Amardesh
আজঃঢাকা, শুক্রবার ১৬ মার্চ ২০১২, ০২ চৈত্র ১৪১৮, ২২ রবিউস সানি ১৪৩৩ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বই আলোচনা

« আগের সংবাদ
তথ্যবহুল ও আকর্ষণীয় স্মৃতিচারণ
মোহাম্মদ ইসহাক

সম্প্রতি ফজলে রাব্বি রচিত ‘স্মৃতিতে বাংলা একাডেমী’ বইটির ঘরোয়া প্রকাশনা উত্সব হলো নানা স্মৃতিতে ঘেরা মরহুম সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়ার বাড়িতে। যিনি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে সচিবালয়ে গিয়ে প্রথমেই নির্দেশ দেন বাংলা একাডেমী স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে নথি খুলতে। সাহসী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আজিজুল হক নান্না মিয়ার ১৪ পূর্ব তেজতুরি বাজারে অবস্থিত বিশাল বাড়ি এখনো গাছগাছালিতে ভরা, মনোরম পরিবেশ, ভূমিদস্যুদের থাবা স্পর্শ করতে পারেনি। আজও তেমনি আছে আগের মতো। চমত্কার খোলামেলা, বাড়িটি দেখলে তার মনের বিশালতাকে বোঝায়।
ফজলে রাব্বি পরিবার পরিজন নিয়ে এই বাড়িতে আছেন অনেকদিন থেকে। জীবনে পড়ন্ত বেলায় কিছু লেখালেখি করে সময় কাটে। গ্রন্থ ও গ্রন্থজগতের সঙ্গে তার এই দীর্ঘ মিতালী। কর্মজীবনের মধুর স্মৃতি বাংলা একাডেমী তার প্রিয় প্রাঙ্গণ। যেখানে জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়গুলো কেটেছে। তাই তার ‘স্মৃতিতে বাংলা একাডেমী’ বইয়ের শুরুতে লিখলেন—‘ভাগ্যের কী অপূর্ব খেলা। হতে চেয়েছিলাম ডাক্তার, কয়েক মাস ডাক্তারি পড়েও ছিলাম। অবশেষে পড়া শুরু করলাম বাংলা সাহিত্য নিয়ে এবং আমার কর্মস্থল হলো বাংলা একাডেমী।’
‘স্মৃতিতে বাংলা একাডেমী’ জাগৃতি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত ১৯২ পৃষ্ঠার চমত্কার ছাপা ও বাঁধাই করা একটি বই। লেখক তিনটি পর্বে বিভক্ত করেছেন পুরো বইটিকে। এক. সূচনা পর্ব (১৯৬০-১৯৬৭), দুই. দ্বিতীয় পর্ব (১৯৬৭-১৯৭২), তিন. তৃতীয় পর্ব (১৯৭২-১৯৭৯)। প্রতিটি পর্বই খুব সুখপাঠ্য। একাডেমীতে কর্মজীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি নানা কাহিনী, নানা গল্প অর্থাত্ আঠার বছরের খতিয়ান তিনি পলে পলে সাজিয়ে গেছেন প্রাঞ্জল ভাষা দিয়ে। মজার মজার ঘটনা দিয়ে। তিনি ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমীর চাকরিতে যোগ দেন। বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫৫ সালে। পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু হয় ১৯৬০ সালে। মাত্র এক বছরের ব্যবধান। বলা চলে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি বাংলা একাডেমীর সঙ্গে জড়িত। তার হাতেই গড়ে উঠেছিল এই বিভাগের অন্যতম একটি শাখা মুদ্রণ শাখা অর্থাত্ প্রেস। প্রেসের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণ, মেশিনপত্র ক্রয়, জনবলের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি কাজের মধ্যে তার আনন্দ-বেদনা ছিল এবং নতুন নতুন অভিজ্ঞতার কথা সব তুলে ধরেছেন বইটির পাতায় পাতায়।
তখন বাংলা একাডেমীর চাকরি ছিল অনেক গৌরবজনক। এই মনোভাব সবার মধ্যে কাজ করত। এমনকি সবার মধ্যে প্রচণ্ড রকম দেশপ্রেম ছিল। বাংলা একাডেমী এ দেশের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির সূতিকাগার। একাডেমীর লক্ষ্যই ছিল বাংলা ভাষার উন্নতিসাধন।
তাই প্রবল উত্সাহ উদ্দীপনা নিয়ে একাডেমীর কাজে সবাই নিজ নিজ দায়িত্বে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফজলে রাব্বিও এই অনুভূতিতে কাজ করেছেন। পরিচালক সৈয়দ আলী আহসান থেকে ড. কাজী দীন মুহাম্মদ, কবীর চৌধুরী, ড. মযহারুল ইসলাম, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, ড. মুস্তাফা নূর উল ইসলাম, সবশেষে ড. আশরাফ সিদ্দিকী—সবার সঙ্গে কাজ করে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাদের যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তার বয়ান তিনি খুব সুন্দরভাবে সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন, যা বাংলা একাডেমীর ইতিহাসেরই একটি অংশ।
