Amardesh
আজঃঢাকা, বুধবার ২১ মার্চ ২০১২, ৭ চৈত্র্য ১৪১৮, ২৭ রবিউস সানি ১৪৩৩ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ওরা জাতির পিতাকে সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছে

সি রা জু র র হ মা ন
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
উনি বাংলাদেশে ফিরে প্রথমে হলেন রাষ্ট্রপতি, তারপর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে নিজে হলেন নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী। অন্তত আমি তাতে হতাশ হয়েছিলাম। মুজিব ভাই পাকিস্তান থেকে প্রথমে লন্ডনে এসেছিলেন। পাকিস্তানে তাকে এ ধারণা দেয়া হয়েছিল যে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানকে ‘অটোনমি‘ (স্বায়ত্তশাসন) দিতে রাজি হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে শুনে তিনি রীতিমত একটা ধাক্কা খেয়েছিলেন।
আমি তাকে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির আনুপূর্বিক বিবরণ দিয়েছিলাম। এটাও তাকে বলেছিলাম, স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠন এবং জনসাধারণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা মেটানো কঠিন হবে। তিনি যদি রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী না হয়ে গান্ধীর মতো একটা অভিভাবকের (হাতে একটা চাবুক রাখার কথাও বলেছিলাম তাকে) ভূমিকা নেন তাহলে ভালো হবে বলেও বলেছিলাম তাকে। মুজিব ভাইকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনতাম। তখন তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন। তারপর আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মসহ তার রাজনৈতিক জীবন এবং স্বল্প কিছুকালের মন্ত্রিত্ব লক্ষ্য করেছি সাংবাদিক হিসেবে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তার বিশেষ ছিল না। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের গোটা রক্তক্ষরা সময় তিনি ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে। দেশে তখন কী ঘটেছে, কে কী করেছে, এসব সম্বন্ধে তার কোনো ধারণাই ছিল না।
আমি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম যাই তার মাসখানেক পরে। আমি দিল্লি হয়ে কলকাতায় যখন পৌঁছি তখন তিনি মনুমেন্ট ময়দানের পাদদেশে বিশাল জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। কলকাতার সাংবাদিক বন্ধুরা বলছিলেন, শেখ মুজিব এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করে দিতে। শুনেছিলাম, ঢাকা থেকে যশোর-খুলনা যাওয়া সুবিধাজনক নয়। তাই ঢাকা যাওয়ার আগেই একখানি ভারতীয় গাড়ি ভাড়া নিয়ে আমি সে দুটো জেলা সফর করি। আমার সঙ্গে আরও ছিলেন ডেনমার্কের ‘ইনফরমেশন‘ পত্রিকার সম্পাদক ও ডেনিশ রেডিওর ভাষ্যকার পল নিলসেন। আমার সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ দেখবেন বলে দু’দিন ধরে তিনি কলকাতায় অপেক্ষা করছিলেন।
বিবিসিতে নিয়মিত খবর পেয়েছি এবং সেসব খবর প্রচার করেছি। তা সত্ত্বেও যশোর এবং খুলনায় ক্ষয়ক্ষতি যা দেখেছি তাতে স্তম্ভিত হয়েছি। বিশেষ করে বেনাপোল থেকে যশোর যাওয়ার রাস্তা যেখানে খুলনা রোডের সঙ্গে মিশেছে, সেখানে ধবধবে সাদা কঙ্কালের স্তূপের দৃশ্য এখনও প্রায়ই আমার মনে পড়ে। ভারতীয় বিমানে ঢাকা যাওয়ার পথে কলকাতার পত্রিকায় বাংলাদেশ বিমানের ট্রেনিং ফ্লাইট বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পড়ে কান্না সামলাতে পারিনি। নিহত পাইলটদের মধ্যে একাধিক আমার পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে ক্যাপ্টেন নাসিরুদ্দিন হায়দার সবুজ কলকাতায় আমার বন্ধু এবং মুকুল ফৌজে সহকর্মী ছিলেন।
