Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ৯ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ঢাকায় এডিস ও কিউলেক্স মশার উপদ্রব ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া রোগের আশঙ্কা : সতর্ক থাকার পরামর্শ চিকিত্সকদের

মাহমুদা ডলি
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
রাজধানী ঢাকায় কিউলেক্স এবং এডিস মশার উপদ্রব বেড়েছে। রাজধানীর অলিগলিতে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, ড্রেন-জলাশয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করাসহ দীর্ঘদিন ধরে মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় কিউলেক্স ও এডিস মশার উপদ্রব বেড়েছে। বর্ষাকাল শেষে এডিস ও কিউলেক্স মশার দাপটে অতিষ্ঠ নগরবাসীকে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া কিংবা অন্য ভাইরাল ফিবার থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিত্সকরা। এরই মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে ম্যালেরিয়া এবং ডেঙ্গু রোগীর খোঁজও পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য দুই ডিসিসিতে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও মাঠে তার কার্যক্রম অদৃশ্য। এ নিয়ে খোদ ডিসিসি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
এডিস, কিউলেক্স মশার দাপটে অতিষ্ঠ নগরবাসী : সরেজমিনে এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে মশার দাপট। অভিজাত এলাকা থেকে বস্তি সর্বত্র মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী। চলতি বছর বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর রাজধানীর বদ্ধ জলাশয়, ড্রেন, নর্দমায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হয়নি। এডিস মশার উপদ্রব বাড়ার এ মৌসুমেও দুই ডিসিসির মশক নিধন কার্যক্রমে স্থবিরতা। ফলে নগরবাসী ডেঙ্গু আতঙ্কে রয়েছে। এ সময় নিয়মিত তদারকি না থাকায় মশার ওষুধ বিশেষ করে লার্ভিসাইড প্রয়োগের কার্যক্রমও গ্রহণ করেনি দুই ডিসিসি। ফলে
বিভিন্ন স্থানে মশার দাপট বেড়ে যায়। নগরীর বিভিন্ন এলাকা যেমন ঢাকা উত্তরের অধীনে মিরপুরের রূপনগর খাল, বনানী-গুলশান লেক, হাতিরঝিল। এদিকে দক্ষিণ ডিসিসির ধানমন্ডি লেক, পুরনো ঢাকার একাধিক পুকুর দু’তিন বছরেও পরিষ্কার করা হচ্ছে না। ফলে এসব জলাশয় মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ডিএনসিসির স্থানীয়রা জানান, মিরপুর, পল্লবী, পাইকপাড়া, দুয়ারীপাড়া, ভাসানটেক, মোহাম্মদপুর, কুড়িল, শাহজাদপুর, রামপুরা, মগবাজার, মধুবাগ, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় মশার দাপট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাশের পুকুরের মধ্যে মশার ওড়াওড়ি ছাড়া দিনের বেলায় পানিও দেখা যায় না। ওই কমপ্লেক্স এলাকায় অনেক ছেলেমেয়ে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার্থী রয়েছে। তাদের দিনের বেলাতেও কয়েল জ্বালিয়ে পড়ালেখা করতে হচ্ছে। কমপ্লেক্সের মুন্সি মহিউদ্দিন জানান, গত এক বছরে মিরপুর এলাকায় কোনো মশক নিধন কার্যক্রম দেখেননি তারা। ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় পুরনো ঢাকার দীননাথ সেন রোডের ৪৩ নম্বর থেকে ৫৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাসিন্দারা জানান, গত এক বছরে তারা শুধু এ এলাকাই নয়, পুরনো ঢাকায় মশক নিধন কার্যক্রম তাদের চোখে পড়েনি। হাজারীবাগের স্থানীয় বাসিন্দা গৃহবধূ ময়না জানান, দিনের বেলায়ও তাদের শিশুসন্তানকে মশারি টানিয়ে ঘুমাতে দিতে হয়। পুরানো ঢাকার সাবেক ৭১, ৭২, ৭৩ সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর সুরাইয়া বেগম দৈনিক আমার দেশকে জানান, মশার জ্বালায় ঘরের মধ্যে দিনের বেলায়ও ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ‘ওই এলাকার অলিগলিতে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ এবং ড্রেন পরিষ্কার না করায় মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ৯ মাস হয়ে গেল ডিসিসি বিভক্ত হয়েছে। নগরবাসী সেবা না পেয়ে এখনও তার কাছে ছুটে আসে। গতকাল সকালেও এলাকার ক’জন তার কাছে এসেছেন মশক নিধন কার্যক্রমের অনুরোধ নিয়ে।’ মগবাজার আমবাগান এবং রামপুরা এলাকার বাসিন্দারা বলেন, অপরিচ্ছন্ন ও দূষিত পানিতে মশার প্রজননক্ষেত্র থাকায় সন্ধ্যার আগেই জানালা-দরজা দিয়ে হাজারো মশা ঘরে ঢোকে। মশার কয়েল বা স্প্রেতেও এখন আর কাজ হয় না। এর সঙ্গে অন্যান্য পোকামাকড়ের যন্ত্রণা তো রয়েছেই।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ : দুই ডিসিসির মশক নিধন কার্যক্রমে স্থবিরতায় এডিস এবং কিউলেক্স মশার দাপটে অতিষ্ঠ নগরবাসীকে সচেতন এবং সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষক রাজীব চৌধুরী দৈনিক আমার দেশকে বলেন, এ মৌসুমে এডিস মশার প্রকোপ বাড়ে। ফলে ডেঙ্গুর আতঙ্ক তো রয়েছেই। একইসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে নগরীতে অনেক ফাইলেরিয়া রোগী এসেছে। যারা বেশিরভাগ ছিন্নমূল-ভিক্ষুক। কিউলেক্স মশা এসব রোগীকে কামড়ে পরজীবী বহন করে সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তারও ফাইলেরিয়া হতে পারে। সুতরাং এ থেকে সাবধান হওয়া উচিত নগরবাসীর। এছাড়াও আরেক বিশেষজ্ঞ ড. পবিত্র কুমার ভাণ্ডারী বলেন, নগরীতে এরই মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু এবং ম্যালেরিয়া রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তাছাড়া কিউলেক্স মশা ভাইরাল ফিবার বহন করে ভাইরাসজনিত যে কোনো রোগ ছড়াতে পারে। তাই এ থেকে শিশু, শিক্ষার্থীদের সাবধানে রাখা উচিত। একইসঙ্গে এডিস মশার প্রকোপ যাতে ছড়াতে না পারে, সেজন্য এখনই লার্ভিসাইডের মাধ্যমে মশার ডিম ও ওল্ড মশাগুলো ধ্বংস করে দেয়া উচিত।
