Amardesh
আজঃ ঢাকা, বুধবার ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১০, ২৪ ভাদ্র ১৪১৭, ২৮ রমজান ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ রাত ১.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 বিশেষ সংখ্যা
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ছাগলের দেহেও অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত, ৫ গরুর মৃত্যু : আরও অর্ধশত মানুষ আক্রান্ত তিন জেলায় : বেনাপোলে পুঁতে ফেলা হলো আমদানি : করা ৫ টন মাংস, আটক ৩ টন

ডেস্ক রিপোর্ট
দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়েছে। লালমনিরহাট, বগুড়া ও মানিকগঞ্জে নতুন করে ৬৫ জন অ্যানথ্রাক্স রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বগুড়ায় আক্রান্ত হয়েছেন একই পরিবারের চারজন। গরুর পাশাপাশি ছাগলের দেহেও এ রোগ ধরা পড়েছে। টাঙ্গাইলে একদিনে একটি গ্রামের পাঁচটি গরু মরা গেছে। বেনাপোলে পুঁতে ফেলা হয়েছে ভারত থেকে আমদানি করা গরুর ৫ টন মাংস। আটক করা হয় আরও ৩ টন। সীমান্ত দিয়ে দেদার আসছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও টিকা দেয়া ছাড়াই বৈধ-অবৈধ গরু-মহিষ। আমাদের অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো বিস্তারিত খবর :
লালমনিরহাট : এবার লালমনিরহাটের মানুষ অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কে ভুগছেন। জেলার সদর উপজেলার হারাটী ইউনিয়নের কিসামত হারাটী গ্রামে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরুর মাংস খেয়ে ওই গ্রামের শতাধিক মানুষ প্রতি মুহূর্তে ভুগছেন অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কে। গতকাল গ্রামটির ৫৬ বাসিন্দাকে অ্যানথ্রাক্স রোগী বলে শনাক্ত করেছে একদল চিকিত্সক।
আক্রান্ত গরুর মাংস খেয়ে গতকাল দুপুরে ওই গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে সিরাজুল হক মেনাজ (২৬) অসুস্থ হয়ে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি হলে লালমনিরহাট সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে একদল চিকিত্সক তাকেসহ কিসামত হারাটী গ্রামের ৫৬ জনকে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করে। চিকিত্সকরা জানান, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এ ঘটনায় পুরো জেলায় এখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
চিকিত্সাধীন সিরাজুল হক মেনাজ সাংবাদিকদের জানান, আগস্টের ১৫ তারিখে প্রতিবেশী বাবুল হোসেনের একটি গাভী মারা যায়। অন্য একটি গরু গত ৩০ আগস্ট অসুস্থ হলে সেটি জবাই করে মাংস বিক্রি করা হয় ওই গ্রামে। ওই গরুর মাংস খাবার ৩/৪ দিন পরই তিনি আক্রান্ত হন। তিনি বাম হাতের আঙুলে ঘায়ের মতো লক্ষ করলে স্থানীয় বাজারে এক হোমিও চিকিত্সকের কাছে যান। চিকিত্সক তাকে গতকাল লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। হাসপাতালের চিকিত্সক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে অ্যানথ্রাক্স রোগী বলে শনাক্ত করেন। কর্তব্যরত চিকিত্সক জানান, সিরাজুল ইসলাম মেনাজ কিউটিনিয়াস অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত। বর্তমানে তিনি লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের আলাদা একটি কক্ষে চিকিত্সাধীন।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোখলেছার রহমান সরকার সাংবাদিকদের বলেন, অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৫৬ জনকে সদর হাসপাতালে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিত্সার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে তিনি এ ব্যাপারে জেলাবাসীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে আতঙ্কিত হওয়ার বা ভয়ের কোনো কারণ নেই।