তেজগাঁ বিমানবন্দরে নেমে দেখি লোকে লোকারণ্য। অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান পাঁচ-ছয় হাজার লোক নিয়ে আমাকে অভ্যর্থনা করতে এসেছেন। বিবিসিতে চাকরি করি, খবর পড়ি, তারই জন্য মানুষের এত কৃতজ্ঞতা অত্যন্ত গভীরভাবে প্রাণকে স্পর্শ করেছিল। পরদিন সকালে জনদুই বন্ধু এসেছিলেন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দেখা করতে। একজন অপরিচিত তরুণও এলেন। বললেন, শেখ ফজলুল হক মণির সঙ্গে দেখা করলে আমার উপকার হবে। প্রধানমন্ত্রীর (শেখ মুজিব) সঙ্গে সাক্ষাত্ এবং অন্য কোনো ব্যাপারে সাহায্যের প্রয়োজন হলে তিনি ব্যবস্থা করে দেবেন। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় জানালাম। বন্ধুরা বললেন, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বকে তার পরিবারের কোনো কোনো সদস্যসহ কিছু লোক অর্থকরী ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
মুজিবকে ওরা ঘিরে রেখেছিল
লন্ডনে হাইকমিশনারের অফিস থেকে ওরা টেলিফোন করে বলেছিলেন, ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় পাইপের তামাক পাওয়া যাচ্ছে না, আমি কিছু তামাক নিয়ে গেলে ভালো হবে। আমি দু’পাউন্ড এরিনমোর তামাক আর ভালো দেখে ডানহিলের একটা পাইপ (তার মৃতদেহের সঙ্গে যে পাইপটা ৩২ নম্বর রোডের বাড়ির সিঁড়িতে পড়েছিল) নিয়ে গিয়েছিলাম। সেগুলো নিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই পুরনো গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বললেন, পরে কখনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসতে। আমার বিস্ময়ের কারণ এই ছিল যে, ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার ২০ বছরের বেশি দিনের পরিচয় এবং মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা তিনি ভালো করেই জানতেন। তবে আমি জানতাম, মুক্তিযুদ্ধে তিনি পুরোপুরি আমাদের পক্ষে ছিলেন না।
আমি ফিরেই আসছিলাম, কিন্তু অন্য একজন কর্মকর্তা নিরাপত্তা প্রহরীদের আমার পরিচয় দিয়ে এসে বললেন, আপনি সরাসরি চলে যান, দেখি কে আপনার পথ আটকায়। প্রহরীরা স্যালুট করে আমাকে ভেতরে যেতে দিলেন। মুজিব ভাই খুব খুশি হয়েছিলেন। আমাকে ডেকে পাশে বসালেন, কর্মচারীদের বললেন, ‘সিরাজ স্বাধীন বাংলাদেশে এসেছে, ওকে মিষ্টিমুখ করাও, রসগোল্লা খাওয়াও।’ মন্ত্রী কামরুজ্জামান আর তোফায়েল আহমেদ ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে। তাছাড়া চার-পাঁচজন অচেনা লোক, তারা ‘জি হুজুর’ ভঙ্গিতে হাতজোড় করে বসেছিলেন। আমি তামাক আর পাইপ তার হাতে দিলাম। তিনি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সপ্রশংস দৃষ্টিতে পাইপটা দেখলেন। বললেন, ‘আমি ঘুষ খাই না, কিন্তু সিরাজ আমার ভাই, সে পাইপ এনেছে, সেটা আমি খাব।’ এমন সময় কবি জসিম উদ্দিন মনোজ বসুর নেতৃত্বে এক ডজনেরও বেশি কলকাতার লেখককে নিয়ে ঢুকলেন। তারা সবাই লাল ফিতায় বাঁধা নিজেদের বই টেবিলে রাখলেন আর ঝুঁকে প্রধানমন্ত্রীর চরণ স্পর্শ করে তাকে প্রণাম করলেন। আমার খুব খারাপ লেগেছিল বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকদের এই হীনমন্যতা দেখে। আমি বিদায় চাইলাম। মুজিব ভাই আমার হাত ধরে বললেন, ‘কাল ভোরে ভোরে আসিস, তোর সঙ্গে অনেক কথা আছে।’