তার এই দীর্ঘ চলার পথে এদেশের তত্কালীন শ্রেষ্ঠ কবি, সাহিত্যিক, পণ্ডিত ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের খুব কাছে থেকে দেখেছেন। তাদের চমত্কার সান্নিধ্য যা তাকে আপ্লুত করেছে, অভিভূত করেছে তিনি কিছু কিছু ঘটনা উল্লেখ করে তা উপস্থাপন করেছেন। ‘অধ্যাপক মনসুর উদ্দীনের কথা... ‘হারামণি’ তার লোকসাহিত্য সঙ্কলন গ্রন্থ। বই ছাপার কাজ প্রায় সমাপ্ত এমন সময়, তিনি হয়তো একগোছা বাজে কাগজে হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি এনে দিলেন। বললেন, বইয়ের শেষ অংশে যোগ করতে হবে। স্যারের পাণ্ডুলিপি এমনি হতো।’ ‘কবি শামসুর রাহমানের ছড়ার বইয়ের ছবি আঁকতে দিয়েছিলেন কাইয়ুম ভাইকে। আর সেই ছড়ার বই প্রকাশ করতে ইতিহাস সৃষ্টি হলো। কাইয়ুম ভাই আজ কাল করে করে বছরের পর বছর পার করতে লাগলেন, কিন্তু ছবি আর আঁকা হয় না। একদিন শামসুর রাহমান ভাই বললেন—যার জন্য ছড়াগুলো লিখেছি, সে তো বড় হয়ে যাচ্ছে। আমার ছড়ার বই প্রকাশ কবে হবে?’
‘অন্যদিকে কবি আহসান হাবীবের একটি ছড়ার বই ছাপাতে দেয়া হয়েছিল আমাদের সবার ঘনিষ্ঠ একজন প্রগতিশীল সাহিত্য প্রকাশকের প্রেসে... বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর। আর শামসুর রাহমানের ছড়ার বইটির নাম ছিল ‘ধান ভানলে কুঁড়ো দেব’। বই দু’টি অবশেষে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করার ১৪ বছর পর।’
এমনি আরও মজার মজার ঘটনা আছে। গভর্নর মোনায়েম খানের পরিচালক নিয়োগের ইন্টারভিউ খুব মুখরোচক।
একাত্তরের মার্চের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর বর্ণনা খুবই লোমহর্ষক। ‘জীবনের ভয়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে তৈরি করা সেই স্টেটমেন্টে সই করে কেউ হলেন শহীদ আবার কেউ হলেন কোলেবরেটর। এমনি এক অবস্থার মধ্যে জানি না, কেন কখনো ভূতের গলিতে, কখনো নারায়ণগঞ্জে, কখনো রাজারবাগে, কখনো এলিফ্যান্ট রোডে নিজের বাসায় স্থান পরিবর্তন করে চলেছি আর অফিস করছি।’
১৯৭৩ সালে জাপানে বুক প্রোডাকশন প্রশিক্ষণ কোর্সে যোগ দেয়ার জন্য ফজলে রাব্বির নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। অথচ মন্ত্রণালয়ের অবস্থা কী ভয়ানক। ‘যেখানে স্বয়ং সচিব ও মন্ত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন সেখানে সেকশন কর্মকর্তা নথি চাপা দিয়ে ফেলে রেখেছে।...আর একটু হলে সম্ভবত দুই দিন বিলম্ব হলে ফেলোশিপ বাতিল হয়ে যেত। বাংলাদেশ থেকে কেউ সেই প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করতে পারত না। সচিবালয়ের এমন অবস্থা আজও অপরিবর্তিত রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কলকাতায় বাংলাদেশী বইয়ের প্রতি ভারতীয় প্রকাশক ও লেখকদের মনোভাব প্রকাশ করতে গিয়ে ফজলে রাব্বি লিখেছেন—‘আমরা যখনই কোন প্রদর্শনীর আয়োজন করতাম, তখনই প্রকাশকদের সঙ্গে, লেখকদের সঙ্গে কলকাতায় কীভাবে বাংলাদেশের বই সহজলভ্য করা যায় আলোচনা করতাম। ফল কিছুই হতো না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার কলকাতার পত্র-পত্রিকায় মুসলমান নামগুলো সঠিকভাবে লেখা হতো না। আমার নাম রাব্বির স্থলে ছাপা হয়েছিল রবি আর শামসুজ্জামান খান-এর স্থলে হয়েছিল শ্যাম সুন্দর খান।’