বগুড়া : বগুড়ায় অ্যানথ্র্যাক্সে একই পরিবারের চারজন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। শহরের নিশিন্দারা ধমকপাড়ায় আক্রান্ত এ রোগীদের ব্যাপারে বগুড়া স্বাস্থ্য বিভাগ নিশ্চিত করেছে। তাদের মধ্যে দু’জনকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকার বকুল হোসেন তিনদিন আগে গোদারপাড়াবাজার থেকে গরুর মাংস কেনেন। মাংস খাওয়ার পর তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম, তার দুই ছেলে মিজানুর রহমান ও ইমরান হোসেন এবং মিজানুর রহমানের স্ত্রী খালেদা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংবাদ পেয়ে বগুড়া পৌরসভার মেডিকেল অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন তাদের দেখতে যান। বগুড়ার ডেপুটি সির্ভিল সার্জন ডা. গোলাম হোসেন রোগী দেখে নিশ্চিত হন। বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. আবদুল হক জানান, বিষয়টি তিনি পুরো না জানলেও ডেপুটি সিভিল সার্জন জেনেছেন। তবে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য বিভাগ এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নূরুননবী জানান, ধুনট, শেরপুর ও নন্দীগ্রাম উপজেলাকে ঝুকিপুঁর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ওইসব এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) : মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ফুকুরহাটি ইউনিয়নের একটি গ্রামে ২ শিশুসহ ৫ জন অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হয়েছে। অসুস্থ ছাগল জবাই করে মাংস খাওয়ার ফলে তারা এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গতকাল সকালে জেলা সিভিল সার্জন, জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আশপাশের এলাকার সব গবাদিপশুকে অ্যানথ্রাক্স ভ্যাকসিন প্রদান করা হয়েছে।
সাটুরিয়া উপজেলার ফুকুরহাটি ইউনিয়নের আইরমারা চর গ্রামের মৃত এলাহী মিয়ার ছেলে লেচু মিয়া ২২ আগস্ট গৃহপালিত অসুস্থ ছাগল জবাই করে গ্রামের লোকজন নিয়ে মাংস খান। এরপর থেকেই লেচু মিয়া, রাজা মিয়ার ছেলে রিফাত, কছিমুদ্দিনের ছেলে স্বপন হোসেন, মৃত কফিল উদ্দিনের ছেলে ওফাজ উদ্দিন ও রজ্জব আলীর স্ত্রী সাহেরা অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হন।
মানিকগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. সিদ্বেশ্বর মজুমদার অ্যানথ্রাক্স রোগে দুই শিশুসহ ৫ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি আক্রান্ত ব্যক্তিরা অসুস্থ ছাগল জবাই করে তার মাংস নাড়াচাড়া ও তা খাওয়ার ফলে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান।
নাগরপুর (টাঙ্গাইল) : টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের পর এবার নাগরপুরে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার একটি গ্রামে ৫টি গরু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার দপ্তিয়র ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামে একদিনে ৫টি গরু মারা যাওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। গতকাল সকালে নাগরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভেটেরিনারি কম্পাউন্ডার মো. লিয়াকত আলী নিশ্চিন্তপুর গ্রামে গিয়ে গবাদিপশুকে প্রতিষেধক টিকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। লিয়াকত আলী ৫টি গরু অ্যানথ্রাক্স রোগে মারা গেছে কিনা তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গরু মারা যাওয়ার পরই মালিকরা তা মাটিচাপা দিয়েছেন। এ জন্য পরীক্ষা করা যায়নি। গ্রামের শহিদ মিয়া, তারা বেপারি, আবদুল হালিম, খসরু ডাক্তার ও বুদ্দু মোল্লার ৫টি গরু সোমবার আকস্মিক মারা যায়। অ্যানথ্রাক্স রোগেই ৫টি গরু মারা গেছে বলে এলাকাবাসী ধারণা করছে। এদিকে একদিনে ৫টি গরু মারা যাওয়ার ঘটনায় গোটা এলাকায় অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক বিরাজ করছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার বাবু তন্ময় দাস এটাকে নিছক গুজব উল্লেখ করে বলেন, অ্যানথ্রাক্সের অস্তিত্ব এলাকায় পাওয়া যায়নি। জনগণকে তিনি গুজবে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন। এছাড়া মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিত্সকরা প্রতিষেধক ইনজেকশন (ভ্যাকসিন) দিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