পরদিন তিনি বললেন, মুক্তিযুদ্ধে আমার ভূমিকার কথা তিনি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে শুনেছেন। আমাকে তিনি পুরস্কৃত করতে চান। আমি বললাম, আমি চাই তার সবচেয়ে প্রিয় পোট্রেট। কামাল লোহানী তখন ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ অধিকর্তা। তিনি গণভবনে হাজির ছিলেন। মুজিব ভাই তার সব ফটো তার কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। আমি বললাম, পরদিন সকালে আমি চাটগাঁ যাচ্ছি, ২২ ফেব্রুয়ারি তার সঙ্গে দেখা করব।
সড়কপথে চট্টগ্রাম
দাউদকান্দিতে বড়সড় একদল তরুণ (তারা দাবি করেছিলেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা) সড়কে ব্যারিকেড তৈরি করেছেন। ওখানে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা বাস চাপা পড়ে মারা গেছেন। শেখ মুজিব নিজে এসে বিচার না করলে সে সড়ক দিয়ে কেউ যেতে পারবে না। আমি বিবিসির সিরাজুর রহমান, বিবিসির কাজে চাটগাঁ যাচ্ছি শুনে আমাকে যেতে দিতে রাজি হলো তারা, তবে এ শর্তে যে আমাকে কিছু বলতে হবে। এমন সময় জিপে হাজির হলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল ভানোট। তিনি জানতে চাইলেন, আমি নিরাপদ আছি কিনা। বললাম, আমার নিরাপত্তার কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা হচ্ছে জনপ্রিয়তার। কর্নেল ভানোট ‘বাই বাই’ বলে চাটগাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে একজন আমাদের গাড়িতে চাটগাঁ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। আরও কয়েকটা ব্যারিকেড তিনি আমাদের পার করে দিয়েছিলেন, তবে সবখানেই আমাকে ছোটখাটো বক্তৃতা করতে হয়েছিল।
চাটগাঁয় ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির মাঠে বিরাট জনসভাসহ অনেক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে হয়েছে। অনেক ফুলের তোড়া আর মালা পেয়েছিলাম। ফিরতি পথে ভোরে ভোরে বেরিয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন বন্ধুরা। পথঘাট নিরাপদ নয়, ডাকাতি, গাড়ি ছিনতাই অহরহ হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নভেম্বরে মা মারা গিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে কাছের এক গ্রামে লুকিয়ে থাকা ভাইরাও তার জানাজায় আসতে পারেননি। বৃদ্ধ বাবা গ্রামের বাড়িতে সম্পূর্ণ একলা। ঠিক করলাম, ফেনী থেকে চৌমুহনী হয়ে আমিশাপাড়ায় আব্বার সঙ্গে দেখা আর আম্মার কবর জিয়ারত করে ঢাকা ফিরব। লাকসামে বড় সেতুটি মুক্তিযোদ্ধারা ভেঙে দিয়েছিল। ফিরতেও হবে আবার ফেনী হয়ে। এদিকে সন্ধ্যার পর ফেরি চলে না। আইডব্লিউটিএ ব্যবস্থা করেছিল যে আমার জন্য দাউদকান্দির ফেরি সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত দেরি করবে। সুতরাং ফেরার চিন্তাও আছে।
শহীদ দিবসের ফুল আর আমার গাড়ি
