যৌথ নদী কমিশন বৈঠকে বসতে রাজি নয় ভারত
এম এ নোমান
ফেনী নদীর পানিসহ বাংলাদেশের কাছ থেকে একতরফা স্বার্থ আদায়ের পর যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠকে আর বসতে রাজি হচ্ছে না ভারত। টিপাইমুখ বাঁধ প্রসঙ্গ, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি ও গঙ্গাচুক্তির পর্যালোচনাসহ অভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে বারবার চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এতে কোনো সাড়া দেয়নি। গত বছর সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর ব্যর্থ হওয়ার পর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় তিস্তা চুক্তি বিষয়ে দু’দেশের মধ্যে ফের আলোচনা শুরু করতে এরই মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে তিনটি চিঠি দেয়া হয়েছে। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বসা তো দূরের কথা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এসব চিঠির একটিরও জবাব দেয়নি ভারত। সর্বশেষ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের নিজস্ব নদী ফেনী থেকে পানি আদায় করে নেয়ার পর ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় পানি সমস্যা নিয়ে আর বৈঠকে বসতে রাজি হচ্ছে না। ফেনী নদী থেকে পানি নেয়া বিষয়ে চুক্তির আগ পর্যন্ত ভারতই দুই দেশের মধ্যে বৈঠকের বিষয়ে বেশি আগ্রহ দেখাত। ড. মনমোহন সিংসের সফরে তিস্তা চুক্তিসহ পানি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আগ মুহূর্তেও ভারত পানিবণ্টন বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে। বাংলাদেশকে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দেবে—এই আশ্বাস দিয়েই মূলত ভারত ফেনী নদীর পানি নিতে বাংলাদেশকে চুক্তিবদ্ধ হতে বাধ্য করে। তারা বলেন, তিস্তা ও বরাক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে ভারত বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে। অথচ এরই মধ্যে ভারত কৌশলে বাংলাদেশের কাছ থেকে ফেনী নদীর পানি নেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। ফেনী নদী থেকে দিনে পৌনে দুই কিউসেক পানি নেয়ার কথা থাকলেও
তারা মূলত প্রতিদিন ৭৫ কিউসেক পানি তুলে নিচ্ছে। এতে ফেনী নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল সেচ প্রকল্পগুলোও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বারবার অনুরোধের পরও যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বসতে ভারতের অনাগ্রহ ও বাংলাদেশের স্বার্থহানি বিষয়ে জানতে পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে ফোন করলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। যৌথ নদী কমিশনের বাংলাদেশের সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও দু’দেশের পানিবণ্টন সমস্যা ও যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে পানিবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তিস্তা ও বরাক নদীর পানিসহ অন্যান্য নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি আন্তর্জাতিক আইনসম্মত অধিকার। ভারত একতরফা বাংলাদেশের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে আর সরকারও সব কিছু উজাড় করে দিচ্ছে। তারা বলেন, ভারতের স্বার্থ পরিপূর্ণভাবে আদায় হয়ে গেছে। এখন সরকার শুধু নিয়ম রক্ষার জন্যই ভারতের সঙ্গে চিঠি চালাচালি করছে। তারা বলেন, চিঠি চালাচালির পরিবর্তে এখন সরকারের উচিত হবে এ বিষয়ে জাতীয়ভাবে একটি কনভেনশন করা। দল-মত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও পেশাজীবীদের সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত কনভেনশন থেকে প্রস্তাব গ্রহণ করে তা ভারতকে জানিয়ে দিতে হবে। ভারত এই প্রস্তাবে সাড়া না দিলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের দাবির ন্যায্যতা তুলে ধরতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অংশ হিসেবেই যৌথ নদী কমিশনকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। ভারতের অবজ্ঞা, অবহেলা আর অনীহা এবং বাংলাদেশের কার্যকর ভূমিকার অভাবে যৌথ নদী কমিশন এখন একটি মৃত সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
