Amardesh
আজঃঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ১৩ পৌষ ১৪১৯, ১৩ সফর ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

কনকনে শীতে বাড়ছে রোগ : ২৪ ঘণ্টায় ৯ জনের মৃত্যু : চিকিত্সা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতালগুলোর চিকিত্সকরা

ডেস্ক রিপোর্ট
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
কনকনে শীতে বাড়ছে রোগশোক। হাসপাতালগুলোতে ভিড় বাড়ছে রোগীর। বেশিরভাগই হাইপারটেনশন, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, পেটেরপীড়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। জায়গার সংকুলান না হওয়ায় চিকিত্সা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিত্সকদের। প্রচণ্ড শীতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল পর্যন্ত অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৭ জনই বৃদ্ধ। বাকি দু’জন শিশু।
শীতে প্রাণহানীর এসব ঘটনা ঘটেছে ঝালকাঠির রাজাপুর, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামের রাজীবপুর ও পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায়। এদের মধ্যে রাজাপুরে ২, দৌলতপুরে ১, লালমনিরহাটে ১, রাজীবপুরে ১, শ্রীমঙ্গলে ১ ও মঠবাড়িয়ায় ১ বৃদ্ধ রয়েছেন। দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে কুড়িগ্রাম সদরে।
এদিকে গতকাল এ মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহীতে। আবহাওয়া অফিস সূত্র জানিয়েছে, সেখানে গতকাল তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৪ দিন পর সেখানে মঙ্গলবার সূর্যের দেখা মিললেও গতকাল ঘন কুয়াশার চাদরে সারাদিন ঢাকা ছিল আকাশ। কনকনে ঠাণ্ডার সঙ্গে বইছে হিমেল বাতাস। এর ফলে কাহিল হয়ে পড়ছেন লোকজন।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও শীতের তীব্রতা রয়েছে প্রায় অপরিবর্তিত। শীতে বিপর্যস্ত জনপদ রক্ষায় উল্লেখ করার মতো কোনো ত্রাণ তত্পরতা কোথাও লক্ষ্য করা যায়নি। শীতবস্ত্রের জন্য গরীব-অসহায় মানুষ হন্যে হয়ে ছুটছে দ্বারে দ্বারে। কিন্তু দেখা নেই শীতবস্ত্রের।
শীতের তীব্রতার প্রভাব নিয়ে খবর পাঠিয়েছেন আমার দেশ-এর আঞ্চলিক অফিস ও প্রতিনিধিরা। বিস্তারিত তাদের পাঠানো খবর :
রাজশাহীতে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৮ : শীতে উত্তর জনপদের মানুষ এখন বেসামাল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। তীব্র শীতে বিপর্যস্ত এখানকার জনজীবন। আরেক দফা কমেছে রাজশাহীর তাপমাত্রা। গতকাল রাজশাহীতে চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। গত ৫ দিন থেকে শৈত্যপ্রবাহ, ঘন কুয়াশা ও মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া আর কনকনে হিমেল বাতাসে মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখিরাও বিপাকে। এদিকে শীতার্ত অসহায় মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। রাজশাহী জেলা প্রশাসক আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, অসহায় শীতার্ত মানুষের জন্য ২৫ হাজার কম্বল দু’একদিনের মধ্যে এসে পৌঁছবে।
রাজশাহীতে টানা ৪ দিন পর মঙ্গলবার সূর্যের দেখা মিললেও গতকাল আবারও চলে গেছে কুয়াশার অন্তরালে। ফলে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও আবার চলেছে কমতির দিকে। একদিনের ব্যবধানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমেছে ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। ফলে এ অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। সর্বত্রই বিপর্যয় নেমে এসেছে। তীব্র শীত সহ্য করতে না পেরে এরই মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অনেকেই। শীতে জবুথবু হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের ছিন্নমূল ও ভাসমান জনগোষ্ঠী। শীতার্তদের সহায়তায় রাজশাহীতে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে চাহিদামাফিক সরকারি কম্বল না পৌঁছানোয় অপেক্ষা করতে হচ্ছে রাজশাহী জেলা প্রশাসনকে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক আবদুল হান্নান জানান, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডারে ১০ হাজার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ১৫ হাজার কম্বলের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আগামী দু’একদিনের মধ্যে এসব কম্বল হাতে এসে পৌঁছাবে। এর আগে ৫ হাজার কম্বল শীতার্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিত্তবানদের আহ্বান জানান তিনি।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান, গতকাল রাজশাহীর সর্বনিম্ন আগের দিনের চেয়ে তাপমাত্রা ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। আগামী দু’একদিনের মধ্যে চলমান এ অবস্থার উন্নতি ঘটবে বলে জানান তিনি।
শ্রীমঙ্গলে ১ জনের মৃত্যু : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে উপজেলার উত্তসুর হাওর এলাকায় তীব্র শীতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে হাইলহাওরের পার্শ্ববর্তী উত্তসুর গ্রামের গৃহহীন গরীব ও বয়স্ক মহিলা ছালাতুন নেছার মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার রাতে তীব্র শীতের কারণে তিনি মারা যান বলে তার স্বামী কলিম মিয়া জানিয়েছেন।