দুই ডিসিসির ১৯ কোটি টাকা ব্যয়, কার্যক্রম অদৃশ্য : মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য দুই ডিসিসির বাজেটের প্রায় ১৯ কোটি টাকার মধ্যে তিন ভাগের দু’ভাগ খরচ হয়ে গেলেও মাঠে মশক নিধন কার্যক্রম অদৃশ্য। খোদ দুই ডিসিসির বিভিন্ন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, একের পর এক টেন্ডারের মাধ্যমে মশার ওষুধ কেনা হচ্ছে, ডিসিসিতে সাপ্লাই করা হচ্ছে; কিন্তু বাইরে মশক নিধন কার্যক্রম নেই। তাহলে সাপ্লাই হওয়া এত ওষুধ কোথায় যায়। এ খাতে দুর্নীতি হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য ডিএসসিসিতে চলতি বছর বাজেট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একইসঙ্গে গত বছরের বাজেটের সম্পূর্ণ অর্থই ব্যয় দেখানো হয়েছে মশক নিধন কার্যক্রম এবং মশার ওষুধ কেনার ব্যয় হিসেবে। ডিএনসিসিতে চলতি বছর বাজেট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। কিন্তু এরই মধ্যে অদৃশ্য কার্যক্রমের মাধ্যমে উত্তরের বাজেটের প্রায় সম্পূর্ণটাই ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা, স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ডিসিসি বিভক্তির পর এখনও পর্যন্ত কোনো ধরনের মশক নিধন কর্মসূচি পালন করেনি উত্তর ডিসিসি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দক্ষিণ ডিসিসিতে গত বৃহস্পতিবার ক্রাশ প্রোগ্রামের নামে শুধু আইওয়াশ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে; তাতে কিন্তু মশা কমেনি।
ওষুধ কেনা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ : সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে রাজধানীতে মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে মশক নিধনে জরুরি ভিত্তিতে কর্মসূচি নেয়ার নির্দেশ এলেও এখনও পর্যন্ত নানা অজুহাতে দুই সিটি করপোরেশনই মশক নিধন কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারেনি। সূত্র জানায়, মশক নিধন কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতির সময় দেখা যায় নতুন মশার ওষুধ কেনার কার্যক্রম এখনও শেষ হয়নি। প্রায় ১ লাখ হাজার লিটার এডাল্ডিসাইড কেনার জন্য কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত সরবরাহ করেছে মাত্র ১৯ হাজার লিটার। এছাড়া ৪ হাজার লিটার লার্ভিসাইড কেনার জন্য টেন্ডার হলেও ওষুধ এখনও ভাণ্ডারে আসেনি। চলতি অর্থবছরে দুই সিটি করপোরেশনে মশার ওষুধ কেনার জন্য প্রায় ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সময়মত ওষুধ না কেনা ডিসিসির স্বাস্থ্য এবং ভাণ্ডার বিভাগের কৌশল। বছরের শুরুতে মূল চাহিদার চেয়ে অনেক কম ওষুধ কিনে ঘটা করে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করা হয়, পরে বাকি ওষুধ কেনা হয়। অবশিষ্ট ওষুধ কেনা নিয়েই অনিয়ম হয় বলে তিনি জানান। এছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক’জন কর্মকর্তা জানান, এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিবছর প্রত্যেকটি টেন্ডার একই কোম্পানিকে দেয়া হয়েছে কমিশনের ব্যাপারে। ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ভেজাল ওষুধ নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে মন্ত্রণালয় থেকেও তদন্ত হয়েছে বলে জানান তারা। এরপরও একই কোম্পানিকে টেন্ডার দেয়ায় দুর্নীতির সুযোগটা বেশি। এমনকি গত তিন বছরে ওই কোম্পানির কাছ থেকে মশার ওষুধ সরবরাহ এবং টেন্ডারের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হলে বড় ধরনের দুর্নীতি বেরিয়ে আসবে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
দুই ডিসিসির বক্তব্য : এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মশক নিধন কার্যক্রমে স্বাস্থ্য ও ভাণ্ডার বিভাগের সঙ্গে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের সমন্বয়হীনতা চলছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা দুর্নীতির জন্য দায়ী করেন ভাণ্ডার বিভাগকে। এমনকি ওষুধ কেনা, ওষুধ ছিটানোসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে পরিচ্ছন্নতা বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ থেকে ফাইল গেলে সেই ফাইল ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগে দু’দিন গিয়ে জানা গেছে, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ হারুন জরুরি মিটিংয়ে বাইরে আছেন। পরে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. নুরন্নবী চৌধুরী জানান, মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে, তার অনেকগুলোই অচল। ফলে সমস্যা হয়ে যাচ্ছে মশক নিধন কার্যক্রমে।