Amardesh
আজঃঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ১৩ পৌষ ১৪১৯, ১৩ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

জ্বালানির দাম বাড়ালেই হরতাল

মাহাবুবুর রহমান
পরের সংবাদ»
ঢাকার রাজপথে গতকাল দিনভর গণসংযোগে বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া জনদুর্ভোগ না বাড়িয়ে অবিলম্বে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এ সরকার জনসমস্যা সমাধানে ব্যর্থ। দুর্নীতি, লুট ও চুরিতে তারা সফল। বারবার বিদ্যুত্-জ্বালানি-গ্যাস-পানির দাম বাড়িয়ে মানুষকে অসহনীয় কষ্টে রেখেছে। আবারও জ্বালানির দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আর জ্বালানির দাম বাড়ানো চলবে না। বাড়ালে আমরা রাজপথে নামব। হরতাল-অবরোধ-ধর্মঘট ডাকব। দৈনিক আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়েরের নিন্দা জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, মাহমুদুর রহমান রাষ্ট্রদ্রোহী নন, তিনি দেশপ্রেমিক। যারা তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা করেছে, ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা দায়ের করা হবে।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালানোর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, আসন্ন অধিবেশনে তত্ত্বাবধায়ক বিল আনুন। তাহলে আমরা সংসদে যোগ দেব। আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করব। কিন্তু জনদাবি না মানলে গণঅভ্যুত্থানে এ সরকারকে হটানো হবে বলে হুশিয়ারি দেন তিনি।
রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরেও গতকাল বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের গণসংযোগ কর্মসূচিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা যোগ দেন।
রাজধানীতে গণসংযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বেলা ১১টায় গাবতলী থেকে শুরু করে বেগম খালেদা জিয়া কাওরানবাজার, যাত্রাবাড়ী, বাসাবো ও বাড্ডায় সন্ধ্যা ৬টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত পাঁচটি পথসভায় বক্তৃতা করেন। দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করেন। ১৮ দলীয় জোট আয়োজিত গণসংযোগের এসব পথসভা বিশাল জনসভায় পরিণত হয়। রাস্তায় জনস্রোত নামে। ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। স্লোগান-বিক্ষোভের মধ্যেও গণসংযোগ ছিল উত্সবমুখর। প্রতিটি জনসভায় বক্তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠার আওয়াজ তোলেন। বেগম জিয়া পাঁচটি পথসভায় ৩৫ থেকে ৪২ মিনিট পর্যন্ত বক্তৃতা করেন। প্রথম পথসভা গাবতলী এবং শেষ পথসভা বাড্ডায় তিনি গণসংযোগের মূল দাবি, সরকারের ব্যর্থতার চিত্র এবং আগামী দিনে বিরোধী জোটের আন্দোলন ও ক্ষমতায় এলে তাদের সম্ভাব্য কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেন।
এদিকে, বিএনপির দফতরের দায়িত্বে নিয়োজিত যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দলের চেয়ারপার্সনের পক্ষ থেকে গণসংযোগ সফল করায় রাজধানী ঢাকাসহ সব মহানগরীর অধিবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে আগামী আন্দোলন কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। রুহুল কবির রিজভী ফোনে আমার দেশ-কে জানান, পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করতে চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া আগামী শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় দলের স্থায়ী কমিটির সভা ডেকেছেন।
বেগম খালেদা জিয়া গতকালের প্রতিটি পথসভায় আন্দোলনের প্রধান দাবি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক পুনর্বহাল দাবি নানা যুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার আমাদের আন্দোলন নিয়ে নানা মিথ্যাচার ও অপপ্রচার করছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলছি, আমাদের আন্দোলন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক পুনর্বহাল দাবির আন্দোলন। দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষার আন্দোলন। চোর, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে জাতিকে রক্ষার আন্দোলন। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার আন্দোলন নয় জানিয়ে বেগম জিয়া বলেন, আমরাও যুদ্ধাপরাধের বিচার চাই। প্রধানমন্ত্রীর ঘর ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হোক। আর এ বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের ও স্বচ্ছ।
