Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ২৫ নভেম্বর ২০১২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ১০ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

চলছে বালু তোলার মহোত্সব

পরের সংবাদ»
শেরপুর : শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা ঝিনাইগাতি। ভারতের মেঘালয় থেকে মহারশি নদী ঝিনাইগাতিতে এসে মিশেছে। নদীর দু’ধারে রয়েছে শত শত হেক্টর আবাদি জমি ও বাগান। এ নদী থেকে পানি তুলেই স্থানীয় কৃষক তাদের আবাদি জমির পানির চাহিদা পূরণ করত এবং গাছেও পানি দেয়া হতো। কয়েক বছর ধরে বৈধ ও অবৈধভাবে প্রভাবশালীদের নদী থেকে বালু তোলার মহোত্সব চলছে। প্রতিদিন শত শত শ্যালো মেশিন দিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। বালুর সঙ্গে উঠে যাচ্ছে নদীর পানি। এতে শুকনো মৌসুমে তো নয়ই, বর্ষা মৌসুমেও পানি থাকছে না। মাটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এখানে সেচ বসানো ব্যয়বহুল। এ কারণে এলাকার একমাত্র পানির উত্স মহারশি নদী থেকে পানি তুলে আবাদ করতে পারছে না কৃষক। এর দরুন শত শত হেক্টর জমির উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান নদী থেকে পানি তুলে ক্ষেতে দেয়ার জন্য ২৫ লাখ টাকা সরকারি ব্যয়ে নদীর পাড় থেকে পাকা ড্রেনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। নদীতে পানি না থাকায় এ উদ্যোগটিও ভেস্তে গেছে। অপরদিকে সরকারি গাছগুলোতেও পানি দেয়া যাচ্ছে না, উপরন্তু নদীর দু’পাড় গাছসহ ভেঙে পড়ছে। আর নদী থেকে তোলা বালু পরিবহনের জন্য প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে শত শত বড় ট্রাক। এ ট্রাকের অবাধ যাতায়াতের কারণে ঝিনাইগাতির ফরেস্ট অফিস থেকে শুরু করে হলদি গ্রাম, ফকরাবাদ, সন্ধ্যাকুড়া হয়ে সীমান্ত পর্যন্ত রাস্তা বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। মোট ১০ কিলোমিটার রাস্তা জনচলালের একেবারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কৃষক বদি মিয়া বলেন, রাস্তা খারাপ হওয়ায় কৃষকের উত্পাদিত টনকে টন সবজি কিনতে গাড়ি আসে না। এলাকার শত শত টিউবওয়েল অকেজো হওয়ার কারণে মানুষ বিশুদ্ধ খাবার পানি পাচ্ছে না। নদী থেকে অতিরিক্ত বালু তোলার কারণে মহারশি ব্রিজটি রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। প্রতি ট্রাক বালুতে নিচ্ছেন ৭০০-৮০০ টাকা। প্রতিদিন এ বালুমহাল থেকেই গড়ে ১০০ ট্রাক বালু উত্তোলন করা হয়। একটি সূত্র জানায়, উত্তোলিত বালুর আয় থেকে একটি বিশাল অংশ সরকারি দল ও প্রশাসনকে দিয়ে ম্যানেজ করে মামলা দীর্ঘসূত্রী করে দীর্ঘ সময় ধরে বালু তুলে যাচ্ছে প্রভাবশালীরা। সম্প্রতি ছামিউল ফকিরের অবৈধ বালুমহালে আবার ভাগ বসিয়েছে উপজেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে দু’গ্রুপ সংঘাতে লিপ্ত হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলুল হক চানের মধ্যস্থতায় ভাগাভাগির ভিত্তিতে সমঝোতা করে দেয়া হয়। নদীর অপর ডাকাবর এলাকার ১১ একর জায়গা লিজ নিয়ে জনৈক এমরানুজ্জামান লিজের বাইরে বিস্তর এলাকাজুড়ে বালু তুলছেন—এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর। বালু তোলা প্রসঙ্গে ছামিউল হক ফকির বলেন, হাইকোর্টের অনুমতি নিয়েই বৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ঝিনাইগাতি উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাদশা জানিয়েছেন, বালু তোলার কারণে বিভিন্ন সমস্যা হচ্ছে, তবে কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে ও কৃষকের জমি আগের মতো প্লাবিত হচ্ছে না। তবে তিনি অনিয়মের কথা স্বীকার করে বলেন, মহারশি নদীর লাল বালু খুব মূল্যবান।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জানান, ছামিউল হক ফকিরের মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। অবৈধ বালু তোলা বন্ধের জন্য কয়েকবার মোবাইল কোর্ট বসিয়ে মেশিন সিজ করা হয়েছে এবং পুলিশকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। যদি বালু তোলা জনস্বার্থবিরোধী হয়, তবে সরকার অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।
