Amardesh
আজঃঢাকা, শুক্রবার ৩০ নভেম্বর ২০১২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ১৫ মহররম ১৪৩৪    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

অনুবাদ এবং অনুবাদের অনুবাদ

আ হ ম দ বা সি র
পরের সংবাদ»
কাজী নজরুল ইসলামের ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম’ অনুবাদের আগে এবং পরে ওমর খৈয়ামের বাংলা অনুবাদ করেছেন বহু লেখক ও অনুবাদক কিন্তু ‘কাজীর অনুবাদ সকল অনুবাদের কাজী’র আসনে এখনো সমাসীন। সৈয়দ মুজতবা আলীর এই উক্তি এখনও অসংশয়। এ অনুবাদকে মানদণ্ড ধরে বিচার করা সম্ভব কতগুলো অনুবাদকর্ম সত্যিকার অর্থে বাংলায় পুনঃসৃজিত হয়েছে—সেই সৃষ্টিকর্মের মূল রস, রূপ, স্বাদ, কাঠামো ও ভাব-প্রবণতাকে ধারণ করে।
যে কোনো সৃজনশীল রচনার অনুবাদ মানেই পুনঃসৃজন। ভাষার বিভিন্নতার কারণেই এটা অনিবার্য। অন্যান্য অনেক ভাষার মতো বাংলা ভাষায়ও অনুবাদকর্ম সৃজনশীল রচনার মর্যাদা পেয়ে আসছে। যদিও খুব কম অনুবাদকর্মই প্রকৃত সৃজনশীল প্রতিভার হাতে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে অন্যান্য ভাষার সেরা সৃষ্টিকর্মের রসাস্বাদনে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাভাষী পাঠক। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এ অবস্থা এখনও বর্তমান এবং কলকাতার তুলনায় ঢাকা এক্ষেত্রে এখনও কিছুটা পিছিয়ে। বাংলাদেশে বলতে গেলে সৃজনশীল অনুবাদকর্মের হাল-হকিকত খুব একটা ভালো নয়।
বর্তমান শতকের শুরু থেকে দেশে সৃজনশীল অনুবাদকর্মের চাহিদা ও প্রকাশ বেশ কিছুটা বেগবান হয়েছে। নানা ধরনের বই অনুবাদ হচ্ছে, প্রকাশ পাচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে। এসব অনুবাদের কতগুলো সত্যিকার সৃজনশীল অনুবাদ পরীক্ষা করে দেখা দরকার। এগুলোর মধ্যে ইংরেজি ছাড়া অন্যান্য ভাষার বই কতগুলো অনুবাদ হচ্ছে, সেগুলো সেসব ভাষা থেকে সরাসরি নাকি ইংরেজি থেকে হচ্ছে, সেগুলোর তালিকা করা দরকার। দেখা যাবে ইংরেজি ছাড়া অন্যান্য ভাষার যে পরিমাণ বই অনুবাদ হয়, সেগুলোর অধিকাংশই হয় ইংরেজি থেকে। ফলে মূল থেকে সেখানে অনেক দূর সরে যাওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান। যেসব ইংরেজি বইয়ের বাংলা অনুবাদ হয়, সেগুলোর মান নিয়েও থাকে নানা সংশয়।
কাজী নজরুল ইসলামের ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম’ অনুবাদের আগে এবং পরে ওমর খৈয়ামের বাংলা অনুবাদ করেছেন বহু লেখক ও অনুবাদক; কিন্তু ‘কাজীর অনুবাদ সকল অনুবাদের কাজী’র আসনে এখনও সমাসীন। সৈয়দ মুজতবা আলীর এই উক্তি এখনও অসংশয়। এ অনুবাদকে মানদণ্ড ধরে বিচার করা সম্ভব কতগুলো অনুবাদকর্ম সত্যিকার অর্থে বাংলায় পুনঃসৃজিত হয়েছে সেই সৃষ্টিকর্মের মূল রস, রূপ, স্বাদ, কাঠামো ও ভাব-প্রবণতাকে ধারণ করে। খৈয়াম মানসের গভীরে পৌঁছানোর ক্ষমতা ছিল বলেই নজরুল খৈয়ামকে ধারণ করে পুনঃসৃজন করতে পেরেছেন। নজরুলের আগে অধিকাংশ অনুবাদকই খৈয়াম অনুবাদ করেছেন খৈয়ামের ইংরেজি অনুবাদক ফিটজেরাল্ড থেকে, নজরুল করেছেন সরাসরি খৈয়ামের সৃজিত ভাষা থেকে। যোগাযোগটি সরাসরি না হলে যেমন ফসকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, এক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। এমনকি ফিটজেরাল্ড নিজেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। নজরুল নিজেও ফিটজেরাল্ডের অনেক ধারণা ভ্রান্ত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। লেখকের সঙ্গে, রচনার সঙ্গে মানসের যোগাযোগ না ঘটলে উত্কৃষ্ট অনুবাদ করা যায় না এবং অনুবাদক যদি সৃষ্টিশীল ও উভয় ভাষায় পারঙ্গম না হন, তাহলেও তা সম্ভব নয়। এসব বিবেচনা সামনে রাখলেই অনুবাদের আসল দশা বেরিয়ে আসবে।