স্বার্থ আদায়ের পর জেআরসির বৈঠকে ভারতের অনীহা : ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদনদীর পানিবণ্টন, নদী ভাঙন রোধ, জেগে ওঠা চরের মালিকানা নির্ধারণসহ বিরাজমান এ সংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) গঠন করা হয়। ১৯৭৪ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সম্মত করতে ভারতের তাগিদেই মাত্র দুই বছরে জেআরসির ৭টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকেই এ কমিশনের বৈঠক বিষয়ে ভারত আর আগ্রহ দেখায়নি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রথম দুই বছরে ভারতের প্রয়োজন ছিল বলেই তারা তাগাদা দিয়ে ৭টি বৈঠক করিয়েছে। পরে ৩৭ বছরে সাকুল্যে বৈঠক হয়েছে মাত্র ৩০টি—জেআরসির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যদিও বছরে ৪টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। উভয় দেশের এ সংক্রান্ত যৌথ ঘোষণার ৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী অববাহিকার উন্নয়ন এবং জলবিদ্যুত্ শক্তি ও সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে যৌথ সমীক্ষা পরিচালনা ও যৌথ কার্যক্রম গ্রহণে উভয় দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। এছাড়া উভয় দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর ব্যাপক জরিপ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উভয় দেশের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন ও সেগুলোর বাস্তবায়নের উদ্দেশে দুই নদী কমিশন কাজ করবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিস্তাচুক্তির বিষয়টি সামনে এনে কারিগরিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে যৌথ নদী কমিশনের বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়। গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আগমুহূর্তে ঢাকায় দুই দেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা চুক্তির বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশের কাছে ফেনী নদী থেকে প্রতিদিন পৌনে দুই কিউসেক পানি চায়। ফেনী নদী থেকে পানি নিয়ে তারা ত্রিপুরার খাবার পানির সঙ্কট দূর করতে একটি পানি শোধনাগার স্থাপনের কথা বলে। এ চুক্তির পর ভারত এখন কমপক্ষে দিনে ৭৫ কিউসেক পানি তুলে নিচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী আমার দেশকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা যতটুকু জেনেছি ভারত ৭৫ কিউসেক পানি নিয়ে শোধনাগারে ব্যবহারের পাশাপাশি ত্রিপুরার সাবরম ও বিলোনিয়া এলাকায় সেচ প্রকল্প চালু করেছে। তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে ফেনী নদীতে গড়ে পানি থাকে ৪০০ কিউসেক। এ পানির ওপর ভরসা করেই চট্টগ্রামের মিরসরাই, ফেনীর দাগনভূঁইয়া, ছাগলনাইয়াসহ অন্যান্য এলাকার সেচ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এখন ভারত ফেনী নদীর পানি তুলে নেয়ার ফলে ওইসব সেচ প্রকল্পগুলো বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে নদীর নাব্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, ভারত ফেনী নদীর পানির জন্যই কিছুদিন বাংলাদেশের সঙ্গে বৈঠকে বসতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। তাদের স্বার্থ আদায়ের পর এখন আর বৈঠকে বসতে মোটেও রাজি হচ্ছে না। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানিয়েছে, ড. মনমোহন সফরের পর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিজ উদ্যোগে ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ভারতকে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বসার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয়া হয়। ভারত এখন পর্যন্ত একটি চিঠিরও জবাব দেয়নি।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও সুপারিশ : সাবেক সচিব ও বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ আ ন হ আখতার হোসেন বলেছেন, ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় আমাদের জীবন-মরণ সমস্যা। উজানের দেশ ভারতের পানি প্রত্যাহারের বিষয়ে ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের উদ্বিগ্ন ও উত্কণ্ঠিত হওয়ার কথা। জেআরসি হচ্ছে ভারতের কাছে বাংলাদেশের উদ্বেগ প্রকাশের একটি স্বীকৃত ফোরাম। কিন্তু ওই ফোরামকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। ভারত এ ফোরামকে তাদের মর্জি মতো ব্যবহার করছে। আর আমরা সবলের প্রতি দুর্বলের যে মনোভাব থাকে, তাই প্রকাশ করে আসছি। এখন আমাদের প্রাপ্তিনির্ভর করছে ভারতের করুণার ওপর। তিনি বলেন, আয়তনে ও শক্তির দিক থেকে ভারত যত বড়, প্রতিবেশীকে তার ন্যায্য হিস্যা প্রদানের ব্যাপারে ততই ছোট। ভারত যেমন তার রাজ্য সরকার ও আমলাদের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে আসছে; ঠিক বাংলাদেশ সরকারও তার জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ব্যাপারে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। তিনি বলেন, চাণক্যনীতি ও কূটবুদ্ধির মাধ্যমে জেআরসিকে অকার্যকর করে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করে নিচ্ছে। আর সরকারও ভারতকে ‘চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য থাকে’।
