বিশ্বজুড়ে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীর শাস্তি—এরশাদের বিচারের সুযোগ অবশ্যই আছে : শাহদীন মালিক বিচারের দুটি পথ খোলা : বিশেষজ্ঞদের অভিমত
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
গত ২৬ আগস্ট সুপ্রিমকোর্টের এক রায়ে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর থেকে সাবেক স্বৈরশাসক হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা জবর দখলের অভিযোগে বিচারের সম্মুখীন হচ্ছেন কিনা, তা নিয়ে মিডিয়া থেকে মাঠপর্যায়ে নানা জল্পনা-কল্পনা হচ্ছে। এরশাদের বিচার প্রচলিত আইনে করা সম্ভব হবে, না সংসদে নতুন আইন করে তার বিচার হবে, না-কি আদৌ তার বিচার হবে না—এ প্রশ্ন সর্বত্র। বিশ্বের সামরিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় অবৈধ ক্ষমতা দখলদারে বিচারের রেকর্ড কম। তবে দুটি ভিন্ন অভিযোগে এরশাদের বিচার হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। তবে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বল যেহেতু ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের কোর্টে, সেহেতু এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে। আর সরকারকে এ উদ্যোগ সংসদের ভেতরে ও বাইরে নিতে হবে।
অবশ্য ক্ষমতা হারানোর পরও জবর দখলকারী স্বৈরশাসকরা বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন—এমন নজির আমাদের সামনে খুব একটা নেই। তাই সাবেক স্বৈরশাসক হুসাইন মুহম্মদ এরশাদও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের অপরাধে বিচারের সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন—এমন নিশ্চয়তা কোনো মহল দিতে পারছে না।
এদিকে মিডিয়ায় সাম্প্রতিক আলোচনায় এটা ফুটে উঠেছে, আইন না থাকার কারণে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী এরশাদের বিচার হয়তো সম্ভব হবে না। তবে ভিন্ন অপরাধের কারণে তাকে দুটি প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। এ দুটি প্রক্রিয়া হচ্ছে— সেনাপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন মর্মে, সেনা আইনে এরশাদের বিচার হতে পারে। দ্বিতীয় পন্থাটি হচ্ছে, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানকালে সেলিম, দেলোয়ার, জেহাদ, রাউফুন বসুনিয়া, নূর হোসেন, ডাক্তার মিলনসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে সাবেক এ স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মামলা হলে বিচার করা যায়। সম্প্রতি আর্জেন্টিনার সাবেক স্বৈরশাসক রাফায়েল ভিদেলাকেও একই পন্থায় বিচারের সম্মুখীন করে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন দৈনিক আমার দেশকে বলেন, অন্যায় বা ভুল স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা না চাইলে এরশাদের বিচার হওয়া উচিত। তবে কোন আইনে বিচার হতে পারে, তা বাতলে দিতে পারেন বিচারকরা। আমার জানা মতে, এখনও পর্যন্ত মহাজোটে এরশাদের বিচার ইস্যুতে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
সাবেক স্বৈরশাসক এইচএম এরশাদের বিচার প্রসঙ্গে আইনজীবী শাদহীন মালিক গতকাল আমার দেশকে বলেন, অবশ্যই এরশাদের বিচার করার সুযোগ রয়েছে। প্রচলিত আইনেই ফৌজদারি মামলায় তার বিচার সম্ভব। তবে এ বিষয়ে উদ্যোগ অবশ্যই সরকারকে নিতে হবে। এক্ষেত্রে বাদীপক্ষে থাকবে সরকার আর অন্যপক্ষে অভিযুক্ত।
‘আমার বিচার কেউ করতে পারবে না’ এরশাদের এ মন্তব্যের জবাবে সিনিয়র এই আইনজীবী বলেন, সঠিকভাবে ও সত্য কথা বলার অতীত ইতিহাস এরশাদের নেই। তিনি নিজে চাইবেন না আরও ১০ বছর জেল খাটি। তাই এসব বলে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা তো করবেনই। অতীতে এরশাদের একাধিক মামলা প্রত্যাহার হয়েছে এমন উদাহরণ তুলে ধরে শাদহীন মালিক বলেন, আইনের ফাঁকফোকড় বের করে এরশাদ আমাদের নীতিহীন রাজনীতির সুযোগ নিতে চাইবেন—এটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
এরশাদের সামরিক শাসনের ভিকটিম ও বিএনপির তত্কালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমদ কোরেশী গতকাল আমার দেশকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আদালতের রায়েই এরশাদকে দোষী সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং তার বিচারের পথে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টির (পিডিপি) বর্তমান সভাপতি ফেরদৌস কোরেশি বলেন, আমরা আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, এরশাদের বিচার সম্ভব। এরশাদ আইনের ফাঁকফোকড় খুঁজে পার পাওয়ার অপচেষ্টা করছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ঈদের পর তিনি ও তার দল এরশাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার দিকে যাবে।
