Amardesh
আজঃ ঢাকা, শনিবার ৪ সেপ্টেম্বর ২০১০, ২০ ভাদ্র ১৪১৭, ২৪ রমজান ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ রাত ১.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট রোগীদের মানসিক কারাগার

হাসান শান্তনু
গতকাল তখন সকাল সাড়ে দশটা। রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগ একেবারে নীরব। এ বিভাগে রোগীর জন্য আছে ছয়টি শয্যা। সব শয্যা খালি। কর্তব্যরত চিকিত্সকের কক্ষের দরজা খোলা। তবে ভেতরে কেউ নেই। এ কক্ষের সামনে পেতে রাখা লম্বা টুলে বসে চিকিত্সকের অপেক্ষা করছিলেন তিন রোগী। পাশে সেবিকার কক্ষেও কেউ নেই। এ বিভাগের সামনে টানানো আছে একটি জরুরি নোটিশ। তাতে লেখা জরুরি বিভাগ দুপুর দুটা থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত খোলা। সরকারি ছুটির দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা। গতকাল সরকারি ছুটির দিন হলেও চিকিত্সক ডা. হারুনুর রশীদকে পাওয়া যায় দুপুর ২টার পর। চিকিত্সককে না পেয়ে এরই মধ্যে বাসায় ফিরে গেছেন দুই রোগী। খোঁজ নিলে জানা যায়, এ প্রতিষ্ঠানের জরুরি বিভাগসহ অন্য বিভাগে এসে চিকিত্সককে না পেয়ে রোগীদের ফিরে যাওয়ার এ চিত্র প্রতিদিনের।
দোতলার রোগী ওয়ার্ডে গেলে দেখা যায়, সেটি তালাবদ্ধ। এ ওয়ার্ডে চিকিত্সা নিচ্ছেন প্রায় ২০ মানসিক রোগী। গতকাল সকাল ১১টায় কয়েক রোগী গেটের তালা ভেঙে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তারা প্রলাপ বকতে থাকেন। ঘণ্টা দেড়েক পর এক সেবিকা এসে রোগীদের ধমক দেন। একপর্যায়ে ওই সেবিকা তাদের গালাগালি শুরু করেন। এ সময় গেটের পাশে কর্তব্যরত চিকিত্সকের কক্ষটি ছিল তালাবদ্ধ। কয়েক রোগীর অভিভাবক আমার দেশ-এর কাছে অভিযোগ করেন, হাসপাতালের সেবিকা, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা এরকম আচরণ প্রায়ই রোগীদের সঙ্গে করেন। বকশিশ না পেলে তারা ভালো আচরণ করেন না। তাতে মানসিক রোগীরা সবসময়ই থাকেন মানসিক চাপে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানী স্বীকার করেন, হাসপাতালের স্টাফদের মধ্যে অনেকে অর্ধশিক্ষিত। রোগীর সঙ্গে দরদ, মমতা জড়ানো আচরণ তারা সবসময় করতে পারেন না।
জানা যায়, এ চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানে যারা ভর্তি হন, তারা নানা মানসিক রোগে আক্রান্ত। তারা বাইরে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা প্রতিনিয়তই করেন। তাদের আটকে রাখার জন্য রোগী ওয়ার্ডগুলো সবসময় তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। এ প্রতিষ্ঠানে রোগীদের দুই ভাগে ভাগ করে চিকিত্সাসেবা দেয়া হয়। এর মধ্যে আছে লঘু মানসিক রোগী ও গুরুতর মানসিক রোগী। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা, উদ্বেগজনিত ভীতিতে আক্রান্তদের ধরা হয় লঘু মানসিক রোগী। আর হর্ষবিষাদ উন্মত্ততা, সন্দেহবাতিকে আক্রান্তদের ধরা হয় গুরুতর মানসিক রোগী। তাদের চিকিত্সার ওষুধও আলাদা। তবে দু’রকমের রোগীকে রাখা হচ্ছে একই ওয়ার্ডে। তাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড নেই। হর্ষবিষাদ উন্মত্ততায় আক্রান্তরা প্রায় সময় হৈ চৈ করেন, জিনিসপত্র ছোড়াছুড়ি করেন, জোরে জোরে প্রলাপ বকেন। যা বিষণ্নতায় আক্রান্তদের মাঝে অনেক সময় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে চিকিত্সকরা মনে করেন।
দেশের অন্যতম এ সরকারি চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান ভুগছে রোগী সঙ্কটে। প্রতিষ্ঠানটির বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও জরুরি বিভাগে বেশিরভাগ সময় থাকে রোগী সঙ্কট। এ প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জরিপ মতে, দেশের ৫০ লাখ মানুষ চরম হতাশায় ভুগছেন। তারা নানা মানসিক রোগে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারাবিশ্বের মতো এদেশেও মানসিক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। চিকিত্সার অভাবে তাদের মধ্যে অনেকে বদ্ধ পাগল হয়ে যাচ্ছেন, অনেকে করছেন আত্মহত্যা। মানসিক সমস্যা থেকে আত্মহত্যার ঘটনাও দেশে বেড়েছে। আত্মহত্যার প্রবণতায় ভুগছেন এরকম রোগী দেশে বাড়লেও এ প্রতিষ্ঠানে চিকিত্সার জন্য বছরে গড়ে ২০০ জনের বেশি আসেন না। পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে গত ৫ বছরে প্রায় ৫৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। অন্য এক হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে ১৪ হাজারের বেশি মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে মানসিক রোগে আক্রান্তদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। নানা হিসাবে দেশে রোগী বাড়লেও এ ইনস্টিটিউটে রোগীর সঙ্কট কাটছে না। ২০০ শয্যা এ চিকিত্সা কেন্দ্রে অধিকাংশ সময় চিকিত্সাধীন থাকেন বড়জোর ১০০ রোগী। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার অভাব, সরকারের উদাসীনতা ও রোগীর প্রতি চিকিত্সকদের অবহেলাই সঙ্কটের কারণ বলে জানা যায়।
