লুত্ফুর রহমানের বিজয় ও আওয়ামী লেবারদের মৌলবাদের জিগির
শ ও ক ত মা হ মু দ ও মু হ ম্ম দ তা ও সি ফ সা লা ম
এই সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ বেনেডিক্ট ব্রিটেন কাঁপানো সফরে গিয়েছিলেন। তখন কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির মধ্যে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বিতর্কটা ভালোই জমে উঠেছিল। রক্ষণশীল দলের চেয়ারপারসন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এমপি লেডি ওয়ারসি শ্রমিক দলের ধর্মনিরপেক্ষতা তথা ধর্মহীনতার নীতিকে তুলোধুনো করে বলেছিলেন (১৫ সেপ্টেম্বর অক্সফোর্ডে ইংল্যান্ডের ধর্মাযাজকের সম্মেলনে) লেডি ওয়ারসির এই মন্তব্যকে টেনে আনার কারণ হলো, পরের মাস অক্টোবরে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাচনে মৌলবাদের জিগির তুলে লুত্ফুর রহমানকে মনোনয়ন না দিয়ে লেবার পার্টি বিরাট ভুল করে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে লুত্ফুর রহমান অবিস্মরণীয় বিজয় ছিনিয়ে আনেন। যেমনি করে রেসপেক্ট পার্টির জর্জ গ্যালওয়ে ইরাক যুদ্ধের প্রতিবাদ করে ইস্ট লন্ডনে লেবারকে হটিয়ে ঐতিহাসিক বিজয় এনেছিলেন।
এবারই প্রথম এই কাউন্সিলে সরাসরি ভোটে বিপুল নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন মেয়রের ভোট হলো। এই কাউন্সিলে শ্বেতাঙ্গদের পাশাপাশি বহু এশীয় থাকে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পূর্ব লন্ডনের এই কাউন্সিল বরাবরই লেবারদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। এখানে প্রায় সব দল-মতের ইমিগ্র্যান্টরা লেবারকে সমর্থন করে মূলত দলটির প্রো-ইমিগ্রেশন ও সামাজিক সুরক্ষা নীতির জন্য। আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকজন এতদিন লেবার পার্টিতে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল, যার দ্বিতীয় পতন হলো লুত্ফুরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। স্থানীয় বাংলাদেশী এমপি রুশনারা আলীও প্রচণ্ড রাজনৈতিক ঝাঁকুনি খেলেন লুত্ফুরের বিরোধিতা করে। লেবারের আচরণে বাংলাদেশীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদী ভোট দিয়ে লুত্ফুরকে এমন কর্তৃত্বে বসিয়েছে যে ২০১২ সালে এই এলাকায় তার হাত দিয়েই বসবে অলিম্পিকের জমজমাট আসর।
বিলাতের বাংলাভাষীদের বড় একটা অংশের সন্দেহ, মনোনয়ন নিয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটিকে দ্বিধাবিভক্ত করে এর ফাঁকে কোন শ্বেতাঙ্গকে এই প্রাণবন্ত কাউন্সিলের মাথায় বসানোর কোনো চক্রান্ত থেকে থাকলে বাংলাদেশীরা তাকে উল্টে দিয়েছে। এও সত্য, লুত্ফুরকে লেবার দলের ক্ষুব্ধ এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমর্থকরাও ভোট দিয়েছে। বৃহত্তর লন্ডনের সাবেক মেয়র এবং আগামী নির্বাচনে লেবারের মেয়র প্রার্থী কেনেথ লিভিংস্টোন লুত্ফুরের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।
লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির যাত্রা যে গণতন্ত্রের মুণ্ডুপাত দিয়ে শুরু হয়েছে, তাতে সম্ভবত সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কোনো নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক প্রস্তুতির মৌলিক দিকগুলো কী কী, তা বুঝতে উচ্চভুরু রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার দরকার হয় না। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাকর্মীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের প্রতিফলন ঘটছে, এটা নিশ্চিত করাই হচ্ছে গণতন্ত্রভিত্তিক নির্বাচনী প্রস্তুতি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে টাওয়ার হ্যামলেটসের সদ্যসমাপ্ত মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির আসল লড়াইটা হয়েছে গণতন্ত্রের সঙ্গে। দলটির স্থানীয় প্রতিনিধিরা যে লুত্ফুর রহমানকে প্রার্থিতার জন্য মনোনীত করেছিলেন, সে লুত্ফুর রহমানকে মনোয়ন না দিয়ে লেবার পার্টি প্রাথমিকভাবে গণতন্ত্রের ওপর চড়াও হয়েছিল। আখেরে গণতন্ত্রই লেবার পার্টির ওপর চড়াও হয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে যে ঘটনার জন্ম দিল, তা অবশ্যই লেবার পার্টির প্রতি গণতন্ত্রের একটি স্মরণীয় চপেটাঘাত, যার কালসিঁটে দলটিকে অনেক কাল ধরে বয়ে বেড়াতে হতে পারে। নির্বাচনী ফলাফল সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এলাকাটিতে লেবারের এই বিপর্যয় ২০০৫ সালে ব্যক্তি জর্জ গ্যালওয়ের কাছে দল লেবারের পরাজয়ের চেয়েও বেশি মারাত্মক।