এদিকে এরশাদের বিচারের ব্যাপারে এখনও সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার তো এরশাদের বিচারের কথা বলছে না। বিচারের কোনো পদক্ষেপ এখনও দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, রায় হাতে না পাওয়া গেলে বিচারের বিষয়ে কিছু বলা যাবে না। তবে যতটুকু আমি জানি এ বিষয়ে সংসদে সিদ্ধান্ত হবে।
সঙ্গত কারণে এরশাদের বিচার হবে কি হবে না বা এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন মহাজোট কী ভাবছে, তা নিয়ে চূড়ান্ত কথাটি ঠিক এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে স্বৈরশাসকদের ব্যাপারে নিকট-অতীতের নানা উদাহরণ থেকে দেখা গেছে, গত শতকের মাঝামাঝি থেকে বিভিন্ন দেশে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে কিছুদিন গদিতে বসে থাকতে পেরেছেন, তাদের অনেকেই গদিচ্যুত হলেও বিচার বা শাস্তির সম্মুখীন হননি।
অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে এরশাদের বিচারের পথে দুটি বাধা রয়ে গেছে। প্রথম বাধাটি হচ্ছে স্বৈরশাসকদের বিচারের জন্য পর্যাপ্ত আইন। দ্বিতীয় বাধাটি একান্তভাবেই রাজনৈতিক। আর তা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি থেকে অতীতেও যেমন সহযোগিতা পেয়েছে, বর্তমান মহাজোট সরকার গঠনেও সহযোগিতা পেয়েছে। এ সম্পর্ক নষ্ট করার ঝুঁকি আওয়ামী লীগ নিতে যাচ্ছে—এমন কোনো লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়। প্রথম বাধার সমর্থনে এরই মধ্যে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, বিশিষ্ট আইনজীবী আনিসুল হক ও আরও কয়েক আইনজীবী বলে দিয়েছেন, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে ক্ষমতা জবর দখলের বিচার করার মতো আইন নেই। আর বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আজ আইন তৈরি করে তা দিয়ে আইনি ভাষায় ‘গতকাল যা অপরাধ ছিল না’ তার জন্য দণ্ড দেয়া যায় না। তবে আনিসুল হক পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, জেনারেল এরশাদ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ককে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন মর্মে সেনা আইনে তার বিচার করা সম্ভব হতে পারে। এছাড়া আর্জেন্টিনার পথ অনুসরণ করে খুন ও গুমের অভিযোগে স্বৈরশাসক রাফায়েল ভিদেলার মতো এরশাদকেও শাস্তি দেয়া যায়।
স্বৈরশাসকরা যুগে যুগে পার পেয়ে গেছেন। ১৯৫৮ সালে তত্কালীন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান তত্কালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে দিয়ে সংবিধান বাতিল করিয়ে সেনাশাসন ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানেরই সাগরেদ নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাকে অপসারণ করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক শাসনকর্তা হন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হলে ইয়াহিয়া খানও ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু পাকিস্তানে এ ২ জবর দখলকারীর কারোরই বিচার হয়নি।
১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে ভবিষ্যতের অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদের বিচারের কথা সংযুক্ত হয়। কিন্তু সেনা অভ্যুত্থান থেমে থাকেনি। সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউল হক পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতায় থাকাকালে এক বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেলেও তার মরণোত্তর বিচারে পাকিস্তান সরকারের আগ্রহের কথা শোনা যায়নি। জেনারেল পারভেজ মোশাররফ জনগণের বিক্ষোভের চাপে ক্ষমতা ছাড়লেও জোর করে গদি দখলের অপরাধে তারও বিচার হয়নি এখন পর্যন্ত।
মিয়ানমারে জেনারেল নে উইন ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৮৮ সালে জনতার বিক্ষোভের চাপে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু জোর করে ক্ষমতা দখলের দায়ে তার বিচার হয়নি; বরং আরেক দল সেনাশাসক ১৯৯০-এর সাধারণ নির্বাচনের ফল অমান্য করে তখন থেকে এখন পর্যন্ত সেনাশাসন অব্যাহত রেখেছেন। ইন্দোনেশিয়ায় জেনারেল সুহার্তো কমিউনিস্ট দমনের নামে দেশে ভয়ঙ্কর রক্তবন্যা বইয়ে দেন। কিছুদিন পর তিনি রাষ্ট্রপতি সুকর্নোকে অপসারণ করে নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। ১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়া দারুণ অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ার পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার অভিযোগে সুহার্তোর বিচার হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক শাসকরাও ক্ষমতা দখলের জন্য কোনো বিচারের মুখোমুখি হননি।
