Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ৯ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

রিভিউ : স্বামীভাগ্য

মাহফুজুর রহমান
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
পরিচালক : এফআই মানিক
অভিনয়ে : ডিপজল, রেসি, আমিন খান, রুমানা, দীঘি, মিজু আহমেদ, শিবা শানু, আলীরাজ প্রমুখ
চলচ্চিত্রের পরিভাষায় একে বলে ‘রিমেক’। পুরনো কোনো ছবির পুনঃনির্মাণ। সময়ের দাবিতে গল্পে কিছু পরিবর্তন হতে পারে। চরিত্রের এদিক-ওদিকও হতে পারে। তবে দুটি ছবির মূল সুর থাকবে একই। সারা দুনিয়ায় কম-বেশি এভাবেই ছবি রিমেক হচ্ছে। রিমেক বৈধ তো বটেই, ক্ষেত্রবিশেষে মূল ছবির পুনর্জন্ম হতে পারে রিমেকের মধ্য দিয়ে। হলিউডে হরহামেশা রিমেক হচ্ছে। এতদিন বলিউড পিছিয়ে থাকলেও ‘ডন’, ‘অগ্নিপথ’ রিমেকের পর আর সে কথা বলার জো নেই। বাকি থাকল ঢালিউড মানে ঢাকাই ছবির জগত। একটা সময় চুটিয়ে রিমেক করেছেন নির্মাতারা। এখন আগ্রহ হারিয়েছেন। রিমেক-টিমেকের আর ধার ধারছেন না। সরাসরি পুরনো ছবি থেকে গল্প টুকে নিচ্ছেন। তাতে একাধিক ছবির গল্পের মিশ্রণ থাকায় না হচ্ছে রিমেক, না হচ্ছে মৌলিক ছবি। ‘স্বামীভাগ্য’ এমনই একটি ছবি। বছর পঁচিশেক আগের গল্প। ‘স্বামীর আদেশ’সহ আশির দশকের বেশকিছু ছবির সঙ্গে ‘স্বামীভাগ্য’র প্লটের দারুণ মিল। কিন্তু কোথাও এই মিলগুলো অর্থবোধক নয়। ডিপজল ও আমিন খান দুই ভাই। বড় ভাই ডিপজল মাকে মৃত্যুর সময় কথা দিয়েছিলেন ছোটভাইকে জীবনে কোনোদিন দুঃখ দেবেন না। আমিন খানও বড় ভাইকে বাবার চেয়েও বেশি মানেন। নিম্নমধ্যবিত্ত এই সংসারে বড় বউ হয়ে আসেন রেসি। ডিপজল-রেসির ঘরে জন্ম হয় দীঘির। চাচ্চু বলতে সে অজ্ঞান। বিয়ের বয়স হয়ে এসেছে আমিন খানের। তিনি প্রেমে পড়েন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আলীরাজের একমাত্র মেয়ে রুমানার। খুব সহজেই আন্দাজ করতে পারছেন এরপর পরিচালক এফআই মানিক গল্পের সুতো কীভাবে ছাড়লে ‘স্বামীভাগ্য’-কে কোন পুরনো ছবির রিমেক বলা যেতে পারে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, দুই ভাইয়ের সংসারে রুমানা আমিনের স্ত্রী হয়ে ঢোকার পরই অগ্গুম্ন্যত্পাতের সূত্রপাত। আলীরাজ মেয়ের বিয়ে মেনে নিতে পারেন না। রেসির সঙ্গে আমিনকে জড়িয়ে রুমানার মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেন। তাতে ইন্ধন দেন পাড়াতো শয়তান মিজু আহমেদ। ভেঙে যায় ছবির মতো সাজানো সংসার। আলীরাজের গুটিচালে আমিনের পরিচয় হয় ঘরজামাই। একমাত্র শিশুকন্যাকে নিয়ে পথে নামেন ডিপজল-রেসি। রুমানাকে না পেয়ে শিবা শানু প্রস্তুত আলীরাজের অঢেল সম্পত্তি হাতাতে। তারপর সবার মহামিলনে আড়াই ঘণ্টার প্রতীক্ষার অবসান। যদি এই বলে মনকে প্রবোধ দিতে পারেন, আপনি পঁচিশ বছর আগের কোনো ছবি দেখতে ছবিঘরে এসেছেন, তবে গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, ‘স্বামীভাগ্য’ আপনার ভালো লাগবেই। যদি সব ছবিতে ডিপজলের অভিনয়কে আপনার একই রকম মনে না হয়ে থাকে, তাহলেও এ ছবিতে টিকিটের পয়সা উসুলের অজুহাত খুঁজে পাবেন আপনি। একই রকম সেট, একই রকম অতি নাটকীয় অভিনয়, একই রকম গান; এত্তো কিছু এক থাকলেও নতুন