বেনাপোল : বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত ৫ টন গরুর মাংস সোমবার মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। ঢাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফ্রেস অ্যান্ড ফ্রোজেন ভারত থেকে এ মাংস আমদানি করে। পচা ও অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত সন্দেহে বন্দর টার্মিনালে কাস্টমস এবং বন্দর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গভীর রাতে মাংসের চালানটি মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আল-কোরাইস আবাতনি।
গতকাল দুপুরে বেনাপোল বাজার গোশতপট্টি এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ৩ মণ অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরুর মাংস আটক করেছে পৌর স্বাস্থ্য বিভাগ ও পুলিশ। এ ঘটনায় একজনকে আটক করার পর পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যায় সে।
কাস্টমস যুগ্ম কমিশনার ইসমাইল হোসেন সিরাজী জানান, ২৬ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি ভারত থেকে ৫ হাজর কেজি গরুর মংস আমদানি করে। আমদানি করা মাংস খালাশ করতে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ছাড়পত্র না নেয়ায় চালানটি খালাস দেয়া সম্ভব হয়নি। আমদানি করা মাংস অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত সন্দেহে ট্রাকসহ বন্দরের ৩১ নম্বর ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে আটক রাখা হয়। চালানটি পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর কারণে আমদানিকারকের অনুমতি নিয়ে বন্দরের ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডের পাশে তা পুঁতে ফেলা হয়।
বন্দরের পরিচালক ট্রাফিক আমিনুর রহমান জানান, পচা মাংসের গন্ধের কারণে বন্দর এলাকায় পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ে। অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কে সারাদেশে রেড অ্যালার্ট জারি থাকায় আমদানি করা গরুর মাংস দ্রুত মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। আমদানি করা বিপুল পরিমাণ গরুর মাংস ধ্বংস করার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভারত থেকে গরুর মাংস প্রাণিসম্পদ বিভাগের পূর্ব অনুমতি না নিয়ে কীভাবে আমদানি করা হলো তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে বলে কাস্টমস সূত্র জানায়।
রাজশাহী : উত্তরাঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধক ভ্যাকসিন থাকলেও পশুর চিকিত্সা তদারকি করতে পারছে না প্রাণিসম্পদ বিভাগ। কারণ হিসেবে উপজেলা পর্যায়ে যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন তার অর্ধেকও তাদের নেই বলে জানিয়েছে তারা। এদিকে সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে অবাধে গরু-মহিষ আসছে, যা কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। ফলে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে যে কোনো পদক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সপ্তাহে চারদিন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে এক হাজারেরও বেশি গরু-মহিষ আসছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় গবাদিপশু রয়েছে প্রায় পৌনে ২ কোটি। এ বিপুল পরিমাণ পশু চিকিত্সার জন্য ১৬ জেলার ১২৪ উপজেলায় প্রয়োজনীয় জনবল নেই প্রাণিসম্পদ বিভাগের।
প্রাণিসম্পদ বিভাগে জনবল সঙ্কটের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় গরু-মহিষ জবাই করার আগে যে পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে, তাও মানা হচ্ছে না। হাটবাজারগুলোতে নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় পশু যেখানে-সেখানে জবাই করা হচ্ছে। পশু জবাইয়ের কোনো নিয়ম না মানায় অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা।
রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা খায়রুল আলম জানান, নিয়ম অনুযায়ী বাজারে গবাদিপশুর মাংস বিক্রি করতে হলে আগের দিন পিলখানায় এনে তা জড়ো করতে হয়। এরপর একজন ভেটেরিনারি সার্জন গিয়ে তা পরীক্ষা করে সনদ দেয়ার পর জবাই করা যায়। কিন্তু কোথাও এ নিয়ম মানা হয়নি। হাটবাজরে পশু জবাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক পিলখানা নেই। ফলে গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, যেখানে-সেখানে জবাই করা হয়। এতে করে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