তবে ৪/৫ দিন ধরে শ্রীমঙ্গলের ওপর দিয়েও তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৭।
রাজাপুরে দু’নারীর মৃত্যু : ঝালকাঠির রাজাপুরে হাড়কাঁপানো শীতে গত তিন দিনে নারী-শিশুসহ শতাধিক মানুষ অসুস্থ হয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিত্সা নিয়েছেন। শীতজনিত রোগে অক্রান্ত হয়ে ভর্তিও হয়েছেন অনেকে। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে উপজেলার বড়ইয়া গ্রামের আবদুস ছোবাহানের স্ত্রী জাহানুর বেগম (৬০) ও উত্তর পালট গ্রামের মোকছেদ আলী খানের স্ত্রী হায়াতুনেচ্ছা (৬৫) মারা গেছেন।
দৌলতপুরে আরও একজনের মৃত্যু : কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক সপ্তাহ ধরে শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত আছে। গতকাল ভোরে শীতজনিত কারণে উপজেলার ফারাকপুর পূর্বপাড়া গ্রামের শামসের প্রামাণিক (৭২) মারা গেছেন। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে শৈত্যপ্রবাহ ও শীতজনিত কারণে ৬ জন মারা গেছেন। উপজেলার খেটে খাওয়া ছিন্নমূল মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল আখতার জানান, সরকারিভাবে ৬১৪টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে—যা একেবারে অপ্রতুল।
লালমনিরহাটে আরও একজনের মৃত্যু : শীতের প্রচণ্ড আক্রমণে লালমনিরহাট অচল হয়ে পড়েছে। গত ১০ দিন ধরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো পড়ছে কুয়াশা। কয়েক দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। শীতবস্ত্রের জন্য ধনীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে অসহায় মানুষ। অস্বাভাবিক কুয়াশায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রিকশাচালক ও দিনমজুররা বিপাকে পড়েছে। শিশুরা শীতজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবারে শীতের তীব্রতা অনেক বেশি। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে অসহায় দরিদ্র অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
এদিকে প্রচণ্ড শীতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার বড়খাতা এলাকায় ফজলুর রহমান (৫৫) নামের আরও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সে ওই এলাকার মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে শীতে গত ১০ দিনে শিশুসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রাজীবপুরে একজনের মৃত্যু : তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে নানা রোগব্যাধি। মঙ্গলবার উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের ভাঙ্গা পাড়া গ্রামের ফজলুল হক (৬৫) ঠাণ্ডায় মারা গেছে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় মাঠে সারাদিন কাজ করেন ফজলুল হক। পরে বাড়িতে এসে রাতে ঘুমের ঘোরে তিনি মারা যান। কোদালকাটি ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম জোদ্দার জানান, তার ইউনিয়নে দিনমজুর শ্রেণীর মানুষের বসবাস বেশি। তাদের বেশিরভাগেরই শীত নিবারণের গরম কাপড় নেই। তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জরুরি ভিত্তিতে শীতের কাপড়ের চাহিদা পাঠিয়েছেন বলে জানান।
কুড়িগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ জনের মৃত্যু : কুড়িগ্রামে অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে সদর হাসপাতালে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে শুধু কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালেই মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে। এদের মধ্যে ২০ জনই শিশু। শীত ও ঠাণ্ডাজনিত রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত শিশু ও বৃদ্ধরা। হাসপাতালে প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না মানুষ। কাজে বেরোতে পাড়ছে না শ্রমজীবী মানুষ। বৃষ্টির মতো টপটপ করে ঝরছে কুয়াশা। ঘন কুয়াশায় বোরো বীজতলা ও আলু ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঠাণ্ডার কারণে সন্ধ্যার পরপরই দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যানবাহনগুলো দিনের বেলাও হেডলাইট জ্বেলে চলাচল করছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিস জানায়, কুড়িগ্রাম অঞ্চলের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ থেকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠা-নামা করছে।
কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতাল আবাসিক মেডিকেল অফিসার, ডা. মো. নজরুল ইসলাম জানান, গত এক মাসে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ২০ জনই শিশু। তবে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মঠবাড়িয়ায় বৃদ্ধের মৃত্যু : পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় কয়েক দিনের শৈত্যপ্রবাহ ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বলেশ্বর নদ-তীরবর্তী উপকূলীয় মঠবাড়িয়ার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় হতদরিদ্র পান্না মিয়া (৫০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। মৃত পান্না মিয়া উপজেলার উত্তর ভেচকী গ্রামের আর্শেদ আলীর ছেলে।