Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ২৫ নভেম্বর ২০১২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ১০ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

এফবিসিসিআই’র নির্বাচনে সরকারদলীয় সমর্থকদের পেশিশক্তি প্রদর্শন : চেম্বার গ্রুপে কাজী আকরাম প্যানেলের নিরঙ্কুশ জয়

রিজাউল করিম
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
সরকারদলীয় সমর্থকদের পেশিশক্তি প্রদর্শনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হলো ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) নির্বাচন। নির্বাচনে চেম্বার গ্রুপের সভাপতি পদপ্রার্থী কাজী আকরাম উদ্দিনের প্যানেলের নিরঙ্কুশ জয় হয়েছে।
গতকাল অনুষ্ঠিত ২০১২-১৪ মেয়াদের নির্বাচনে পরিচালক পদে ১৫টি পদের মধ্যে ১১টি পদে জয়ী হয়েছেন আকরাম উদ্দিন সমর্থিত জেলা চেম্বারের নেতারা। অন্যদিকে সংগঠনের সাবেক সভাপতি আনিসুল হক সমর্থিত গণতান্ত্রিক পরিষদের ৪ জন পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
শনিবার রাত ১০টা ২০ মিনিটে চেম্বার গ্রুপের ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী আশরাফ এমপি। চেম্বার গ্রুপ থেকে কাজী আকরাম পরিষদের নির্বাচিত পরিচালকরা হলেন : আমিনুল হক শামীম (২৬২), রেজাউল করিম রেজনু (২৪৯), বজলুর রহমান (২৪০), মনোয়ারা হাকিম আলী (২৩৯), মমতাজ উদ্দিন (২১৩), প্রবীর কুমার সাহা (২০৯), এ কে এম শাহেদ রেজা (২০৪), আবদুুল ওয়াহেদ (২০৩), জালাল উদ্দিন ইয়ামেনী (১৯৭), সিরাজুল হক (১৮৮) ও বিজয় কুমার কেজরিওয়াল (১৮৫)। আনিসুল হক সমর্থিত গণতান্ত্রিক পরিষদ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন আনোয়ার সাদাত সরকার (২১৭), গোলাম মোস্তফা তালুকদার (২১২), কোহিনুর ইসলাম (২১০) ও তাবারাকুল তোসাদ্দেক হোসেন খান টিটু (১৯৭)। শনিবার ভোররাত অথবা রোববার সকালে অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের ফল ঘোষণা হতে পারে।
এফবিসিসিআই নির্বাচনে গতকাল সরকারদলীয় প্রার্থীদের পক্ষে আওয়ামী ক্যাডাররা ব্যাপক পেশিশক্তি প্রদর্শন করেছে। সব পর্যায়ে নির্বাচনী আচরণবিধি চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদের পক্ষে ছাত্রলীগকে শোডাউন করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে সরকার সমর্থকদের একটি গ্রুপ আনিসুল হকের গণতান্ত্রিক পরিষদের এক ভোটারের ওপর হামলা চালায়। এ ধরনের অনেক অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্য দিয়ে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে।
নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী সীমার মধ্যে মিছিল ও স্লোগান, অবৈধভাবে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ, প্রার্থীদের কাছে ভোট চাওয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটেছে। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী আনিসুল হকের গণতান্ত্রিক পরিষদ সদস্যদের ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ পেপার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি হিসেবে ৯৪৩ নম্বর ভোটার ও আনিসুল হক সমর্থিত গণতান্ত্রিক পরিষদের প্রচারণাকারী হাজি আমির উদ্দিনের ওপর হামলা চালান ১৩ নম্বর ব্যালটধারী হারুন-অর-রশিদের সমর্থকরা। এতে আমির উদ্দিন মাথা ও নাকে প্রচণ্ড আঘাত পান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমির উদ্দিন বলেন, ‘দুপুর পৌনে ১টার দিকে নির্বাচনী সীমানার অনেক দূরে আনিসুল হকসহ আমরা কয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিলাম। এ সময়ে একটি ক্যাডার বাহিনী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে তারা আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।’
তিনি জানান, আনিসুল হক নির্বাচনে অংশ না নিয়েও নির্বাচন কেন্দ্রে যাওয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয়। হামলায় তার মাথা ও নাকে প্রচণ্ড আঘাত পান। আক্রমণকারীদের গায়ে এশিয়ান টেক্সটাইলের গেঞ্জি ছিল বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে আনিসুল হক বলেন, নির্বাচনী এলাকার যে সীমানায় যাওয়া যায় না, আমি সেখানে যাইনি। নির্ধারিত সীমার বাইরেই ছিলাম। তবে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অধিকার রয়েছে আমার।
নির্বাচন চলাকালীন সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ভোটকেন্দ্রে কে কার চেয়ে বেশি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে পারে, সে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। কোনো ধরনের বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয়নি। তবে বিধি লঙ্ঘনে সরকার সমর্থনপুষ্ট কাজী আকরাম উদ্দিনের প্যানেল প্রার্থীরা ছিলেন বেপরোয়া। এ প্যানেলের প্রভাবে গণতান্ত্রিক প্যানেলের প্রার্থীরা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।
