Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ৯ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

এরশাদের হঠাত্ স্বপ্নভঙ্গ!

সৈয়দ আবদাল আহমদ
পরের সংবাদ»
‘আমরা একলা নির্বাচন করব, জনগণের রায় নিয়ে আবার ক্ষমতায় আসব। উই আর রেডি কাম টু পাওয়ার।’
গত ১০ নভেম্বর নূর হোসেন হত্যা দিবসে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ তার ক্ষমতায় আসার স্বপ্নের কথা এভাবেই জোর গলায় বলছিলেন। নূর হোসেনের হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত এরশাদ তার ক্ষমতায় থাকাকালীন ওই অপকর্মের জন্য সেদিন সামান্য অনুতপ্তও হননি। বরং আবার কীভাবে ক্ষমতার চেয়ারটি দখল করবেন সেই আস্ফাালনই করছিলেন।
তিনি এমনভাবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন যেন তিনি ও তার দল ক্ষমতায় আসার সবকিছু পাকাপাকি হয়ে গেছে, শুধু সেটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু হঠাত্ ঘটল এরশাদের স্বপ্নভঙ্গ। এই স্বপ্নভঙ্গের জন্য যত নষ্টের মূল ঘাটাইল উপনির্বাচন। এ নির্বাচনটি যেন সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। একক নির্বাচন করার ঢোল বেশ কিছুদিন ধরেই বাজাচ্ছিলেন এরশাদ। বিএনপির অনুপস্থিতিতে সেই একক নির্বাচনের মহড়া দিতে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপনির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছিল এরশাদের জাতীয় পার্টি। আশা ছিল জাপা প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে। কিন্তু সেই আশা গুড়ে বালি। বিজয় তো দূরে থাক, কোনোমতে জামানত রক্ষা পেয়েছে জাপা প্রার্থীর। ওই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ৯৭ হাজার ভোট পেয়ে। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্নই ওঠে না, মাত্র ১১ হাজার ভোট পেয়ে জাপা প্রার্থীকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনার জন্য জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলুকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তিনি দিনরাত সেখানে উপস্থিত থেকে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন। আর তার ফল হিসেবে জুটেছে মাত্র ১১ হাজার ভোট! জিয়াউদ্দিন বাবলু সেদিনই মুখ নিচু করে ঢাকায় চলে আসেন। মনের দুঃখে এরশাদও ওই নির্বাচন নিয়ে মিডিয়ায় টু-শব্দটি পর্যন্ত করেননি। নির্বাচনের দু’দিন পর এরশাদ নীরবে-নিভৃতে চলে গেছেন আজারবাইজান। হঠাত্ তিনি আজারবাইজান কেন গেলেন? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে মুসলিম দেশগুলোর রাজনৈতিক দলগুলোর একটি কনভেনশন হচ্ছে। সেই কনভেনশনে এরশাদ দাওয়াত পেয়েছেন। তিনি মুসলিম দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় পার্টির নাকি একটি সংযোগ ঘটাতে চান। তবে জাতীয় পার্টির অনেক নেতার মুখেই গুঞ্জন, ঘাটাইল নির্বাচনের ধাক্কা সামলাতেই তিনি আজারবাইজানে অবকাশ কাটাতে গেছেন। তাছাড়া রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখেও জাপায় গৃহদাহ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে জাপার প্রার্থী মশিউর রহমান রাঙ্গার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে রংপুরের অন্য নেতাকর্মীরা।
গত ১১ নভেম্বর ‘তৃণমূল জাতীয় পার্টি’ নামে নতুন দলও গঠন হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফার নেতৃত্বে তৃণমূল জাপা সংগঠিত হচ্ছে। এর ফলে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এরশাদের স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ রংপুরে গিয়েও জাপা প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাতে পারছেন না। তাকে বলে দেয়া হয়েছে তিনি যেন নির্বাচনী প্রচারে মাঠে না নামেন। ফলে তিনি সার্কিট হাউসে এবং তাদের বাড়িতেই অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদকে বলা হয় ‘আনপ্রেডিক্ট্যাবল ক্যারেক্টার’। অর্থাত্ এরশাদ একজন অবিশ্বস্ত রাজনীতিবিদ। তিনি কখন যে কী করেন, কেউ তা বলতে পারেন না। ছোট ভাই বাণিজ্যমন্ত্রী গোলাম কাদেরের এ সম্পর্কে একটি চমত্কার মন্তব্য আছে। গোলাম কাদের সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এরশাদ সাহেব আমার বড় ভাই। তবে তার ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। তিনি সকালে এক কথা বলেন, আবার বিকালে বলেন আরেক কথা। বাণিজ্যমন্ত্রী গোলাম কাদেরের এ বক্তব্য থেকেই এরশাদ সম্পর্কে যে কেউ একটি স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারেন। এরশাদের কাছে আদর্শ বড় কথা নয়। তিনি কখন কোন অবস্থানে থাকবেন, সেটাই বড় কথা। এরশাদ কখনও মার্শাল ল’র স্বপ্ন দেখেন, কখনও আরেকটি এক-এগারোর স্বপ্ন দেখেন। কখনও কখনও আবার ভাবেন পাতানো একটি নির্বাচনের মাধ্যমে যদি ক্ষমতার মসনদে আসা যায়! অর্থাত্ সুযোগ ধরার জন্যেই সবসময় তিনি ওঁত্ পেতে আছেন।