‘স্মৃতিতে বাংলা একাডেমী’ ফজলে রাব্বির সাম্প্রতিক প্রকাশনা। বইটি স্মৃতিচারণমূলক হলেও তথ্যবহুল। অনেক ঘটনার সাক্ষী। প্রকাশনা উত্সবে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক এএফ সালাউদ্দিন আহমদ। সভাপতি ছিলেন বাংলা একাডেমীর প্রাক্তন মহাপরিচালক অধ্যাপক মুনসুর মুসা। সবাই বইটির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রকাশককে ধন্যবাদ জানান বইটি প্রকাশের জন্য। দৈনিক আমার দেশ-এর ফিচার সম্পাদক হাসান হাফিজকে অজস্র ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জনাব ফজলে রাব্বি লেখাটি ধারাবাহিকভাবে আমার দেশ-এ প্রকাশের জন্য। মূলত তারই ঐকান্তিকতায় ও অনুপ্রেরণায় লেখাটি তৈরি করতে পেরেছেন বলে জানালেন ফজলে রাব্বি।
বইয়ের শেষে তাঁর একটি মন্তব্য খুব ভালো লেগেছে। ‘মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় যৌবনকাল; আমার সেই যৌবনকালের আঠারটি বছর বাংলা একাডেমীর কাজে ব্যয় করার আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, বই প্রকাশ করা খুব কঠিন কাজ নয়। কঠিন হচ্ছে বই বাজারজাত করা, পাঠক সৃষ্টি করা। তাই বাংলা একাডেমীর প্রকাশনা ও মুদ্রণের সীমাবদ্ধ কর্মক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম বই প্রকাশনায় নয়, বইয়ের পাঠক সৃষ্টির কাজে, বই সবার জন্য করার বিশাল ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য।’
তিনি অবশ্য বাংলা একাডেমী থাকতেই নারায়ণগঞ্জ তার পিত্রালয়ে সুধীজন পাঠাগার গড়েছেন। সুধীজন পাঠাগারটি সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশে বেসরকারি পাঠাগারের মডেল হয়ে যেটি তারই চিন্তার ফসল। এভাবে তিনি নিজের গ্রামে পাঠাগার গড়েছেন এবং বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে লাইব্রেরি গড়ার আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশ বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সমিতি নামে একটি সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা তিনি। পাঠক ও পাঠাগার তৈরির কাজে তার আপ্রাণ চেষ্টা আজও অব্যাহত রয়েছে।
তাঁর ‘স্মৃতিতে বাংলা একাডেমী’ বই একটি অনন্য সুন্দর প্রকাশন। বইটির বহুল প্রচার কামনা করছি। প্রাপ্তিস্থান : ৩৩ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা-১০০১, মূল্য : ৩০০ টাকা।

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে মূল্যবান গ্রন্থ

আফরীনা মামুন

কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ অব বাংলাদেশ। মো. আতিকুর রহমান, মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব, মো. সোলায়মান
প্রকাশক : ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস), রাজশাহী।
প্রকাশকাল : জানুয়ারি, ২০১২
মূল্য : ২৫০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২২৮
ঐতিহ্য একটি জাতির সম্পদ, সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয়। ঐতিহ্যের গৌরবগাথা নিয়ে তরুণ প্রজন্ম অহঙ্কার করে। সংস্কৃতির মেলবন্ধনে বয়স, ধর্ম, লিঙ্গ, শিক্ষা, গ্রাম ও শহর একাকার হয়ে যায়। যে জাতীয় ঐতিহ্য যত প্রাচীন, ইতিহাসে তার অবস্থানও তত সুদৃঢ়। তেমনি যে সংস্কৃতি সবাইকে বক্ষে ধারণ করে সব ভেদাভেদ ভুলে একাকার করে দেয়, সে সংস্কৃতি কালোত্তীর্ণ এমনকি দেশোত্তীর্ণও বটে। ‘কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ অব বাংলাদেশ’ বইটি পড়ে আমরা এই সত্যই উপলব্ধি করি।