চিত্রনাট্যে পুরনো গল্পেরও প্রাণ ফিরে আসতে পারে। এফআই মানিকের ‘স্বামীভাগ্যে’ এসেছে। ছবির কোথাও বাড়তি মেদ নেই। কমেডি নেই, আইটেম গান নেই, ভিলেনদের দাবড়ানি নেই। একটা জংধরা গল্প আছে। সেই গল্পকে যথাসম্ভব যত্নের সঙ্গে দর্শকের সামনে পরিবেশনের চেষ্টা আছে। এই প্রচেষ্টাটুকু অবহেলা করার সাধ্য কারও নেই। অতি চেনা, মুখস্থ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডিপজল, আমিন খান, আলীরাজরা। কিন্তু তাদের অভিনয়ে অসততা ছিল না। ডিপজলের সব ছবিতে, সব চরিত্রে একই রকম আঞ্চলিক ভাষা একঘেয়ে লাগতেই পারে। কিন্তু পর্দায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী যদি হোন আলীরাজ, তবে সংলাপে সংলাপে সংঘর্ষ উপভোগে আর বাধছে কোথায়! এ মুহূর্তে ঢাকাই ছবির শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা যোশেফ শতাব্দী, সেটা তিনি প্রমাণ করলেন ‘স্বামীভাগ্যে’। বহুবার, বহুভাবে শোনা সংলাপগুলোই তিনি নতুন মোড়কে, নতুন স্বাদে পেশ করেছেন। পুরো ছবি দাঁড়িয়ে আছে সংলাপের ওপর। ঠিক বিরতির আগে ডিপজল-আলীরাজের ড্রামা সিকোয়েন্সটির প্রশংসা না করলেই নয়। আলীরাজ বরাবরই আপ টু দ্য মার্ক অভিনয় করেন। তার সঙ্গে ডিপজল যেভাবে তাল মিলিয়েছেন তাতে অবাক না হয়ে পারা যায়নি। ছবিতে আলীরাজ ও ডিপজল ছাড়া রুমানা ভালো পারফর্ম করেছেন। বয়স অনুপাতে স্থূলকায় হতে চলা রুমানার সঙ্গে আমিন খানের জুটি মানিয়ে গেছে। ক্যািরয়ারের ২০ বছর পার করার পর আমিন খানের ফিটনেস তার জুনিয়র নায়কদের লজ্জা দেবে। রেসির অভিনয় আগের মতোই, উন্নতি-অবনতি কোনোটাই নজর কাড়ে না। ছবির কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনার প্রায় কিছুই নেই। আগেই বলেছি, এ ছবির খুঁটি পারিবারিক সেন্টিমেন্ট। একটা সময় ড্রামা সিকোয়েন্সের উপরেই নির্ভর করত ঢাকাই ছবির সুপারহিট হওয়া, না হওয়া। সংলাপের তুবড়ি ছুটত পর্দায়। সেদিন ফুরিয়েছে অনেক আগেই। তামিল-তেলুগু-হিন্দি ছবির ফর্মুলায় ডুবে অক্সিজেন খুঁজছেন নির্মাতারা। ডিপজলের মতো প্রযোজক, যাদের টার্গেট হলবিমুখ ফর্মুলা ছবির দর্শক, তাদের ছবিতেই সোনালি দিনের ছবির প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় এখনও। কিন্তু সময়ের চাহিদাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা রাখেন না কোনো পরিচালক। বদলে যাওয়া সময়ের বদলে দর্শকের নাড়ির স্পন্দন ধরতে না পারলে ফ্লপের কলঙ্ক থেকে কে বাঁচাবে পরিচালকের সৃষ্টিকে? ভাবতে পারেন, ২০১২ সালের একটি ছবিতে সেলফোনের ব্যবহার নেই। ‘স্বামীভাগ্য’ ছবির শেষ দৃশ্যে ভিলেন নায়ককে তার ডেরায় আমন্ত্রণ জানান সেলফোনে। এছাড়া আর কোথাও কোনো চরিত্রকে সেলফোনে কথা বলতে দেখা যায় না। গল্প যদি হয় পঁচিশ বছর আগে, সেখানে সেলফোনের প্রয়োজনও নেই। একান্নবর্তী পরিবারের সমাজ থেকে উজাড় হয়ে যাওয়া নিয়ে কত চমত্কার ছবিই না হতে পারে এখন! তা না করে ২০-৩০ বছর আগে যে কাহিনীর মৃত্যু ঘটেছে, তাকে কবর খুঁড়ে তুলে আনা কেন? অবশ্য এ ছবি দেখলে লোকসানের কিছু নেই। ফি সপ্তাহে মুক্তিপ্রাপ্ত নকল, মানহীন, গ্ল্যামারসর্বস্ব বিদঘুটে ছবিগুলো থেকে ‘স্বামীভাগ্য’ অনেক পরিচ্ছন্ন, অনেক আপন।