শেখ হাসিনার সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘বিশ্বচোর’ বলে খ্যাতি পেয়েছে জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার পুত্রসহ স্বজনদের দুর্নীতির প্রমাণ আছে, একদিন এর বিচার হবে। তারা পদ্মা সেতুর কাজ শুরুর আগেই পার্সেন্টেজ নিয়ে নিয়েছে। এসব তথ্য বিশ্বব্যাংকের কাছেও আছে। প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবার ধরা পড়ে যাবে বলেই দুই আবুল এবং উপদেষ্টা মসিউরকে দুর্নীতি মামলা থেকে বাঁচানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সাম্প্রতিক রাজপথে ছাত্রলীগের হাতে বিশ্বজিত্ হত্যা, ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং ২০০৬ সালে লগি-বৈঠা হত্যার বিবরণ তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেন, আগামীতে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হবে। এতে প্রধানমন্ত্রী হুকুমের আসামি হবেন। বিশ্বজিত্ হত্যায় হুকুমের আসামি হবেন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
গণমাধ্যম নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সাংবাদিকরা সত্য প্রকাশ করে। আর এজন্য তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়, হত্যা করা হয়। এ পর্যন্ত ১৬ জন সাংবাদিককে এ সরকার হত্যা করেছে। সাগর-রুনি সরকারের দুর্নীতির কথা জানতেন এবং তারা তা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তাই তাদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি।
দৈনিক আমার দেশ-এর ওপর সরকারি খড়গের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বন্দী কেন? তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে? যুদ্ধাপরাধের বিচার যে ঠিকমত হচ্ছে না— আমার দেশ তা প্রকাশ করেছে। আগেই ইকোনমিস্টে এসব বেরিয়েছিল। ইউটিউবে আগেই এসব তথ্য এসে গিয়েছিল। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়া হয়েছে। আমি বলতে চাই, আপনারা রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করেছেন। আপনাদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রবিরোধী মামলা হবে। মাহমুদুর রহমান রাষ্ট্রদ্রোহী নন, দেশপ্রেমিক ও সময়ের সাহসী সংবাদিক। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আপনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে, আর মাহমুদুর রহমান বীরের বেশে বের হয়ে আসবেন।
বেগম খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী নোংরা ও অশ্লীল বক্তব্য দিচ্ছেন। এরা বিশ্বচোরের খেতাব পেয়েছে। ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, আপনি (শেখ হাসিনা) চোরের মা। আর এজন্যই আপনার বড় গলা। আপনার ছেলে, আপনার বোন, জামাইবাবু, মেয়ে এবং আপনি নিজেও দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি করেছেন। ডাকাতি করেছেন। আর তা বিদেশে পাচার করেছেন। আপনার কথা আপনার দিকেই বর্তায় যে, চোরের মায়ের বড় গলা। আপনার গলাই বড়। গলাটা ছোট করুন, সামনের দিন ভালো নয়। চুরি-ডাকাতির হিসাব জনগণ নেবে।
বেগম খালেদা জিয়া পৌঁছার দু’তিন ঘণ্টা আগেই প্রতিটি পথসভা বিশাল জনসভায় পরিণত হয়। আর এতে বিএনপিসহ জোটের সিনিয়র নেতারা বক্তৃতা করেন। স্থানীয় নেতারা করেন পৃথক পৃথক শোডাউন।
গাবতলীতে প্রথম পথসভায় পৌঁছেন ১১টা ৫ মিনিটে। সেখানে তিনি ৪০ মিনিট বক্তৃতা করেন। বেগম জিয়া বলেন, জালেম ও দুর্নীতিবাজ সরকারকে বিদায় না করা পর্যন্ত আন্দোলনের কর্মসূচি চলবে। সরকার নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের বিল সংসদে পাস না করলে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। জালেম, দুর্নীতিবাজ সরকারকে বিদায় করতে হবে। এদের বিদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলনের কর্মসূচি বন্ধ হবে না। ১৮ দলীয় জোটের সভা করে আমরা পরবর্তী কর্মসূচি দেব।
সাবেক এমপি ও মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এ খালেকের সভাপতিত্বে পথসভায় আরও বক্তৃতা করেন বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস, আবদুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, আবদুল মান্নান, আমানউল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব-উন নবী খান সোহেল, জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক মজিবুর রহমান, সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, নুরুল ইসলাম বুলবুল, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপার শফিউল আলম প্রধান, আতিকুল ইসলাম মতিনসহ ১৮ দলীয় জোট নেতারা।