অন্যদিকে এ প্রতিষ্ঠানে কেবল নেই আর নেই। কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীদের বিনামূল্যে ৩০ আইটেমের ওষুধ দেয়া হয়। রোগীর অভিভাবকের অভিযোগ, অনেক ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। যাদের সামর্থ্য নেই তারা ওষুধ কিনতে পারছেন না। রোগীদের হাঁটাচলার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তালাবদ্ধ অবস্থায় ওষুধ, চিকিত্সাসেবা ছাড়া অনেক রোগীকে থাকতে হচ্ছে। তাতে অনেকের কাছে এ হাসপাতাল হয়ে উঠেছে মানসিক কারাগার। প্রতিষ্ঠানটিতে নেই পর্যাপ্ত সংখ্যক লোকবল। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে আছেন ১৫৯ জন। এর মধ্যে চিকিত্সক ৩৪ জন, সেবিকা ৩৯ জন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সঙ্কট চরমে পৌঁছেছে। তাতে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন রোগী ও অভিভাবকরা। অনেক রোগীর অভিভাবককে বাধ্যতামূলক হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানী জানান, পাঁচ রোগীর জন্য একজন কর্মচারী দরকার। অথচ ২৫ রোগীর জন্য থাকছেন একজন কর্মচারী।
প্রতিষ্ঠানটিতে আছে মাদকাসক্তদের চিকিত্সার জন্য বিশেষ ওয়ার্ড। তাতে শয্যা আছে ৫০টি। সরেজমিন দেখা যায়, ওই ওয়ার্ডে ছয় থেকে সাতজন ভর্তি আছেন। অথচ দেশে মাদকাসক্তি নিরাময়ের বেসরকারি চিকিত্সা কেন্দ্রগুলো সবসময় থাকে রোগীতে ভর্তি। অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানী এ প্রসঙ্গে জানান, কর্মচারীর অভাবে মাদকাসক্ত রোগী বেশি রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির এক চিকিত্সক বলেন, অনিয়মের কারণে এ ওয়ার্ডের চিকিত্সা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। তাছাড়া বেসরকারি মাদকাসক্তি চিকিত্সা কেন্দ্রের দালালদের এখানে দাপট আছে। তারা এখান থেকে রোগী ভাগিয়ে নিচ্ছে।
তথ্যমতে, ১৯৯৫ সাল থেকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের হাসপাতালপাড়া বলে পরিচিত এলাকায় এ চিকিত্সা কেন্দ্রের ভবন নির্মিত হয়। ২০০১ সাল থেকে চিকিত্সা কার্যক্রম শুরু হয়। এ প্রতিষ্ঠানে বিভাগ আছে ছয়টি। সব বিভাগে আছে বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ। ছয়টি বিভাগ মিলে প্রতিদিন রোগী আসেন গড়ে দেড়শ’ থেকে দুইশ’। এ প্রতিষ্ঠানে আসা রোগীদের মধ্যে শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগই গরিব। রোগীর জন্য থাকা ২০০টি শয্যার মধ্যে ৬০ ভাগ পেয়িং আর বাকি ৪০ ভাগ নন পেয়িং। প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিত্সায় উচ্চতর কোর্সও চালু আছে। এখানে দু’রকমের গবেষণা হয়। যারা এখান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছেন তারা গবেষণা করেন। আর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ক্লিনিক্যাল সাইক্লোজিতে গবেষণার জন্যও শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন। এ প্রতিষ্ঠানের গবেষণা সংক্রান্ত প্রকাশনাও আছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ জার্নাল নামের এ ম্যাগাজিন প্রতি তিন মাস পর প্রকাশ হয়। পত্রিকাটির এক বছরে চারটি সংখ্যার জন্য চলতি অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ আছে পাঁচ লাখ টাকা।
এ প্রতিষ্ঠান দেশে বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছে মানসিক রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা নিয়ে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। ওই জরিপে দেশের রোগীদেরই কেবল অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে বিদেশে প্রতিষ্ঠানটির খ্যাতি লাভ করার কারণ হলো, উন্নয়নশীল অনেক দেশ এখনও পর্যন্ত এরকম জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। সার্কভুক্ত কোনো দেশেই মানসিক রোগীদের নিয়ে জরিপ নেই। প্রতিষ্ঠানটির অধীনে কেরানীগঞ্জ, ধামরাই, সোনারগাঁও ও কালীগঞ্জ উপজেলার মানসিক চিকিত্সাসেবা কার্যক্রম চলছে। সেখানকার সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ‘মডেল’ হিসেবে বিবেচনা করে কমিউনিটিভিত্তিক এ কার্যক্রম চলছে।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?