বাংলার বিলীয়মান সংস্কৃতি যেমন বহু রঙে রঞ্জিত উপাখ্যান সংবলিত নকশিকাঁথা, এক কালের বিশেষ বাহন পালকি, নানা কাজে ব্যবহৃত বিচিত্র নাম ও আকৃতির নৌকা, অবহেলিত রিকশাচিত্র এবং প্রায় বিলুপ্ত পুঁথি সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা বইটিকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে এক ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতাও পূরণ করেছে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে উপজীব্য করে ইংরেজিতে লেখা এ জাতীয় বইয়ের সংখ্যা হাতেগোনা। পুরো বিষয়বস্তুকে চারটি অংশে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম অংশে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, দ্বিতীয় অংশে ইতিহাস, তৃতীয় অংশে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং চতুর্থ অংশে সমাজ, অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবিষয়ক আলোচনাকে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করে দেখালে পাঠকের জন্য আরও আকর্ষণীয় হতো। তবে সন্নিবেশিত গ্রন্থপঞ্জী (ইরনষরড়মত্ধঢ়যু) ও টীকাপুঞ্জ (এষড়ংংধত্ু) বইটির মান বৃদ্ধি করেছে। প্রচ্ছদে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নান্দনিক উপস্থাপন বইটির শ্রীবৃদ্ধি করেছে।
পাঠ্যসূচির অতিরিক্ত বিষয় সংযুক্ত হওয়ায় বইটির মান বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রণ প্রমাদ সম্পর্কে আর একটু সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন ছিল। এরকম একটি বইয়ের কাগজের গুণগত মান আরও উত্কৃষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। মৃিশল্প, কারুশিল্প, লোকজ খেলনা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এখানে অন্তর্ভুক্ত হলে বইটি আরও পূর্ণতা পেত। পরবর্তী সংস্করণে বইটির সাদা-কালো ছবিগুলো আয়তনে আর একটু বড় হলে দৃষ্টিনন্দন হবে। বাংলা ভাষায় একই মোড়কে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আলোচনা প্রায় দুর্লভ। ইংরেজি ভাষায় কিছু কিছু চর্চা হলেও বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে এমন একটি ব্যাপক তথ্যবহুল এবং সাদাকালো ও রঙিন চিত্র সংবলিত গ্রন্থ আমাদের জানামতে, এটিই প্রথম। সেই বিচারে বইটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষার চর্চা বিশেষ করে এ ধরনের বই লেখার প্রবণতা অনেক কম বলে আমরা বইটির দ্রুত একটি বাংলা অনুবাদের প্রত্যাশা করি। হ




সহজবোধ্য ভাষায় ও পাণ্ডিত্যসহকারে শ্রেণী দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বিশ্লেষণ
হায়দার আকবর খান রনো বাংলাদেশ কমিউনিস্ট আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় নেতা। ষাটের দশকে নতুন ধারার শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি। রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ওপর লিখেছেন অনেক প্রবন্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথ শ্রেণী দৃষ্টিকোণ থেকে’ গ্রন্থের রয়েছে বিশেষ তাত্পর্য।
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে অতীতেও বহু গবেষণা ও লেখালেখি হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। এই বইয়ে লেখক সহজবোধ্য ভাষায় ও পাণ্ডিত্যসহকারে শ্রেণী দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে বিশ্লেষণ করেছেন। সাম্প্রদায়িক বা অতি-বাম সঙ্কীর্ণ জায়গা থেকে রবীন্দ্রবিরোধী ধারণা খণ্ডন করা হয়েছে। এই বইয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের শ্রেণী সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে লেখকের মতে, সামগ্রিক বিবেচনায় যে অবদান প্রগতিবাদী ও মুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রে তার মূল্য অপরিসীম। লেখক আরও বলতে চেয়েছেন, চূড়ান্ত বিচারে রবীন্দ্রনাথ জনগণেরই কবি, তিনি উচ্চ শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক জগতের অভিজাত কিছু লোকের সম্পত্তি নন।
