Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ৯ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

যশোরের ঐতিহ্য খেজুর গুড়ের মৌসুম শুরু

রহিদুল ইসলাম খান, চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
যশোরের ঐতিহ্য খেজুর গুড়ের মৌসুম শুরু হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকে অবিভক্ত ভারতে খেজুর গুড়ের জন্য যশোর জেলা বিখ্যাত ছিল। এজন্য একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস।’ দিন বদলের সঙ্গে যশোরের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শুধু পরিবর্তন হয়নি খেজুরের রস সংগ্রহ এবং গুড়-পাটালি তৈরি পদ্ধতি। শীত মৌসুমের আগমনে ‘গাছিরা’ খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সনাতন পদ্ধতিতে মাটির হাঁড়িতে রাতভর রস সংগ্রহ করা হয়। ভোরের সূর্য ওঠার আগে ‘গাছিরা’ রস ভর্তি মাটির হাঁড়ি গাছ থেকে নামিয়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করে। পরে ওই রস আবার মাটির হাঁড়িতে (জালই) কিংবা টিনের তামালে জ্বালিয়ে গুড়-পাটালি তৈরি করা হয়ে থাকে। যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে এর মধ্যে গাছিরা খেজুর গাছ তোলা চাচার কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে। অল্প পরিমাণ গুড়-পাটালি বর্তমানে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। গ্রামবাংলায় এখন চোখে পড়ছে খেজুর গাছ তোলা-চাচার দৃশ্য। গাছিরা এখন মহাব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কিছুদিন পরই গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতিক মধু বৃক্ষ থেকে সুমধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে শুরু হবে গুড়-পাটালি তৈরির উত্সব। গ্রামে গ্রামে খেজুরের রস জ্বালিয়ে পিঠা, পায়েস, মুড়ি-মুড়কি ও নানা রকমের মুখরোচক খাবার তৈরি করার ধুম পড়বে। সকালে এবং সন্ধ্যায় কাঁচা রস খেতে খুবই মজাদার। রসে ভেজা কাচি পোড়া পিঠার (চিতই পিঠা) স্বাদই আলাদা। নলেন, ঝোলা ও দানা গুড়ের সুমিষ্ট গন্ধেই যেন অর্ধভোজন। রসনা তৃপ্তিতে এর জুড়ি নেই। নলেন গুড় পাটালির মধ্যে নারিকেল কোরা, তিল ভাজা মিশালে আরও সুস্বাদু লাগে। যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড়-পাটালির ইতিহাস অনেক প্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকে চিনি তৈরি করা হতো। এই চিনি ‘ব্রাউন সুগার’ নামে পরিচিত ছিল। খেজুরের রস থেকে উন্নতমানের মদও তৈরি করা হতো। এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালান যেত। বিলেত থেকে সাহেবরা দলে দলে যশোর অঞ্চলে এসে চিনির কারখানা স্থাপন করে চিনির ব্যবসায় নামেন। চিনির কারখানাগুলো চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুর শহরের আশপাশে কেন্দ্রীভূত ছিল। যশোরের ইতিহাস থেকে জানা যায়, চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুরের আশপাশে প্রায় পাঁচশ’ চিনি কারখানা গড়ে উঠেছিল। তখন কলকাতা বন্দর দিয়ে খেজুর গুড় থেকে উত্পাদিত চিনি রফতানি করা হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের অন্য ব্যবসার সঙ্গে চিনি রফতানির ব্যবসায়ে নামে।
মূলত ১৮৯০ সালের দিকে আখ থেকে সাদা চিনি উত্পাদন শুরু হলে খেজুর গুড় থেকে তৈরি চিনির ব্যবসায়ে ধস নামে। একে একে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। খেজুরের গুড় থেকে চিনি তৈরি না হলেও এখন পর্যন্ত বাঙালির কাছে খেজুর গুড়-পাটালির কদর কমেনি। তবে বিজ্ঞানের এই যুগে এখনও রস থেকে গুড়-পাটালি তৈরিতে মান্ধাতার আমলের পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। গুড়-পাটালি তৈরিতে আধুনিকতা আনা গেলে এটিও রফতানি পণ্যের তালিকায় স্থান পেত।
জানা যায়, খেজুর গাছ ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় বেশ আগের থেকে এ অঞ্চলে গুড়, পাটালির উত্পাদন বহুলাংশে কমে গেছে। এখন আর আগের মতো মাঠভরা খেজুর বাগানও নেই, নেই মাঠে মাঠে রস জ্বালানো বান (চুলা)। যা আছে তা নিতান্তই কম। নলেন গুড়, পাটালি পাওয়া দুষ্কর। মৌসুমে যা তৈরি হয় তা রীতিমত কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়।
বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, গাছিরা গাছ পরিষ্কার বা তোলা চাচার উপকরণ গাছি দা, দড়ি তৈরিসহ হাঁড়ি ক্রয় ও রস জ্বালানো জায়গা ঠিক করাসহ বিভিন্ন কাজে রয়েছে ব্যস্ত। চাঁদপাড়া গ্রামের আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাস, বাদেখানপুর গ্রামের গিয়াস উদ্দীন, সিংহ ঝুলি গ্রামের সাবের আলী জানান, গাছ কাটা, রস জ্বালানো ও গুড়, পাটালি তৈরির উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার গত বছরের তুলনায় গুড়-পাটালির দাম দ্বিগুণ হবে।
তবে বনবিভাগ জানিয়েছে, যশোর অঞ্চলে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের বনবিভাগের উদ্যোগে গত কয়েক বছর আগে খেজুর গাছ রোপণের কাজ শুরু করেছে। ‘বৃহত্তর যশোর জেলার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে রোপিত হয়েছে কয়েক লাখ খেজুর গাছের চারা। দেশি জাতের সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে আরব দেশীয় খেজুরের চারাও রোপণ করা হয়েছে বলে বনবিভাগ জানিয়েছে।