Amardesh
আজঃ ঢাকা, শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০১২, ১৫ মাঘ ১৪১৮, ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩ হিজরী     আপডেট সময়ঃ রাত ১.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ছানায় দেয়া হচ্ছে ফরমালিন : কর্তৃপক্ষ উদাসীন : পাবনা ও সিরাজগঞ্জে তৈরি হচ্ছে নকল দুধ ও ঘি

ওয়াহিদুজ্জামান, বেড়া (পাবনা)
পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় নকল দুধ ও ঘি তৈরি অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন এ অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ নকল দুধ ও ঘি। কিন্তু নকল প্রতিরোধে প্রশাসনের নেই কোনো তত্পরতা। নকল দুধ ও ঘি তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ছানার পানি, মিল্ক পাউডার, দুধের ননী, সয়াবিন, আলুর পেস্ট, হাইড্রোজ, লবণ, চিনি, ফরমালিন ও কালার ফ্লেভার। এছাড়া ছানা তাজা রাখার জন্য তাতে দেয়া হচ্ছে ফরমালিন। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই দুধ, ঘি ও ছানার তৈরি মিষ্টান্নদ্রব্য খেয়ে মানুষ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
জানা যায়, স্বাধীনতার পর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ীতে বড়াল নদীর পাড়ে স্থাপন করা হয় দুগ্ধজাতপণ্য উত্পাদন কারখানা বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা। এর আওতায় ৩৫০টি দুগ্ধ সমবায় সমিতি রয়েছে। সমিতিতে গো-খামার রয়েছে ছয় সহস্রাধিক। এসব সমিতি প্রতিদিন গড়ে আড়াই লাখ লিটার দুধ সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার গ্রাম এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গাভী পালন করা হয়। এসব গাভী থেকে আরও প্রায় ১ লাখ থেকে সোয়া লাখ লিটার দুধ পাওয়া যায়। এই দুধ মিল্কভিটাসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও ঘোষেরা কিনে থাকেন।
এই দুগ্ধ অঞ্চলকে টার্গেট করে প্রাণ, আকিজ, আফতাব, ব্র্যাক ফুড (আড়ং), আমো ফ্রেশমিল্কসহ বেশকিছু বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ করতে এ অঞ্চলে তাদের আঞ্চলিক ও শাখা দুগ্ধ সংগ্রহশালা স্থাপন করেছে। এর ফলে তরল দুধের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে কেন্দ্র করে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার তাদের জীবিকার পথ হিসেবে গাভী পালন ও দুধের ব্যবসা বেছে নিয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার গো-খামার। চাহিদার তুলনায় দুধ উত্পাদন কম হওয়ায় ছানা উত্পাদক এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা গোপনে নকল দুধ তৈরি করে আসল দুধের সঙ্গে মিশিয়ে বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করছে। বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নকল তরল দুধ সংগ্রহ করছে। পরে আসল দুধের সঙ্গে নকল দুধ মিশিয়ে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই দুধ চটকদার প্যাকেটে ভরে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে বাজারজাত করছে বলে জানা গেছে।
পাবনা ও সিরাজগঞ্জ প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ অঞ্চলে প্রতিদিন সাড়ে ৪ লাখ লিটার দুধের চাহিদা রয়েছে। উত্পাদন হচ্ছে সাড়ে ৩ লাখ লিটার। এরমধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার লিটার থেকে দেড় লাখ লিটার বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা, পৌনে ২ লাখ লিটার দুধ আফতাব, আকিজ, প্রাণ, অ্যামোফ্রেশ মিল্ক, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, ঘোষরা ৫০ থেকে ৫৫ হাজার লিটার, দুই শতাধিক মিষ্টির দোকান ১৫ হাজার লিটার, হাট-বাজারে স্থানীয় ক্রেতারা প্রায় ১০ হাজার লিটার দুধ কিনে থাকে। এ হিসেবে প্রতিদিন দুধের ঘাটতি পড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার। একশ্রেণীর অসাধু ঘোষ ও ব্যবসায়ী নকল দুধ তৈরি করে দুধের এই ঘাটতি পূরণ করে থাকে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সুজানগর, আটঘড়িয়া এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, তারাশ, বেলকুচি ও কাজীপুর উপজেলার ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা শতাধিক কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ১১ হাজার ২০০ কেজি (২৮০ মণ) ছানা তৈরি করে। ওই পরিমাণ ছানা তৈরিতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মণ দুধের প্রয়োজন হয়। ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা ছানা তৈরির পর ছানার পানি ফেলে না দিয়ে তা বড় বড় ড্রামে সংরক্ষণ করে রাখে। পরে ওই ছানার পানির সঙ্গে নানা উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় নকল দুধ। প্রতিটি কারখানায় সবসময় ২ থেকে ৫ হাজার লিটার ছানার পানি মজুত রাখা হয়।
