Amardesh
আজঃঢাকা, বুধবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১২, ১১ আশ্বিন ১৪১৯, ৯ জিলকদ ১৪৩৩    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০ টায়
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিকের বিরুদ্ধে আমার দেশ-এর অনুসন্ধান

বিশেষ প্রতিনিধি
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের লন্ডনে সম্পত্তি ক্রয় ও তার বিরুদ্ধে লন্ডন আদালতে দায়ের করা প্রতারণার মামলার বিষয়ে অনুসন্ধান করেছে দৈনিক আমার দেশ। আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি অলিউল্লাহ নোমান লন্ডনে ১২ দিন অবস্থান করে সেখানে ভূমি অফিস ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে যোগাযোগ করে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের সম্পদের বিষয়ে খোঁজ নেন। একইসঙ্গে তার বাড়িগুলোও পরিদর্শন করা হয়।
বিচারপতি মানিকের সম্পদের হিসাব অনুযায়ী লন্ডনে তার সম্পত্তি হচ্ছে ৩টি বাড়ি। হিসাবে দেখানো হয়েছে বাড়িগুলো কিনেছেন মাত্র ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে। বাংলাদেশে এলিফ্যান্ট রোডে তার একটি বাড়ি বিক্রি করা হয় ৫০ লাখ টাকায়। ২০০৭ সালের ৮ আগস্ট ৫২ এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িটির রেজিস্ট্রি দলিল অনুযায়ী বিক্রিমূল্য দেখানো হয় ৫০ লাখ টাকা। মাহবুবা খানম, মাহফুজা খানম ও তিন্নি ফেরদৌসী খানম নামে ৩ জন যৌথ দলিলে বাড়িটি ক্রয় করেছেন। তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির আয়কর পরিশোধ করার পর ২০০৮-০৯ ও ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেখানো হয় তার কাছে নগদ ৫০ লাখ ২৮ হাজার ৬৪ টাকা রয়েছে। ২০১০-১১ সালের ব্যক্তিগত হিসাবে দেখানো হয় তিনি লন্ডনে ৩টি বাড়ি ক্রয় বাবদ ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। বাড়িগুলোর ঠিকানা দেখানো হয় (1) 6 Ruskin Way, London SW17; (2) 108 Sheppey Road, Dagenham (RM9 4LB); (3) 26 The Warrent, London (E12 5HY). এই ঠিকানার সূত্র ধরে লন্ডনের ভূমি অফিসে খোঁজ নেয়া হয়। লন্ডন সরকারের আইন অনুযায়ী সরকার অনুমোদিত সলিসিটরের মাধ্যমে নির্ধারিত ফি দিয়ে জমিগুলোর রেজিস্ট্রি দলিল নেয়া হয়। রেজিস্ট্রি দলিলে পাওয়া যায় বিস্তারিত তথ্য। বাড়ির টাকা কোন তারিখে পরিশোধ করা হয়েছে, কত টাকা দিয়ে ক্রয় করা হয়েছে, কোন তারিখে রেজিস্ট্রি হয়েছে—সবই সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে দলিলগুলোতে।
লন্ডনের ভূমি অফিস থেকে পাওয়া দলিলের তথ্য অনুযায়ী বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক লন্ডনের 108 Sheppey Road, Dagenham (RM9 4LB) ঠিকানার বাড়িটি কিনেছেন সেখানকার স্থানীয় মুদ্রা ১ লাখ ৮৬ হাজার পাউন্ডে। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০০৮ সালের ৭ অক্টোবর তিনি এই টাকা পরিশোধ করে সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেছেন। রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে তার নিজের ঠিকানাও দেখানো হয় এই বাড়ি।
লন্ডন ভূমি রেজিস্ট্রি দলিলের তথ্য অনুযায়ী 26 The Warrent, London (E12 5HY) ঠিকানার বাড়িটির মালিক হলেন বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। এ বাড়িটির দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয় ২০০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। রেজিস্ট্রি দলিলের তথ্য অনুযায়ী বাড়িটির ক্রয়মূল্য হচ্ছে লন্ডনের স্থানীয় মুদ্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এ দুটি বাড়ি কিনতেই তার ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অথচ তার হিসাবে দেখানো হয় মাত্র ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩টি বাড়ি কিনেছেন। প্রকৃত মূল্য তিনি গোপন করেছেন এবং হিসাবে দেখানো হয়নি।
ভূমি অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী 94 East Hill, London (SW18 2HF) বাড়িটির মালিক হলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী এবং নাদিয়া চৌধুরী। গত বছরের (২০১১) সালের ২১ নভেম্বর বাড়িটি তাদের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। এর ক্রয়মূল্য হচ্ছে লন্ডনের স্থানীয় মুদ্রায় ১০ হাজার পাউন্ড। এই বাড়িটির ক্রয় রেজিস্টারে তাদের ঠিকানা দেখানো হয়েছে 108 Sheppey Road, Dagenham (RM9 4LB). লন্ডনে গিয়ে তিনি এ বাড়িতেই বসবাস করেন বলে জানা গেছে। এ বাড়িটি তার হিসাবে দেখানো নেই। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারপতি পদে পুনর্বহাল হয়ে তিনি বাড়িটি ক্রয় করেছেন। এছাড়া তার হিসাবে দেখানো ৩টি বাড়ি ক্রয় করেছেন ২০০১ সালে বিচারপতি হওয়ার পর।