পাবনা : পাবনা জেলার পদ্মা ও যমুনা নদীর চর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানি সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। কৃষি ও সেচ কাজ ব্যাহত এবং নদী ভাঙনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে যমুনার নাব্য ভয়াবহভাবে হ্রাস পেয়েছে। অস্বাভাবিকভাবে পানি কমতে থাকায় যমুনা ও পদ্মার বুক চিরে জেগে উঠছে অসংখ্য চর ও ডুবোচর। ফলে নগরবাড়ী-পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং বাঘাবাড়ীর নৌরুটে নৌ যোগাযোগ যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সূত্র জানায়, পাবনা সদর উপজেলার সদিরাজপুর, আশুতোষপুর, রাধাকান্তপুর, চরবলরামপুর, ঈশ্বরদী উপজেলার ডিক্রির চর, সাহাপুর, দাদাপুর, কামালপুর, সুজানগর উপজেলার রাইপুর, নাজিরগঞ্জ ঘাট, বেড়া উপজেলার নগরবাড়ী ঘাট, চর কল্যাণপুর, বৃশালিকা, পাইনা, পাঁচাকোলা, মোহনগঞ্জ, নাকালিয়া, মাছখালীসহ পদ্মা ও যমুনার চরাঞ্চল হতে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিদের সহায়তায় স্থানীয় কিছু জনগণ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। ফলে এলাকাগুলোতে এবং এলাকাসংলগ্ন গ্রামগুলোতে নদী ভাঙনের প্রকোপ প্রচণ্ড আকারে দেখা দিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমের আগেই এসব স্থানে পানি সঙ্কট দেখা যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে এ সঙ্কট আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলার সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের বরখাপুর গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার চর থেকে প্রতিদিন ২০টি ট্রলার ভর্তি করে আনুমানিক ৫০ হাজার সিএফটি বালু দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। এসব বালু মাদারীপুর, টেকেরহাট, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে নেয়া হয়।
শালিখা (মাগুরা) : উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের বয়রা গ্রামের কালীদাসখালী সরকারি খাল থেকে দু’বছর ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় ১০০ একর ফসলি জমি হুমকির মধ্যে পড়েছে। অবৈধভাবে এ বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে ২২ নভেম্বর সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ঘটনাস্থলে গিয়ে মালামাল জব্দ করেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের বয়রা গ্রামে কালীদাসখালী খালের হিজলতলা থেকে একই ইউনিয়নের পাঁচকাহনিয়া গ্রামের বালুদস্যু তৈয়ব আলী ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে সম্পর্কের দাপট দেখিয়ে দু’বছর ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। স্থানীয়ভাবে শ্যালোমেশিন দিয়ে মাটির গভীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করার ফলে একসময় খালের মাটি দেবে গিয়ে দু’পাশের শতাধিক একর ফসলি জমি গভীর গর্তে বিলীন হয়ে গেছে। পাশের জমির মালিকরা ভবিষ্যতে ক্ষতির কথা চিন্তা করে তৈয়ব আলীকে বালু উত্তোলনে নিষেধ করলেও কোনো লাভ হয়নি। ক্ষমতাসীন দল, প্রশাসন ও বয়রা গ্রামের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তার সঙ্গে আছে এ ভয় দেখিয়ে সে দ্বিগুণ উত্সাহে বালু উত্তোলন করে চলেছে।
পীরগাছা (রংপুর) : রংপুরের পীরগাছায় বুড়াইল নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় তাম্বুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, দাখিল মাদরাসা ও ১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বুড়াইল ব্রিজসহ আশপাশের বসতভিটা হুমকির মুখে পড়েছে। নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
বুধবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার তাস্বুলপুর ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়াইল নদী থেকে এলাকার প্রভাবশালী ও বর্তমান ছাওলা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আমজাদ হোসেন দীর্ঘদিন থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে আসছেন। স্থানীয়ভাবে শ্যালোমেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করায় বুড়াইল নদী ঘেঁষে তাম্বুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, তাম্বুলপুর দাখিল মাদরাসা ও বহুল আলোচিত প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বুড়াইল ব্রিজসহ আশপাশের বসতভিটা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে যে কোনো মুহূর্তে তাম্বুলপুর বাজারটি নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে এলাকাবাসী একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেও কোনো সারা পাননি। ফলে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আমজাদ হোসেন এলাকার প্রভাবশালী ও বর্তমানে ওই ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সচিব হওয়ায় তার বিরুদ্ধে এলাকার জনগণ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। তাম্বুলপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার রাশেদুন্নবী জানান, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি তিনি লিখিতভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেছেন। বালু উত্তোলনকারী ইউপি সচিব আমজাদ হোসেন বলেন, সবাই বালু উত্তোলন করেন। তাই আমিও উত্তোলন করে আসছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম সরোয়ার জাহান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে অবৈধভাবে কেউ বালু উত্তোলন করে থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
চারঘাট : দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারও শুরু হয়েছে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার মোক্তারপুরে পদ্মা নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের হিড়িক। ফলে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ ও সারদা পুলিশ একাডেমী এ দুটি বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান আজ হুমকির সম্মুখীন।
এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘদিন চারঘাটের মোক্তারপুরের পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার পর আবারও রহস্যজনক কারণে শুরু হয়েছে বালু উত্তোলন। তারা বলেন, এর আগে রাজশাহী থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এসে মোক্তারপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মজুতকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ করে দেন। শুধু বালু উত্তোলন বন্ধ করেননি, রীতিমত এর সঙ্গে জড়িতদের জেলজরিমানাও করেন। এছাড়া মোক্তারপুর বালুর ঘাটে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার পর আবারও মোক্তারপুর এলাকার একটি প্রভাবশালী মহল বালু উত্তোলনে মেতে উঠেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোক্তারপুর এলাকার আবদুল হান্নান, হাবিব, শাহিনসহ ১৮ থেকে ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র আবারও বেপরোয়াভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, মোক্তারপুর এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বালু উত্তোলনকারীদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শুধু বালু উত্তোলনকারীদের মাঝে সংঘর্ষ থেমে থাকেনি, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে স্থানীয় প্রশাসন বালু উত্তোলনকারী ট্রাক থানায় ধরে আনার জের ধরে বালু উত্তোলনকারীরা পুলিশের পিকআপ গাড়িও আটক করেছিল। পরে থানায় আটককৃত বালুর ট্রাক ছেড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি পুলিশ দিলে পিকআপ গাড়ি ছেড়ে দেয় বালু উত্তোলনকারীরা। এ ব্যাপারে ওই সময় বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশ হয়।
এ ব্যাপারে চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্সি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, স্থানীয় লোকজন অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে এ সংবাদ পেয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলেছি। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অপরদিকে রাজশাহী জেলা প্রশাসক বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এরই মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।