Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ৯ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

পঞ্চগড়ের খুদিপাড়া সীমান্তে বিএসএফের ভূমি আগ্রাসন

অলিউল্লাহ নোমান পঞ্চগড় থেকে
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সরকার পর্যায়ে স্বাধীনতা-উত্তর সম্পর্কের সর্বোত্তম পর্যায়ে পঞ্চগড় সীমান্তের মানুষ বিএসএফের ভূমি দখল আতঙ্কে বসবাস করছেন। উত্তরের পঞ্চগড় সীমান্তে দেখা গেছে সীমান্ত গ্রামগুলোর মানুষ ভারতীয় বিএসএফ আতঙ্কে রয়েছেন। বাংলাদেশের ভূমি দখলে নিতে ভারতীয়রা নতুন করে শুরু করেছে আগ্রাসী তত্পরতা। পঞ্চগরের হাড়িভাসা ইউনিয়নের খুদিপাড়া সীমান্তে নতুন করে বাংলাদেশী ভূমি দখলে নিতে বিএসএফ মরিয়া। এ সীমান্তে ১৫ নভেম্বর সরেজমিন অনুসন্ধানে সঙ্গে ছিলেন আমাদের পঞ্চগড় প্রতিনিধি হোসেন রায়হান। পঞ্চগর জেলা সদর থেকে হাড়িভাসা সীমান্তের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। সদর উপজেলার এই হাড়িভাসা ইউনিয়নের খুদিগ্রামে ৩০ একর বাংলাদেশী ভূমি ভারতীয়রা দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আশপাশের গ্রামের মানুষ দিন-রাত কাটাচ্ছেন আতঙ্কের মধ্যে। শুধু ভূমি দখল নয় বিএসএফ রাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে বলেও অভিযোগ করেন খুদিপাড়া গ্রামের মানুষ। স্বাধীনতার পর সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে পঞ্চগড়ের এই সীমান্তেই ভারতকে দিয়ে দেয়া হয় বেড়ুবাড়ি। এই বেড়ুবাড়ি সংলগ্ন আরও ৩০ একর জমি এখন জোর করেই দখলে নিতে চাচ্ছে ভারত। এ নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও চাপা
উত্তেজনা দেখা গেছে। খুদিপাড়া গ্রামসহ ৩০ একর ফসলি জমি দখলে নিতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ১৩ নভেম্বর রাতে লাল পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করে দেয়। পাকা ধানের ক্ষেতে ভারতীয় লাল পতাকা দেখে জমির মালিকরা দিশেহারা। অনেক কষ্টে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে ফসল আবাদ করেছেন তারা। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন জমির আইলে ভারতীয় দখলের চিহ্ন হিসেবে লাল পতাকা উড়ছে। যদিও পরের দিন পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আপাতত লাল পতাকা সরিয় নেয় বিএসএফ। তবে ১৫ নভেম্বর বিকালে খুদিপাড়ায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে বিএসএফ তখনও অবস্থান করছে। বিকাল সোয়া ৫টায় সেখানে গিয়ে পৌঁছানোর পর পথেই সতর্ক করে দেন এক বৃদ্ধা। খুদিপাড়া গ্রাম কোনটি জিজ্ঞাসা করতেই ওই বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে দেখান এটাই খুদিপাড়া গ্রাম। তবে মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার সময় যেন ডান দিকে গ্রামটির পথে মোড় না নিই কঠোরভাবে সতর্ক করেন তিনি। বলেন, এখানে বিএসএফ রয়েছে। বাঁশঝাড়ের তলায় বিএসএফ অবস্থান করছে। কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে বিএসএফ বাংলাদেশের খুদিপাড়া গ্রামের ভেতর পাহারা বসিয়েছে। বেড়ুবাড়ি অভিমুখী সোজা রাস্তার একটু সামনে এগোলেই গ্রামের কয়েকজন লোককে পাওয়া গেল। রাস্তার পাশে বসে তারা বিএসএফের পাহারা পর্যবেক্ষণ করছিল। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় খুদিপাড়া গ্রাম ও জমির মধ্যে বিএসএফের পুঁতে রাখা লাল পতাকা সম্পর্কে। সঙ্গে সঙ্গে একজন খুদিপাড়া গ্রামে বাঁশঝাড়ের দিকে হাত দেখিয়ে বলেন, দেখেন, দেখেন ওই যে বিএসএফ দেখা যাচ্ছে। লাল পতাকা নিয়ে গেলেও বিএসএফ যায়নি। তারা পাকা ধান কাটতে পারবে কি না এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। পাকা ধানের সোনালি ফসলের মাঠ দেখিয়ে বলেন, এগুলো আমাদের জমি, এখন এই জমির ফসল কিভাবে ঘরে আনব সেটাই চিন্তা। স্থানীয়রা জানান লাল পতাকা বসানোর পর জমির দিকে অগ্রসর হলেই বিএসএফ রাইফেল তাক করে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে খুদিপাড়া গ্রামে কয়েকটি ভারতীয় পারিবার বসবাস করছে। ভারতীয় নাগরিক হলেও তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডেই থাকছে। ব্যবহার করছে বাংলাদেশের হাটবাজার থেকে শুরু করে সব সুযোগ-সুবিধা। তবে তাদের নাগরিকত্বের সনদ হচ্ছে ভারতীয়। ভারতীয় নাগরিক খুদিপাড়া গ্রামে রয়েছে এই অজুহাতে বিএসএফ এখানে আসা-যাওয়া করে। এখন তারা গ্রামসহ ৩০ একর জমি দখলে নিতে চায়। খুদিপাড়া সীমান্ত থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে খাগড়া বিওপি বা বিজিবি ক্যাম্প। এই ক্যাম্পের জওয়ানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বিএসএফও স্বীকার করে খুদিপাড়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের মধ্যে রয়েছে। একজন বিজিবি সদস্য বলেন, তারাও (বিএসএফ) স্বীকার করে খুদিপাড়া হচ্ছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বেও মধ্যে। তবে যেহেতু ভারতের নাগরিক এখানে বসবাস করছেন ওই অজুহাতে বিএসএফ যাতায়াত করে। এ ক্যাম্পের হাবিলদার জানান, পতাকা বৈঠকেও বিএসএফ স্বীকার করেছে ভূমিটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বেই মধ্যেই রয়েছে। তাদের দেশের নাগরিক বসবাসের কারণে বিএসএফ এখানে যাতায়াত করে। তারা লাল পতাকা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। পতাকা বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে ভারতের নাগরিক খুদিপাড়ায় বসবাসের কারণে বিএসএফ যাতায়াত করবে-বিজিবিও এখানে ডিউটি দেবে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের খুদিপাড়া ৭৫৪নং সীমান্ত পিলারের কাছে বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থিত। এ সীমান্ত পিলারের কাছে ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত সিপাইপাড়া বিএসএফ ক্যাম্প। এ ক্যাম্পের সদস্যরাই গত ১৩ নভেম্বর রাতে বাংলাদেশী ভূখণ্ডে লাল পতাকা দিয়ে নিজেদের দখলে নেয়। এতে স্থানীয় গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা বিষয়টি বিজিবিকে অবহিত করে। বিজিবি লিখিত প্রতিবাদ জানিয়ে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানায় বিএসএফকে।
পতাকা বৈঠক আহ্বানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বিজিবির এক সদস্য জানান, এটি খুবই বিরক্তিকর বিষয়। পত্র বহন করে সীমান্ত পিলারের কাছে গিয়ে জিরো পয়েন্টে একটি পতাকা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। বিএসএফের টহল সদস্যরা এই অবস্থান দেখে তাদের ক্যাম্পে সংবাদ পৌঁছানোর পর সেখান থেকে পত্র গ্রহণের জন্য লোক পাঠায়। এতে মাঝে মধ্যে দুই-তিন ঘণ্টা পর্যন্ত জিরো পয়েন্টে এভাবে বসেই থাকতে হয় পত্র নিয়ে।
পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের ভিতরগড় ক্যাম্পের কমান্ডার আ. রহিম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, আমরা এরই মধ্যে ভারতীয় সিপাইপাড়া ক্যাম্পের বিএসএফকে প্রতিবাদ পতাকা বৈঠকে আহ্বান জানালে তারা রাজি হয়। খুদিপাড়া সীমান্তে ৭৫৩ এস পিলারের কাছে ১৪ নভেম্বর বিএসএফ-বিজিবির মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় বিজিবি ও বিএসএফ আগের মতোই নিজেদের মতো করে এখানে ডিউটি করবে। স্থানীয়রা জানান, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে খুদিপাড়ার এ ৩০ একর জমি বাংলাদেশের দখলে রয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকদের মালিকানাধীন এ জমি চাষাবাদ করে আসছেন স্থানীয় কৃষকরা।
পঞ্চগড় ১৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ওই সীমান্তে ভারতীয়রা হঠাত্ করে লাল পতাকা ওড়ালে তাত্ক্ষণিক বিজিবির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হয়। পতাকা বৈঠকের পর ভারতীয়রা লাল পতাকা সরিয়ে নেয়। তিনি দাবি করেন বাংলাদেশের গ্রাম দখল করার বিষয়টি ভিত্তিহীন। তিনি আরও জানান, হাড়িভাসা সীমান্তের খুদিপাড়া গ্রাম বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই রয়েছে। স্থানীয়দের সব নিরাপত্তার বিষয়ে বিজিবি সতর্ক রয়েছে।
উল্লেখ্য, খুদিপাড়া সীমান্তের পাশেই বেড়ুবাড়ি অঞ্চলটি ১৯৭৩ সালে ভারতকে দিয়ে দেয় শেখ মুজিবুর রহমান সরকার। এর জন্য সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আনা হয়। বেড়ুবাড়ির বিনিময়ে লালমনিরহাট জেলার পাতগ্রামে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যাতায়াতের সুবিধার জন্য বাংলাদেশকে ৩ বিঘা জমি দেয়ার চুক্তি হয়েছিল। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নামে স্বীকৃত এ চুক্তি বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করলেও ভারত এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। দীর্ঘ ৪০ বছর অবরুদ্ধ থাকার পর গত দুই বছর থেকে দহগ্রাম আঙ্গরপোতা ছিটমহলের মানুষ বিনাবাধায় ২৪ ঘণ্টা নিজের দেশে যাতায়াতের সুবিধা ভোগ করছে। এখন বেড়ুবাড়ির পাশের মূল্যবান জমির ওপর নতুন করে লোলুপদৃষ্টি পড়েছে ভারতের।