তার এমন ওঁত্ পাতার কথা গত সোমবার প্রকাশ করেছেন মেজর জেনারেল (অব.) আমিন আহমেদ চৌধুরী। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির ‘রোড টু ডেমোক্রেসি’ নামের টকশোতে এসেছিলেন তিনি। গণতন্ত্র প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে মেজর জেনারেল (অব.) আমিন আহমেদ চৌধুরী বীর বিক্রম কীভাবে ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টি হয়েছিল, সে কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, এরশাদের বাড়িতে এ ব্যাপারে বৈঠক হয়েছিল। তিনি বলেন, এরশাদ সাহেব এখন কী চান তা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার যেমন কিছুই জানেন না, তেমনি কাজী ফিরোজ রশিদও জানেন না। এ সময় তার কাউন্টার পার্ট ছিলেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ। কিন্তু কাজী ফিরোজ রশিদ মেজর জেনারেল (অব.) আমিন আহমেদ চৌধুরীর এ বক্তব্য বিষয়ে কিছুই বলেননি; বরং সম্মতিসূচক ইঙ্গিত দিয়েছেন।
গত আগস্ট মাসে এইচএম এরশাদ ভারত সফর করেন। পাঁচ দিনের এই সফরটি ছিল ভারতে এরশাদের একটি হাইপ্রোফাইল ভিজিট। ভারতে তাকে খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংসহ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয় এরশাদের। ভারত সফর শেষে ১৮ আগস্ট দেশে ফিরে বিমানবন্দরে এরশাদ বলেন, তার এই সফর খুবই সফল হয়েছে। দিল্লি তাকে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত নাকি মহাজোটের সঙ্গে থাকতে পরামর্শ দিয়েছে। আর তিনি আগামী নির্বাচন এককভাবে করার জন্য ভারতের সহযোগিতা চেয়েছেন। তবে ভারত তাকে কী সহযোগিতা করবে—অর্থ দিয়ে, না নির্বাচনে জিতিয়ে, সে সম্পর্কে খোলাসা করেননি তিনি। অবশ্য কয়েকদিন পর তিনি বলেন, দুই নেত্রীর রাজনীতি থেকে অবসর নেয়া উচিত। কারণ দুই নেত্রী নির্বাচনে না থাকলে তার সুবিধা হয়।
ভারত থেকে আসার পর থেকেই এরশাদ রাজনীতিতে খুব তত্পর হয়ে ওঠেন। তিনি যেন বুঝতে পারছেন ক্ষমতা তার নাগালে। এ সম্পর্কে তার হিসাব হলো, সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তুলে দেয়া হয়েছে। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। শেখ হাসিনা কোনোভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনবেন না। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচন হবে একতরফা। এই নির্বাচনে তিনি এককভাবে যাবেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের অবস্থা খুবই খারাপ। নির্বাচনে তাই জনগণ তাকেই ভোট দিয়ে দেবে এবং তিনি ক্ষমতায় চলে আসবেন। আর ক্ষমতায় না আসতে পারলেও প্রধান বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ হতে পারে। সেক্ষেত্রে এরশাদ হবেন বিরোধীদলীয় নেতা।
এরশাদ তার বক্তব্যেও একথা প্রকাশ করেছেন। ৮ নভেম্বর সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মহাজোটের অবস্থা ভালো নয়। আগামী নির্বাচনে মহাজোট ভালো করতে পারবে না। এ কারণে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে মহাজোটের হয়ে অংশ নেবে না। এককভাবে নির্বাচন করবে। জাতীয় পার্টি আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে। সময় হলেই মহাজোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দেবেন এরশাদ।
৭ নভেম্বর ওয়েস্টিন হোটেলে মার্কিন দূতাবাস আয়োজিত প্রতীকী ভোট অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের এরশাদ বলেন, নির্বাচন হবে কি-না আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারেন না। ৯ অক্টোবর এরশাদ বনানী কার্যালয়ে বলেন, দেশের সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যত্। যথাসময়ে নির্বাচন হবে কি-না, গণতন্ত্র থাকবে কি-না এ নিয়ে জনমনে সন্দেহ আছে। সামনে নির্বাচন হবে, নাকি মার্শাল ল’ বা অনির্বাচিত সরকার আসবে—এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
এসব বক্তব্যের পাশাপাশি আবার এরশাদ দলের মনোনয়নও ঠিক করছেন। সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যে, এরশাদ ইতোমধ্যে ১১১ আসনে প্রার্থী তালিকা ঠিক করে ফেলেছেন এবং আরও ১১০ আসনে ঠিক করছেন। ১৭ সেপ্টেম্বর গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় তিনি বাছাই করা ১১১ দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তিনি প্রার্থীদের বলেছেন, শিগগিরই ঢাকায় মহাসমাবেশ করে মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দেবেন। আগামী নির্বাচনে এককভাবে তিনি লড়বেন। তবে ঘাটাইল নির্বাচনে জাপার এ পরিণতির পর তিনি কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটাই দেখার বিষয়। অনেক নেতাই বলেছেন, এরশাদ সাহেব দলীয় প্রার্থী বাছাই কয়েক দফায় করবেন। কারণ মনোনয়ন-বাণিজ্য বিষয়টি তিনি খুবই বোঝেন। এখন তো তিনি ক্ষমতায় নেই, তাই মনোনয়ন-বাণিজ্য ছাড়া টাকা হাতানোর তেমন রাস্তা নেই। ঘাটাইল নির্বাচন আপাতত এরশাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। তার পরবর্তী তত্পরতা আজারবাইজান থেকে আসার পরই বোঝা যাবে।