রাজশাহী প্রাণিসম্পদ দফতরের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অ্যানথ্রাক্স ভ্যাকসিন দেয়া জটিল কাজ। এ ভ্যাকসিন দিতে দক্ষ জনবল দরকার। জনবল সঙ্কটে ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম সঠিকভাবে করা যাচ্ছে না। সূত্র জানায়, সিরাজগঞ্জ ও পাবনাসহ উত্তরের ৮ জেলায় জুলাই-সেপ্টেম্বরে অ্যানথ্রাক্স ভ্যাকসিনের চাহিদা পাঠানো হয়েছিল ৪ লাখ ৭৫ হাজার পিস। এর বিপরীতে জুলাই ও আগস্টে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার জন্য অ্যানথ্রাক্স ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে ২ লাখ ২১ হাজার ৭০০ পিস। এরই মধ্যে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ পিস অ্যানথ্রাক্স ভ্যাকসিন বিক্রি হয়েছে।
কলারোয়া (সাতক্ষীরা) : কলারোয়া সীমান্ত দিয়ে অ্যানথ্রাক্স পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভ্যাকসিন প্রয়োগ ছাড়াই বৈধ-অবৈধ পথে প্রতিদিন শত শত ভারতীয় গরু এ দেশে আসছে। এসব গরু কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জবাই করা ছাড়াও ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। এতে দেশে অ্যানথ্রাক্স আক্রমণ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনোপ্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ভারতীয় গরু পাইকারি হারে সীমান্ত দিয়ে ঢোকায় উপজেলার সর্বত্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাতক্ষীরার ১৩৮ কিলোমিটির সীমান্তে কাস্টমস অ্যাক্সাইড অ্যান্ড ভ্যাট সার্কেলের আওতায় সাতানি, সেনাবাড়িয়া, কুলিয়া ও কালীগঞ্জের বসন্তপুরে চারটি করিডোর রয়েছে। তার মধ্যে বিডিআর, কাস্টমস ও পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত সোনাবাড়িয়া করিডোর দিয়ে প্রতিনিয়ত ভারতীয় গরু বাংলাদেশে আসে। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া কাস্টমস করিডোর দিয়ে প্রায় ৭ হাজার ভারতীয় গরু বাংলাদেশে বৈধভাবে আনা হয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে প্রতিনিয়ত বিপুলসংখ্যক গরু আসছে। আর এসব গরু অ্যানথ্রাক্স বহন করছে কিনা তা নিশ্চিত না হয়ে বা কোনোপ্রকার প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা না নিয়েই সীমান্ত দিয়ে পার হয়ে আসা গরু দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যাচ্ছে। সীমান্তের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, অবৈধপথে বিপুলসংখ্যক গরু আসার কারণে কলারোয়ার একমাত্র কাস্টমস করিডোরটি অচল হয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা কাস্টমস সুপারিন্টেন্ডেন্ট বেগম সামসুন্নাহারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, গত ৮ মাসে সাতক্ষীরার ৪টি করিডোর থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে। করিডোর ব্যবস্থাপনার জন্য চাহিদা অনুযায়ী জনবলের অভাব আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গরুর অ্যানথ্রাক্স রোধে সরকারি নির্দেশ পেলেই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কলারোয়া প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, ভারত থেকে আসার পর গবাদিপশুকে এ ধরনের ভ্যাকসিন দেয়ার কোনো নির্দেশনা তাদের কাছে এখনও পর্যন্ত আসেনি।
হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) : স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে যত্রতত্র গরু-মহিষ-ছাগল জবাই করে মাংস বিক্রি চলছে। এতে অন্যান্য স্থানের মতো হাটহাজারীতেও অ্যানথ্রাক্সের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গবাদিপশু জবাই করার আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার নিয়ম থাকলেও উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের হাটবাজারে তা করা হচ্ছে না।
দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়িতে গরুর মাংসের চাহিদা বেশি থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে ব্যাপক হারে আসছে গবাদিপশু। এসব পশুর কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই বাজারে বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। আর এসব গরু-মহিষ হাটবাজারে জবাই করা হচ্ছে প্রতিদিন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের নজরদারির অভাবে মাংস বিক্রেতারা অধিক মুনাফার জন্য রোগাক্রান্ত গরু-ছাগল জবাই করছেন। অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ার পর এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে মাংস ক্রয়কারীদের মধ্যে।
এ ব্যাপারে হাটহাজারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আইয়ুব মো. রানা বলেন, হাটহাজারীতে অ্যানথ্রাক্সের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আর গরু-মহিষ জবাইয়ের আগে পরীক্ষার ব্যাপারে তাদের কাছে এখনও কোনো নির্দেশ আসেনি।
লামা (বান্দরবান) : গবাদিপশুর অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সরকারি নির্দেশ জারি হলেও লামা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল বেসরকারি সংস্থা আইডিএফ চেয়ারম্যানপাড়ার কার্যালয়ে অ্যানথ্রাক্স টিকা বিতরণের উদ্যোগ নিলে ৫ শতাধিক গরুর মালিকের কাছ থেকে প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মচারীরা গরুপ্রতি ১০ টাকা হারে উেকাচ আদায় করে বলে অভিযোগ ওঠে।
টিকা নিতে আসা গরুর মালিক মো. কিবরিয়া জানিয়েছেন, প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে জোরপূর্বক অ্যানথ্রাক্স টিকা বিতরণে গরুপ্রতি ১০ টাকা ও ক্ষেত্রবিশেষ আরও বেশি হারে আদায় করেছে। সদর ব্লকের ভিএফএ উশাথোয়াই মার্মা এবং অফিস সহকারী এমন চাকমা জানিয়েছেন, পারিশ্রমিক বাবদ অ্যানথ্রাক্স টিকা প্রদানে গরুপ্রতি ১০ টাকা হারে নেয়া হচ্ছে। ভ্যাকসিন প্রদানে গরুপ্রতি সরকার নির্ধারিত ফি ৬০ পয়সা হলেও জনসাধারণ খুশি হয়ে ১০ টাকা হারে প্রদান করছে বলে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানিয়েছেন। অথচ অতিরিক্ত টাকা আদায় করায় জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পাবনা : অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কে বৃহত্তর পাবনায় দুগ্ধখামারিরা মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন। সাঁথিয়ায় অ্যানথ্রাক্সে গরু মারা যাওয়ায় দুগ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, বাঘাবাড়ী, বেলকুচি, চৌহালী, উল্লাপাড়া এবং পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরসহ জেলার ১০টি উপজেলায় ৫০ হাজার খামারির মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে গেছে। এদিকে অ্যানথ্রাক্সের ভ্যাকসিনের অভাবে আক্রান্ত মানুষ ও গরু চিকিত্সা পাচ্ছে না। প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মীরা মাঠে আছেন বলা হলেও তেমন কোনো মাঠকর্মীকে পাওয়া যায়নি। তবে প্রাণিসম্পদ বিভাগের উপ-পরিচালক বলেন, লোকবলের অভাবে ঠিকমতো ভ্যাকসিন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রাণিসম্পদ বিভাগের মাঠকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা প্রতিটি গরু ভ্যাকসিন বাবদ ৩০ টাকা করে নিচ্ছেন। এদিকে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, এ পর্যন্ত পাবনার ৪টি উপজেলায় ৯টি গাভী, দুটি ছাগল আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে এবং ৫৬ জন মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। তবে বেসরকারি হিসাবে প্রায় শতাধিক গরু মারা গেছে এবং ৮৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে অ্যানথ্রাক্স রোগে গরু ও মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে সাধারণ মানুষ দুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে মহাবিপদে পড়েছেন বৃহত্তর পাবনার ৫০ হাজার খামারি। দুধের দাম কমে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া গরু মোটাতাজাকরণের পর সেই গরু বিক্রি করতে গিয়ে দাম না পেয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে।
বাঘাবাড়ী ও বেড়া দুগ্ধ উত্পাদনকারী সমিতির সভাপতি এবিএম নুরুন্নবী সাইমুম জানান, অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কে মানুষ দুধ কেনা বাদ দেয়ায় বাজার অর্ধেকে নেমে এসেছে। এছাড়া যারা বিক্রির জন্য গরু মোটাতাজা করেছিলেন, তারাও বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?