Amardesh
আজঃঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ১৩ পৌষ ১৪১৯, ১৩ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

আমার দেশ সাইবার ক্রাইম করেছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে : তথ্যমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, বিচারপতির কথোপকথন হ্যাকিংয়ের বিষয়ে সাইবার ক্রাইম আইন অনুাযায়ী এরই মধ্যে মামলা দায়ের হয়েছে। প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে। দ্রুত তদন্তের ভিত্তিতে জড়িতদের চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
গতকাল তথ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাকিং নিয়ে নতুন করে আইন করার প্রয়োজন নেই। প্রচলিত আইনেই দেশের মাটিতে অথবা বাইরের যে কোনো দেশে আলাপচারিতা হ্যাক করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ব্যক্তিগত কথপকথন, আলাপচারিতা ও আদান-প্রদান কোনো তৃতীয় পক্ষ চুরি কিংবা প্রকাশ করতে পারে না। তিনি বলেন, আমার দেশ পত্রিকায় বিচারপতির স্কাইপ সংলাপ নিয়ে প্রকাশিত খররের ব্যাপারে মামলা হয়েছে। তদন্ত করে দেখা হচ্ছে সেখানে কোনো সাইবার ক্রাইম ঘটছে কীনা। আর ঘটে থাকলে তা কারা ঘটিয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর কারা জড়িত তা জানা যাবে।
স্কাইপ সংলাপ ও বিচারপতির পদত্যাগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাব তিনি বলেন, বিষয়টি মহামান্য আদালত আমলে নিয়েছে। আদালতের মাধ্যমেই এটা নিষ্পত্তি হবে। এ বিষয়ে সরকারের কোনো মন্তব্য নেই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের চলমান বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে মহল বিশেষ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে এ বিষয়ে জনগণকে স্বচ্ছ ধারণা দিতে ও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে সরকারের তরফ থেকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, একটি মহল একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বন্ধে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করতে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলা শুরু করেছে।
ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের প্রত্যেককে একজন একজন করে খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। যুদ্ধাপরাধী আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ কিংবা জামায়াত যে দলেরই হোক না কেন, তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা হবে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সরকার বিপর্যস্ত কীনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা জনগণের ম্যান্ডেটের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছি। সরকার মোটেও বিপর্যস্ত নয়। সব বিভ্রান্তির জাল ছিন্ন করে আমরা বিচার শেষ করবোই।
মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের পুনর্বিচারে আসামিপক্ষের আবেদনের বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিচারক পদত্যাগ করলে, বিচারক অপসারণ হলে, বিচারক মারা গেলে কিংবা অসুস্থ হলে বিচার বাধাগ্রস্ত হয় না। আইন অনুসারে বিচারিক প্রক্রিয়া যে অবস্থায় রয়েছে, সে অবস্থা থেকেই শুরু করতে হয়। সুতরাং বিচারপতির পদত্যাগে আদালতের কাজ বন্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না। যেখানে তিনি রেখে গেছেন সেখান থেকেই নতুন বিচারপতি কাজ করবেন।
বিচারকের পদত্যাগ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইনু বলেন, এটা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাচ্ছি না। বিচারক পদত্যাগও করতে পারেন, সরেও যেতে পারেন। এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে বিচার কাজ বিলম্বিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রাজনৈতিক নয় দাবি করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, মোট চারটি কারণে এ বিচার করা হচ্ছে। সেগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অপরাধীদের মাফ করে দেয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা, জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা এবং মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
সরকার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিচার চায় দাবি করে তিনি বলেন, আমরা নির্যাতন করে সামরিক শাসনের মতো বিচার করতে চাই না। আমরা সভ্য মানুষ, গণতান্ত্রিকভাবে বিচার করতে চাই। এই বিচারের জন্য ৪০ বছর অপেক্ষা করেছি, আইন নিজের হাতে তুলে নেইনি।
একে একে দেশের সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, বিচার কাজ শুরু হয়েছে এবং এটা চলতে থাকবে। আগামী নির্বাচনে যদি বাংলাদেশের সরকার আসে তাহলে বিচারকাজ চলতে থাকবে। আর যদি আফগানিস্তান বা পাকিস্তানপন্থী সরকার আসে তাহলে বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত হবে। তবে, আমার বিশ্বাস জনগণ বাংলাদেশের সরকারকে নির্বাচিত করবে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, দু’টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিহ্নিত ও আত্মস্বীকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদেরই বিচার করা হচ্ছে। এ বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করতে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দেয়া হচ্ছে। নানা ষড়যন্ত্র, হামলা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে বিচার ভণ্ডুলে মরিয়া হয়ে উঠেছে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক দল জামায়াত এবং তাদের সহযোগী দল, মহল ও ব্যক্তিরা। তবে, সব চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র নির্মূল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হবেই বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ট্রাইব্যুনালকে সম্পূর্ণ স্বাধীন উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা বিচার কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং তারা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে স্বাধীনভাবেই বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সরকারের তরফ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি এ বিচার সম্পন্ন করতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সহযোগিতা কামনা করেন।
যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্তদের ক্ষমা করা হয়নি। তবে যারা পাকিস্তানিদের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিলেন, কিন্তু খুন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত হননি, তাদের ক্ষমা করে দেয়া হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ কলাবরেটর আইন ১৯৭২-এর অধীনে ৩৭ হাজার অপরাধীকে আটক করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, ধর্মান্তরিত করাসহ ৬টি সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ১১ হাজার অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এ অপরাধীদের বিচারের জন্য ৬৩টি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৬৮ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৭৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত করা হয়।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করার পর সামরিক শাসকগোষ্ঠী কলাবরেটর অ্যাক্ট বাতিল করে দণ্ডিত আটক যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর আসামিদের মুক্ত করে দেয়া হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক ফরমানের বৈধতা দেন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও প্রতিষ্ঠিত করেন।
বিএনপি-জামায়াত বিচার বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে অভিযোগ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বিচার বন্ধের সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছে। জামায়াত-বিএনপি বিচার বন্ধে সরাসরি আক্রমণও চালাচ্ছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিচার বানচালের উদ্দেশ্যে ডাকা হরতালে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে। এতেই তারা বিচার চায় কিনা, তা স্পষ্ট। বিএনপি-জামায়াত রাখ-ঢাক বা লাজ-লজ্জা না রেখেই বিচার বানচাল করতে আইনের অপব্যাখ্যা, ভুল ব্যাখ্যা করছে। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া হচ্ছে।
বিচারে আসামিদের অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে উল্লেখ করে ইনু আরও বলেন, আসামিরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাচ্ছেন। আসামিরা ইচ্ছেমতো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারছেন, জামিন আবেদন করতে পারছেন এবং আপিলের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া আসামিপক্ষ সাক্ষীকে জেরা করতে পারছেন।
সাংবাদিকদের মাধ্যমে সবাইকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারে সহায়তার আহ্বান জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা না বলে, যারা অপরাধ করেছেন তাদের ন্যায়বিচারের কথা বলা হচ্ছে। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সবাইকে সচেতন করার আহ্বানও জানান মন্ত্রী।
উল্লেখ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ বিচারে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ প্রথম ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার। এতে হাইকোর্টের বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। চলতি বছরের ২২ মার্চ অপর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরকে চেয়ারম্যান করে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
সম্প্রতি বিচারপতি (পদত্যাগ) নিজামুল হক নাসিম ও বেলজিয়াম প্রবাসী আইনজীবী ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপ কথোপকথন দৈনিক আমার দেশ ও লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী ইকোনমিস্ট টাইমসে প্রকাশিত হলে দেশ-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। স্কাইপ সংলাপের সংবাদ প্রকাশের পর বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম গত ১১ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগে ট্রাইব্যুনাল-১-এ শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ১৩ ডিসেম্বর এ শূন্যতা পূরণ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে নতুন বিচারক নিয়োগ ও দুটি ট্রাইব্যুনালকে পুনর্গঠন করে সরকার। এতে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান হন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান একই ট্রাইব্যুনালের বিচারক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
বিচারপতি নাসিমের পদত্যাগের ফলে কয়েকটি মামলার পুনর্বিচারের আবেদনসহ ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন আবেদন করছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। বিচারকে বিলম্বিত করা ও দীর্ঘসূত্রতায় ফেলতে এসব আবেদন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটেই জনমনের বিভ্রান্তি দূর করে ধারণা স্বচ্ছ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করার অঙ্গীকার পূরণে আশ্বস্ত করতেই সরকার তার অবস্থান স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেয়।