Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২৩ পৌষ ১৪১৯, ২৩ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

চলে গেলেন ধারাভাষ্যের জাদুকর টনি গ্রেগ

মো. ওহিদুল ইসলাম (শ্যামল)
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত টনি গ্রেগ ৬৬ বছর বয়সে ক্রিকেটবিশ্বকে কাঁদিয়ে গত ২৯ ডিসেম্বর সিডনির সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সময় রাত ১টা ৪৫ মিনিটে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি ক্রিকেটার হিসেবে তত সুপরিচিত নন, যত একজন ধারাভাষ্যকার হিসেবে। কারণ ক্রিকেটার গ্রেগের পরিচয়কে গৌণ করে দিয়েছিল ধারাভাষ্যকার গ্রেগ। তাই বলে ক্রিকেটার হিসেবেও তার সফলতা কম নয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭—মাত্র পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারে ৫৮টি টেস্ট খেলেছেন, অধিনায়ক হিসেবে ১৪টি টেস্টে ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, করেছেন ৩৫৯৯ রান এবং বোলার হিসেবে নিয়েছেন ১৪১ উইকেট। এ পরিচয়টিই যখন ধারাভাষ্যকার পরিচয়ের আড়ালে পড়ে যায়, তখন সহজেই অনুমেয়, ধারাভাষ্যকার হিসেবে তিনি কত সফল ছিলেন। ধারাভাষ্য যে একটা বড় মাপের শিল্প এবং ধারাভাষ্য যে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কত বৃদ্ধি করতে পারে, সেটা ক্রিকেটবিশ্বকে দেখিয়ে গেলেন টনি গ্রেগ। ভরাট আর দরাজ কণ্ঠে তার রসালো বর্ণনা, নিখুঁত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ধারাভাষ্যে যোগ করেছিল এক অনন্য মাত্রা, যা ক্রিকেটকে করেছিল দারুণ উপভোগ্য।