লেবারের টিকিট নিয়ে পরপর দুবার সরাসরি ভোটে কাউন্সিলার নির্বাচিত হওয়া লুত্ফুর রহমানকে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দিয়েও অতি ঠুনকো কারণ দেখিয়ে সেই মনোনয়ন কেড়ে নেয় লেবার পার্টি। এই কেড়ে নেয়ার পেছনে কারণ হিসেবে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির (এনইসি) কাছে লুত্ফুর রহমান প্রসঙ্গে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অপর লেবার নেতা ও আওয়ামী লীগ সমর্থক হেলাল উদ্দীন আব্বাসের মিথ্যা বিষোদগারকেই দায়ী করা হয়। লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলে বিশাল ইস্ট লন্ডন মসজিদকে কেন্দ্র করে যে পরিচালনা কর্মকাণ্ড, তাতে ধর্মপ্রাণ লুত্ফুর রহমান সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মক্কার হেরেম শরীফের ইমাম আবদুর রহমান আস-সুদাইসকে যেখানে দাওয়াত দিয়ে আনার পেছনে লুত্ফুর সক্রিয় ছিলেন, ইমাম সাহেবের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন, লুত্ফুর উগ্রবাদী মুসলিমদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে ইত্যাকার অভিযোগ করে লেবার পার্টির নেতৃত্বের একাংশকে বিভ্রান্ত করেন স্থানীয় মূল ধারার আওয়ামী লীগাররা, যাদের মাঝে কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরীও ছিলেন। এতে পূর্ব লন্ডনের ব্যাপক মানুষ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল, ‘পোপ লন্ডনে এলে মৌলবাদ হয় না, কাবা শরীফের ইমামকে আনলে মৌলবাদ কেন হবে?’ এই প্রতিবাদ জানানো মানুষের মধ্যে সচেতন ধর্মপ্রাণ আওয়ামী লীগারও রয়েছেন। অমূলক ওই অভিযোগের ভিত্তিতে লুত্ফুর রহমানের মনোনয়ন কেড়ে নেয়াই সার নয়, তার পরিবর্তে দল ওই হেলাল উদ্দীন আব্বাসকেই মনোনয়ন দেয়, যার পক্ষে প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন লেবার নেত্রী ও সদ্য নির্বাচিত হাউস অব কমনস সদস্য রুশনারা আলী এমপি। অথচ চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার পর ১৪ সেপ্টেম্বরে লুত্ফুর যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তার ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করেন, তখন রুশনারা আলী সেখানে যাননি। বাংলাদেশী কমিউনিটির প্রায় সবার চোখেই এটা দৃষ্টিকটু ঠেকেছে।
লেবার পার্টির নেতা নির্বাচনে রুশনারা ডেভিড মিলিব্যান্ডকে সমর্থন করেছিলেন। ইস্ট লন্ডনে এনে ডেভিড মিলিব্যান্ডকে হাইলাইটও করা হয়েছে। যার ফলে ছোট ভাই এড মিলিব্যান্ডের কাছে তার পরাজয়ের ঘটনাটি ছিল রুশনারার জন্য এক বড় আঘাত। অবশ্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে কাউন্সিলর টিউলিপ সিদ্দিকি এসব ঘটনা থেকে নিজের ইমেজকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তবে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের জন্য লুত্ফুরের এই বিজয়ই শুধু নয়, দুর্নীতির অভিযোগে তাদের সমর্থক লর্ড সভার বাংলাদেশী সদস্য ব্যারনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দীনের লর্ডশিপের দীর্ঘমেয়াদি সাসপেনশানও আরেক চপেটাঘাত। ব্যারনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দীন বাংলাদেশ নিয়ে এক সেমিনারে গত জুলাই মাসে আওয়ামী লীগের প্রতি নগ্ন পক্ষপাত দেখিয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে সমালোচিত হয়েছিলেন।
কিন্তু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে টাওয়ার হ্যামলেটসের অধিবাসীরা দলীয় ইমেজকে নয়, ব্যক্তি ইমেজকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ধর্মের প্রশ্নে কাউকে অপবাদ দেয়ার প্রতিবাদ করেছেন। সংখ্যার হিসাব তাই বলছে। দলীয় পরিচয়বিহীন প্রার্থী লুত্ফুর রহমান পেয়েছেন অর্ধেকেরও বেশি ভোট। আর দলীয় ইমেজের বন্দনাকারী লেবার প্রার্থী হেলাল উদ্দীন আব্বাস পেয়েছেন এক-চতুর্থাংশ ভোট। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা লুত্ফুর রহমানের প্রাপ্ত ভোটের অর্ধেকেরও কম। বাকি এক-চতুর্থাংশ ভোট ভাগাভাগি করেছেন টরি, গ্রিন আর লিবারেল ডেমোক্রেট প্রার্থীরা। ২০০৫ সালে বেথনাল গ্রিন এবং বো আসনে জর্জ গ্যালওয়ের কাছে উনা কিংয়ের পরাজয়, যার মধ্য দিয়ে স্থানীয় লেবারের মূলধারায় শোকের মাতম পড়ে গিয়েছিল, সেই পরাজয়ও কিন্তু এত মারাত্মক ছিল না, গ্যালওয়ে মাত্র ৮২৩ ভোটে জিতেছিলেন। লুত্ফুর সেটিকে ছাপিয়ে চলে গেছেন বহুদূর। বাংলাদেশী হিসেবে সুবিধা পেয়েছেন তাই বা বলি কী করে। ১২ হাজারেরও বেশি ভোটে যে লেবার প্রার্থীকে তিনি হারিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন অপর বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ও আওয়ামী লীগ সমর্থক হেলাল উদ্দীন আব্বাস।
‘শেক্সপিয়ারীয়’ নির্বাচনের নেপথ্যে...
