Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ২৫ নভেম্বর ২০১২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ১০ মহররম ১৪৩৪ হিজরী
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
 
আর্কাইভ: --
 

বাংলাদেশের গর্ব সিলেটের আবুল হাসান রাজু

মো. মঈন উদ্দিন মনজু
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
টেস্ট ম্যাচের পুরোটা জুড়ে স্কোরবোর্ডে লেখা দেখানো হয়েছে ‘হাসান’। অভিষেক টেস্টে বিরল এক সেঞ্চুরি হাঁকানো এই হাসানের পুরো নাম আবুল হাসান রাজু। রাজু বৃহত্তর সিলেটের ছেলে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় এক চা বাগানে জন্ম তার। বাবা মরহুম আবদুল খালিক, মা কামরুন নাহার।
পরিবার প্রসঙ্গে একটু পরে আসি। এর দু’দিন আগের একটি ঘটনা। সেদিন আমার সহকর্মী মুহাম্মদ তাজউদ্দিন খুব হতাশ কণ্ঠে বলছিলেন, সিলেটের ক্রিকেটাররা কী আর জাতীয় দলে খেলতে পারবে না।
সিলেটের ক্রিকেটাররা অনেক পিছিয়ে পড়েছে বলে হা-হুতাশ করলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে আমি পাল্টা জবাবে জানিয়ে ছিলাম, বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব ১৪, ১৬, ১৮ ও ১৯ বয়সভিত্তিক দলগুলোতে সিলেটের একাধিক ছেলে দারুণ পারফর্ম করছে। বর্তমানেও তিনজন ক্রিকেটার অনূর্ধ্ব ১৯ দলে খেলছে। এরা হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই জাতীয় দলে এসে আলো ছড়াবে।
এই আলাপের ঠিক দু’দিন পরই সিলেটের ছেলে আবুল হাসান রাজু টেস্টে রাজসিক কায়দায় পদার্পণ করলেন। যেন জাতীয় দলে সিলেটের ক্রিকেটারদের ব্যাট নিজের হাতে তুলে নিলেন। সিলেটের রাজু আজ দেশে সবচেয়ে আলোচিত নাম। অথচ মঙ্গলবার পর্যন্ত আবুল হাসান রাজু নামটি ছিল অখ্যাত।
সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে, বুধবার রাত সাড়ে ৮টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ফোন করে রাজুর সঙ্গে কথা বলেছেন। তার অসাধারণ ইনিংসের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক আকরাম খানকে ফোন করে রাজুর সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
সিলেট বিভাগীয় ক্রিকেট কোচ একেএম মাহমুদ ইমনসহ সিলেটের ক্রিকেটের খোঁজ খবর যারা রাখেন তারা জানেন আবুল হাসান রাজুর মতো সিলেটের অনেক সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার পর্যায়ক্রমে জাতীয় দলে এসে আলো ছড়ানোর অপেক্ষায় আছে। রাজুর বিস্ময়কর পারফরম্যান্স যেন এই আশা জাগানিয়া তথ্যই জানান দিচ্ছে।
রাজুর বিরল ইনিংসটি বিস্ময়করই বলতে হবে। দশ নম্বরে ব্যাট করতে নামা ‘বোলার’ আবুল হাসান করলেন এক অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি! যে সেঞ্চুরি বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে আজীবন দাগ কাটবে।
আর ঐতিহাসিক বলা হচ্ছে এ কারণে, আবুল যে কীর্তি করেছেন, তা টেস্ট ক্রিকেটে বিরলতম ঘটনাগুলোর একটি। অভিষেকে দশ নম্বরে কোনো ব্যাটসম্যান টেস্ট ক্রিকেটে সর্বশেষ সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন ১১০ বছর আগে, ১৯০২ সালে। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার রেগি ডাফ করেছিলেন সেই সেঞ্চুরি।