বাবা-ছেলে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম কিছুক্ষণ। আব্বা খুব শুকিয়ে গিয়েছিলেন। গ্রামের বুয়ার রান্না মোটেই খেতে পারেন না। বুয়াকে বললাম, একটা মুরগি জবাই করে কেটেকুটে দিতে। নিজেই আমি সে মুরগি, কচি লাউয়ের তরকারি আর মসুর ডাল রান্না করলাম। বাবা-ছেলে আর ড্রাইভার একসঙ্গে বসে খেলাম। ততক্ষণে বেলা পড়ে গেছে। আব্বার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার যাত্রা শুরু। ফেনী ঘুরে কুমিল্লার কাছাকাছি যখন এসেছি তখন সন্ধ্যা ৭টা পার হয়ে গেছে। হেডলাইটের আলোয় দেখি দুটি ছেলে রাইফেল উঁচিয়ে পথরোধ করে আছে।
সেদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি। ওরা কুমিল্লায় ডিসি সাহেবের বাংলো থেকে শহীদ মিনারের জন্যে ফুল আনতে যাবে, অতএব আমার ভাড়া করা গাড়িটা তাদের দরকার। বললাম, তাতে কোনো সমস্যা নেই, আমিও ডিসি সাহেবকে সালাম দিতে যাব, ওরা আমার সঙ্গে আসতে পারে। আমার প্রস্তাব তাদের মনঃপূত হলো না। ওদের গাড়ির চাবি দিয়ে ড্রাইভার আর আমাকে নেমে যেতে হবে। ড্রাইভার বুদ্ধিমান লোক। বলল, উনি কে জানলে তোমরা এ গাড়ি নেবে না। আমি বিবিসির সিরাজুর রহমান শোনার পর ওদের সুর সম্পূর্ণ বদলে গেল। দাবি করল, ওদের ‘অটোগ্রাফ’ দিতে হবে। হেডলাইটের আলোয় রাইফেলের বাঁটে কাগজ রেখে ওদের অটোগ্রাফ দিলাম। ওরা বলল, অন্য কারও গাড়ি নেবে তারা।
২২ তারিখ সকালে গেলাম পুরনো গণভবনে। মুজিব ভাই কিছুটা বিদ্রূপের সুরেই বললেন, আমার তো ধারণা ছিল বাংলাদেশে ফুলের মালা শেখ মুজিবুর রহমানই পান। আমি বললাম, বড় ভাইয়ের গৌরবের ছিটেফোঁটা তো ছোট ভাইদের গায়েও লাগে। উনি বরাবরের মতো পাশে বসতে বললেন। বললেন, দেশে কি আর ফিরবি না? আমি বললাম, ফিরব না কেন, অবশ্যই ফিরব। তিনি জানতে চাইলেন, দেশে এসে কী করবি? এবারে বিদ্রূপের পালা আমার। বললাম, এসে আপনার অফিসের বাইরে ফুলের দোকান করব। আর আপনার কর্মচারীদের ঘুষ দেব। ফুলের মালা আপনার কাছে আসবে আর পেছন দরজা দিয়ে আমার কাছে ফিরে ফিরে যাবে; ব্যবসায় ভালো হবে, কী বলেন? এবারে হো-হো করে হাসলেন মুজিব ভাই।
একজন কর্মচারী এক স্তূপ ফটো এনে রাখলেন তার সামনের কফি টেবিলের ওপর। মুজিব ভাই তার নিজের ছবিগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছিলেন। বললেন, ছবিগুলো তোর ভাবীর কাছে নিয়ে যা, তাকেই বলিস একটা ছবি পছন্দ করে দিতে। আমি বললাম, সেটা তার পছন্দ হবে, আমি চাই আপনার পছন্দের ছবি। একসময় লক্ষ্য করলাম, একটা ছবি তিনি দেখছেন বারবার করে। পকেট থেকে কলম বের করে তার হাতে দিলাম। বললাম, লিখে দিন যে এ ছবিটা আপনি আমাকে দিলেন। আর জনসংযোগ বিভাগকে বলে দেবেন, এ ছবি যেন আর কোথাও ব্যবহার না করা হয়। তিনি ছবির নিচের দিকের ডান কোণে লিখলেন, ‘স্নেহের সিরাজকে, তোমার মুজিব ভাই, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২।’ আমি বললাম, পরশু লন্ডনে ফিরে যাচ্ছি, মুজিব ভাই। তিনি বললেন, বিদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যেসব প্রস্তাব আবু সাঈদ চৌধুরীকে দিয়েছিলি সেগুলো লিখে তার কাছে দিয়ে যাস। আমি বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
নতুন স্বাধীন দেশের কিছু আলামত