স্থানীয় লেবার পার্টির একটি অংশ যে লুত্ফুর রহমানকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে খুবই আগ্রহী, তা প্রথম বোঝা গিয়েছিল আগস্ট মাসে, সম্ভাব্য মনোয়ন-প্রত্যাশীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে দুবার লুত্ফুর রহমানের নাম বাদ দেয়ার মধ্য দিয়ে। লুত্ফুর রহমান বিষয়টি হাইকোর্টে নিয়ে গেলে সেখান থেকে তার নাম সংযোজন করার নির্দেশ দিয়ে রায় দেয়া হয় এবং লুত্ফুর রহমান সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার অবস্থান ফিরে পান। কিন্তু এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে টাওয়ার হ্যামলেটসে ইতিহাসের প্রথম সরাসরি মেয়র নির্বাচনে লুত্ফুর রহমানের যাত্রা সহজ হবে না, কেননা শত্রুরা অবস্থান করছিল তার নিজ (বর্তমানে প্রাক্তন) দলের মধ্যেই।
সংক্ষিপ্ত তালিকার ৭ জনের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচিত করার লক্ষ্যে ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১০ তারিখে দলের টাওয়ার হ্যামলেটস কার্যালয়ে সর্বোচ্চ ৮৬৮ জন এবং সর্বনিম্ন ৮৪১ জন প্রতিনিধি পাঁচ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে অংশ নেন। পূর্বের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া লুত্ফুর রহমান প্রাথমিক পর্যায়ের এই ভোটাভুটিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন।
মাঠপর্যায়ের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল লেবার নেতা কেনেথ ক্লার্কের তত্ত্বাবধানে। ৬ সেপ্টেম্বরে এই কেনেথ ক্লার্কই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন এবং উপস্থিত শত শত লেবার কর্মী ও সংবাদকর্মীর সামনে লুত্ফুর রহমানকে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচনের লেবার প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।
১৪ সেপ্টেম্বর তারিখে এই কার্যালয়েই লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে লুত্ফুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। লেবার নেতা জেমস ফিটজপ্যাট্রিক এমপি এক ভিডিও অ্যাড্রেসের মাধ্যমে লুত্ফুর রহমানের প্রতি তার সমর্থনের কথা জানান এবং উপস্থিত সমর্থকদের নিশ্চিত করেন যে লুত্ফুর রহমানই হবেন টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্বোত্তম মেয়র। পরে অবশ্য এই জেমস ফ্রিটজপ্যাট্রিকের পরিচয় বদলে যায়।
মাঠপর্যায়ের ভোটে ভরাডুবির শিকার এবং অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী হেলাল উদ্দীন আব্বাস ২০ সেপ্টেম্বরে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির (এনইসি) কাছে ৯ পৃষ্ঠাবিশিষ্ট একটি অভিযোগপত্র পেশ করেন। পত্রে আব্বাস লুত্ফুরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, কথিত ইসলামী উগ্রবাদীদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন, অনুগত রাজনৈতিক কর্মীদের পদ প্রদান ও নিয়মবহির্ভূত রাজনৈতিক আচরণের অভিযোগ আনেন।
এ ক্ষেত্রে উগ্রবাদীদের সমর্থন প্রসঙ্গে আনীত অভিযোগের বিষয়টি বিশ্লেষণ না করে পারছি না। হেলাল আব্বাসের এই বিশেষ অভিযোগের ভিত্তি প্রসঙ্গে জানলে সব পাঠকই আশ্চর্য যে হবেন এমনটা হলফ করে বলতে পারি না। কেননা বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার চলমান হুজুগে হেলাল আব্বাসের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণাকারীও জুটে যাবেন কিছু, সন্দেহ নেই। তবে আমরা লজ্জাবোধ করছি এটা জেনে যে, লুত্ফুর রহমানকে উগ্রপন্থী আখ্যা দেয়ার পেছনে হেলাল আব্বাসের তুলে ধরা প্রধান একটি যুক্তি ছিল মক্কা শরীফের (মসজিদে হারাম) ইমাম শেখ আবদুুর রহমান আস-সুদাইসের সঙ্গে লুত্ফুরের সম্পর্ক ও সাক্ষাতের বিষয়টি!
ক্রিশ্চানদের নেতা পোপের সঙ্গে বারংবার সাক্ষাত্ করা রাষ্ট্রনায়করা কেন উগ্রপন্থী নন এবং কেন মসজিদে হারামের ইমামের সঙ্গে সাক্ষাত্ করার অপরাধে লুত্ফুর রহমান উগ্রপন্থী, এই প্রশ্নটি হেলাল আব্বাসকে করার সুযোগ এখনও আমাদের হয়নি। বাড়িতে নামাজ শিক্ষা, ইসলামী ইতিহাস, হাদিস শরীফ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বই রাখলে মিডিয়া কোন বিলম্ব না করে ইসলামী উগ্রপন্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেবে, ইদানীং তাই দিচ্ছে, হয়তো এই বিশ্বাস থেকেই হেলাল আব্বাসরা এনইসির কাছে লুত্ফুর রহমানের ‘উগ্রপন্থী’ পরিচয়টি ফলাও করে প্রচার করেছিলেন।
শুধু হেলাল আব্বাসের ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই ২১ সেপ্টেম্বরে লেবার পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক এই এনইসি মাঠপর্যায় থেকে নিরঙ্কুশ বিজয়লাভ করা লুত্ফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করে দেয়। ব্যাখ্যাস্বরূপ লেবার পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘মনোনয়ন-নির্ধারণী প্রাথমিক ভোটে অংশ নেয়া দলীয় প্রতিনিধিদের যোগ্যতা এবং প্রার্থী হিসেবে লুত্ফুর রহমানের আচরণ, উভয় প্রসঙ্গেই প্রাপ্ত কিছু মারাত্মক অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়গুলোর তদন্তের জন্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে... প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেহেতু লেবার প্রার্থী হিসেবে লুত্ফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের জন্য অপর একজন মনোনয়ন প্রত্যাশীকে লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া ছাড়া এনইসির আর কোনো উপায় নেই।’