এই বইয়ের নিবন্ধগুলোর শিরোনাম হচ্ছে—পাকিস্তানি মানসিকতায় রবীন্দ্রনাথ, অতি-বাম সঙ্কীর্ণ জায়গা থেকে রবীন্দ্রবিরোধিতা, শিল্প-সাহিত্য প্রসঙ্গে মার্ক্সবাদ, ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণ, রবীন্দ্রকাব্যে ভাববাদ ও বাস্তবমুখিতা, রবীন্দ্রনাথ ও রাজনীতি, ‘ধর্ম, জাতিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ’, রবীন্দ্রসাহিত্যে নারী, ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি উপন্যাস, রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি নাটক, রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তা, রাশিয়ার চিঠি—তীর্থ দর্শনের অভিজ্ঞতা, সভ্যতার সঙ্কট।
রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক চিন্তা, ধর্ম, তার উপন্যাস, গল্প, কাব্য, নাটক, ভ্রমণ কাহিনী ইত্যাদি বিষয়ের চুম্বক আলোচনা সহজবোধ্য ভাষায় পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন লেখক। রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক কাল, তার কাব্য এবং সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়ে দিক পরিবর্তন ও উত্তরণের বিষয়গুলো কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন হায়দার আকবর খান। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের কিছু গল্প, উপন্যাস ও নাটক নিয়ে অল্পবিস্তর আলোকপাত করা হয়েছে বইটিতে।
রাজনৈতিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ আলোচনা করতে গিয়ে লেখক বলেছেন, ১৯১০ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ‘গোরা’র যে বাণী, তা হিন্দুত্ববাদের ঊর্ধ্বে বিশ্বমানবতাকে তুলে ধরেছিল। সমাজ প্রগতির ধারায় ‘গোরা’র অবস্থান উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রচিত ‘সভ্যতার সঙ্কট’ রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তার দলিলও বটে।
গ্রন্থটি দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশের ক্ষেত্রে ভূমিকা বলে আশা করা যায়, সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের সাড়াও আশা করা যায়।
২৭২ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে গণসংস্কৃতি কেন্দ্র। প্রচ্ছদ এঁকেছেন কাজী সাইফুদ্দিন আব্বাস। বইটির মূল্য ৩৫০ টাকা।

এক মলাটে ইংরেজদের ভারত আগমন থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ধারাবাহিক ইতিহাস

মো. আবদুল কাইয়ুম ঠাকুর দীর্ঘ তিন বছর অক্লান্ত শ্রম, সাধনা আর যত্নে ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’ নামক বইটি লেখেন। বইটিতে ইংরেজদের ভারত আগমন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জন্মলাভ পর্যন্ত চিত্র ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তুলে ধরা হয়েছে। ভারতবর্ষে ইংরেজদের আগমন ঘটেছিল বণিক হিসেবে। একপর্যায়ে বণিকের পরিচয় ছাপিয়ে তারা হয়ে ওঠে শাসক। তারপর ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন এক প্রহসনমূলক যুদ্ধের মাধ্যমে ইংরেজদের কাছে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর গোটা ভারতবর্ষে ইংরেজদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইংরেজদের অপশাসনের বিরুদ্ধে সর্বত্রই চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল। ছোটখাটো বিদ্রোহ সবসময় লেগেই থাকত। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পথ ধরেই একপর্যায়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয়।