Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ৯ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বিএমএ নির্বাচন : স্বাচিপকে জয়ী করতে মরিয়া প্রশাসন

হাসান শান্তনু
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থক চিকিত্সকদের সংগঠন ‘স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদ’কে (স্বাচিপ) বিএমএ নির্বাচনে জয়ী করতে প্রশাসন মরিয়া হয়ে উঠেছে। স্বাচিপের সভা, সমাবেশে অংশ না নেয়া ও নির্বাচনের খরচ উপলক্ষে চাঁদা না দেয়ায় চিকিত্সকদের বদলির সুপারিশ করে তালিকা পাঠানো হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। সারাদেশ থেকে মন্ত্রণালয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ২০
হাজার চিকিত্সকের তালিকা পাঠিয়েছেন স্বাচিপ নেতারা। তালিকা অনুযায়ী ভিন্ন মতের চিকিত্সকদের বদলি চলছে। স্বাচিপকে ভোট দিতে নানাভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। স্বাচিপ প্যানেল কোনো জেলায় হারলে ওই জেলার সিভিল সার্জনকে চাকরিচ্যুত ও শাস্তিমূলক বদলির হুমকি দিচ্ছেন স্বাচিপের শীর্ষ নেতারা। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও সিভিল সার্জনরা প্রকাশ্যে স্বাচিপের পক্ষে নানা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। তারা সারাদেশের হাসপাতালে ‘ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র (ড্যাব) নেতাদের নির্বাচনী প্রচারণা ও প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। স্বাচিপের পক্ষে কাজ করতে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা মাঠে নেমেছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের নির্বাচনী প্রচারণা ঠেকাতে হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে তাদের জেলে পাঠানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত অর্ধশতের বেশি ছাত্র নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’র (বিএমএ) জেলা পর্যায়ের নির্বাচনে জেলা সিভিল সার্জনরা সাধারণত ‘প্রিজাইডিং অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেজন্য দলীয় সিভিল সার্জনদের নির্বাচনে এভাবে ব্যবহার করে স্বাচিপকে জয়ী করার তত্পরতা চলছে। নির্বাচনে সরকারপন্থী সংগঠনের চিকিত্সকদের পক্ষে অতীতে প্রশাসনের এমন দলীয়করণ হয়নি। এ অবস্থায় সারাদেশে বিএমএ’র ৬৭টি শাখায় ২৯ নভেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সূত্র জানায়, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলীয়করণের কারণে বিএমএ’র নির্বাচনে স্বাচিপের শোচনীয় পরাজয়ের কথা মাস দুয়েক আগে সরকারের শীর্ষ পর্যায়কে জানায় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এরপর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরকে স্বাচিপকে নির্বাচনে যে কোনো মূল্যে জয়ী করানোর নির্দেশ দেয়া হয়। স্বাচিপ মহাসচিব ডা. ইকবাল আর্সলান ও সারাদেশের জেলা সিভিল সার্জন, সরকারি হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সকদের স্বাচিপের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেন। গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনের কারণে এবারের নির্বাচনে ডা. শারফুদ্দিন আহমেদকে মনোয়ন দেয়া হয়নি বলেও সূত্রটি উল্লেখ করে। স্বাচিপের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হওয়ায় এবং স্বাস্থ্যখাতে বিরাজমান সমস্যার সমাধান ও চিকিত্সকদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে সাধারণ চিকিত্সকসহ ভিন্নমতের চিকিত্সকের বিভিন্ন সংগঠন এবার ড্যাবকে সমর্থন জানাচ্ছে।
ড্যাব মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন এসব প্রসঙ্গে আমার দেশ-কে বলেন, ‘প্রকাশ্যে সিভিল সার্জনরা দলীয়ভাবে বিএমএ নির্বাচনে এভাবে ব্যবহৃত আগে কখনও হননি। দিন যত যাচ্ছে, ক্ষমতাসীনদের ততই অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। তারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী প্রচারণায় আমাদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আমরা বিষয়গুলো জানিয়েছি। তবে দেশের গণমাধ্যম সজাগ থাকলে কোনোভাবেই বিএমএ নির্বাচনে কারচুপি সম্ভব হবে না।’ তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে জানান, ‘এর মধ্যে আমরা সারাদেশে নির্বাচনী প্রচারণা ও প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠান করেছি।’
জানা যায়, বিভিন্ন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও জেলা সিভিল সার্জনরা স্বাচিপের ছক অনুযায়ী ড্যাব নেতাদের নানাভাবে হেনস্থা করছেন। তারা সবাই মহাজোট সরকারের দলীয় লোক। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য চেমন আরা তৈয়বের স্বামী ডা. মোহাম্মদ আবু তৈয়ব। আরও বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জন নানাভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। রাজশাহীর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আশরাফুজ্জামান, ঢাকা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্য সমন্বয় সহকারী কর্মকর্তা ডা. ফোরকান দলীয় বিবেচনায় তাদের পদে আসীন হন। তারা প্রকাশ্যে স্বাচিপের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। মানিকগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. সিদ্ধেশ্বর মজুমদার, ভোলার সিভিল সার্জন ডা. আবদুল বারী, সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন, গোপালগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. মঈন উদ্দিন, নেত্রকোনার সিভিল ডা. শহীদ বিভিন্নভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারাও ভিন্নমতের চিকিত্সকদের বদলির হুমকি দিচ্ছেন। সম্প্রতি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের চিকিত্সক ড্যাব নেতা ডা. একরামুল এহসান টিপুকে বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয়ে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। স্বাচিপের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় চট্টগ্রামের সাড়ে সাতশ’ চিকিত্সককে বদলির সুপারিশ করে তালিকা পাঠানো হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হকের কাছে। ওই তালিকার শীর্ষ তিন চিকিত্সক নেতাকে এর মধ্যে সিলেট ও দিনাজপুরে বদলি করা হয়। তারা হলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. সুরঞ্জিত ঘোষ, ডা. অজয় দাশ ও ডা. ধীমান বড়ুয়া। মঙ্গলবার তারা স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত বদলির আদেশ পান। ওই তিন চিকিত্সক স্বাচিপের আজীবন সদস্য হলেও এবার তারা স্বাচিপ মনোনীত প্যানেলের বিপক্ষে থাকায় বদলি হন। এ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. রুহুল হককে গতকাল কয়েকবার ফোন করলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন জেলার কোনো হাসপাতালে ড্যাবকে নির্বাচনী প্রচার করতে দেয়নি। ১১ নভেম্বর ড্যাব মহাসচিব ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন (নির্বাচনে মহাসচিব প্রার্থী) ও ড্যাব সভাপতি ডা. অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হকসহ (সভাপতি প্রার্থী) সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা সেখানে গেলে তাদের হাসপাতালে ঢুকতে দেননি। তাদের মতো বিশিষ্ট চিকিত্সক নেতাদেরও অপমান করেন সিভিল সার্জন। তবে ২০ নভেম্বর হাসপাতালে স্বাচিপের প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠানে জেলা সিভিল সার্জন ছিলেন সভাপতি। তিনি স্বাচিপের প্যানেলের জন্য সরাসরি ভোট চান। রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকও ওই অনুষ্ঠানে স্বাপিচের পক্ষে ভোট চান। মানিকগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন সেখানকার সব সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিত্সকদের কাছে স্বাচিপের পক্ষে ভোট চেয়ে এসএমএস দিয়েছেন। স্বাচিপকে ভোট না দিলে শাস্তিমূলক বদলি করার হুমকিও তিনি চিকিত্সকদের দিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে নির্বাচনী প্রচার করতে পারছেন না ড্যাব, এনডিএফ প্রার্থীরা। মেডিকেল চত্বর থেকে ড্যাব এনডিএফ প্রার্থীর সব ধরনের ব্যানার-ফেস্টুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। স্বাচিপের পক্ষে ছাত্রলীগকে নির্বাচনী মাঠে নামানো হলেও অন্য কোনো প্রার্থীর পক্ষে কোনো ছাত্রসংগঠন যেন নামতে না পারে সেজন্য ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ একাধিক ছাত্রসংগঠনের প্রায় ৪০ নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। সরকারি শীর্ষ মহলের নির্দেশে বিএমএ নির্বাচনের আগে তাদের জামিন আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ১৮ নভেম্বর দুপুরে তারা গ্রেফতার হন। গতকাল ফরিদপুর জেলা সদর হাসপাতালে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ড্যাবের ব্যানার, ফেস্টুন পুড়িয়ে ফেলে।
নরসিংদী জেলা সিভিল সার্জন ডা. রশীদ আহমেদ ড্যাব নেতাদের জেলা সদর ও উপজেলার কোনো হাসপাতালে ঢুকতে দেননি। ২০ নভেম্বর ড্যবের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা সেখানে যান। পরে তারা জেলার মাতৃমঙ্গল নামে ছোট একটি ক্লিনিকে প্যানেল পরিচিতি সভা করেন। এর আগে ৮ অক্টোবর নরসিংদী জেলা ড্যাব’র দু’চিকিত্সক বিএমএ’র কেন্দ্রীয় কাউন্সিল পদে সদস্য হিসেবে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র পূরণ করে ঢাকায় পাঠাচ্ছিলেন। ডা. রশীদ তাদের বদলি করার ভয় দেখিয়ে মনোনয়নপত্র জমা না দেয়ার কথা বলেন। ফলে তারা ফরম জমা দিতে পারেননি। ওই দু’চিকিত্সক নরসিংদী সদর হাসপাতালে কর্মরত। ডা. রশীদ স্বাচিপ নেতা ডা. শারফুদ্দিন আহমেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আওয়ামী সমর্থক। তার সঙ্গে গতকাল ফোনে যোগাযোগ করলে বলেন, ‘সিভিল সার্জন হিসেবে আমি নতুন। স্বাচিপ আমাকে দায়িত্ব সম্পর্কে যেভাবে বোঝাচ্ছে, সেভাবেই কাজ করছি।’
ময়মনসিংহে ২১ নভেম্বর ড্যাব নেতারা গেলে ঢুকতে দেননি সিভিল সার্জন। ছাত্রলীগ ও পুলিশ বাধা দেয় ড্যাব নেতাদের। সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ড্যাবের অনুষ্ঠান করতে দেননি জেলা সিভিল সার্জন। বিএমএ নেতাদের তিনি মেডিকেলে ঢুকতেও দেননি। জামালপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. নারায়ণচন্দ্র দে ভিন্নমতের চিকিত্সকদের হুমকি দিচ্ছেন। ২১ নভেম্বর ড্যাব নেতারা সেখানে গেলে তিনি প্রচার ও প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠান করতে দেননি।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে ভোটার আছেন ৩২ হাজার ৮৯২ জন। ভুয়া প্রার্থীর তালিকা টানানো, নির্বাচন কমিশনে দলীয়করণ ও নির্বাচনের পরিবেশ না থাকার অভিযোগে বিএমএ’র ২০০৯ সালের নির্বাচন ড্যাব, এনডিএফ ও চিকিত্সক সংসদ বর্জন করে।