অনুবাদের জন্য গ্রন্থ নির্বাচনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যে যেমন সামনে পাচ্ছে, অনুবাদ করছে দেদারসে। বাণিজ্যিক কারণে অনুবাদ হচ্ছে অনেক বই, যেগুলো কোনো না কোনো কারণে আলোচিত হচ্ছে কিংবা লেখক নিজে আলোচিত ব্যক্তি। ফলে জ্ঞান ও সৃজনশীলতার চর্চায় যে বইগুলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক মনোযোগের দাবি রাখে, সে ধরনের অনেক বইয়ের অনুবাদ হচ্ছে না। লেখক, গ্রন্থ কিংবা রচনা নির্বাচন অবশ্যই তাত্পর্যপূর্ণ একটি বিষয়। এক্ষেত্রে বাংলাভাষী পাঠকদের মেজাজ ও চারিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়াদি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অনূদিত হওয়া উচিত।
কাজী নজরুল ইসলাম তার রুবাইয়াত্-ই-ওমর খৈয়ামের ভূমিকায় খৈয়ামের রচনা নির্বাচন সম্পর্কে চমত্কার কিছু কথা বলেছেন। এই বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি ওমরের রুবাইয়াত্ বলে প্রচলিত প্রায় এক হাজার রুবাই থেকেই কিঞ্চিদধিক দু’শ রুবাই বেছে নিয়েছি এবং তা ফারসি ভাষার রুবাইয়াত্ থেকে। কারণ, আমার বিবেচনায় এইগুলি ছাড়া বাকি রুবাই ওমরের প্রকাশভঙ্গি বা স্টাইলের সঙ্গে একেবারে মিশ খায় না।... বাকিগুলোতে ওমর খৈয়ামের ভাব নেই, ভাষা নেই, গতি ঋজুতা—এক কথায় স্টাইলের কোন কিছু নেই। খুব সম্ভব ওগুলি অন্য কোনো পদ্য-লিখিয়ের লেখা। আর, তা যদি ওমরেরই হয়, তবে তা অনুবাদ করে পণ্ডশ্রম করার দরকার নেই। বাগানের গোলাপ তুলব; তাই বলে বাগানের আগাছাও তুলে আনতে হবে এর কোনো মানে নেই।’ নজরুলের এ বক্তব্যের শেষ বাক্যটি খুবই তাত্পর্যবহ। লেখক যত বিখ্যাতই হন না কেন, তার সব লেখা একই মানের হবে না। এমনকি তার অনেক লেখাই হয়তো পঠনযোগ্যই নয়, অনুবাদযোগ্যতা তো পরের কথা। নজরুল গভীরভাবে ওমরকে বুঝতে পেরেছিলেন বলেই ওমরের রুবাই চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। নজরুলের এই সর্বময় সাফল্যের পেছনে নিহিত কারণটি সম্পর্কে রুবাইয়াত্-ই ওমর খৈয়ামের ভূমিকা থেকে আরও কিছু কথা এখানে উল্লেখ করতে পারি। নজরুল বলেন, ‘আমি আমার ওস্তাদি দেখাবার জন্য ওমর খৈয়ামের ভাব ভাষা বা স্টাইলকে বিকৃত করিনি— অবশ্য আমার সাধ্যমতো। এর জন্য আমার অজস্র পরিশ্রম করতে হয়েছে, বেগ পেতে হয়েছে। কাগজ-পেন্সিলের যাকে বলে আদ্যশ্রাদ্ধ, তাই করে ছেড়েছি। ওমরের রুবাইয়াতের সবচেয়ে বড় জিনিস ওর প্রকাশের ভঙ্গি বা ঢং। ওমর আগাগোড়া মাতালের ‘পোজ’ নিয়ে তাঁর রুবাইয়াত্ লিখে গেছেন—মাতালের মতোই ভাষা, ভাব, ভঙ্গি, শ্লেষ, রসিকতা, হাসি, কান্না সব। কত বত্সর ধরে কত বিভিন্ন সময়ে তিনি এই কবিতাগুলি লিখেছেন, অথচ এর স্টাইল সম্বন্ধে কখনো এতটুকু চেতনা হারাননি। মনে হয় একদিনে বসে লেখা। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি—ওমরের সেই ঢঙটির মর্যাদা রাখতে, তার প্রকাশভঙ্গিকে যতটা পারি কায়দায় আনতে। কতদূর সফল হয়েছি, তা ফারসি-নবিশরাই বলবেন।’