তার আয়কর হিসাব অনুযায়ী 6 Ruskin Way, London SW17 ঠিকানার বাড়িটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ ঠিকানাটি ভুল অথবা অসম্পূর্ণ অথবা প্রকৃত ঠিকানা গোপন করা হয়েছে। লন্ডন ভূমি অফিসের রেকর্ডে এ ঠিকানায় কোনো সম্পত্তি তার নামে নেই। এ ঠিকানার অনুসন্ধান করতে গিয়ে লন্ডনের ভূমি অফিসের দলিলে দেখা যায় 6 Ruskin Way, London SW17-তে কোনো জমির তথ্য নেই। ভূমি অফিসে তল্লাশি দিলে 6 Ruskin Way, London SW19 2UP রোডে একটি ঠিকানা পাওয়া যায়। এ ঠিকানার বাড়িটির মালিক শামসুদ্দিন চৌধুরী নন। এটির মালিক হলেন মোহাম্মদ শারফ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। তিনি বাড়িটি ২০১১ সালের ৯ আগস্ট রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে ক্রয় করেছেন। বাড়িটির মূল্য দলিলে উল্লেখ রয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড। এতেই স্পষ্ট, বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ব্যক্তিগত হিসাবে ৩টি বাড়ির যে ঠিকানা দেখিয়েছেন, তার মধ্যে একটি অসম্পূর্ণ অথবা ভুল অথবা প্রকৃত ঠিকানা গোপন করা হয়েছে। নিজের হিসাবে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের দেখানো ঠিকানা অনুযায়ী এ বাড়িটির অস্তিত্ব খুঁজে না পাওয়ায় এর মূল্য জানা যায়নি। এ বাড়িটির মূল্য যোগ হলে বাড়ি কেনার পেছনে তার প্রকৃত ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী 108 Sheppey Road, Dagenham (RM9 4LB) ঠিকানার বাড়িটি কেনার ক্ষেত্রে Mortgage express নামের একটি অর্থঋণ কোম্পানি থেকে ঋণের জন্য আবেদন করেন। এ আবেদনে তিনি নিজেকে লন্ডনের একটি কোম্পানিতে মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত বলে দাবি করেন। মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে তিনি বছরে লন্ডনের স্থানীয় মুদ্রায় ৩৪ হাজার ৪৫০ পাউন্ড বেতন পান বলেও উল্লেখ করা হয় ঋণের আবেদনে। ঋণের আবেদনে তিনি ২০০৩ সালের ১ জুন এই বর্ণনা উল্লেখ করেন। অথচ তিনি তখন সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত একজন বিচারপতি। তিনি হাইকোর্ট বিভাগে ২০০৩ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি ও সুপ্রিম জুডিশিয়ালের কাছে পেশ করা আবেদনে বলা হয়, সুপ্রিমকোর্টের আচরণবিধি অনুযায়ী বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি থাকা অবস্থায় ভিন্ন কোনো চাকরি করতে পারেন না। অথচ তিনি বিচারপতি থাকা অবস্থায় লন্ডনে ঋণের আবেদনে নিজেকে সেখানে একটি কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে দাবি করে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, চলতি বছরের (২০১২ সালের) ২৫ জুন জিসান নাসিম নামে এক ব্যক্তি লন্ডনের আদালতে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করেছেন। জিসান নাসিম পাকিস্তানি নাগরিক। তিনি বিচারপতি শামসুদ্দিনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। জিসানের আইনজীবী জানান, তার ক্লায়েন্ট এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর প্রতারণার শিকার হয়ে বিপদে পড়েছেন। লন্ডনের সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে নির্ধারিত আইনজীবীর মাধ্যমে এই মামলার তথ্য পাওয়া যায়।
দায়ের করা মামলার দাবি অনুযায়ী ওই ব্যক্তির কাছে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী নিজেকে ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইজার হিসেবে পরিচয় দেন। ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইজার হিসেবে তিনি ওই ব্যক্তিকে লন্ডন ওয়েস্টমিনস্টার কলেজে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং বলেন, এই কলেজের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইজারের পাশাপাশি নিজেকে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারপতি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে কলেজটিতে ভর্তি হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। এতে জিসান নাসিম আশ্বস্ত হয়ে বিচারপতি মানিকের পরামর্শে সেই কলেজে ভর্তি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। এজন্য লন্ডনের স্থানীয় মুদ্রায় ১৫ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করা হয়েছে। লন্ডনের The Northhampton County Court-এ দায়ের করা বিচারাধীন মামলাটির নম্বর হচ্ছে 2QT70489. মামলার নোটিশ পাওয়ার পর গত ৭ জুলাই বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী আদালতে একটি সময়ের আবেদন জানান। মামলাটির নোটিশের জবাব দিতে সময়ের আবেদনে তিনি নিজেকে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া ভিত্তিহীন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে দাবি করে বলা হয়—জবাবের জন্য পর্যাপ্ত সময়ের দরকার।