Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ৯ মহররম ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

১ ডিসেম্বর বুয়েট ভর্তি পরীক্ষা সময়টা ভর্তি প্রস্তুতির

« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
২০১১ সালে বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় ১ম ও ২য় হয়েছেন যথাক্রমে আশরাফুল ইসলাম আশিক এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ। ভর্তিচ্ছুদের জন্য তাদের পরামর্শ—

নদীবিধৌত মেঘনা নদীর পাড় ঘেঁষে অবস্থিত সবুজ-শ্যামল ছোট্ট একটি গ্রামের নাম দিলারপুর। নরসিংদী জেলার প্রত্যন্ত এ গ্রামের ছেলে আশিক, পুরো নাম আশরাফুল ইসলাম। ১৯৯৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পিতা জহিরুল ইসলাম ও মাতা হালিমা খাতুনের কোলজুড়ে আসে ছোট্ট আশিক। শান্তশিষ্ট নম্র-ভদ্র পড়ুয়া ও মেধাবী বলে পরিচিত আশিকের ছোট্ট বেলার দুরন্ত শৈশবটা কেটেছে মেঘনা নদীর বিশাল পাড় ঘেঁষে প্রকৃতির সবুজ প্রান্তরে। প্রকৃতিপ্রিয় এ শিশু আশিক গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে বেড়াত আনমনে। কখনও হেঁটে হেঁটে চলে যেত নিজগ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে, খুঁজে বেড়াত প্রকৃতির অফুরন্ত রহস্যের জাল। কিন্তু খুঁজে পেত না কোনো কূল-কিনারা। কখনও কখনও রং-বেরঙের ঘাস ফড়িংয়ের পিছে দৌড়াতে দৌড়াতে কেটে যেত পুরো দুপুর-সন্ধ্যা। জ্ঞানপিপাসু ছোট্ট আশিক পড়তে শুরু করল নাম না জানা বই। তারপর হাজারও রহস্যের দ্বার উন্মোচিত হতে লাগল বইয়ের অফুরন্ত ভাণ্ডার। পড়তে ভালো লাগে বলে ছোট্ট আশিক সব সময় নিজের পৃথিবীটা গড়ে তুলেছিল বই আর বই দিয়ে। তাই তো গত্বাঁধা নিয়ম করে পড়ার ব্যাপারটিকে উপেক্ষা করে একান্ত জানার পরিধিকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করার তাগিদে পাঠ্যবই ছাড়াও অসংখ্য বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হওয়া জ্ঞানের অফুরন্ত ভাণ্ডার বাড়িয়ে আশরাফুল ১ম শ্রেণী থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকসহ বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় ১ম স্থান অধিকার করে প্রমাণ করেছ পড়ার কোনো বিকল্প নেই। জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি জানতে চাইলে মেধাবী ছাত্র আশিক জানালেন, পিতা-মাতা থেকে শুরু করে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমণ্ডলী, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজন সবার কথা। ২০০৮ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যতগুলো গণিত ও ফিজিক্স অলিম্পিয়ার্ড নিজ কলেজ ও অন্যান্য কলেজে অনুষ্ঠিত হয়েছে তার প্রায় সবগুলোতে মেধাবী এই ছেলেটি ১ম, ২য় এবং চ্যাম্পিয়ান হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া এই ছেলেটি তার মতিঝিল মডেল স্কুল ও নটরডেম কলেজের অবদানের কথা বলতেই কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে পড়েছেন। তিনি বললেন, একটি ছাত্রের জীবনে স্কুল ও কাজের বিশাল ভূমিকা পালন করেছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সারা জীবনই স্কলারশিপ পেয়ে পড়াশোনা করা এই আশিকও শিক্ষকদের ভীষণ প্রিয় ছাত্র বলে পরিচিত ছিল। বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করার গল্প করতে গিয়ে আশিক নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে এ বছর যারা ভর্তি পরীক্ষায় কীভাবে প্রস্তুতি নিবে সে সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন,
