Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ২৫ নভেম্বর ২০১২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ১০ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

মূল হোতা আমির র্যাবের ক্রসফায়ারে আহত হওয়ার পর গ্রেফতার! : ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেয়া হয়নি : পুলিশের দাবি

স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
কেরানীগঞ্জে শিশু পরাগ মণ্ডল (৬) অপহরণের মূল হোতা সন্ত্রাসী আমির হোসেন ওরফে ল্যাংড়া আমির ওরফে মোক্তার হোসেন গোয়েন্দা পুলিশের ক্রসফায়ারে আহত হওয়ার পর গ্রেফতার হয়েছে। শুক্রবার রাতে টঙ্গী এলাকায় ভাড়া বাসা থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় গ্রেফতার করা হয় তার স্ত্রী বিউটি আক্তার রুবিনাকেও। তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল ও ৪৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়।
আহত আমিরকে গ্রেফতারের পর তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে আমিরকে গ্রেফতারের তথ্য জানানো হয়।
ডিবির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) সানোয়ার হোসেন জানান, পরাগ অপহরণের পর থেকে গা-ঢাকা দেয় আমির। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার রাত তিনটার দিকে গোয়েন্দা পুলিশ ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ টঙ্গীর পিলাগাথি সিংবাড়ী এলাকায় একটি বাড়ি ঘিরে ফেলে। আমিরের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর বাড়ির মালিককে দিয়ে দরজা খোলানো হয়। তখন স্ত্রী বিউটি আক্তার রুবিনা, ছেলে আবির হোসেন ও গৃহকর্মী রুমা আক্তারসহ বাসার ভেতরেই ছিল আমির। দরজা খুলে আমির বাইরে পুলিশ দেখেই গুলি ছোড়ে। একটি কালো রঙের পিস্তল থেকে সে তিন-চার রাউন্ড গুলি করার পর পাল্টা গুলি ছোড়ে পুলিশ। এ সময় আমিরের বুকে ও কানে গুলি লাগে। পরে তাকে আহত অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়। এ সময় আরেকটি পিস্তল সরানোর সময় স্ত্রী বিউটি বেগমকেও গ্রেফতার করা হয়। আহত অবস্থায় আমিরকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ডিবির ডিসি (দক্ষিণ) মনিরুল ইলসাম জানান, গত ১১ নভেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বিমল মণ্ডলের স্ত্রী লিপি মণ্ডল, মেয়ে পিনাকি মণ্ডল ও গাড়িচালক নজরুল ইসলামকে গুলি করে পরাগ মণ্ডলকে অপহরণ করা হয়। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য পরাগকে অপহরণ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর পুলিশের পাশাপাশি মামলাটি তদন্ত করে ডিবি। ওই সময় অপহরণকারীদের শনাক্ত করা হলেও তাদের গ্রেফতারের আগে পরাগ মণ্ডলকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বলে দাবি করেন ডিসি মনিরুল। গত ১৩ নভেম্বর গ্রেফতার করা হয় আমিরের ব্যবসায়িক পার্টনার মামুনকে (৪০)। পরাগ মণ্ডলকে ছেড়ে দেয়ার পর অপহরণকারীদের গ্রেফতারের জন্য অভিযানে নামে ডিবি পুলিশের টিম। পরাগকে উদ্ধার করার পর মূল হোতা আমিরকে গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়। গত ২২ নভেম্বর গ্রেফতার করা হয় অন্যতম সহযোগী মোটরসাইকেল চালক আল আমিনকে। তার কাছ থেকে অপহরণে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার হয় (ঢাকা মেট্রো ল ২১-২২২৯)। আল আমিনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় আমিরকে।
পুলিশ জানায়, পরাগ অপহরণ মামলায় এ পর্যন্ত মোট ১১ জন গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে আমিরসহ ৪ জনকে ডিবি ও ৬ জনকে গ্রেফতার করে র্যাব। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অপহরণের ঘটনায় দুইজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তারা। তারা হচ্ছে মোহাম্মদ আলী রিফাত ও ফয়সাল।
৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেয়া হয়নি : ডিসি মনিরুল ইসলাম বলেন, মুক্তিপণের উদ্দেশে পরাগকে অপহরণ করা হলেও কোনো মুক্তিপণ দেয়া হয়নি। কারণ সহযোগীরা গ্রেফতার হওয়ায় আমির নিজেকে বাঁচাতে মুক্তিপণের টাকা পাওয়ার আশা বাদ দিয়ে পরাগকে ছেড়ে দেয়। র্যাব বলছে, পরাগের বাবা ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছেলেকে ফেরত পেয়েছেন—এ প্রশ্নের উত্তরে ডিসি মনিরুল বলেন, মুক্তিপণ দেয়ার বিষয়টি একেবারেই ভিত্তিহীন। আমির সুস্থ হলেই তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত পরাগের বাবা দাবি করেন, পরাগ অপহরণের ঘটনায় তার কাছে কোনো মুক্তিপণের টাকা চায়নি কেউ। তিনি ছোটখাটো ব্যবসায়ী। তার অত টাকাও নেই। তাছাড়া তিনি কোনো মুক্তিপণ দেননি। বর্তমানে তিনি ছেলেকে ফিরে পাওয়ার পর কোনো নিরাপত্তাহীনতায় নেই জানিয়ে বলেন, যাদের জন্য আমার বেঁচে থাকা, তারা যেহেতু আমার কাছে রয়েছে, আমার আর কেনো ভয় নেই। এ ঘটনায় অপহরণকারীদের গ্রেফতারে কেউ তাকে হুমকিও দিচ্ছে না।
এদিকে ডিবির হাতে গ্রেফতার আমিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আল আমিন জানায়, তাকে চাকরি দেয়ার কথা বলে আমির সেদিন ডেকে এনেছিল। পরাগকে অপহরণের আগে সে মোটরসাইকেলের চালক ছিল। পেছনে বসা ছিল আমির। এ সময় আমির নিজ হাতে পরাগ মণ্ডলের মাকে গুলি করে পরাগকে ছিনিয়ে নেয়। সে গুলি করে পরাগের বোন এবং গাড়ি চালককেও। পরে পরাগকে ওই মোটরসাইকেলে করে আমির তার বাসায় যায়। সেখানে আমিরের স্ত্রী বিউটি পরাগকে চেতনানাশক ইনজেকশন দেয়। এরপর তাকে আমিরের এক খালার বাসায় রেখে আমির চলে যায়।
গ্রেফতার মামুন জানায়, আমির তার ভগ্নিপতি। ১৯৯৮ সালে তার বোনকে বিয়ে করে আমির। সে ঘরে আমিরের এক সন্তান রয়েছে। আমির একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। আমির খারাপ লোক জেনেও তাকে তার বোন বিয়ে করে। এরপর ২০০৪ সালের দিকে আমিরকে তার বোন তালাক দেয়। এরপর আমির প্রায়ই গুলিস্তানে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসত ছেলের খোঁজখবর নেয়ার জন্য। চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসে আমিরকে সঙ্গে নিয়ে সে চায়না যায়। মামুনের দাবি, পরাগ মণ্ডলের অপহরণের সঙ্গে সে জড়িত নয়। পরাগ মণ্ডল অপহরণের পর ডিবি তার দুই ভাইকে আটক করে। পরে সে নিজে এসে ডিবি কার্যালয়ে আত্মসমর্পণ করে। পরাগ যেদিন উদ্ধার হয়, সেদিন সে ডিবি কার্যালয়ে ছিল।
উল্লেখ্য, কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা পশ্চিম পাড়ার বাসার সামনে থেকে গত ১১ নভেম্বর সকালে মা লিপি মণ্ডল, বোন পিনাকি মণ্ডল ও গাড়িচালক নজরুল ইসলামকে গুলি করে শিশু পরাগকে অপহরণ করে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় আমির ও তার সহযোগীরা। এর তিন দিন পর ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে কেরানীগঞ্জের আটিবাজার এলাকায় মোটরসাইকেলে করে এনে অচেতন অবস্থায় পরাগকে রেখে চলে যায় তারা। সেখান থেকে উদ্ধার করে রাজধানীর পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতালে ১০ দিন চিকিত্সাধীন থাকার পর গত ২২ নভেম্বর বিকেলে পরাগ সুস্থ হয়ে নিজ বাসায় ফিরে যায় পরিবাররে সঙ্গে।
এর আগে গ্রেফতার করা হয় আমিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আল আমিন ও ব্যবসায়িক পার্টনার মামুন, যুবলীগের নেতা আমিনুল ইসলাম, জুয়েল মোল্লাহসহ ৩ জনকে। র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয় ৬ জন। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান, ডিবির ডিসি মনিরুল ইসলাম, মিডিয়া সেন্টারের পরিচালক ডিসি মাসুদুর রহমান, অভিযান পরিচালনাকারী এসি সানোয়ার ছাড়া পরাগ মণ্ডলের বাবা বিমল মণ্ডল উপস্থিত ছিলেন।