আন্তর্জাতিক নদী আইন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল যৌথ নদী কমিশনের বিষয়ে বলেন, জেআরসির মাধ্যমে ভারতের সদস্য ও তাদের প্রকৌশলীরা তাদের দেশের স্বার্থ আদায়ে যতটা গুরুত্ব দেন, ঠিক তার উল্টো চিত্র বাংলাদেশের ব্যাপারে। জেআরসিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সদস্য নিজ দেশের চেয়ে ভারতের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে কাজ করেন। জেআরসি অকার্যকর হয়ে পড়া ও এর বৈঠকে বসতে ভারতের অনীহার বিষয়ে ড. আসিফ নজরুল আরও বলেন, এর জন্য ভারতের চেয়ে আমাদের সরকারও কম দায়ী নয়। বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী বলেন, ‘ভারত টিপাইমুখে বাঁধ দিলে বাংলাদেশ লাভবান হবে।’ আবার কোনো মন্ত্রী বলেন, ‘ভারত আগে বাঁধ নির্মাণ করুক। তারপর কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা দেখে প্রতিবাদ করব।’ বাংলাদেশের মন্ত্রীদের মুখে এ ধরনের কথা শোনার পর ভারতের আর জেআরসির বৈঠকে বসার প্রয়োজন থাকার কথা নয়। ভারত না চাইতেই বাংলাদেশ উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ভারতকে একতরফা দিয়েই যাচ্ছে। তিনি বলেন, ভারত বুঝতে পেরেছে যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব আইনকানুন, রীতিনীতি ভেঙে বাংলাদেশ সরকার নিজেদের তিতাস নদী হত্যা করে এর বুকের ওপর দিয়ে রাস্তা বানিয়ে বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দিয়েছে। কাজেই বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা না দিলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি উঠবে না। এটা বুঝে-শুনে ভারত শুধু জেআরসিকেই নয়, বাংলাদেশের নাগরিকদের অবহেলা ও অবজ্ঞা করে চলেছে। বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী নাগরিকের বর্বর নির্যাতনের মাধ্যমে যার প্রমাণ বিশ্ববাসী সম্প্রতি পেয়েছে। আমাদের সরকার ভারতের প্রতি কতটা অনুগত ও করুণার পাত্র সেটার পরীক্ষা ভারত ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে নিয়েছে। সরকারের প্রতি পরামর্শ রেখে ড. আসিফ নজরুল বলেন, সরকারের উচিত হবে অতি তাড়াতাড়ি সব দলের ও মতের নাগরিকদের নিয়ে পানির হিস্যা আদায়ের বিষয়ে একটি জাতীয় কনভেনশন করা। এ কনভেনশনে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিষয়ে প্রস্তাব নিয়ে তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা। এর কোনো বিকল্প নেই।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের নিজস্ব নদী ফেনী থেকে পানি আদায় করে নেয়ার পর ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় পানি সমস্যা নিয়ে আর বৈঠকে বসতে রাজি হচ্ছে না। ফেনী নদী থেকে পানি নেয়া বিষয়ে চুক্তির আগ পর্যন্ত ভারতই দুই দেশের মধ্যে বৈঠকের বিষয়ে বেশি আগ্রহ দেখাত। ড. মনমোহন সিংসের সফরে তিস্তা চুক্তিসহ পানি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আগ মুহূর্তেও ভারত পানিবণ্টন বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে। বাংলাদেশকে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দেবে—এই আশ্বাস দিয়েই মূলত ভারত ফেনী নদীর পানি নিতে বাংলাদেশকে চুক্তিবদ্ধ হতে বাধ্য করে। তারা বলেন, তিস্তা ও বরাক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে ভারত বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে। অথচ এরই মধ্যে ভারত কৌশলে বাংলাদেশের কাছ থেকে ফেনী নদীর পানি নেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। ফেনী নদী থেকে দিনে পৌনে দুই কিউসেক পানি নেয়ার কথা থাকলেও
