সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণ মৌসুমে চলছে রাজস্ব ফাঁকির মহোত্সব

খুলনা অফিস « আগের সংবাদ
পরের সংবাদ» ০৫ জানুয়ারী ২০১৩, ১০:১৪ পূর্বাহ্ন

সুন্দরবন থেকে গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুমে এবার চার শতাধিক নৌকা বনে প্রবেশ করেছে। গোলপাতা বোঝাই করে লোকালয়ে আসার আগে এসব নৌকায় মলম লাগিয়ে (অতিরিক্ত তক্তা লাগিয়ে বা ঘেরা দিয়ে ধারণক্ষমতা বাড়ানো) কয়েক কোটি টাকার গোলপাতা ও কাঠ কেটে আনা হচ্ছে। হিসাব বহির্ভূতভাবে আনা এসব বনজ দ্রব্য থেকে সরকার রাজস্ব হারালেও সুন্দরবন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গোলপাতা আহরণের সঙ্গে জড়িত বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এ সম্পর্কিত চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ নভেম্বর থেকে সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগ থেকে গোলপাতা আহরণ করার জন্য পাস ইস্যু করা হয়।
পাস ইস্যু করার পর পশ্চিম বিভাগের আড়ুয়া শিবসা ও শিবসা গোলপাতা কুপে চার শতাধিক নৌকা ঢুকেছে। তবে অধিকাংশ নৌকার বিএলসিতে (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) উল্লেখ করা পরিমাপের সঙ্গে নৌকার পরিমাপের ঠিক নেই বলে আগেই অভিযোগ ওঠে।
পরিমাপ ঠিক না থাকলেও বাওয়ালিরা বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে বনে ঢুকেছে। এজন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে যত মণ বেশি গোলপাতা নৌকায় বোঝাই করা হবে, তত মণের জন্য একশ’ টাকা করে বন কর্মচারীদের দিতে হয় বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।
নৌকার পরিমাপের হেরফের ঠিক করতে গোলপাতা বোঝাই করার পর অবৈধভাবে নৌকার দু’পাশে সুন্দরবন থেকে গেওয়া গাছ কেটে তা ঝুল হিসেবে ব্যবহার করার জন্যও ঘনফুট হিসেবে ১০ থেকে ১২ টাকা আদায় করা হয় বলে জানা যায়। অথচ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই আছে, সুন্দরবন থেকে গাছ কাটা যাবে না।
কিন্তু প্রতিটি নৌকায় কমপক্ষে ৫০ ঘনফুট করে গাছ কেটে ঝুল লাগানো হলেও বন বিভাগ মাত্র ১২ ঘনফুট কাঠের রাজস্ব আদায় করছে। বাকি টাকা চলে যাচ্ছে বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে।
বাওয়ালি সূত্রে জানা যায়, শুধু নৌকায় ঝুল নয়, ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য গোলপাতা বোঝাই করার আগে নৌকার পেছনে ৬০ থেকে একশ’ মণ কাঠ কেটে রাখা হয়। যেখানে মাটি রাখলেও কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু তারা বনবিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে মাটির পরিবর্তে কাঠ কেটে বোঝাই করছে, যার একটি টাকাও সরকারের ঘরে পৌঁছে না।
নিয়মানুযায়ী, প্রতিটি নৌকায় জলদাগ আছে। এই দাগ ডুবিয়ে নৌকা বোঝাই করা যাবে না। কিন্তু কূপের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মণপ্রতি ১০-১২ টাকা উেকাচ নিয়ে নৌকায় ৫০-৭০ ইঞ্চি মলম লাগিয়ে দিচ্ছে। এ নৌকাগুলো ঠিকমত চেক করলে সরকার প্রতিটি নৌকা থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি রাজস্ব পাবে বলে সূত্র জানিয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নৌকাগুলো সুন্দরবন থেকে বেরিয়ে আসবে।
এ ব্যাপারে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা জহির উদ্দিন জানান, যারা নিয়ম না মানবে তাদের জন্য যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে। তিনি বলেন, বাওয়ালিদের ১২ ঘনফুট ঝুল কাঠ কাটার অনুমতি সরকারিভাবে নয়, বনবিভাগ থেকে দেয়া হয়েছে।
এদিকে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাশার ও চেয়ারম্যান ওলিউল্লাহ গত মঙ্গলবার অভিযান চালিয়ে সুন্দরবন থেকে অবৈধভাবে বেরিয়ে আসা ১৮টি গোলপাতা বোঝাই নৌকা জব্দ করে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী গোলপাতা বোঝাই নৌকা গোলকুপ থেকে বন কর্মকর্তাদের চেকআপের পর পাস নিয়ে স্টেশন ঘাটে এসে পাস জমা দিয়ে সিটি পাস (পারমিটের পরিবর্তে পূরণীয় পাস) নিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করতে হয়। আটককৃত নৌকাগুলো নিয়ম বহির্ভূতভাবে অবৈধভাবে পাসের অধিক মাল বোঝাই করে বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বন থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেছিল।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাশার জানান, আটককৃত নৌকায় পাসের অধিক মাল বোঝাই থাকায় ১৭টি মামলা হয়েছে, ২টি নৌকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং ২টি নৌকায় সুন্দরী কাঠ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা দেয়া হয়েছে।

আমার বাংলা এর আরও সংবাদ

সাপ্তাহিকী


উপরে

X