হেলাল আব্বাসের অভিযোগ, তার সূত্র ধরে লুত্ফুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল ইত্যাদি বিষয়ে এনইসি-সংক্রান্ত তথ্যাবলী লেবার পার্টি কর্তৃৃক নিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইট লেবারব্রিফিং (খধনড়ঁত্ইত্রবভরহম.ড়ত্ম.ঁশ) থেকে জানা যায়। ওয়েবসাইটটিতে প্রকাশ করা হয়, যে বিশেষ অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে এনইসি লুত্ফুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল করেছে, তার লেখক হচ্ছেন হেলাল উদ্দীন আব্বাস। লেবার ব্রিফিং জানাচ্ছে, অভিযোগকারীর অভিযোগ শুধু আমলেই নেয়া হয়নি, সেই অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি, বরং তার সঙ্গে অভিযোগকারীর রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি জেনেও অভিযোগকারীকে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে সুবিধা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। লেবার ব্রিফিং একপর্যায়ে এনইসির ওই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মৃদু সমালোচনা করে উল্লেখ করেছে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে হয়তো এটা প্রতিষ্ঠা পেল যে প্রাথমিক ভোটাভুটিতে নির্বাচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো প্রকারের অভিযোগ আনতে পারলেই দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয়স্থানের অধিকারীরাও তাকে সরিয়ে নিজেরা মনোয়ন পেতে পারেন।
লেবার পার্টির প্রার্থী মনোনয়নে এসব নাটকীয়তা দেখে প্রতিপক্ষ টরি প্রার্থী নিল কিং নির্বাচনটিকে এক ‘শেক্সপিয়ারীয় নির্বাচন’ (ঝযধশবংঢ়বধত্বধহ ঊষবপঃরড়হ) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। নাটকের কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
লুত্ফুরকে অপসারণের পেছনে এনইসি প্রদর্শিত যুক্তি যে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ছিল, তা নির্বাচনের মাধ্যমে পরে চূড়ান্তরূপে প্রমাণিত হলেও তত্ক্ষণাত্ প্রতিক্রিয়ায়ও সেখানকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এনইসির ওই সিদ্ধান্তের মুণ্ডুপাত করেন। লুত্ফুর রহমানের বিরুদ্ধে হেলাল আব্বাসের আনা এবং এনইসির মেনে নেয়া অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, কোনো বিশ্লেষকই সেই বিতর্কের ধার মাড়াননি। তাদের প্রত্যাখ্যানের পেছনে মূলত যুক্তি ছিল এই যে, লুত্ফুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ একান্তই গুরুতর হলে এনইসি তাকে তলব করে তার ব্যাখ্যা চাইতে পারত। তা না করে তারা তাদের এমন একজন সদস্যের অভিযোগকে আমলে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে সদস্য মাঠপর্যায়ের ভোটাভুটিতে পাঁচটি রাউন্ডের চারটিতেই শতকরা ১৫ ভাগেরও কম এবং শেষবার ২০ ভাগেরও কম ভোট পেয়েছেন এবং একবারের জন্যও প্রথম তো সুদূরপরাহত, দ্বিতীয় স্থানটিও অধিকার করার যোগ্যতা জুগিয়ে উঠতে পারেননি। সবচেয়ে বড় কথা, এই ব্যক্তি টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টির মাঠপর্যায়ের ভোটাভুটিতে লুত্ফুর রহমানের পরাজিত প্রতিযোগী। পরে লুত্ফুরকে অপসারণ করে এই হেলাল আব্বাসকেই লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে এনইসি তাদের নীতিবিসর্জনের ষোলকলা পূর্ণ করে। শুধু তাই নয়, ২৬ সেপ্টেম্বরে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে লেবার নেতারা মিলিত হয়ে লুত্ফুর রহমানসহ তার সমর্থক লেবার নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন। বহিষ্কৃত বাংলাদেশী নেতাদের মাঝে আটজনই ছিলেন সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলর। তারা হলেন অহিদ আহমেদ, ওলিউর রহমান, লুতফা বেগম, রানিয়া খান, আমিনুর খান, রাবিনা খান, সেলিনা খাতুন ও আলিবর রহমান।
২৬ সেপ্টেম্বরে ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে অনুষ্ঠিত লেবার নেতাদের এই বৈঠকটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বিশেষ একটি এলাকায় দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনার স্থান হিসেবে ওয়েস্টমিনস্টারকে বেছে নেয়ার মধ্য দিয়ে একাধিক লেবার এমপির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে এই বিশ্লেষকরা মনে করেন। এদের মাঝে প্রবীণ লেবার নেতা, সাবেক কাউন্সিলর এবং বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার পিটার কেনিয়ন মত দিয়েছেন, লুত্ফুর রহমানকে বহিষ্কারের মূল ভিত্তি ওই অভিযোগগুলোর জবাব দেয়ার কোনো সুযোগ তো লুত্ফুরকে দেয়া হয়ইনি, উপরন্তু তাকেসহ তার সমর্থকদের হেনস্তা করতে ওয়েস্টমিনস্টারে বৈঠক করে দুজন লেবার এমপি তাদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এই দুজন লেবার এমপি হচ্ছেন রুশনারা আলী এবং জেমস ফিটজপ্যাট্রিক। পিটার কেনিয়ন তার ব্লগে সরাসরি লিখেছেন, ওয়েস্টমিনস্টারে বৈঠক করতে চাইলে হলরুমের বুকিং কেবল এমপিরাই করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে এই দুই এমপির কোনো একজন বা উভয়ই ওয়েস্টমিনস্টারের ঐ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে তারা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।
উল্লেখ্য, এই জেমস ফিটজপ্যাট্রিকই কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বরে ঘোষণা করেছিলেন যে লুত্ফুরই হতে পারেন টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্বোত্তম মেয়র। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিবিদদের সৃষ্ট বিভ্রান্তির ফলে টাওয়ার হ্যামলেটসকে নিয়ে লেবার পার্টিতে যে ক্ষমতার খেলা চলছিল, তার জের ধরে লুত্ফুরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন হাউস অব কমন্সের এই সদস্য। লুত্ফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিলসহ তাকে ও তার সমর্থক কাউন্সিলরদের দল থেকে বহিষ্কারের অগণতান্ত্রিক সব সিদ্ধান্ত ছিল ক্ষমতার এই খেলারই ফলাফল। এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে লন্ডনের সাবেক মেয়র কেনেথ লিভিংস্টোন, যিনি ২০১২ সালে অনুষ্ঠিতব্য লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে লেবারের একজন সম্ভাব্য প্রার্থী, বলেছেন যে এড মিলিব্যান্ডের মতো একজন দলনেতা সে সময়ে উপস্থিত থাকলে লেবার পার্টির এনইসি কখনওই এসব অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের জন্মস্থান হতো না। উল্লেখ্য, বড় ভাই ও সাবেক মন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়ে লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হন এড মিলিব্যান্ড এবং রুশনারা আলী ওই নির্বাচনে ডেভিড মিলিব্যান্ডের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন জানিয়েছিলেন। টাওয়ার হ্যামলেটসে মনোনয়ন সংক্রান্ত সেসব ঘটনা লেবার নেতা নির্বাচনের কয়েকটি মাত্র দিন আগের ঘটনা।
টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশী কমিউনিটির ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণ করতে যারা তত্পর ছিলেন, তাদের প্রতি টাওয়ার হ্যামলেটস অধিবাসীদের জবাব ওপরের ছকটিতে ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সামাজিক কাঠামো জাহান্নামে যায় যাক, ক্ষমতা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না বা যে কোনো মূল্যে প্রতিপক্ষের জিত ঠেকাতে হবে, এই মনোভাব থেকে সেই বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি সুদূর টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টির ছত্রচ্ছায়ায় থেকেও যে পরিত্যাগ করতে পারেনি, লুত্ফুরের নির্বাচনী যাত্রার প্রতিটি স্তরে রয়েছে তার প্রমাণ। তবে তাদের প্রতি ভাগ্যের পরিহাসই হবে হয়তো, এই একই নির্বাচনের ফলাফল আবার এটাও প্রমাণ করে দিয়েছে যে মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে মৌলবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ফায়দার অন্বেষণকারীরা সর্বত্রই সাধারণ মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবে।
এবারই প্রথম এই কাউন্সিলে সরাসরি ভোটে বিপুল নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন মেয়রের ভোট হলো। এই কাউন্সিলে শ্বেতাঙ্গদের পাশাপাশি বহু এশীয় থাকে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পূর্ব লন্ডনের এই কাউন্সিল বরাবরই লেবারদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। এখানে প্রায় সব দল-মতের ইমিগ্র্যান্টরা লেবারকে সমর্থন করে মূলত দলটির প্রো-ইমিগ্রেশন ও সামাজিক সুরক্ষা নীতির জন্য। আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকজন এতদিন লেবার পার্টিতে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল, যার দ্বিতীয় পতন হলো লুত্ফুরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। স্থানীয় বাংলাদেশী এমপি রুশনারা আলীও প্রচণ্ড রাজনৈতিক ঝাঁকুনি খেলেন লুত্ফুরের বিরোধিতা করে। লেবারের আচরণে বাংলাদেশীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদী ভোট দিয়ে লুত্ফুরকে এমন কর্তৃত্বে বসিয়েছে যে ২০১২ সালে এই এলাকায় তার হাত দিয়েই বসবে অলিম্পিকের জমজমাট আসর।
বিলাতের বাংলাভাষীদের বড় একটা অংশের সন্দেহ, মনোনয়ন নিয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটিকে দ্বিধাবিভক্ত করে এর ফাঁকে কোন শ্বেতাঙ্গকে এই প্রাণবন্ত কাউন্সিলের মাথায় বসানোর কোনো চক্রান্ত থেকে থাকলে বাংলাদেশীরা তাকে উল্টে দিয়েছে। এও সত্য, লুত্ফুরকে লেবার দলের ক্ষুব্ধ এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমর্থকরাও ভোট দিয়েছে। বৃহত্তর লন্ডনের সাবেক মেয়র এবং আগামী নির্বাচনে লেবারের মেয়র প্রার্থী কেনেথ লিভিংস্টোন লুত্ফুরের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।
লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির যাত্রা যে গণতন্ত্রের মুণ্ডুপাত দিয়ে শুরু হয়েছে, তাতে সম্ভবত সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কোনো নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক প্রস্তুতির মৌলিক দিকগুলো কী কী, তা বুঝতে উচ্চভুরু রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার দরকার হয় না। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাকর্মীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের প্রতিফলন ঘটছে, এটা নিশ্চিত করাই হচ্ছে গণতন্ত্রভিত্তিক নির্বাচনী প্রস্তুতি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে টাওয়ার হ্যামলেটসের সদ্যসমাপ্ত মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির আসল লড়াইটা হয়েছে গণতন্ত্রের সঙ্গে। দলটির স্থানীয় প্রতিনিধিরা যে লুত্ফুর রহমানকে প্রার্থিতার জন্য মনোনীত করেছিলেন, সে লুত্ফুর রহমানকে মনোয়ন না দিয়ে লেবার পার্টি প্রাথমিকভাবে গণতন্ত্রের ওপর চড়াও হয়েছিল। আখেরে গণতন্ত্রই লেবার পার্টির ওপর চড়াও হয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে যে ঘটনার জন্ম দিল, তা অবশ্যই লেবার পার্টির প্রতি গণতন্ত্রের একটি স্মরণীয় চপেটাঘাত, যার কালসিঁটে দলটিকে অনেক কাল ধরে বয়ে বেড়াতে হতে পারে। নির্বাচনী ফলাফল সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এলাকাটিতে লেবারের এই বিপর্যয় ২০০৫ সালে ব্যক্তি জর্জ গ্যালওয়ের কাছে দল লেবারের পরাজয়ের চেয়েও বেশি মারাত্মক।