যারা কলেজে দুই বছর পড়াশোনা না করে এইচএসসি পরীক্ষার আগে শুধু গত্বাঁধা কিছু সাজেশন মুখস্থ করে জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাদের জন্য বুয়েট ভর্তি পরীক্ষা বিভীষিকার মতো। কিন্তু যারা প্রকৃত অর্থেই এই দুই বছর অনেক পরিশ্রম করেছে, তাদের জন্য এই পরীক্ষা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার মাধ্যম অ+ খুব সহজেই বর্তমানে অর্জন করা যায়। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করার জন্য প্রয়োজন কঠোর অধ্যাবসায় আর পরিশ্রম। বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা। এই ৩ ঘণ্টার মধ্যে দেড় ঘণ্টা নৈর্ব্যক্তিক আর দেড় ঘণ্টা রচনামূলকের জন্য। প্রতিটি রচনামূলক প্রশ্নের জন্য গড়ে ৩ মিনিট আর নৈর্ব্যক্তিকের জন্য প্রায় ৪৫ সেকেন্ড সময় পাওয়া যায়। এই অল্পসময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ ধহংবিত্ করে আসা প্রায় অসম্ভব। তাই যেসব প্রশ্নের সমাধান জানা আছে অথবা সমাধান করতে পারা যাবে বলে মনে হয় সেগুলো আগে ধহংবিত্ করা উচিত।
পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত আর ইংরেজি—এই চারটি বিষয়ের ওপর প্রশ্ন থাকে। এদের মধ্যে পদার্থ আর গণিতের প্রশ্নগুলো তুলনামূলকভাবে কঠিন থাকে।
গণিতের অনেক প্রশ্নই বই থেকে সরাসরি অথবা একটু ঘুরিয়ে দেয়া হয়। সুতরাং মূল বই ভালোভাবে পড়া থাকলে গণিতে খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে বাজারে অনেক লেখকের বইগুলোর মধ্যে কার বই পড়ব—এটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভুগে। তবে আমার মতে, ভালোভাবে বুঝে পড়ে থাকলে যে কারও বই পড়লেই চলবে। গণিতে ভালো করার জন্য আসলে অনেক বেশি চত্ধপঃরপব করতে হবে।
রসায়নের প্রশ্নগুলো যদিও গণিত অথবা পদার্থবিজ্ঞানের মতো এতটা কঠিন কখনই থাকে না, তবুও এ বিষয়টিতে অনেক সময় দিতে হবে, বিশেষ করে জৈব রসায়নে। বিক্রিয়াগুলো বারবার লিখে চত্ধপঃরপব করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় সব বিক্রিয়া, সঙ্কেত শনাক্তকরণ আলাদা খাতায় লিখে হড়ঃব করে রাখলে।
গঈছ-এর জন্য সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত ংড়ষাব করার দক্ষতা। এজন্য দরকার প্রচুর অনুশীলন করা।
আর অবশ্যই স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। খুব বেশি রাত জেগে পড়া উচিত নয়। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, কারও প্রস্তুতিই কিন্তু ১০০ শতাংশ থাকে না। আর বুয়েট পরীক্ষা অনেকের খারাপ হওয়ার মূল কারণ থাকে খুব বেশি আতঙ্কিত থাকা। আসলে আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। এসব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোয় দেখা যায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই তারা এতদিন যা পড়ে এসেছে তার অধিকাংশ হলে গিয়ে ভুলে যায় এবং কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে খুব বেশি সময় নষ্ট করায় সহজ প্রশ্নগুলো সমাধান করে আসতে পারে না। তাই ঠাণ্ডা মাথায় পরীক্ষা দিতে পারলে বুয়েটে পযধহপব পাওয়া আসলে কঠিন কোনো ব্যাপার নয়।