পানামার নরিয়েগাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধরে নিয়ে গিয়ে মাদক চালানের জন্য বিচার করেছে; কিন্তু জোর করে ক্ষমতা দখলের জন্য তার শাস্তি হয়নি। সাইপ্রাসে যে সামরিক কর্মকর্তারা আর্চবিশপ মাকারিয়সকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ক্যু করে সরিয়ে দিয়েছিল, তাদেরও বিচার হয়নি। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে ঘৃণিত অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী ও সেনাশাসক চিলির পিনোশের কোনো বিচার হয়নি সেদেশে। আর্জেন্টিনার সাবেক সেনাশাসক রাফায়েল ভিদেলার ২৫ বছর কারাদণ্ড হয়েছে সম্প্রতি, কিন্তু তা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য নয়। বরং তার শাসনামলে যে বিরুদ্ধ মতাবলম্বীরা গুপ্তহত্যা ও গুম হয়ে যাওয়ার শিকার হন সরকারের গোপন বাহিনীদের হাতে, সেই অপরাধে তার সাজা হয়েছে। একই পন্থায় এরশাদেরও বিচার করা সম্ভব।
অবশ্য ক্ষমতা হারানোর পরও জবর দখলকারী স্বৈরশাসকরা বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন—এমন নজির আমাদের সামনে খুব একটা নেই। তাই সাবেক স্বৈরশাসক হুসাইন মুহম্মদ এরশাদও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের অপরাধে বিচারের সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন—এমন নিশ্চয়তা কোনো মহল দিতে পারছে না।
এদিকে মিডিয়ায় সাম্প্রতিক আলোচনায় এটা ফুটে উঠেছে, আইন না থাকার কারণে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী এরশাদের বিচার হয়তো সম্ভব হবে না। তবে ভিন্ন অপরাধের কারণে তাকে দুটি প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। এ দুটি প্রক্রিয়া হচ্ছে— সেনাপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন মর্মে, সেনা আইনে এরশাদের বিচার হতে পারে। দ্বিতীয় পন্থাটি হচ্ছে, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানকালে সেলিম, দেলোয়ার, জেহাদ, রাউফুন বসুনিয়া, নূর হোসেন, ডাক্তার মিলনসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে সাবেক এ স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মামলা হলে বিচার করা যায়। সম্প্রতি আর্জেন্টিনার সাবেক স্বৈরশাসক রাফায়েল ভিদেলাকেও একই পন্থায় বিচারের সম্মুখীন করে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন দৈনিক আমার দেশকে বলেন, অন্যায় বা ভুল স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা না চাইলে এরশাদের বিচার হওয়া উচিত। তবে কোন আইনে বিচার হতে পারে, তা বাতলে দিতে পারেন বিচারকরা। আমার জানা মতে, এখনও পর্যন্ত মহাজোটে এরশাদের বিচার ইস্যুতে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
সাবেক স্বৈরশাসক এইচএম এরশাদের বিচার প্রসঙ্গে আইনজীবী শাদহীন মালিক গতকাল আমার দেশকে বলেন, অবশ্যই এরশাদের বিচার করার সুযোগ রয়েছে। প্রচলিত আইনেই ফৌজদারি মামলায় তার বিচার সম্ভব। তবে এ বিষয়ে উদ্যোগ অবশ্যই সরকারকে নিতে হবে। এক্ষেত্রে বাদীপক্ষে থাকবে সরকার আর অন্যপক্ষে অভিযুক্ত।
‘আমার বিচার কেউ করতে পারবে না’ এরশাদের এ মন্তব্যের জবাবে সিনিয়র এই আইনজীবী বলেন, সঠিকভাবে ও সত্য কথা বলার অতীত ইতিহাস এরশাদের নেই। তিনি নিজে চাইবেন না আরও ১০ বছর জেল খাটি। তাই এসব বলে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা তো করবেনই। অতীতে এরশাদের একাধিক মামলা প্রত্যাহার হয়েছে এমন উদাহরণ তুলে ধরে শাদহীন মালিক বলেন, আইনের ফাঁকফোকড় বের করে এরশাদ আমাদের নীতিহীন রাজনীতির সুযোগ নিতে চাইবেন—এটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
এরশাদের সামরিক শাসনের ভিকটিম ও বিএনপির তত্কালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমদ কোরেশী গতকাল আমার দেশকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আদালতের রায়েই এরশাদকে দোষী সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং তার বিচারের পথে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টির (পিডিপি) বর্তমান সভাপতি ফেরদৌস কোরেশি বলেন, আমরা আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, এরশাদের বিচার সম্ভব। এরশাদ আইনের ফাঁকফোকড় খুঁজে পার পাওয়ার অপচেষ্টা করছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ঈদের পর তিনি ও তার দল এরশাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার দিকে যাবে।
