Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ২৫ নভেম্বর ২০১২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ১০ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

সুন্দরবনে নির্বিচারে বন্যপ্রাণী শিকার

জাকারিয়া মাহমুদ
পরের সংবাদ»
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে প্রতিনিয়ত বন্যপ্রাণী শিকার চলছেই। শিকারিরা নির্বিচারে বাঘ, হরিণ, বানর, পাখি, সাপ, কুমিরসহ শিকার করে চলেছে নানা বন্যপ্রাণী। বন্যপ্রাণী নিধন প্রতিরোধে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ ব্যবস্থা ও দুর্বল নজরদারির কারণে কোনোভাবেই চোরা শিকারিদের প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। সীমিত জনবলের বন রক্ষীদের অগোচরে চোরা শিকারি চক্র এখন খুবই তত্পর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একশ্রেণীর অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারী উেকাচের বিনিময়ে এসব শিকারিকে শিকার ধরার সুযোগ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একশ্রেণীর মহাজনের কাছ থেকে আগাম দাদন নিয়ে এসব শিকারি সুন্দরবনে ঢোকার পাস সংগ্রহ করে। সুন্দরবনে ভাড়ায় মেলে আগ্নেয়াস্ত্র। প্রচার রয়েছে, টাকার জোগান থাকলেই সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় যে কেউ সহজেই সুস্বাদু হরিণের মাংসের স্বাদ নিতে পারেন। তাছাড়া ওইসব এলাকায় বিভিন্ন উত্সব-পার্বণের ভোজ অনুষ্ঠানে বিশেষ আকর্ষণ থাকে ‘হরিণের মাংস’। অনেকে কাজ বাগাতে এখান থেকে হরিণের মাংস সংগ্রহ করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান। বনের মায়াবী হরিণের শিং নয়, এখন জীবন্ত হরিণই শোভা পায় ভিআইপি-সিআইপিদের অভিজাত বাড়ির আঙিনায়।
সর্বশেষ মাত্র ৪ দিন আগে ২১ নভেম্বর বিকালে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কোকিলমনির বাকের খাল এলাকা থেকে ফাঁদসহ ৯ হরিণ শিকারিকে আটক করেছে বনরক্ষীরা। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার, ৫০ ফুট ফাঁদ, রান্না করা হরিণের মাংস ও দা-কুড়ালসহ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
বৃহস্পতিবার বিকালে বাগেরহাট সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের কার্যালয়ে শিকারিদের আনা হয়। পরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
আটককৃতরা হলো বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার রাজনগর গ্রামের তিতাস ঘোষ, আলমগীর সেখ, ওলিউর, আরিফ, মোঃ খবির উদ্দিন, বেল্লাল হাজরা, মনিরুল সেখ, সুজিত ঘোষ, ফিরোজ সেখ।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের ডিএফও আমীর হোসেন চৌধুরী জানান, বুধবার সন্ধ্যায় সুন্দরবনের কোকিলমনি বাকের খাল এলাকায় হরিল শিকারিরা অবস্থান করছে—এমন খবরের ভিত্তিতে স্থানীয় ফরেস্ট ক্যাম্পের বনরক্ষীরা সেখানে অভিযান চালায়। এসময় তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে শিকারিরা দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। পরে বনরক্ষীরা ধাওয়া করে শিকারিদের ট্রলারসহ আটক করে। এ ঘটনায় বন্যপ্রাণী নিধন আইনে একটি মামলা দায়ের হয়েছে।
সুন্দরবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেশকে দিয়েছে বিশ্বখ্যাতি। সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারই এখন অস্ত্বিত্ব সঙ্কটে। বিশ্বখ্যাত এই বাঘের শেষ আশ্রয়স্থল সুন্দরবনও এখন তাদের জন্য নিরাপদ নয়। শুধু হত্যাই নয়, বাঘের চলাফেরা, প্রজনন, বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশেও হানা দিচ্ছে শিকারি চক্র।
১৯৬০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রায় ১৩০টি বাঘ হত্যার খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ সংখ্যা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। এসময় শতাধিক বাঘের চামড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে উদ্ধার হয়েছে। তবে এ চক্রের গডফাদাররা ধরা পড়েনি কখনও।
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি এক দিকে বন ধ্বংস করে নতুন বসতি গড়ে ওঠায় বন নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে বাঘের স্বাভাবিক চলাচলের জায়গা দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। অপরদিকে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলার পর জোয়ারের পানি দ্রুত বনাঞ্চলে প্রবেশ করে নিষ্কাশনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে মিষ্টি পানির পুকুরগুলোতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে বাঘ মিষ্টি পানি ও খাবারের সন্ধানে আকস্মিকভাবেই লোকালয়ে চলে আসছে এবং গণপিটুনির শিকারে প্রাণ হারাচ্ছে। সুন্দরবন বিভাগের একাধিক বন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিকারিদের হাতে ও গণপিটুনিতে বাঘ মারা যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে সামপ্রতিক সময়ে বাঘ হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