তারা মূলত প্রতিদিন ৭৫ কিউসেক পানি তুলে নিচ্ছে। এতে ফেনী নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল সেচ প্রকল্পগুলোও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বারবার অনুরোধের পরও যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বসতে ভারতের অনাগ্রহ ও বাংলাদেশের স্বার্থহানি বিষয়ে জানতে পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে ফোন করলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। যৌথ নদী কমিশনের বাংলাদেশের সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও দু’দেশের পানিবণ্টন সমস্যা ও যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে পানিবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তিস্তা ও বরাক নদীর পানিসহ অন্যান্য নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি আন্তর্জাতিক আইনসম্মত অধিকার। ভারত একতরফা বাংলাদেশের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে আর সরকারও সব কিছু উজাড় করে দিচ্ছে। তারা বলেন, ভারতের স্বার্থ পরিপূর্ণভাবে আদায় হয়ে গেছে। এখন সরকার শুধু নিয়ম রক্ষার জন্যই ভারতের সঙ্গে চিঠি চালাচালি করছে। তারা বলেন, চিঠি চালাচালির পরিবর্তে এখন সরকারের উচিত হবে এ বিষয়ে জাতীয়ভাবে একটি কনভেনশন করা। দল-মত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও পেশাজীবীদের সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত কনভেনশন থেকে প্রস্তাব গ্রহণ করে তা ভারতকে জানিয়ে দিতে হবে। ভারত এই প্রস্তাবে সাড়া না দিলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের দাবির ন্যায্যতা তুলে ধরতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অংশ হিসেবেই যৌথ নদী কমিশনকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। ভারতের অবজ্ঞা, অবহেলা আর অনীহা এবং বাংলাদেশের কার্যকর ভূমিকার অভাবে যৌথ নদী কমিশন এখন একটি মৃত সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
স্বার্থ আদায়ের পর জেআরসির বৈঠকে ভারতের অনীহা : ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদনদীর পানিবণ্টন, নদী ভাঙন রোধ, জেগে ওঠা চরের মালিকানা নির্ধারণসহ বিরাজমান এ সংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) গঠন করা হয়। ১৯৭৪ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সম্মত করতে ভারতের তাগিদেই মাত্র দুই বছরে জেআরসির ৭টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকেই এ কমিশনের বৈঠক বিষয়ে ভারত আর আগ্রহ দেখায়নি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রথম দুই বছরে ভারতের প্রয়োজন ছিল বলেই তারা তাগাদা দিয়ে ৭টি বৈঠক করিয়েছে। পরে ৩৭ বছরে সাকুল্যে বৈঠক হয়েছে মাত্র ৩০টি—জেআরসির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যদিও বছরে ৪টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। উভয় দেশের এ সংক্রান্ত যৌথ ঘোষণার ৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী অববাহিকার উন্নয়ন এবং জলবিদ্যুত্ শক্তি ও সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে যৌথ সমীক্ষা পরিচালনা ও যৌথ কার্যক্রম গ্রহণে উভয় দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। এছাড়া উভয় দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর ব্যাপক জরিপ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উভয় দেশের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন ও সেগুলোর বাস্তবায়নের উদ্দেশে দুই নদী কমিশন কাজ করবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিস্তাচুক্তির বিষয়টি সামনে এনে কারিগরিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে যৌথ নদী কমিশনের বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়। গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আগমুহূর্তে ঢাকায় দুই দেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা চুক্তির বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশের কাছে ফেনী নদী থেকে প্রতিদিন পৌনে দুই কিউসেক পানি চায়। ফেনী নদী থেকে পানি নিয়ে তারা ত্রিপুরার খাবার পানির সঙ্কট দূর করতে একটি পানি শোধনাগার স্থাপনের কথা বলে। এ চুক্তির পর ভারত এখন কমপক্ষে দিনে ৭৫ কিউসেক পানি তুলে নিচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী আমার দেশকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা যতটুকু জেনেছি ভারত ৭৫ কিউসেক পানি নিয়ে শোধনাগারে ব্যবহারের পাশাপাশি ত্রিপুরার সাবরম ও বিলোনিয়া এলাকায় সেচ প্রকল্প চালু করেছে। তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে ফেনী নদীতে গড়ে পানি থাকে ৪০০ কিউসেক। এ পানির ওপর ভরসা করেই চট্টগ্রামের মিরসরাই, ফেনীর দাগনভূঁইয়া, ছাগলনাইয়াসহ অন্যান্য এলাকার সেচ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এখন ভারত ফেনী নদীর পানি তুলে নেয়ার ফলে ওইসব সেচ প্রকল্পগুলো বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে নদীর নাব্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, ভারত ফেনী নদীর পানির জন্যই কিছুদিন বাংলাদেশের সঙ্গে বৈঠকে বসতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। তাদের স্বার্থ আদায়ের পর এখন আর বৈঠকে বসতে মোটেও রাজি হচ্ছে না। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানিয়েছে, ড. মনমোহন সফরের পর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিজ উদ্যোগে ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ভারতকে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বসার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয়া হয়। ভারত এখন পর্যন্ত একটি চিঠিরও জবাব দেয়নি।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও সুপারিশ : সাবেক সচিব ও বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ আ ন হ আখতার হোসেন বলেছেন, ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় আমাদের জীবন-মরণ সমস্যা। উজানের দেশ ভারতের পানি প্রত্যাহারের বিষয়ে ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের উদ্বিগ্ন ও উত্কণ্ঠিত হওয়ার কথা। জেআরসি হচ্ছে ভারতের কাছে বাংলাদেশের উদ্বেগ প্রকাশের একটি স্বীকৃত ফোরাম। কিন্তু ওই ফোরামকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। ভারত এ ফোরামকে তাদের মর্জি মতো ব্যবহার করছে। আর আমরা সবলের প্রতি দুর্বলের যে মনোভাব থাকে, তাই প্রকাশ করে আসছি। এখন আমাদের প্রাপ্তিনির্ভর করছে ভারতের করুণার ওপর। তিনি বলেন, আয়তনে ও শক্তির দিক থেকে ভারত যত বড়, প্রতিবেশীকে তার ন্যায্য হিস্যা প্রদানের ব্যাপারে ততই ছোট। ভারত যেমন তার রাজ্য সরকার ও আমলাদের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে আসছে; ঠিক বাংলাদেশ সরকারও তার জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ব্যাপারে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। তিনি বলেন, চাণক্যনীতি ও কূটবুদ্ধির মাধ্যমে জেআরসিকে অকার্যকর করে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করে নিচ্ছে। আর সরকারও ভারতকে ‘চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য থাকে’।
আন্তর্জাতিক নদী আইন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল যৌথ নদী কমিশনের বিষয়ে বলেন, জেআরসির মাধ্যমে ভারতের সদস্য ও তাদের প্রকৌশলীরা তাদের দেশের স্বার্থ আদায়ে যতটা গুরুত্ব দেন, ঠিক তার উল্টো চিত্র বাংলাদেশের ব্যাপারে। জেআরসিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সদস্য নিজ দেশের চেয়ে ভারতের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে কাজ করেন। জেআরসি অকার্যকর হয়ে পড়া ও এর বৈঠকে বসতে ভারতের অনীহার বিষয়ে ড. আসিফ নজরুল আরও বলেন, এর জন্য ভারতের চেয়ে আমাদের সরকারও কম দায়ী নয়। বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী বলেন, ‘ভারত টিপাইমুখে বাঁধ দিলে বাংলাদেশ লাভবান হবে।’ আবার কোনো মন্ত্রী বলেন, ‘ভারত আগে বাঁধ নির্মাণ করুক। তারপর কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা দেখে প্রতিবাদ করব।’ বাংলাদেশের মন্ত্রীদের মুখে এ ধরনের কথা শোনার পর ভারতের আর জেআরসির বৈঠকে বসার প্রয়োজন থাকার কথা নয়। ভারত না চাইতেই বাংলাদেশ উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ভারতকে একতরফা দিয়েই যাচ্ছে। তিনি বলেন, ভারত বুঝতে পেরেছে যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব আইনকানুন, রীতিনীতি ভেঙে বাংলাদেশ সরকার নিজেদের তিতাস নদী হত্যা করে এর বুকের ওপর দিয়ে রাস্তা বানিয়ে বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দিয়েছে। কাজেই বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা না দিলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি উঠবে না। এটা বুঝে-শুনে ভারত শুধু জেআরসিকেই নয়, বাংলাদেশের নাগরিকদের অবহেলা ও অবজ্ঞা করে চলেছে। বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী নাগরিকের বর্বর নির্যাতনের মাধ্যমে যার প্রমাণ বিশ্ববাসী সম্প্রতি পেয়েছে। আমাদের সরকার ভারতের প্রতি কতটা অনুগত ও করুণার পাত্র সেটার পরীক্ষা ভারত ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে নিয়েছে। সরকারের প্রতি পরামর্শ রেখে ড. আসিফ নজরুল বলেন, সরকারের উচিত হবে অতি তাড়াতাড়ি সব দলের ও মতের নাগরিকদের নিয়ে পানির হিস্যা আদায়ের বিষয়ে একটি জাতীয় কনভেনশন করা। এ কনভেনশনে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিষয়ে প্রস্তাব নিয়ে তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা। এর কোনো বিকল্প নেই।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া