চ্যানেল নাইনের সতীর্থ ধারাভাষ্যকারদের সঙ্গে টনি গ্রেগ
গত মাসে গ্যাবা টেস্টের প্রথম দিনে টেলিফোনে সতীর্থ ধারাভাষ্যকাররা কথা বলছিলেন তার সঙ্গে। ৩৩ বছরের মধ্যে এই প্রথম ব্রিসবেনের ধারাভাষ্য কক্ষে অনুপস্থিত থাকা গ্রেগের কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসছিল। বলেছিলেন, ‘এ রকম একটা দিনে ক্রিকেট মাঠে থাকতে না পারাটা যে কত কষ্টের, সেটা তোমরা কেউ বুঝবে না। বিশেষ করে ৩৩ বছর ধরে এ কাজ করার পর না থাকাটা সত্যিই বিশ্বাস করা কঠিন। এমনকি আমার ছোট ছেলেটা স্কুল থেকে বাসায় ফিরে আমাকে দেখে চমকে উঠেছিল। ওর ভাবখানা ছিল এমন, ‘সে কী বাবা, তুমি বাসায় কী কর! তোমার তো বাসায় থাকার কথা না।’ ব্যাপারটা মেনে নিতে আমার বেশ খানিকটা সময় লেগেছে। তবে আমি নিশ্চিত, এই টেস্ট ম্যাচটা যতই এগোবে, ততই আমার খারাপ লাগবে।’ গত মে মাসে তার ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়। তবে প্রথম দিকে চিকিত্সকরা রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থ হন। তার অসুস্থতাকে ব্রংকাইটিস হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অক্টোবরে ধরা পড়ে, তিনি মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত। তবে তিনি ক্যান্সারে মারা যাননি। নিজ গৃহে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। চ্যানেল নাইনের ধারাভাষ্য দলের হয়ে প্রিয় বন্ধু বিল লরির প্রতিক্রিয়া, ‘সবাই একেবারে ভেঙেচুরে গেছে। ও ৩৩ বছর ধরে আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। আমরা জানতাম ও অসুস্থ। কিন্তু এভাবে হুট করে চলে যাবে, ভাবতেই পারিনি। এটা আমাদের কাছে একটা বড় আঘাত হয়ে এসেছে।’ আইসিসি প্রধান নির্বাহী ডেভিড রিচার্ডসন শোকবার্তায় বলেন, ‘ক্রিকেটের জন্য এটি চরম দুঃখের সংবাদ এবং টনির পরিবার, বিশেষ করে তার স্ত্রী ভিভিয়ানের কাছে আইসিসি তাদের শোক প্রকাশ করছে। খেলোয়াড় হিসেবে আধুনিক ক্রিকেট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সত্তরের দশকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন টনি। এরপর লাখ লাখ ক্রিকেট ভক্তের জন্য অনন্য এক ধারাভাষ্যকার হিসেবে আবির্ভাব ঘটে তার, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার নাইন নেটওয়ার্কে।’
টনি গ্রেগ নামে ক্রিকেটবিশ্বে পরিচিত হলেও তার পূর্ণ নাম অ্যান্থনি উইলিয়াম গ্রেগ। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের মতো তার জীবনটাও অনেক বৈচিত্র্যময় ও বর্ণাঢ্য। জন্মেছিলেন ১৯৪৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্সটাউনে। বাবা ছিলেন স্কটিশ। নাগরিকত্ব নিয়ে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন। আর কয়েক দশক ধরে ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার নাইন নেটওয়ার্কে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নাইন নেটওয়ার্কের সঙ্গেই জড়িত ছিলেন গ্রেগ। এজন্যই তাকে বলা হয় ক্রিকেট’স গ্রেটেস্ট সেলসম্যান। জনপ্রিয় ধারাবিশ্লেষক হার্শা ভোগলে তার স্মরণে বলেন, হি ওয়াজ ওয়ান অব ক্রিকেট’স গ্রেট ট্রাভেলারস। টনি গ্রেগ জেনুইনলি লাভড দ্য গেম, ওয়াজ অলওয়েজ ওয়েল ইনফরমড এবাউট ইট, অ্যান্ড ব্রট এন এনার্জি অল হিজ ওন টু দ্য কমেন্টারি বক্স।
সত্তরের দশকে টনি গ্রেগ বিশ্ব ক্রিকেটে একবার হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন ক্যারি প্যাকার ওয়ার্ল্ড সিরিজে নেতৃত্ব দিয়ে। সেই তোলপাড় করা ঘটনা সম্পর্কে তার দীর্ঘদিনের সতীর্থ বিল লরি বলেন, ‘সেটা আসলে ক্রিকেটকেই নিয়ে এসেছিল অন্য এক ধাপে। কেরি প্যাকারের বিদ্রোহী সেই সিরিজের সর্বেসর্বা ছিলেন তিনিই। ডেনিস লিলি, ইমরান খান, গ্রেগ ও ইয়ান চ্যাপেল, ভিভ রিচার্ডস, ক্লাইভ লয়েডদের মতো তারকাদের নিয়ে গিয়েছিলেন সেই টুর্নামেন্টে। এ টুর্নামেন্টই ওয়ানডে ক্রিকেটটাকে পাল্টে দিয়েছে। এসেছে দিবারাত্রির খেলা, রঙিন পোশাক। এ টুর্নামেন্টই ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিকও একলাফে নিয়ে গিয়েছিল অনেক উপরে।’
আর শোনা যাবে না দরাজ কণ্ঠে তার সুন্দর ও দারুণ উপভোগ্য ধারাভাষ্য। সারাদুনিয়ার ক্রিকেটভক্তরা দারুণ মিস করবে তার জ্ঞানগর্ব নিখুঁত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। চিরলড়াকু গ্রেগের মৃত্যুতে ক্রিকেটবিশ্বে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণীয় নয়। তার প্রিয় বন্ধু, দীর্ঘদিনের সতীর্থ বিল লরির কথায় আবার ফিরে যেতে হয়, ‘বিশ্বক্রিকেট তার অন্যতম এক দূতকে হারাল। এ কারণে শুধু নয় যে টনি গ্রেগ ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ছিল, ওয়ার্ল্ড সিরিজ বিশ্ব একাদশের অধিনায়ক ছিল বলে নয়; বরং এ কারণে, ও ক্রিকেটের জন্য শ্রীলঙ্কা, ভারত, ইংল্যান্ড, দুবাই যে কোনো জায়গায় যেতেই প্রস্তুত ছিল। সারাবিশ্বই ওকে চিনত, ভালোবাসত, সম্মান করত। ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম এক সেরাকেই আজ হারাল।’