Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ২৫ নভেম্বর ২০১২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ১০ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
weather
 
 
আর্কাইভ: --
 

ঠাকুরগাঁওয়ে বেউরঝাড়ি সীমান্তে বর্গির মতো হানা দেয় বিএসএফ : বিএসএফের পাথর নিক্ষেপে নিহত আনসারুলের অসহায় পরিবার দিশেহারা

অলিউল্লাহ নোমান ঠাকুরগাঁও সীমান্ত থেকে ফিরে
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্ত গ্রাম বেউরঝাড়ি। জেলা সদর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার আমজানখোর ইউনিয়নের বেউরঝাড়ি ও নয়াবাড়ী একেবারে দুর্গম সীমান্ত এলাকা। এ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) প্রায়ই বর্গির মতো হানা দেয়। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে হানা দিয়ে রাখাল ও গরু ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ। এছাড়া এ সীমান্তেই মাত্র এক বছর আগে নাগর নদীতে পাথর ছুড়ে এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা বিএসএফের বাংলাদেশী নাগরিক হত্যাযজ্ঞের নতুন মাত্রা যোগ করে। বিএসএফ পাথর ছুড়ে মানুষ মারা ঘটনায় আতঙ্কিত সীমান্তবাসী। বেউরঝাড়ি ও নয়াহাট সীমান্তে মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় চোখে মুখে দেখা গেছে অজানা আতঙ্কের চাপ। এই সীমান্ত এলাকায় সঙ্গে ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলার বীরগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন বাবুল।
মোটরসাইকেলে দীর্ঘ মেঠোপথ অতিক্রম করে বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার বেউরঝাড়ি ও নয়াবাড়ী সীমান্ত। এই সীমান্ত এলাকার মানুষ সারাক্ষণ ভারতীয় বিএসএফ আতঙ্কে ভোগেন। ভারতের তৈরি কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে বর্গির মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হানা দেয় বিএসএফ। নিয়ে যায় কৃষকের গরু। সর্বশেষ চলতি ৩ নভেম্বরের ঘটছে গরু নিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা। একসঙ্গে ১৭১টি গরু নিয়ে গেছে। এ নিয়ে বিজিবি (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) উল্টা মামলা করেছে গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে। হয়রানির শিকার হচ্ছেন গরুর মালিকসহ নিরীহ মানুষ। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ৩ নভেম্বর বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে বেউরঝারি সীমান্তে চারণভূমিতে হানা দেয়। এ সময় ২২ পরিবারের ১৭১টি গরুসহ দুই রাখালকেও ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ। বিজিবিরা কোনো সদস্য তখন সীমান্ত পাহারায় ছিলেন না বলে জানান ভুক্তভোগীরা। যদিও গরু চারণভূমির বিপরীত দিকেই রয়েছে বিএসএফের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চৌকি। শুধু তা-ই নয়, প্রতি একশ’ মিটার দূরে একটি করে বিএসএফের পর্যবেক্ষণ চৌকি রয়েছে এ সীমান্তে। রয়েছে সার্বক্ষণিক টহল। বিপরীতে বিজিবি তেমন কিছুই চোখে পড়েনি। আমার দেশ-এর অনুসন্ধানকালে বিএসএফের সার্বক্ষণিক নজরদারির বিপরীতে সেখানে বিজিবি সদস্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিএসএফ গরু নিয়ে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্তরা স্থানীয় বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) ক্যাম্পে যায়। গরু ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে স্থানীয় বেউরঝাড়ি বিজিবি ক্যাম্পের কর্তাদের অনুরোধ জানায় গরুর মালিকরা। গরু ফেরত আনার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিজিবির সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের কথা কাটাকাটি হয়। এ নিয়ে উল্টো ক্ষতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধার অভিযোগে মামলা দেয় বিজিবি। এ মামলার ভয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের অবস্থা হয়েছে বাংলার বিখ্যাত প্রবাদের মতো ‘ভিক্ষা দরকার নেই বাবা, আপনার কুত্তা সামলান।’ মামলা নিয়েই এখন সবাই দৌড়ে আছে; গরু ফেরত পাওয়া তো অনেক দূরে। গুরুর আগে মামলা সামাল দেয়া নিয়ে ব্যস্ত সবাই।