লেবারের টিকিট নিয়ে পরপর দুবার সরাসরি ভোটে কাউন্সিলার নির্বাচিত হওয়া লুত্ফুর রহমানকে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দিয়েও অতি ঠুনকো কারণ দেখিয়ে সেই মনোনয়ন কেড়ে নেয় লেবার পার্টি। এই কেড়ে নেয়ার পেছনে কারণ হিসেবে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির (এনইসি) কাছে লুত্ফুর রহমান প্রসঙ্গে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অপর লেবার নেতা ও আওয়ামী লীগ সমর্থক হেলাল উদ্দীন আব্বাসের মিথ্যা বিষোদগারকেই দায়ী করা হয়। লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলে বিশাল ইস্ট লন্ডন মসজিদকে কেন্দ্র করে যে পরিচালনা কর্মকাণ্ড, তাতে ধর্মপ্রাণ লুত্ফুর রহমান সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মক্কার হেরেম শরীফের ইমাম আবদুর রহমান আস-সুদাইসকে যেখানে দাওয়াত দিয়ে আনার পেছনে লুত্ফুর সক্রিয় ছিলেন, ইমাম সাহেবের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন, লুত্ফুর উগ্রবাদী মুসলিমদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে ইত্যাকার অভিযোগ করে লেবার পার্টির নেতৃত্বের একাংশকে বিভ্রান্ত করেন স্থানীয় মূল ধারার আওয়ামী লীগাররা, যাদের মাঝে কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরীও ছিলেন। এতে পূর্ব লন্ডনের ব্যাপক মানুষ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল, ‘পোপ লন্ডনে এলে মৌলবাদ হয় না, কাবা শরীফের ইমামকে আনলে মৌলবাদ কেন হবে?’ এই প্রতিবাদ জানানো মানুষের মধ্যে সচেতন ধর্মপ্রাণ আওয়ামী লীগারও রয়েছেন। অমূলক ওই অভিযোগের ভিত্তিতে লুত্ফুর রহমানের মনোনয়ন কেড়ে নেয়াই সার নয়, তার পরিবর্তে দল ওই হেলাল উদ্দীন আব্বাসকেই মনোনয়ন দেয়, যার পক্ষে প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন লেবার নেত্রী ও সদ্য নির্বাচিত হাউস অব কমনস সদস্য রুশনারা আলী এমপি। অথচ চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার পর ১৪ সেপ্টেম্বরে লুত্ফুর যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তার ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করেন, তখন রুশনারা আলী সেখানে যাননি। বাংলাদেশী কমিউনিটির প্রায় সবার চোখেই এটা দৃষ্টিকটু ঠেকেছে।
লেবার পার্টির নেতা নির্বাচনে রুশনারা ডেভিড মিলিব্যান্ডকে সমর্থন করেছিলেন। ইস্ট লন্ডনে এনে ডেভিড মিলিব্যান্ডকে হাইলাইটও করা হয়েছে। যার ফলে ছোট ভাই এড মিলিব্যান্ডের কাছে তার পরাজয়ের ঘটনাটি ছিল রুশনারার জন্য এক বড় আঘাত। অবশ্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে কাউন্সিলর টিউলিপ সিদ্দিকি এসব ঘটনা থেকে নিজের ইমেজকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তবে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের জন্য লুত্ফুরের এই বিজয়ই শুধু নয়, দুর্নীতির অভিযোগে তাদের সমর্থক লর্ড সভার বাংলাদেশী সদস্য ব্যারনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দীনের লর্ডশিপের দীর্ঘমেয়াদি সাসপেনশানও আরেক চপেটাঘাত। ব্যারনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দীন বাংলাদেশ নিয়ে এক সেমিনারে গত জুলাই মাসে আওয়ামী লীগের প্রতি নগ্ন পক্ষপাত দেখিয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে সমালোচিত হয়েছিলেন।
কিন্তু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে টাওয়ার হ্যামলেটসের অধিবাসীরা দলীয় ইমেজকে নয়, ব্যক্তি ইমেজকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ধর্মের প্রশ্নে কাউকে অপবাদ দেয়ার প্রতিবাদ করেছেন। সংখ্যার হিসাব তাই বলছে। দলীয় পরিচয়বিহীন প্রার্থী লুত্ফুর রহমান পেয়েছেন অর্ধেকেরও বেশি ভোট। আর দলীয় ইমেজের বন্দনাকারী লেবার প্রার্থী হেলাল উদ্দীন আব্বাস পেয়েছেন এক-চতুর্থাংশ ভোট। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা লুত্ফুর রহমানের প্রাপ্ত ভোটের অর্ধেকেরও কম। বাকি এক-চতুর্থাংশ ভোট ভাগাভাগি করেছেন টরি, গ্রিন আর লিবারেল ডেমোক্রেট প্রার্থীরা। ২০০৫ সালে বেথনাল গ্রিন এবং বো আসনে জর্জ গ্যালওয়ের কাছে উনা কিংয়ের পরাজয়, যার মধ্য দিয়ে স্থানীয় লেবারের মূলধারায় শোকের মাতম পড়ে গিয়েছিল, সেই পরাজয়ও কিন্তু এত মারাত্মক ছিল না, গ্যালওয়ে মাত্র ৮২৩ ভোটে জিতেছিলেন। লুত্ফুর সেটিকে ছাপিয়ে চলে গেছেন বহুদূর। বাংলাদেশী হিসেবে সুবিধা পেয়েছেন তাই বা বলি কী করে। ১২ হাজারেরও বেশি ভোটে যে লেবার প্রার্থীকে তিনি হারিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন অপর বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ও আওয়ামী লীগ সমর্থক হেলাল উদ্দীন আব্বাস।
‘শেক্সপিয়ারীয়’ নির্বাচনের নেপথ্যে...
স্থানীয় লেবার পার্টির একটি অংশ যে লুত্ফুর রহমানকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে খুবই আগ্রহী, তা প্রথম বোঝা গিয়েছিল আগস্ট মাসে, সম্ভাব্য মনোয়ন-প্রত্যাশীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে দুবার লুত্ফুর রহমানের নাম বাদ দেয়ার মধ্য দিয়ে। লুত্ফুর রহমান বিষয়টি হাইকোর্টে নিয়ে গেলে সেখান থেকে তার নাম সংযোজন করার নির্দেশ দিয়ে রায় দেয়া হয় এবং লুত্ফুর রহমান সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার অবস্থান ফিরে পান। কিন্তু এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে টাওয়ার হ্যামলেটসে ইতিহাসের প্রথম সরাসরি মেয়র নির্বাচনে লুত্ফুর রহমানের যাত্রা সহজ হবে না, কেননা শত্রুরা অবস্থান করছিল তার নিজ (বর্তমানে প্রাক্তন) দলের মধ্যেই।
সংক্ষিপ্ত তালিকার ৭ জনের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচিত করার লক্ষ্যে ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১০ তারিখে দলের টাওয়ার হ্যামলেটস কার্যালয়ে সর্বোচ্চ ৮৬৮ জন এবং সর্বনিম্ন ৮৪১ জন প্রতিনিধি পাঁচ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে অংশ নেন। পূর্বের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া লুত্ফুর রহমান প্রাথমিক পর্যায়ের এই ভোটাভুটিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন।
মাঠপর্যায়ের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল লেবার নেতা কেনেথ ক্লার্কের তত্ত্বাবধানে। ৬ সেপ্টেম্বরে এই কেনেথ ক্লার্কই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন এবং উপস্থিত শত শত লেবার কর্মী ও সংবাদকর্মীর সামনে লুত্ফুর রহমানকে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচনের লেবার প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।