‘আওয়ামী লীগ দলের বাইরে কাউকে চেনে না’ বলে মন্তব্য করে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, সাপকে বিশ্বাস করা যায়, আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করা যায় না। এজন্য আমরা গণসংযোগে নেমেছি। মা-বোনসহ দেশের মানুষকে জেগে উঠতে হবে।
নির্দলীয় সরকার পুনর্বহালের দাবিতে এই গণসংযোগ হলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিচার বিভাগ দলীয়করণের প্রতিবাদ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিও যুক্ত হয়েছে এর সঙ্গে। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতাকর্মীদের অবিলম্বে মুক্তি দিন। নইলে জনগণ রাস্তায় নামবে, তখন আপনারা পালানোর পথ পাবেন না।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা এই সরকারের আমলে কোনো চাকরি পাওনি। তোমাদের নেশা খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে তারা আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চায়। তাই তোমাদের আজ জেগে উঠতে হবে। আমরা তোমাদের জন্য আজ রাস্তায় নেমেছি।
কেন মানুষ খুন হয়, জলা-জঙ্গলে লাশ পড়ে থাকে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এদেশে কেউই নিরাপদ নয়। সাগর-রুনিকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, এই সরকারের আমলে ১৬ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। সত্য কথা ও এই সরকারের দুর্নীতি অপকর্মের কথা লেখে- এটাই তাদের অপরাধ।
আওয়ামী লীগের করা সব গুম-খুনের বিচার হবে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, খুনি খুনের কথা স্বীকার করেছে। তারা অস্ত্র দিয়ে পাঠিয়েছে মানুষ খুন করতে। এই দিন দিন নয়, সামনে আরও দিন আছে। এ হত্যা, গুম, খুনের জন্য বিচারের সম্মুখীন তাদের হতে হবে। তিনি বলেন, ইলিয়াসের ঘটনার বিচার হবে। বিশ্বজিতের কি অপরাধ ছিল? নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এরপরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিথ্যা কথা বলছেন। তারা ঘটনা ঘটায়, আর দোষ দেয় বিএনপি-জামায়াতকে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিরোধী দল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানোর জন্য আন্দোলন করছে বলে যে অভিযোগ সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়- তা সত্য নয়। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা এসব বলছে। আমরা সরকারের দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আন্দোলনে নেমেছি।
ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মামালা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ৭ হাজার মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে, আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পুনঃতদন্ত করে সেগুলোর বিচার করা হবে।
বেলা সোয়া ১১টার দিকে তিনি গাবতলীর হানিফ পরিবহন বাস ডিপো (পুরনো বিউটি সিনেমা হল) প্রাঙ্গণের মঞ্চে পৌঁছলে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। হালকা ঘিয়ে রঙের শাড়ির ওপর শাল পরিহিত খালেদা জিয়া হাত নেড়ে তাদের অভিনন্দনের জবাব দেন। খালেদা জিয়ার পথসভা উপলক্ষে সকাল থেকেই মিরপুর, আমিনবাজার, কাফরুলসহ আশপাশের এলাকা থেকে বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা গাবতলীতে জড়ো হন। তবে স্থান সংকুলান না হওয়ায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে টেকনিক্যাল, বাঙলা কলেজ এলাকা কর্মীদের জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
গাবতলীর পথসভা শেষে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর কারওয়ান বাজারে আসে। সেখানে পথসভা শেষে মিছিল সহকারে মগবাজার, মত্স্যভবন, প্রেস ক্লাব, নগরভবন, গুলিস্তান হয়ে ধোলাইখালে পৌঁছে সাদেক হোসেন খোকার সভাপতিত্বে এক পথসভায় সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করেন। পরে সেখান থেকে মিছিল নিয়ে বেগম জিয়া যাত্রাবাড়ী ফারুক রোডের পথসভায় যোগ দেন এবং বক্তৃতা করেন। সেখান থেকে মিছিল সহকারে বাসাবোর বালুরমাঠে যান এবং বক্তৃতা শেষে বাড্ডায় পৌঁছেন ৬টা ১২ মিনিটে। সেখানে ৩৫ মিনিট বক্তৃতা করেন বেগম খালেদা জিয়া।
