সাক্ষীর অভাবে দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত কালপ্রিটরাই (ধর্ষণকারীরা) পার পেয়ে যাচ্ছে। এর কারণ সাক্ষীদের নিরাপত্তায় দেশে কোনো আইন নেই। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ চাঞ্চল্যকর এ ধরনের মামলাগুলোতে বারবার ক্ষতিগ্রস্তের সাক্ষ্য নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রযুক্তি অনেক এগিয়েছে, একবার ভিডিও করে ক্ষতিগ্রস্তর (নারী-শিশু) বক্তব্য রেকর্ড করা সম্ভব। এজন্য সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করা প্রয়োজন। সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিচারপতি ইমান আলী বলেন, ইংল্যান্ডে যেখানে গত ডিসেম্বরে সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য আইন থাকার পরেও বাজেটে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে সাক্ষীদের নিরাপত্তায় কোনো আইন এখনও হয়নি। এখানে যারা আছেন তারা সবাই একমত সাক্ষীদের নিরাপত্তায় আইন করতে হবে। তা-না হলে কালপ্রিটদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তারা আরও বেশি অপরাধে সাহসী হবে। সংবিধান অনুসারে জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পুলিশ, চিকিত্সক, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টদের সততা, আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১-এর বিচারক সাদিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, আইনজীবীদের মধ্যে অনেকেই মামলার বিষয়বস্তুুর মধ্যে না গিয়ে সাক্ষী-ক্ষতিগ্রস্তদের চরিত্র হনন করেন। প্রকৃত অর্থে এটা ন্যায়বিচারকেই বিলম্বিত করে।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কনটেম্পট হতে পারে এ ঝুঁকি মাথায় নিয়েই বলছি, বিচার ব্যবস্থা আজ এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তার প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পচন ধরেছে। বিচার বিভাগের যেখানে হাত দেয়া হবে সেখানেই ক্যান্সার। বিচার বিভাগে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে। বিচারপতিদের বিরুদ্ধে সততার অভিযোগ উঠছে। সেমিনারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, চিকিত্সক, আইনজীবী, পুলিশ, সমাজসেবা কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি ও মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সাক্ষীরা অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।