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যঘেরা সবুজ মাঠ, গাছপালা, রঙ-বেরঙের ফুলফল, পাতায় ঘেরা নওগাঁ জেলার রানীনগর একটি ছোট্ট মফস্বল শহর। রানীর মতো প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দিয়ে যে এলাকাটাকে সাজানো হয়েছিল, সেটা নওগাঁর রানীনগর নামেই খ্যাত। এই ছোট্ট শহরতলির একজন মমতাময়ী মা আঞ্জুমানআরা বেগমের কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে ছোট্ট শিশু খালিদ বিন ওয়ালিদ। বাবা মো. ইয়াকুব আলীর তৃতীয় সন্তান খালিদ ছোটবেলা থেকেই ভীষণ রকম অমায়িক ও বিনয়ী বলে বড় দুই ভাইবোন তাকে স্নেহ-মমতায় বড় করেছেন চাকরিজীবী মায়ের অনুপস্থিতিতে। দিনের অনেকটা সময় ঘরে মা না থাকলেও খালিদ পড়াশোনা, খেলাধুলা সবকিছুই করেছেন শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে। বড় বোনের তত্ত্বাবধানে ছোট্ট খালিদ বড় হতে থাকেন। গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে গত বছর অনুষ্ঠিত বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় খালিদ মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন।
কল্পনাপ্রিয় স্বপ্নবিলাসী খালিদের অবসর কাটে বই পড়ে, গিটার, কিবোর্ড বাজিয়ে, সধঃযং, ঢ়ত্ড়মত্ধসসরহম কবিতা আবৃত্তি করে। কখনও ক্রিকেট বা বাস্কেটবল খেলে। তাছাড়া উপস্থিত বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া ছিল ওর প্রিয় হবি। আর এসব করে খালিদ পুরস্কারও পেয়েছেন বেশ অনেকগুলো। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ছেলেবেলায় ছোট্ট খালিদ অবসন্ন দুপুরে কিংবা শিশিরভেজা ভোরে চলে যেত পুকুরপাড়ে ফুল, পাখি ও মাছদের খেলা দেখতে, অথবা কচি ঘাসের ডগায় চিকিচক্ করা শিশিরবিন্দু দেখতে। পুকুরপাড়ের কাছে বাঁশঝাড়ের আলো-আঁধারির লুকোচুরি খেলা ছোট্ট খালিদকে ভয় আর গা ছম্ছম্ করা আনন্দ-উচ্ছ্বাস মেশা এক অপরূপ রোমাঞ্চকর অনুভূতিতে উদ্বেল করে তুলত। কখনও বড়শির টোপে মাছ বেঁধে যাওয়ার আনন্দে লাফিয়ে ওঠার অনুভূতিই যেন মুগ্ধতায় মিলিয়ে যেত গ্রামের মেঠোপথ বেয়ে দাদুবাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। কারণ স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নওগাঁর রানীনগর থেকে দাদুবাড়ি বেশ অনেকটা সবুজ মাঠ-ঘাট হেঁটে যেতে হতো। এই হেঁটে যাওয়াটা তখনকার সময় তার কাছে ছিল ভীষণ এক অ্যাডভেঞ্চারের মতো, যার ছায়া সে দেখতে পায় খড়ত্ফ ড়ভ ঃযব জরহমং নামক গ্রন্থটি পড়তে পড়তে।
অজানাকে জানার ও অদেখাকে দেখার প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনাটাকে সর্বপ্রথম ভালোবাসতে হবে—এমনি কথার রেশ ধরে তিনি বললেন, বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় নিজেকে যোগ্য করে দাঁড় করাতে হলে প্রত্যেকটা বিষয় পড়ার সময় খুব ভালোভাবে বুঝে পড়তে হবে। তিনি বলেন, এভাবে বুঝে পড়লে মনের ভেতর সেটার একটা ছবি তৈরি হয়ে যায়। গধঃয করার সময় কোনো ফাংশনের গ্রাফ নিয়ে চিন্তা করলে অনেককিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। চত্ধপঃরপব-এর কোনো বিকল্প নেই। চযুংরপং-এর প্রতিটি সূত্রের উপাদান খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। খুব দ্রুত অঙ্ক করতে গেলে এর তাত্পর্য বোঝা যাবে। কোনো ংযড়ত্ঃ-পঁঃ পদ্ধতি অনুসরণ না করে, বরং চিন্তা-প্রতিক্রিয়াটাকেই এত দ্রুত করতে হবে যেন কম সময়ে উত্তর দেয়া যায়।
কিছু জিনিস মুখস্থ না করে উপায় নেই, যেমন—পারমাণবিক ভর, জারণ-বিজারণের পর একটা ঈযবসরপধষ ংঢ়বপরবং-এর কী পরিবর্তন হয়, কোন বিক্রিয়ায় কোন প্রভাবক ব্যবহার করা হয় ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে ঁহফবত্ষুরহম ঢ়ধঃঃবত্হ/ষড়মরপটা ধরতে পারলে ব্যাপারগুলোকে আর হড়হ-ংপরবহঃরভরপ মনে হয় না, আর মুখস্থও হয় খুব সহজে। পড়তে ভালো না লাগলে জোর করে বসে থাকা যাবে না, বরং উঠে গিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইতে হবে, বা অন্য যা কিছু ভালো লাগে তা করতে হবে। শেষ কথা পড়ালেখাকে ভালোবাসতে হবে, তাহলে বাকিটুকু এমনিতেই হয়ে যাবে।
আঞ্জুমান আরা বেগম