গত ১৬ নভেম্বর বেউরঝাড়ি ও নয়াবাড়ী গ্রামে গিয়ে গরু হারানো পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা যায়, সবাই অজানা আতঙ্কে ভুগছেন। পুলিশি হয়রানির ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। অনেকে একমাত্র সম্বল গরুটি হারিয়ে নির্বাক। বেউরঝাড়ি গ্রামের শরিফ মেম্বার জানান, ৩ নভেম্বর দুই রাখালসহ ১৭১টি গরু নিয়ে যায় ভারতীয় বিএসএফ। দুই রাখালকে ২ ঘণ্টা পর ফেরত দেয়া হয়। তিনি জানান, বিজিবির সঙ্গে অনেক দেন-দরবারের পর ৬০টি গরু ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। বাকি গরু তো দূরের কথা, এখন মামলা নিয়ে সবাই আতঙ্কে।
স্থানীয় একজন নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, বিজিবিকে তাত্ক্ষণিক অবগত করার পরও কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দুই দিন পর বিজিবি ভারতীয় বিএসএফ ক্যাম্পে চিঠি পাঠায়। বিজিবির গড়িমসির কারণে অনেক সময় গরু ফেরত পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। এছাড়া যে ৬০টি গরু ফেরত পাওয়া গেছে, তার জন্য প্রতি গরুতে ১২০০ করে টাকা দিতে হয়েছে বিজিবিকে। মামলার কারণে এখন বাকি গরু ফেরত পাওয়া নিয়ে নানা শঙ্কা রয়েছে। বাকি গরু আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে কি না, এ নিয়ে রয়েছে সংশয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যাদের গরু বিএসএফ নিয়ে গেছে, তাদের অনেকেই গাভীর ওপর নির্ভরশীল। গাভীর দুধের আয় দিয়ে সংসার চালাতে হয়, এমন অনেক হতদরিদ্র পরিবারের গরু নিয়ে গেছে বিএসএফ। আয়ের একমাত্র সম্বলটি হারিয়ে দিশেহারা তারা। যাদের গরু নিয়ে গেছে, তাদের মধ্যে আহাদু পালের ৬টি, শংক পালের ৪টি, চানী পালের ৫টি, আলানু পালের ৩টি, নিম লালের ১৬টি, নেপালের ৬টি, শরীফ মেম্বারের ২০টি, মো. কবীরের ৫টি গরু রয়েছে। যাদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়েছে, শুধু তাদের গরুর হিসাব এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশিষ্ট পরিবারগুলোকে তাত্ক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
বেউরঝাড়ি সীমান্তে গিয়ে দেখা গেছে, ৩৭৯নং সীমানা পিলারের কাছে বাংলাদেশে চারণভূমি। নাগর নদী পার হয়ে চারণভূমির পাশাপাশি বাংলাদেশের কৃষিজমিও রয়েছে। অনেক দূরে ভারতীয় কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার পাশেই রয়েছে প্রতি একশ’ মিটার দূরে ভারতীয় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। স্থানীয় একজন হাত দিয়ে দেখিয়ে বলেন, এ কাঁটাতারের বেড়ায় মাঝে মধ্যেই রয়েছে গেট। এসব গেট খুলে বিএসএফ প্রায়ই বাংলাদেশের এ ভূমিতে হানা দেয়। একসময় বর্গিরা এদেশে হানা দিয়ে মানুষের উত্পাদিত ফসল নিয়ে যেত—এ কাহিনী রয়েছে ইতিহাসে। বর্গি হানার ভয় দেখিয়ে অনেক ঘুমপাড়ানি গান গল্প রচনা করেছেন কবি-সাহিত্যিকরা। ভারতীয় বিএসএফ বর্গির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এ সীমান্ত এলাকায়। এখান থেকে প্রায়ই গরু ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ। এর পর মুক্তিপণ দিয়ে বিজিবির মাধ্যমে ছাড়িয়ে আনতে হয়।
আমাদের অনুসন্ধানকালেও এ চারণভূমিতে গরু চরাতে দেখা গেছে বাংলাদেশী রাখালদের। তাদের বক্তব্য, গরুই হচ্ছে এখানে অনেক পরিবারের আয়ের একমাত্র উত্স। সুতরাং আমাদের দেশের চারণভূমি থেকে গরু নিয়ে আসতে তো কোনো বাধা নেই। তাদের বক্তব্য বিজিবি যথাযথ ডিউটি করলে বিএসএফ এখানে এসে এভাবে হানা দিতে পারত না। তবে স্থানীয় বেউরঝাড়ি বিজিবি ক্যাম্প হাবিলদারের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, নদীতে যখন পানি কম থাকে, তখন ওপারে যাওয়া যায়। পানি বেশি থাকলে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। বিজিবির নৌকা নেই। নাগর নদী পার হয়ে ওই সীমান্তে যেতে হয়। নদী পারাপার হতে হলে সাঁতার দিয়ে পার হতে হবে। পোশাক পরে অস্ত্র নিয়ে সাঁতার দিয়ে বা পোশাক ভিজিয়ে নদী পাওয়ার হওয়া বিজিবির পক্ষে সম্ভব হয় না। এছাড়া পানি কম থাকাকালেও কাপড় ভিজিয়ে নদী পার হতে হয়। এ জন্য অনেক সময়ই নদী পার হয়ে ডিউটি করা বা সীমান্ত পিলারের কাছে যাওয়া সম্ভব হয় না বলে উল্লেখ করেন বিজিবির স্থানীয় বেউরঝারি ক্যাম্পের একজন হাবিলদার।