নজরুল যে সফল হয়েছেন সে স্বীকৃতি একবাক্যে সবাই দিয়েছেন। উল্লিখিত বক্তব্যের মধ্যে নজরুলের সাফল্যের কারণগুলোও নিহিত আছে। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো বহুভাষী রসজ্ঞ পণ্ডিত যেসব কারণে নজরুলের অনুবাদকে সফল অনুবাদের কাজী বলেছেন, সেসব কারণও এর মধ্যে নিহিত আছে। ওমর খৈয়াম যে আগাগোড়া মাতালের ‘পোজ’ নিয়ে রুবাইগুলো লিখেছেন—এ বিষয়টির আবিষ্কারই নজরুলের সাফল্যের প্রধানতম কারণ। নজরুল যে খৈয়ামের ভাষা ও স্টাইলকে বিকৃত করেননি, সেটিও সাফল্যের একটি কারণ। ফলে আমরা যখন নজরুলের অনুবাদ পাঠ করি তখন খৈয়ামকে আস্বাদ করতে পারি। সার্থক অনুবাদের আরও অনেক দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। কবি গোলাম মোস্তফার অনুবাদে ইকবালের ‘শিকওয়া ও জবাব-ই-শিকওয়া’ এবং বেশকিছু কবিতার অনুবাদ অসাধারণ সাফল্য লাভ করেছে। বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে মেঘদূত কিংবা বোদলেয়ারও এ সাফল্যের দাবি রাখে। ফররুখ আহমদের অনুবাদে ইকবালের কবিতা যেভাবে পুনঃসৃজিত হয়েছে, তার সমতুল্য দৃষ্টান্তও বিরল। সংখ্যায় কম হলেও এ ধরনের উত্কৃষ্ট অনুবাদ আমাদের সামনে আদর্শ হয়ে আছে। বাংলায় শেক্সপিয়র অনুবাদ করেছেন অসংখ্য লেখক-অনুবাদক, কিন্তু মুনীর চৌধুরীর মতো দু’একজন হাতেগোনা লেখক-অনুবাদকই কেবল সাফল্যের পরিচয় দিতে পেরেছেন।
বাংলাদেশে আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়কালে বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রচুর উল্লেখযোগ্য ও প্রয়োজনীয় গ্রন্থের অনুবাদ হয়েছে। এ সময় পাঠকদের জন্য বাছাইকৃত বইগুলোর মানসম্পন্ন অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুবাদের ওই স্বর্ণযুগকে অতীত করে দিয়েছে বাংলা একাডেমী। হেরাডোটাসের ‘ইতিবৃত্ত’ কিংবা ইবনে খলদুনের আল-মুকাদ্দিমার মতো গ্রন্থের মানসম্পন্ন অনুবাদ এসময়ই আমরা পেরেছি। জানি না বাংলা একাডেমীর সেই স্বর্ণযুগ আবার ফিরে আসবে কিনা!
শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বাংলা ভাষার এই মর্যাদাপ্রাপ্তির পর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরও বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাণ্ডারকে আমাদের ভাষায় আত্তীকরণের ব্যাপারে আমাদের সীমাহীন গাফিলতি দেখা যাচ্ছে। ইংরেজি-নির্ভরতার কারণেও আমরা পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার সঙ্গে যেভাবে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার দরকার, তাও পারছি না। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা শেখার ব্যাপারেও আগ্রহ, আন্তরিকতা ও পরিশ্রমের যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে অবশ্যই ভাষা শিক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে এবং কেবলমাত্র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সে দিকটা দেখলে হবে না বরং জ্ঞানচর্চার জায়গা থেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে এবং সমগ্র পৃথিবীর বিচিত্র জনগোষ্ঠীর বিচিত্র ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে সীমাবদ্ধ গণ্ডি ছেড়ে পৃথিবীর দিকে অগ্রসর হতে হবে। বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক মর্যাদার দাবি ও শপথ এ-ই হওয়া উচিত।