রাজনীতিকে ফরমালিনমুক্ত করার ডাক

স্টাফ রিপোর্টার « আগের সংবাদ
পরের সংবাদ» ২৩ নভেম্বর ২০১২, ১২:০৪ অপরাহ্ন

দেশের রাজনীতিতে ফরমালিন ঢুকে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবিএম মূসাসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। একই সঙ্গে তারা রাজনীতিকে ফরমালিনমুক্ত করার ডাক দিয়েছেন এবং এ আন্দোলনে সবাইকে শরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। গণতন্ত্র থাকলে হলমার্ক, শেয়ারবাজার, ডেসটিনিসহ সব কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্তদের নাম সরকার গোপন করতে পারত না। এছাড়া সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য দেশ পরিচালনা করলে জনগণকে দেশের মালিক ভাবত। শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নাম জনগণের সামনে প্রকাশ করার দাবি জনিয়ে তারা বলেন, জনগণের সরকার হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। তাই নাম প্রকাশ না করার মধ্য দিয়ে আপনারা বুঝে নিতে পারেন এসবের সঙ্গে কারা জড়িত। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাউথ এশিয়ান লইয়ার্স ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পেশাজীবীদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সায়ীদ, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না, দৈনিক সমকালের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আবু সাঈদ খান, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. পিয়াস করিম, বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন ফোরামের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে ফোরামের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কমিশনকে শক্তিশালী করতে আটটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে নির্বাচনী এলাকার এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেয়ার যে বিধান আছে নির্বাচনী আইনে যা বাতিল করা। কোনো রাজনৈতিক দলে কমপক্ষে তিন বছরের সদস্য থাকার বাধ্যবাধকতার ধারা ১২ (ঞ) বাতিল করা এবং অবাধ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, অর্থ, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকা। ফোরামের প্রস্তাবে আরও বলা হয়, সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনা করে সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হবে তা নিরূপণ করা সম্ভব। নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে রাষ্ট্রপতিকে উদ্যোগ নেয়ার উদাত্ত আহ্বানও জানানো হয়। অনুষ্ঠানে ড. কামাল হোসেন বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কোনো দলের বা ব্যক্তির নয়, এটি ১৬ কোটি মানুষের। আজ এ দেশের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করবে জনগণ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, জনগণের প্রতিনিধিত্ব বাছাই করার প্রক্রিয়া নির্বাচন কীভাবে হবে তা নিয়ে আজ বির্তক শুরু হয়েছে। এ বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক পন্থায় নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য এ বছরের আন্দোলন হবে রাজনীতি থেকে ফরমালিনমুক্ত করার আন্দোলন।
তিনি বলেন, মন্ত্রীরা বলে থাকেন বিভিন্ন কারণে তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। তাহলে তারা মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন না কেন? রেল কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত মন্ত্রীকে সরিয়ে আবার দফতরবিহীন মন্ত্রী করা হলো। এভাবে দেশ চলতে পারে না। স্বাধীন দেশে ১৬ কোটি মানুষ হচ্ছে রাষ্ট্রের মালিক। আমাদের প্রজা ভেবে আচরণ করবেন না। দেশের একজন মালিক হিসেবে যে আচরণ জনগণ পায়, সেই আচরণ করুন। যারা জনগণকে মালিক না ভেবে প্রজা ভাবছে, তাদের আগামী নির্বাচনে রুখতে হবে।
আগামী নির্বাচন সম্পর্কে ড. কামাল হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন এককভাবে কাজ করতে পারে না। কারণ প্রশাসনের ওপর হাত থাকে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের। তারা নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রভাব খাটায়। আর সঙ্গে জড়িত হয় দলীয় পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থার লোকজনের ভূমিকা। তিনি বলেন, এ জন্য নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও পারে না। তাই এবার নির্বাচন কমিশনকে ফরমালিনমুক্ত করতে হবে। শুধু তাই নয়, সাংবাদিক-আইনজীবীদের মধ্যেও ফরমালিন ঢুকে পড়েছে। এসব থেকেও আমাদের মুক্ত হতে হবে।
প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা বলেন, দেশে খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনে ভরে গেছে। আজ দেশের রাজনীতিতেও ফরমালিন ঢুকে পড়েছে। আমরা ফরমালিনমুক্ত রাজনীতি চাই—সেটা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি হোক। ড. কামাল হোসেন এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো কিছু লোক দেশে রয়েছেন, তারা ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা পালন করে ফরমালিনমুক্ত রাজনীতি সৃষ্টি করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা নিজেরা ফরমালিনযুক্ত হয়েছি, কিন্তু তারপরও শঙ্কিত, যেখানে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্ররাও নকল করে। তাই ফরমালিনমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে।
সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সায়ীদ বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে কখনোই অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে না। সবার এই দাবির সঙ্গে আমিও একমত। এখন সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধের চেতনার মূল ধারার কোনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে নেই। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধের মূল ধারার রাজনীতিকদের ঐক্যবদ্ধ করে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপি চেয়ারপারস খালেদা জিয়া বরিশালে গিয়ে বলেছেন, তাকে আরেকবার ক্ষমতায় বসালে দেশ পাল্টিয়ে দেবেন। জনসভায় অনেক লোক দেখে তার মাথা হয়তো ঠিক ছিল না। যে নেত্রী দুর্নীতিবাজ ছেলের সম্পর্কে বলেন ‘তার ছেলের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র’, সেই নেত্রীর আরেক ছেলের দুর্নীতির টাকা বরিশাল থেকে আসার একদিন পরই দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সেই নেত্রী দেশটাকে কী পাল্টিয়ে দেবেন? তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আগামী নির্বাচনে সত্ ও যোগ্য প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন দিতে পারবে? না কি টাকার বিনিময়ে কেউকে মনোনয়ন দেবে? তারা তো তাদের নিজ নিজ দলের ভালো নেতাদের দলের বাইরে রেখেছে। আওয়ামী লীগ বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে। এ জন্য তারা দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা অব্যাহত রাখে না। সত্যবাদী এবং যোগ্য ব্যক্তিদের দল থেকে বাইরে রেখে দেয়। এ জন্য এবার আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেব।

আমার ঢাকা এর আরও সংবাদ

সাপ্তাহিকী


উপরে

X