বিএসএফ হানা দিয়ে গরু নিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মামলা প্রসঙ্গে ওই হাবিলদার বলেন, সরকারি কাজে বাধা দিলে মামলা হওয়াটাই স্বাভাবিক। যারা এখানে এসে বেশি উত্তেজনা দেখিয়েছে, তারা স্থানীয় মাতুব্বর। ইলেকশনে দাঁড়ায়। ভবিষ্যতে ভোটের জন্যই তারা এখানে এসে এসব করে—এটা আমরা বুঝি।
বিজিবি’র দায়ের করা মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়। ওই পাঁচজনের মধ্যে দুইজন হলেন—যাদের গরুর সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাদের একজন হলেন সাবেক মেম্বার নাজিম উদ্দিন ও গত নির্বাচনে পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আখালু ওরফে ডঙ্গা। গ্রামের নিরীহ মানুষদের পক্ষে তারা গরু উদ্ধারের দাবিতে বিজিবি ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। মো. আখালু জানান, মামলার পর তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতীয়রা মাঝে মধ্যেই এখানে হানা দেয়। বিজিবি মামলা দিল কেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, একেবারেই ঠুনকো ঘটনা। যাদের গরু নিয়ে গেছে, তারা একটু উত্তেজিত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। বিজিবির হাবিলদার একজনকে বলেছিলেন খোঁয়াড়ের মালিককে ডেকে আনার জন্য। ওই ব্যক্তি শুধু বলেছিলেন, খোঁয়াড়ের মালিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো নেই। অন্য কাউকে দিয়ে ডেকে আনার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে বিজিবি হাবিলদার মারমুখী আচরণ করে। এ আচরণ থেকেই কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়। এর বেশি কিছু নয়। আর এতেই সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে মামলা করে বিজিবি।
গরুর ওপর নির্ভরশীল পাল সম্প্রদায়ের লোকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকেই হাউমাউ করে কেঁদে বলতে থাকেন, তাদের আর কোনো সম্বল নেই।
দিশেহারা আনছারুলের পরিবার : এই চারণভূমির পাশে নাগর নদীতে গত বছরের অক্টোবরে এক ব্যক্তিকে পাথর ছুড়ে হত্যা করেছিল বিএসএফ। থুকড়া গ্রামের আনছারুল নদী পার হয়ে কৃষিক্ষেতে কাজ করছিল। সন্ধ্যায় বিএসএফের তাড়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয়। কাঁটাতার অতিক্রম করে এসে বিএসএফ তাকে পাথর ছুড়ে নদীতেই হত্যা করে। থুকড়া গ্রামে আনছারুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় করুণ দৃশ্য। তার বৃদ্ধা মা হাসিনা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন ছেলের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে। জানান, একমাত্র ছেলে ছিল আনছারুল। পরিবারে আর উপার্যনক্ষম কেউ নেই। নিহত ছেলের স্ত্রী, ছোট এক মেয়ে ও এক ছেলেসন্তান রয়েছে। তিনি বলেন, বছরখানেক আগে আশ্বিন মাসের শেষের দিকের ঘটনা। হঠাত্ করেই বাড়িতে খবর আসে আনছারুলকে বিএসএফ পাথর দিয়ে হত্যা করে মেরে ফেলেছে। এর পর থেকেই তাদের পরিবারে দুর্যোগ নেমে আসে। আনছারুলের স্ত্রী এবং বৃদ্ধা হাসিনা বেগম কখনও দিনমজুরি, কখনও অন্যের বাড়িতে নানা কাজ-কর্ম করে সংসারের খরচ জোগান দিচ্ছেন। হাসিনা বেগম বলেন, ছেলে হারানোর পর কেউ কোনোদিন খোঁজ নিতেও যায়নি তাদের বাড়িতে।
দুর্গম থুকড়া গ্রামের বাড়িঘর দেখলেই মনে হয় এলাকার মানুষ খুব কষ্টে দিনযাপন করেন। এখানে গরু লালন-পালন এবং কৃষি ছাড়া অন্য কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। ছোট কুঁড়ে ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করতে হয় ৯০ ভাগের বেশি পরিবারকে।