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ উপমহাদেশের এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি বাতিল হয় ১৯১১ সালে। ১৯১৯ সালে সংঘঠিত হয় জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। তারপর ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্রমবিকাশ, ভারতের স্বাধীনতা লাভ, পাকিস্তানের জন্ম, ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪’র নির্বাচন, ১৯৫৮’র সামরিক শাসন, ১৯৬৬’র ছয় দফা, ১৯৬৭’র আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের বাস্তব ও সংক্ষিপ্ত চিত্র ইতিহাসের নিরিখে তুলে ধরে পলাশী থেকে বাংলাদেশে বইটি লিখেছেন মো. আবদুল কাইয়ুম ঠাকুর।
চারটি অংশে বইটি সমাপ্ত। প্রথম অংশে ভারতে ইউরোপীয়দের আগমন, পলাশীর যুদ্ধ, সিরাজউদ্দৌলার বন্দিত্ব ও মৃত্যু, সিরাজউদ্দৌলার মূল্যায়ন, পলাশীর ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম, বাংলার সুবেদার/নবাবদের বিষয় আলোচিত হয়েছে।
দ্বিতীয় অংশে পলাশীর যুদ্ধ, উত্তর বাংলা ও ভারতের চালচ্চিত্র, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবিস্তার, ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধ, ফকির ও কৃষক বিদ্রোহ, ফরায়েজী আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, বঙ্গভঙ্গ ইত্যাদি বিষয় স্থান পেয়েছে।
তৃতীয় অংশে ভারতের স্বাধীনতার ক্রমবিকাশ, খেলাফত আন্দোলন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন, মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি, ভারত ছাড় আন্দোলন, ভারতের স্বাধীনতা লাভ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ইত্যাদি বিষয় স্থান পেয়েছে।
বইটির চতুর্থ ও শেষ অংশে বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভক্তি, ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন, কাশ্মীর সমস্যা ও পাক-ভারত যুদ্ধ, সত্তরের নির্বাচন, ২৬ মার্চ প্রদত্ত ইয়াহিয়া খানের ভাষণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকার গঠন, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।
ধ্রুব এষের প্রচ্ছদে সিঁড়ি প্রকাশন থেকে বোরোনো বইটির মূল্য ৫০০ টাকা।
ছন্দের মনমাতানো শব্দ, পদ্যের গীতল স্পন্দন, অন্ত্যমিল আর মাত্রার খেলায় ‘১০০ ফুলের ঢেউ’

মালেক মাহমুদ একজন শিশুসাহিত্যিক। শিশুদের জন্যই মূলত লেখালেখি করেন তিনি। তাকে আপাদমস্তক শিশুসাহিত্যিক হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। এ পর্যন্ত প্রকাশিত তার বেশিরভাগ বই ছড়া ও কবিতার। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলো থেকে বাছাই করা ১০০টি ছড়া-পদ্য নিয়ে সংকলিত হয়েছে এ গ্রন্থ ‘১০০ ফুলের ঢেউ’। বেশ চমত্কার নাম। বইটি শিশুদের মনে আবেগ ছড়াবে নিশ্চয়ই, এমনকি বড়দেরও। এতে আছে ছন্দের মনমাতানো শব্দ, পদ্যের গীতল স্পন্দন, অন্ত্যমিল আর মাত্রার খেলা। ছড়া পড়ে সাধারণত পাঠক আনন্দিত হয়, পাঠকের আবেগকে নাড়া দেয় এই ছড়া। ঠিক তেমনি গ্রন্থটি ছোটদের সঙ্গে সঙ্গে বড়রাও সমান আনন্দ পাবেন বলে আশা করা যায়। এ বইয়ের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছড়া-কবিতা হচ্ছে— বাংলাদেশকে জানো, মেঘের নদী, আমার গাঁয়ের মাটি, মা, রাস্তা এখন নদী, ধানশালিকের দেশ, লোডশেডিং, সোনার ফসল, এই পতাকা হাতে নিয়ে, যুদ্ধে যাবো, শীতের পাখি, মাটির বুকে ফুল ফুটাতে, স্বপ্ন নাতো কল্পনা, আমাদের দেশ, গাঁয়ের মেয়ে, বন্দিখাঁচার পাখি, জোছনামাখা রাতে, ঝালমুড়ি, এক টুকরো জমি, স্বপ্নরাজ্যের ডানা, যোদ্ধা বাবা, টুকরো ছড়া ইত্যাদি। ১১১ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশ করেছে বিভাস আর প্রচ্ছদশিল্পী হচ্ছেন ধ্রুব এষ। আলী ইমাম ও হাসান হাফিজকে উত্সর্গ করা এ বইয়ের মূল্য ১৫০ টাকা। হ
আসাদ সায়েম