তবে ক্রিকইনফোর তথ্য থেকে জানা যায়, রেগি ডাফ বোলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান। সে যাই হোক, সেই কীর্তিরই পুনরাবৃত্তি করলেন আমাদের আবুল হাসান। শুধু তাই নয়, রেগি ডাফকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ এখন রাজুর সামনে। আর মাত্র ৫ রান করলেই অভিষেকেই দশম ব্যাটসম্যান হিসেবে রেগি ডাফের করা ১০৪ রানের ইনিংসকে পেছনে ফেলে বিশ্বরেকর্ড গড়বেন রাজু। আর ১৮ রান করলেই ১২৮ বছরের রেকর্ড ভেঙে নতুন করে লেখা হবে। ১৮৮৪ সালের ১১ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১০ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ১১৭ রান করেছিলেন ইংল্যান্ডের উইলিয়াম রিডার। ইতিহাসের ১৬তম টেস্টে গড়া সেই রেকর্ড এখনও অক্ষত। সেই রেকর্ডকে এখন চোখ রাঙাচ্ছেন আমাদের সিলেটের রাজু।
রাজুর উত্থান কিন্তু কিছুটা নাটকীয়। শুরুতে ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন। অনূর্ধ্ব-১৫ দলেও যখন খেলতেন, তখন পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যানের তকমা ছিল। বয়সভিত্তিক একটি ম্যাচে বোলিং করতে দেখে বাংলাদেশের জাতীয় দলের ক্রিকেটার মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও নোবেল তাকে পেস বোলিং করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই থেকে বোলার হয়ে গেলেন রাজু। উত্থানটা হলো তরতর করে। এরপর অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ছিলেন নিয়মিত পারফরমার। ২০০৯ সালের ৭ মে শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে স্মরণীয় জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাজু। সেবার ১৯৭ রান তাড়া করতে নেমে ১৪৩ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল বাংলাদেশ। এ সময় নামেন রাজু। আর কোনো উইকেট পড়েনি। অপরাজিত ৩০ রানের কার্যকর ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে সিরিজ জয়ের আনন্দ দিয়েছিলেন রাজু।
২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর জিম্বাবুয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গে অলরাউন্ড নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন রাজু। বল হাতে ২৬ রানে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট, ব্যাটিংয়ে নয় নম্বরে নেমে করেছিলেন অপরাজিত ২২। সেবার ক্রিকইনফো শিরোনাম দিয়েছিল ‘আবুল হাসান ব্রেকস জিম্বাবুয়ে হার্টস’।
আবার চলে আসি রাজুর পরিবারে। রাজুর বাবা কুলাউড়ার গাজীপুর চা বাগানে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে চা বাগানেই সবার ছোট ছেলে রাজুর জন্ম। রাজুরা দুই ভাই এক বোন। রাজুর বড় ভাই এখন গাজীপুর চা বাগানে টিলা সুপারভাইজর পদে চাকরি করেন। একমাত্র বোন ফাতেমা আক্তার অগ্রণী ব্যাংকে চাকরি করেন। রাজুর বাবা ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করায় দেখে যেতে পারেননি ছেলের অনন্য সাফল্য।
বুধবার রাতে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে রাজুর ভাই আবুল কাশেম রুবেল জানান, তাদের পরিবারে এখন আনন্দের বন্যা। রাজুর ব্যাটিং তারা টিভিতে পরিবারের সবাই একসঙ্গে দেখেছেন। বিশেষ করে শেষদিকের উত্তেজনাকর কয়েকটি ওভারের সময় তাদের টেনশন ছিল বেশি। শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি করায় তারা সবার মতো খুবই আনন্দিত।
বড় ভাই জানালেন, সেঞ্চুরির পর হোটেলে ফিরে রাজুর সঙ্গে তার পরিবারের কথা হয়। আগামী দিনের খেলার জন্য খুব বেশি কথা বলতে পারেননি তারা। ভবিষ্যতে রাজু যাতে আরও ভালো খেলতে পারে সেজন্য সিলেটসহ দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেছেন বড় ভাই আবুল কাশেম রুবেল।