১৪ সেপ্টেম্বর তারিখে এই কার্যালয়েই লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে লুত্ফুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। লেবার নেতা জেমস ফিটজপ্যাট্রিক এমপি এক ভিডিও অ্যাড্রেসের মাধ্যমে লুত্ফুর রহমানের প্রতি তার সমর্থনের কথা জানান এবং উপস্থিত সমর্থকদের নিশ্চিত করেন যে লুত্ফুর রহমানই হবেন টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্বোত্তম মেয়র। পরে অবশ্য এই জেমস ফ্রিটজপ্যাট্রিকের পরিচয় বদলে যায়।
মাঠপর্যায়ের ভোটে ভরাডুবির শিকার এবং অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী হেলাল উদ্দীন আব্বাস ২০ সেপ্টেম্বরে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির (এনইসি) কাছে ৯ পৃষ্ঠাবিশিষ্ট একটি অভিযোগপত্র পেশ করেন। পত্রে আব্বাস লুত্ফুরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, কথিত ইসলামী উগ্রবাদীদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন, অনুগত রাজনৈতিক কর্মীদের পদ প্রদান ও নিয়মবহির্ভূত রাজনৈতিক আচরণের অভিযোগ আনেন।
এ ক্ষেত্রে উগ্রবাদীদের সমর্থন প্রসঙ্গে আনীত অভিযোগের বিষয়টি বিশ্লেষণ না করে পারছি না। হেলাল আব্বাসের এই বিশেষ অভিযোগের ভিত্তি প্রসঙ্গে জানলে সব পাঠকই আশ্চর্য যে হবেন এমনটা হলফ করে বলতে পারি না। কেননা বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার চলমান হুজুগে হেলাল আব্বাসের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণাকারীও জুটে যাবেন কিছু, সন্দেহ নেই। তবে আমরা লজ্জাবোধ করছি এটা জেনে যে, লুত্ফুর রহমানকে উগ্রপন্থী আখ্যা দেয়ার পেছনে হেলাল আব্বাসের তুলে ধরা প্রধান একটি যুক্তি ছিল মক্কা শরীফের (মসজিদে হারাম) ইমাম শেখ আবদুুর রহমান আস-সুদাইসের সঙ্গে লুত্ফুরের সম্পর্ক ও সাক্ষাতের বিষয়টি!
ক্রিশ্চানদের নেতা পোপের সঙ্গে বারংবার সাক্ষাত্ করা রাষ্ট্রনায়করা কেন উগ্রপন্থী নন এবং কেন মসজিদে হারামের ইমামের সঙ্গে সাক্ষাত্ করার অপরাধে লুত্ফুর রহমান উগ্রপন্থী, এই প্রশ্নটি হেলাল আব্বাসকে করার সুযোগ এখনও আমাদের হয়নি। বাড়িতে নামাজ শিক্ষা, ইসলামী ইতিহাস, হাদিস শরীফ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বই রাখলে মিডিয়া কোন বিলম্ব না করে ইসলামী উগ্রপন্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেবে, ইদানীং তাই দিচ্ছে, হয়তো এই বিশ্বাস থেকেই হেলাল আব্বাসরা এনইসির কাছে লুত্ফুর রহমানের ‘উগ্রপন্থী’ পরিচয়টি ফলাও করে প্রচার করেছিলেন।
শুধু হেলাল আব্বাসের ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই ২১ সেপ্টেম্বরে লেবার পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক এই এনইসি মাঠপর্যায় থেকে নিরঙ্কুশ বিজয়লাভ করা লুত্ফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করে দেয়। ব্যাখ্যাস্বরূপ লেবার পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘মনোনয়ন-নির্ধারণী প্রাথমিক ভোটে অংশ নেয়া দলীয় প্রতিনিধিদের যোগ্যতা এবং প্রার্থী হিসেবে লুত্ফুর রহমানের আচরণ, উভয় প্রসঙ্গেই প্রাপ্ত কিছু মারাত্মক অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়গুলোর তদন্তের জন্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে... প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেহেতু লেবার প্রার্থী হিসেবে লুত্ফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের জন্য অপর একজন মনোনয়ন প্রত্যাশীকে লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া ছাড়া এনইসির আর কোনো উপায় নেই।’
হেলাল আব্বাসের অভিযোগ, তার সূত্র ধরে লুত্ফুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল ইত্যাদি বিষয়ে এনইসি-সংক্রান্ত তথ্যাবলী লেবার পার্টি কর্তৃৃক নিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইট লেবারব্রিফিং (খধনড়ঁত্ইত্রবভরহম.ড়ত্ম.ঁশ) থেকে জানা যায়। ওয়েবসাইটটিতে প্রকাশ করা হয়, যে বিশেষ অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে এনইসি লুত্ফুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল করেছে, তার লেখক হচ্ছেন হেলাল উদ্দীন আব্বাস। লেবার ব্রিফিং জানাচ্ছে, অভিযোগকারীর অভিযোগ শুধু আমলেই নেয়া হয়নি, সেই অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি, বরং তার সঙ্গে অভিযোগকারীর রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি জেনেও অভিযোগকারীকে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে সুবিধা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। লেবার ব্রিফিং একপর্যায়ে এনইসির ওই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মৃদু সমালোচনা করে উল্লেখ করেছে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে হয়তো এটা প্রতিষ্ঠা পেল যে প্রাথমিক ভোটাভুটিতে নির্বাচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো প্রকারের অভিযোগ আনতে পারলেই দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয়স্থানের অধিকারীরাও তাকে সরিয়ে নিজেরা মনোয়ন পেতে পারেন।
লেবার পার্টির প্রার্থী মনোনয়নে এসব নাটকীয়তা দেখে প্রতিপক্ষ টরি প্রার্থী নিল কিং নির্বাচনটিকে এক ‘শেক্সপিয়ারীয় নির্বাচন’ (ঝযধশবংঢ়বধত্বধহ ঊষবপঃরড়হ) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। নাটকের কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