শেষ পথসভা বাড্ডায় বিশাল জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়। সেখানে সন্ধ্যা ৬টার দিকে পৌঁছে বেগম খালেদা জিয়া ৩৫ মিনিট বক্তৃতা করেন। আসন্ন সংসদ অধিবেশনে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল আনা হলে বিএনপি সংসদে যাবে বলে ঘোষণা দিয়ে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেন, এখনও সময় আছে, সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনুন। আর যদি তা না আনেন, সারাদেশের মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। তখন আর সময় থাকবে না।
রাজধানীজুড়ে সরকারবিরোধী গণসংযোগের অংশ হিসেবে গতকাল রাজধানীর বাড্ডা এলাকার ভাটারা বালুরমাঠে দেয়া পথসভায় তিনি এ কথা বলেন।
ঢাকা মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ কাইয়ুমের সভাপতিত্বে বাড্ডার ভাটারা মাঠের পথসভায় আরও বক্তৃতা করেন বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ, আবদুল্লাহ আল নোমান, ফজলুর রহমান পটল, রুহুল আলম চৌধুরী, এমএ মান্নান, নুরুল ইসলাম বুলবুল, শাম্মী আক্তার এমপি, আজিজুল বারী হেলাল, এসএম জাহাঙ্গীর, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ ১৮ দলীয় জোটের নেতারা বক্তৃতা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে খালেদা জিয়া বলেন, আদালতই তাকে ‘রং হেডেড’ বলে মত দিয়েছেন। তার মাথা খারাপ। তিনি তো সরকারের দায়িত্বে থাকতে পারেন না। খালেদা জিয়া বলেন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে এনে নিজেদের সুবিধামত রায় দেয়া হয়েছে। এখন এ নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। টাকা নিয়ে রায় দেয়া হয়েছে বলেও কথা উঠেছে। এই সরকারের মুখেই শুধু সংবিধানের কথা। সংবিধানকে তারাই গুরুত্বহীন করেছে।
সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্নীতিবাজ, অত্যাচারী সরকারের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, দেশ আজ দুর্নীতিবাজ, দখলবাজের হাতে পড়েছে। শিক্ষাঙ্গনকে অস্ত্রাগার বানানো হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা হারাচ্ছেন, চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ, শিল্প কারখানায় অস্থিরতা চলছে, কৃষিখাতে পিছিয়ে পড়ছে দেশ, প্রশাসনে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, দেশে প্রশাসন বলতে কিছু নেই। দেশের অথর্নীতি ধ্বংসের মুখে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাস করলে পুরস্কৃত হয়, মানুষের জন্য কাজ করলে জেলে যেতে হয়। তার প্রমাণ আমাদের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিশ্বজিত্ দাশ হত্যা প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, সংবাদপত্রে ছবি ছাপা হওয়ার পরও সরকার তার দায় এড়াতে চায়। প্রথমে বলেছে, তাদের ছাত্রলীগ জড়িত নয়। এখন প্রকাশিত হচ্ছে সরকারের হুকুমেই ওই সন্ত্রাসীরা রাস্তায় নেমে বিশ্বজিেক হত্যা করেছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুকুমেই ছাত্রলীগ মাঠে নামে বলে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, তিনি নয়, আসলে হুকুমের আসামি প্রধানমন্ত্রী নিজেই। তিনিই বলেছেন, প্রতিবাদ করতে প্রয়োজনে মাঠে নামতে। তিনি একটা লাশের বদলে দশটা লাশ আর লগি বৈঠা নিয়ে আন্দোলনের কথা বলেছিলেন।
খালেদা জিয়া বলেন, রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা বলেছেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের দল নয়। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বেইমানি করেছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগ তাদের প্রথম সরকার আমলে ৪০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ‘হত্যা’ করেছে দাবি তুলে বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, আগামীতে সিরাজ সিকদারসহ ওইসব হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
গণসংযোগে জনসমাগমে সন্তোষ প্রকাশ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম পথসভায় বলেন, মানুষের ঢল প্রমাণ করেছে এই সরকারের প্রতি জনগণের আর কোনো আস্থা নেই। তাই আমরা দাবি জানাব, অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ করা উচিত। নইলে গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন ঘটবে। ভাটারার পথসভা শেষে রাত ৭টার দিকে গুলশানের বাসায় ফিরে যান বেগম খালেদা জিয়া।