সুন্দরবনের কাছে বাগেরহাট জেলার শরণখোলা, মংলা, মোরেলগঞ্জ, রামপালসহ উপকূলীয় এলাকার শতাধিক গ্রামের সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিরা কাঁকড়া ও মাছ ধরার উছিলায় ছদ্মবেশে বনে প্রবেশ করে সুন্দরবনের মায়াবী হরিণ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বানর, পাখি, সাপ, কুমিরসহ অসংখ্য প্রাণী শিকার করছে। সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সুন্দরবনের ৭টি রেঞ্জের সংলগ্ন গ্রামগুলোতে একাধিক সংঘবদ্ধ শিকারি দল রয়েছে।
বন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সূত্র জানায়, এদের অবস্থান বরগুনা জেলার পাথরঘাটা, চরদুয়ানী, পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া, বাগেরহাট জেলার মংলা, শরণখোলা, রামপাল, মোরেলগঞ্জ, খুলনা জেলার পাইকগাছা, দাকোপ, আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলায়। এরা জেলের বেশে বন বিভাগের অনুমতিপত্র (পাস) নিয়ে বন অভ্যন্তরে চলে যায়। ভেতরে ঢুকে এরা শিকারি বনে যায়। এসব শিকারি খাদ্যে বিষ অথবা ট্রাঙ্কুলাইজার জাতীয় ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে প্রবল শক্তিধর বাঘকে অনায়াসে অচেতন করে ফেলে। পরে এদের জবাই করে হত্যা করে। এছাড়া ফাঁদ পেতে কিংবা গুলি করে বাঘ ও হরিণ শিকার করে।
শিকারিরা বাঘ ও হরিণ হত্যার পর স্থানীয় পদ্ধতিতেই চামড়া, মাংসসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে। পরে সুযোগমত তা নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে। স্থানীয়ভাবে একটি বাঘের জন্য শিকারিরা দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পেলেও আন্তর্জাতিক বাজারে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চামড়ার মূল্য কয়েকগুণ বেশি। কুমিরের চামড়া ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মূল্যও বেশ চড়া।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিকারিরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় বানর ধরে এনে দেশ-বিদেশে পাচার করে থাকে। সার্কাস খেলা ছাড়াও অনেক বাড়িতে শখ করে বানর পোষে। তাই পাচারকারীদের কাছে বাচ্চা বানরের চাহিদা থাকে বেশি। একশ্রেণীর শিকারি সুন্দরবন থেকে হরেক রকম পাখি শিকার করে নিয়ে তা খুলনা নিউমার্কেট ও রাজধানীর কাঁটাবন এলাকায় পাখির বাজারে সরবরাহ করে আসছে। মানিকগঞ্জ এলাকার কিছু সাপুড়ে জেলের ছদ্মবেশে সুন্দরবনে প্রবেশ করে এবং বিষধর সাপ ধরে প্রসেসিং করে তা বিদেশে পাচার করে বলে জানা গেছে। ওই চক্রটি কুমির ও গুঁইসাপ মেরে তার চামড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে পাচার করছে।
বন বিভাগের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৮১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে অর্ধশতাধিক বাঘ হত্যার শিকার হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর সুন্দরবনের হরিণ তো হর-হামেশাই শিকারে পরিণত হয়, যে কোথাও এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। সুন্দরবন এলাকার গ্রামগুলোতে কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় মেলে সুস্বাদু হরিণের মাংস।
তত্কালীন সরকার সুন্দরবনের ৩টি এলাকাকে বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। পূর্ব সুন্দরবনের কটকায় ৫৪৩৯ হেক্টর, হিরণ পয়েন্টের ১৭৭৮ হেক্টর এবং মান্দারবাড়িয়ায় ৯,০৬৯ হেক্টর বনভূমি নিয়ে এই অভয়ারণ্য এলাকা। কিন্তু এসব এলাকাতেও বন্যপ্রাণীরা নিস্তার পাচ্ছে না শিকারিদের হাত থেকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনে অতীতে বহু প্রজাতির বিরল প্রাণীর উপস্থিতি ছিল, যা কালের বিবর্তনে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বুনো মহিষ, পারা হরিণ, বুনো ষাঁড়, ছোট ও বড় এক শিংগি গণ্ডার, বার শিংগা, চিতা বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই। সুন্দরবনের ভেতর বনমোরগের ডাক শোনা এখন ভাগ্যের ব্যাপার। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সাদা মানিকজোড়, গগন বেড়, তিতিরসহ ১৬ প্রজাতির বিভিন্ন বন্য পশু-পাখি। বাঘ, হরিণ, বানর, পাখি, সাপ, কুমিরসহ অন্যান্য বিরল প্রজাতির প্রাণী শিকারের যে মহোত্সব চলছে; তাতে এরা কতদিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে তা বলা মুশকিল।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখতে এখনই যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। এটা কোনো কঠিন কাজ নয়। প্রয়োজন শুধু দেশপ্রেম, সততা ও আন্তরিকতার।