জানা যায়, ১ মণ দুধ থেকে আট কেজি ছানা ও তিন কেজি (ননী) ফ্যাট পাওয়া যায়। ১ হাজার ৪০০ মণ দুধ থেকে ১১ হাজার ২০০ কেজি ছানা ও ৪ হাজার ২০০ কেজি ফ্যাট পাওয়া যায়। ২ কেজি ফ্যাট জ্বালিয়ে এক কেজি খাঁটি ঘি পাওয়া যায়। এ হিসেবে দুটি জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার ১০০ কেজি খাঁটি ঘি তৈরি হয়। ঘোষেরা এ অঞ্চলে উত্পাদিত ছানা সিলেট, চিটাগাং, কুমিল্লা, ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করে থাকে। সরবরাহকৃত ছানা সতেজ (তাজা) রাখার জন্য ফরমালিন দেয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
এ অঞ্চলের শতাধিক ছানা কারখানার ছানার পানিই নকল দুধ তৈরির প্রধান উপকরণ। কিছু আসাধু ব্যবসায়ী ও ঘোষ প্রতি মণ ছানার পানিতে আধা কেজি ননী, আধা কেজি মিল্ক পাউডার সামান্য পরিমাণ লবণ, খাবার সোডা, ১ কেজি চিনি ও দুধের কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে অবিকল দুধ তৈরি করছে, যা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া আসল না নকল বোঝার উপায় থাকে না। ঘোষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এ নকল দুধ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পাঠিয়ে দেন দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে। পরে প্রক্রিয়াজাত করার সময় নকল দুধের সঙ্গে আসল দুধ মিশে সব দুধই ভেজালে পরিণত হয়। ব্যবসায়ীরা দুধ তাজা রাখতে ফরমালিন ব্যবহার করছে। প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় আসল দুধ থেকে শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ফ্যাট (ননী) বের করে নেয়া হয়। এতে দুধের পুষ্টিমান কমে যায়। এ দুধ কিনে ক্রেতাসাধারণ প্রতারিত হচ্ছেন।
সূত্র জানায়, দুধের ল্যাকটো ও ঘনত্ব নির্ণয়ে ল্যাকটোমিটার ব্যবহার করে ভেজাল শনাক্ত করা যায় বলে নকল দুধে চিনি, লবণ, হাইড্রোজ ও সয়াবিন তেল ব্যবহার করা হয়। এতে দুধের ঘনত্ব ও ল্যাকটো বেড়ে যায়। দুধ তাজা রাখার জন্য দেয়া হয় ফরমালিন। ফলে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে ল্যাকটোমিটার দিয়ে এ সূক্ষ্ম প্রতারণা ধরা সম্ভব হয় না। তবে সংশ্লিষ্টরা নকল দুধ ও ঘি তৈরি করে বাজারজাতকরণের কথা অস্বীকার করেছেন।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. তাহমিনা এইচ খান জানান, খাঁটি ঘিয়ের গলনাঙ্ক হবে ২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এরকম তাপমাত্রাতেও এটি দানাদার হয়ে জমাট না বাঁধলে বুঝতে হবে এতে ভেজাল রয়েছে। ২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি এবং ৩০ ডিগ্রির কম তাপমাত্রায় খাঁটি ঘি জমে যাবে না। আসল ঘিয়ে পানি থাকবে শূন্য দশমিক ১ ভাগ। ভোজ্যতেলের গন্ধ হয় ভোঁতা এবং ঘিয়ের গন্ধ হবে চমত্কার। মানুষের জীবনরক্ষার্থে বাজারের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ঘি নিয়মিত পরীক্ষার জন্য বিএসটিআইকে তত্পর হতে হবে বলে তিনি জানান।
আলহাজ ডা. আবদুুল বাছেদ খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিষাক্ত দুধ পান করলে মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। ফরমালিন মেশানোর ফলে হেপাটোটক্সিকিটি বা লিভার রোগ, কিডনি রোগ, ক্ষতিকর মিল্ক পাউডারের ফলে মানবদেহে হাড়ের মধ্যকার দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে শরীরের পেছনের অংশে ব্যথা অনুভব, চর্মরোগ, হজমে সমস্যা, পেটের পীড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আর ভেজাল ঘি খাওয়া মানে বিষ খাওয়া। এতে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হার্টঅ্যাটাক, চোখের অসুখ বেড়ে যাবে। পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, নকল দুধ-ঘি তৈরি ও বিক্রয় সম্পর্কে তিনি শুনেছেন এবং বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেছেন।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?