সকাল ১১টার দিকে কাজী আকরাম উদ্দিনকে ফেডারেশন ভবনের প্রবেশ পথের সিঁড়িতে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করতে দেখা যায়। এসব এলাকায় প্রার্থীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেক প্রার্থী তা মানেননি। তবে আনিসুল হককে নির্বাচনী কেন্দ্রের নির্ধারিত সীমার বাইরে দেখা গেছে।
এফবিসিসিআই সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের স্বার্থে নির্বাচনী প্রচারণার সীমা নির্ধারণ করে দিলেও সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত প্যানেলের সমর্থকরা তা মানেননি। তারা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে পরিচালক পদপ্রার্থীদের ব্যালট নম্বর ধরিয়ে দিয়েছে এবং গ্রুপ করে প্রার্থীর পক্ষে স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আলী আশরাফ আগে থেকেই দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এতে করে আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো প্রার্থী জটলা বাধাতে পারবেন না, স্লোগান দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন না। সিঁড়িতে এবং লিফটের সামনে প্রার্থীরা তাদের প্রচারণা চালাতে পারবেন না। কোনো প্রার্থী ও ভোটার মোবাইল ফোন, ক্যামেরা ও ব্যাগ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। অথচ সব প্রার্থীকেই সিঁড়ি ও লিফটের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ব্যালট নম্বর সংবলিত প্রচারপত্র বিলি করার পাশাপাশি ভোট চাইতে দেখা গেছে। সবাইকে মোবাইল ফোন, ক্যামেরা ও ব্যাগ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতেও দেখা গেছে।
এদিকে পর্দার অন্তরালে থেকে আকরাম উদ্দিন প্যানেলের নেতৃত্বদানকারী সালমান এফ রহমানের সঙ্গে নির্বাচনী বোর্ড কর্মকর্তাদের বাদানুবাদের ঘটনা ঘটে। ব্যালট বাক্স এবং প্রার্থীদের এজেন্টদের বসার স্থান নিয়ে সকাল সাড়ে ৮টায় এ বাদানুবাদ হয়। এ কারণে ভোটগ্রহণ আদা ঘণ্টা পিছিয়ে যায় বলেও জানা গেছে। ভোটগ্রহণ শুরুতে ২৬ মিনিট দেরি হওয়ায় বিকালে ঘোষণা দেয়া হয়, ভোটগ্রহণ সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চলে। সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে সাড়ে ৪টায় শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রার্থীদের কেন্দ্রে বসা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আলী আশরাফ বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘আমরা সব বিষয় কঠোরভাবে মনিটরিং করছি। কোনো সমস্যা দেখলে আমরা সতর্ক করছি। আমরা মাইকে বারবার এ ব্যাপারে সতর্কবাণী প্রচার করছি। কেউ গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে আমরা প্রার্থিতা বাতিল করব।’
এবারের নির্বাচনে ৩০টি পরিচালক পদের বিপরীতে দুটি প্যানেল থেকে ৬৩ জন প্রার্থী ছিলেন। এর মধ্যে চেম্বার গ্রুপে ৩০ জন ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপে ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের সদস্যরা শুধু অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের প্রার্থীদের এবং চেম্বার গ্রুপের সদস্যরা শুধু চেম্বার গ্রুপের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবেন। একজন ভোটার সর্বোচ্চ ১৫ জনকে ভোট দিতে পারেন।
দুটি প্যানেলের মধ্যে একটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ, যিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস এর পক্ষ থেকে মনোনীত হয়ে এরই মধ্যে সংগঠনটির পরিচালক। তিনি সভাপতি প্রার্থী। অন্য প্যানেলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ব্যবসায়ীদের এই শীর্ষ সংগঠনের সাবেক সভাপতি আনিসুল হক, যদিও তিনি নিজে নির্বাচনে অংশ নেননি। ৭৩টি ব্যবসায়ী চেম্বার ও ৩২৬টি অ্যাসোসিয়েশন এফবিসিসিআইয়ের সদস্য।
এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির ৫০টি চেম্বার থেকে ৬ জন করে এবং ‘বি’ ক্যাটাগরির ২৩টি চেম্বার থেকে ৪ জন করে ভোটার রয়েছেন। এর বাইরে ‘এ’ ক্যাটাগরির ৩১৮টি অ্যাসোসিয়েশন থেকে ৫ জন করে এবং ‘বি’ ক্যাটাগরির আটটি অ্যাসোসিয়েশন থেকে ৪ জন করে ভোট দেয়ার সুযোগ পাবেন। তবে নির্বাচনে চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে কারা ভোটার হবেন তা সংশ্লিষ্ট সংঠনের পরিচালনা পর্ষদই নির্ধারণ করে। এ হিসাবে এবারের নির্বাচনে মোট ২০০১ জন ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যাদের মধ্যে চেম্বার গ্রুপের ৩৯০ জন এবং অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের ১৬১১ জন। নির্বাচিত পরিচালকরা ২৬ নভেম্বর ফেডারেশনের সভাপতি ও সহসভাপতি নির্বাচন করবেন। এর ফলাফল প্রকাশ করা হবে ২৯ নভেম্বর।