লুত্ফুরকে অপসারণের পেছনে এনইসি প্রদর্শিত যুক্তি যে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ছিল, তা নির্বাচনের মাধ্যমে পরে চূড়ান্তরূপে প্রমাণিত হলেও তত্ক্ষণাত্ প্রতিক্রিয়ায়ও সেখানকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এনইসির ওই সিদ্ধান্তের মুণ্ডুপাত করেন। লুত্ফুর রহমানের বিরুদ্ধে হেলাল আব্বাসের আনা এবং এনইসির মেনে নেয়া অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, কোনো বিশ্লেষকই সেই বিতর্কের ধার মাড়াননি। তাদের প্রত্যাখ্যানের পেছনে মূলত যুক্তি ছিল এই যে, লুত্ফুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ একান্তই গুরুতর হলে এনইসি তাকে তলব করে তার ব্যাখ্যা চাইতে পারত। তা না করে তারা তাদের এমন একজন সদস্যের অভিযোগকে আমলে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে সদস্য মাঠপর্যায়ের ভোটাভুটিতে পাঁচটি রাউন্ডের চারটিতেই শতকরা ১৫ ভাগেরও কম এবং শেষবার ২০ ভাগেরও কম ভোট পেয়েছেন এবং একবারের জন্যও প্রথম তো সুদূরপরাহত, দ্বিতীয় স্থানটিও অধিকার করার যোগ্যতা জুগিয়ে উঠতে পারেননি। সবচেয়ে বড় কথা, এই ব্যক্তি টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টির মাঠপর্যায়ের ভোটাভুটিতে লুত্ফুর রহমানের পরাজিত প্রতিযোগী। পরে লুত্ফুরকে অপসারণ করে এই হেলাল আব্বাসকেই লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে এনইসি তাদের নীতিবিসর্জনের ষোলকলা পূর্ণ করে। শুধু তাই নয়, ২৬ সেপ্টেম্বরে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে লেবার নেতারা মিলিত হয়ে লুত্ফুর রহমানসহ তার সমর্থক লেবার নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন। বহিষ্কৃত বাংলাদেশী নেতাদের মাঝে আটজনই ছিলেন সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলর। তারা হলেন অহিদ আহমেদ, ওলিউর রহমান, লুতফা বেগম, রানিয়া খান, আমিনুর খান, রাবিনা খান, সেলিনা খাতুন ও আলিবর রহমান।
২৬ সেপ্টেম্বরে ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে অনুষ্ঠিত লেবার নেতাদের এই বৈঠকটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বিশেষ একটি এলাকায় দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনার স্থান হিসেবে ওয়েস্টমিনস্টারকে বেছে নেয়ার মধ্য দিয়ে একাধিক লেবার এমপির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে এই বিশ্লেষকরা মনে করেন। এদের মাঝে প্রবীণ লেবার নেতা, সাবেক কাউন্সিলর এবং বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার পিটার কেনিয়ন মত দিয়েছেন, লুত্ফুর রহমানকে বহিষ্কারের মূল ভিত্তি ওই অভিযোগগুলোর জবাব দেয়ার কোনো সুযোগ তো লুত্ফুরকে দেয়া হয়ইনি, উপরন্তু তাকেসহ তার সমর্থকদের হেনস্তা করতে ওয়েস্টমিনস্টারে বৈঠক করে দুজন লেবার এমপি তাদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এই দুজন লেবার এমপি হচ্ছেন রুশনারা আলী এবং জেমস ফিটজপ্যাট্রিক। পিটার কেনিয়ন তার ব্লগে সরাসরি লিখেছেন, ওয়েস্টমিনস্টারে বৈঠক করতে চাইলে হলরুমের বুকিং কেবল এমপিরাই করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে এই দুই এমপির কোনো একজন বা উভয়ই ওয়েস্টমিনস্টারের ঐ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে তারা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।
উল্লেখ্য, এই জেমস ফিটজপ্যাট্রিকই কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বরে ঘোষণা করেছিলেন যে লুত্ফুরই হতে পারেন টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্বোত্তম মেয়র। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিবিদদের সৃষ্ট বিভ্রান্তির ফলে টাওয়ার হ্যামলেটসকে নিয়ে লেবার পার্টিতে যে ক্ষমতার খেলা চলছিল, তার জের ধরে লুত্ফুরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন হাউস অব কমন্সের এই সদস্য। লুত্ফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিলসহ তাকে ও তার সমর্থক কাউন্সিলরদের দল থেকে বহিষ্কারের অগণতান্ত্রিক সব সিদ্ধান্ত ছিল ক্ষমতার এই খেলারই ফলাফল। এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে লন্ডনের সাবেক মেয়র কেনেথ লিভিংস্টোন, যিনি ২০১২ সালে অনুষ্ঠিতব্য লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে লেবারের একজন সম্ভাব্য প্রার্থী, বলেছেন যে এড মিলিব্যান্ডের মতো একজন দলনেতা সে সময়ে উপস্থিত থাকলে লেবার পার্টির এনইসি কখনওই এসব অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের জন্মস্থান হতো না। উল্লেখ্য, বড় ভাই ও সাবেক মন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়ে লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হন এড মিলিব্যান্ড এবং রুশনারা আলী ওই নির্বাচনে ডেভিড মিলিব্যান্ডের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন জানিয়েছিলেন। টাওয়ার হ্যামলেটসে মনোনয়ন সংক্রান্ত সেসব ঘটনা লেবার নেতা নির্বাচনের কয়েকটি মাত্র দিন আগের ঘটনা।
টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশী কমিউনিটির ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণ করতে যারা তত্পর ছিলেন, তাদের প্রতি টাওয়ার হ্যামলেটস অধিবাসীদের জবাব ওপরের ছকটিতে ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সামাজিক কাঠামো জাহান্নামে যায় যাক, ক্ষমতা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না বা যে কোনো মূল্যে প্রতিপক্ষের জিত ঠেকাতে হবে, এই মনোভাব থেকে সেই বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি সুদূর টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টির ছত্রচ্ছায়ায় থেকেও যে পরিত্যাগ করতে পারেনি, লুত্ফুরের নির্বাচনী যাত্রার প্রতিটি স্তরে রয়েছে তার প্রমাণ। তবে তাদের প্রতি ভাগ্যের পরিহাসই হবে হয়তো, এই একই নির্বাচনের ফলাফল আবার এটাও প্রমাণ করে দিয়েছে যে মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে মৌলবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ফায়দার অন্বেষণকারীরা সর্বত্রই সাধারণ মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবে।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া