পুরনো এত কথা লেখার কয়েকটা উদ্দেশ্য আছে। একটা হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের পাঠকদের স্বাধীন বাংলাদেশের গোড়ার দিকের একটা খণ্ডচিত্র দেয়া। দেশ তখনও ভারতীয় সেনাদের দখলে। আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, এমন কিছু লোক প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে আছে যারা চায়নি যে, কেউ তাকে সুপরামর্শ দিক। তারা স্তব-স্তুতি আর ফুলের মালা দিয়ে তাকে সম্মোহিত করে রেখেছিল এবং সেই অবসরে তারা পুরোদমে লুটপাট করেছে। দুর্নীতি প্রধানমন্ত্রীর নিজের পরিবারেও ঢুকে পড়েছিল।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে দেখে এসেছিলাম, নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জওয়ানরা রবারের স্যান্ডেল পরে কুচকাওয়াজ করছে। ঢাকায় এসে দেখি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জিপে চড়ে আর সে বাহিনীর উর্দি পরে রক্ষী বাহিনীর লোকেরা ঢাকার রাস্তায় হাওয়া খাচ্ছে। তখন শুনেছিলাম, রক্ষী বাহিনীর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন তোফায়েল আহমেদ এবং ভারতীয়দের গড়ে দেয়া মুজিব বাহিনীর অধিনায়করা (শেখ ফজলুল হক মণি, শেখ কামাল, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ)। মুজিবের যারা সমালোচনা করছিল রক্ষী বাহিনী তাদের ধরে নিয়ে গেছে, তারপর আর তাদের কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। পরের বছরের ৭ মার্চ মধ্যমেয়াদে সংসদ নির্বাচন দিলেন মুজিব ভাই। উদ্দেশ্য ছিল, একদলীয় আওয়ামী লীগ সংসদ প্রতিষ্ঠা করা। সে নির্বাচন দেখতে গিয়েছিলাম। তার সঙ্গে হেলিকপ্টারে চড়ে দুটো জনসভায় গিয়েছি। সে নির্বাচনে অসাধুতা আর বলপ্রয়োগে আওয়ামী লীগের আসন দখলের খবর পরিবেশন করেছি। বাংলাদেশের অভাবনীয় অর্থনৈতিক সঙ্কট, দুর্ভিক্ষে ৭০ হাজার মৃত্যু আর রক্ষী বাহিনীর ৪০ হাজার মানুষ হত্যার খবর নিয়মিত পরিবেশন করেছি।
বাংলাদেশের মানুষ তখন রণক্লান্ত। তারা মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করেছে, কিন্তু গণতন্ত্রকে হত্যা করে মুজিবের আজীবন রাষ্ট্রপতি হওয়া সহ্য করতে তারা রাজি ছিল না। আমার কোনো সন্দেহ নেই, মুজিব ভাইকে সম্মোহিত আর নিষ্ক্রিয় রেখে যারা লুটপাট চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল তাদের পরামর্শেই এসব অপকর্ম তিনি করেছিলেন। কিন্তু ততদিনে জাতির সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনাগুলো জনকয়েক সেনা অফিসার ঘটালেও তাদের বিদ্রোহের পেছনে জাতির সম্মতি ছিল।
শেখ মুজিবুর রহমান ফেরেশতা ছিলেন না, কিন্তু তার অনেক সদ্গুণ ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা হিসেবে তিনি অবশ্যই জাতির পিতা ছিলেন। তিনি উপমহাদেশের হানাহানি আর বিবাদের অবসান করতে চেয়েছিলেন। কট্টর যুদ্ধাপরাধী বলে শনাক্ত করা ১৯৫ পাকিস্তানি সৈন্যকে মুক্তি দিতে তিনি সেজন্যই রাজি হয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী ও ভুট্টোর সঙ্গে শিমলা চুক্তি করেছিলেন, স্বয়ং লাহোর সফর করেছেন তিনি। স্বদেশেও তিনি সামাজিক শান্তি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। সেজন্য যারা স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল তাদের জন্য তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসা
স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে দেশে মোটামুটি সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত মুজিবের মেয়ে শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছর দিল্লিতে গোয়েন্দা বাহিনী র’-এর হেফাজতে থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন ঘৃণা আর প্রতিহিংসার বাসনা নিয়ে। তার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের ১৩ দিনের মাথায় রাষ্ট্রপতি জিয়া এক গভীর ষড়যন্ত্রে নিহত হন, যে ষড়যন্ত্রের কোনো সুরাহা আজও হয়নি। জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন দিয়েছেন শেখ হাসিনা, ওই স্বৈরতন্ত্রকে ৯ বছর স্থায়ী হতে সাহায্য করেছেন।
নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে হাসিনা দু’বার ক্ষমতা পেয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। জাতির দুর্ভাগ্য, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বক্ষণ তিনি প্রতিহিংসার মন্ত্র প্রচার করেছেন, জাতীয় ঐক্য ও সংহতি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। বর্তমান দফায় ক্ষমতা পেয়ে তিনি ‘বিচার বিচার’ স্লোগান তুলেছেন। কিন্তু কার বিচার, কিসের বিচার? তার দুই দফা প্রধানমন্ত্রিত্বকালে যে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছে, হাজার হাজার নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে, তাদের বিচার? সাংবাদিক হত্যার বিচার? রুনি ও সাগরের হত্যার বিচার? মোটেই নয়। চার দশক আগে কী ঘটেছিল অথবা ঘটেছিল বলে কল্পনা করা হচ্ছিল, সেসবের বিচারের নামে তিনি আবার বাংলাদেশের আকাশ-বাতাসকে ঘৃণার ধোঁয়ায় বিষাক্ত করে দিয়েছেন। যারা তাঁর সমালোচনা করে তাদের সবাইকে যুদ্ধাপরাধী অপবাদ দিয়ে জেলে পোরা হচ্ছে। গদি রক্ষার জন্য তিনি জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক সম্পদকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশী জাতি অতীতকে ভুলে যেতে চেয়েছিল, মুজিবকে তারা জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সমাহিত অতীতকে শান্তিতে থাকতে দেননি। কী প্রয়োজন ছিল অযথা মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ইত্যাদি মিথ্যা খেতাব দেয়ার? শেখ হাসিনা মনে করেন, তার বাবা (এবং হয়তো তিনি স্বয়ং) ছাড়া বাংলাদেশে আর কারও কোনো অবদান নেই। শহীদ জিয়াউর রহমান ও তার পরিবারকে তিনি অশ্রাব্য গালাগাল করেন, জিয়ার পরিবারকে হয়রানি করার কোনো চেষ্টারই তিনি ত্রুটি রাখেন না।
একথা শেখ হাসিনা একবারও কি ভাবেন না যে, ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়? জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে তার অবিরাম গীবতের কারণে অনেকেই এখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার ও তার বাবার ভুল-ত্রুটি অন্যায়-অবিচারের ঘটনাগুলো খুঁড়ে বের করতে বাধ্য হচ্ছেন। হাসিনা নিজের মানসম্মান নিয়ে চিন্তিত কিনা জানি না, কিন্তু জাতির পিতার স্মৃতিকে নতুন করে অবমানিত করার, তার ভাবমূর্তিকে নতুন করে হত্যা করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
মুজিব ভাইয়ের জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে তার কথা ভাবি। কিন্তু আর কোনো লেখকের মতো স্তব-স্তুতি-ভারাক্রান্ত মিথ্যা লিখতে ইচ্ছা করে না। তখন মনে পড়ে যায়, সত্তরের দশকে যারা তাকে স্তব-স্তুতি দিয়ে ভুলিয়ে রেখে তার ও জাতির সর্বনাশ করেছিল তাদের কথা। শেখ হাসিনা অতীত থেকে শিক্ষা নেননি। বরং অতীতের ভুল-ত্রুটিগুলোর অনুকরণ করতে চাইছেন তিনি। তার বাকশালী মনোভাব বাংলাদেশকে কোনো কল্যাণ দিতে পারবে না, যেমন পারেনি পঁচাত্তরের বাকশাল। (লন্ডন, ১৯.০৩.১২)
serajurrahman@btinternet.com