এদিকে এরশাদের বিচারের ব্যাপারে এখনও সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার তো এরশাদের বিচারের কথা বলছে না। বিচারের কোনো পদক্ষেপ এখনও দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, রায় হাতে না পাওয়া গেলে বিচারের বিষয়ে কিছু বলা যাবে না। তবে যতটুকু আমি জানি এ বিষয়ে সংসদে সিদ্ধান্ত হবে।
সঙ্গত কারণে এরশাদের বিচার হবে কি হবে না বা এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন মহাজোট কী ভাবছে, তা নিয়ে চূড়ান্ত কথাটি ঠিক এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে স্বৈরশাসকদের ব্যাপারে নিকট-অতীতের নানা উদাহরণ থেকে দেখা গেছে, গত শতকের মাঝামাঝি থেকে বিভিন্ন দেশে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে কিছুদিন গদিতে বসে থাকতে পেরেছেন, তাদের অনেকেই গদিচ্যুত হলেও বিচার বা শাস্তির সম্মুখীন হননি।
অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে এরশাদের বিচারের পথে দুটি বাধা রয়ে গেছে। প্রথম বাধাটি হচ্ছে স্বৈরশাসকদের বিচারের জন্য পর্যাপ্ত আইন। দ্বিতীয় বাধাটি একান্তভাবেই রাজনৈতিক। আর তা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি থেকে অতীতেও যেমন সহযোগিতা পেয়েছে, বর্তমান মহাজোট সরকার গঠনেও সহযোগিতা পেয়েছে। এ সম্পর্ক নষ্ট করার ঝুঁকি আওয়ামী লীগ নিতে যাচ্ছে—এমন কোনো লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়। প্রথম বাধার সমর্থনে এরই মধ্যে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, বিশিষ্ট আইনজীবী আনিসুল হক ও আরও কয়েক আইনজীবী বলে দিয়েছেন, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে ক্ষমতা জবর দখলের বিচার করার মতো আইন নেই। আর বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আজ আইন তৈরি করে তা দিয়ে আইনি ভাষায় ‘গতকাল যা অপরাধ ছিল না’ তার জন্য দণ্ড দেয়া যায় না। তবে আনিসুল হক পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, জেনারেল এরশাদ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ককে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন মর্মে সেনা আইনে তার বিচার করা সম্ভব হতে পারে। এছাড়া আর্জেন্টিনার পথ অনুসরণ করে খুন ও গুমের অভিযোগে স্বৈরশাসক রাফায়েল ভিদেলার মতো এরশাদকেও শাস্তি দেয়া যায়।
স্বৈরশাসকরা যুগে যুগে পার পেয়ে গেছেন। ১৯৫৮ সালে তত্কালীন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান তত্কালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে দিয়ে সংবিধান বাতিল করিয়ে সেনাশাসন ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানেরই সাগরেদ নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাকে অপসারণ করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক শাসনকর্তা হন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হলে ইয়াহিয়া খানও ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু পাকিস্তানে এ ২ জবর দখলকারীর কারোরই বিচার হয়নি।
১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে ভবিষ্যতের অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদের বিচারের কথা সংযুক্ত হয়। কিন্তু সেনা অভ্যুত্থান থেমে থাকেনি। সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউল হক পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতায় থাকাকালে এক বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেলেও তার মরণোত্তর বিচারে পাকিস্তান সরকারের আগ্রহের কথা শোনা যায়নি। জেনারেল পারভেজ মোশাররফ জনগণের বিক্ষোভের চাপে ক্ষমতা ছাড়লেও জোর করে গদি দখলের অপরাধে তারও বিচার হয়নি এখন পর্যন্ত।
মিয়ানমারে জেনারেল নে উইন ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৮৮ সালে জনতার বিক্ষোভের চাপে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু জোর করে ক্ষমতা দখলের দায়ে তার বিচার হয়নি; বরং আরেক দল সেনাশাসক ১৯৯০-এর সাধারণ নির্বাচনের ফল অমান্য করে তখন থেকে এখন পর্যন্ত সেনাশাসন অব্যাহত রেখেছেন। ইন্দোনেশিয়ায় জেনারেল সুহার্তো কমিউনিস্ট দমনের নামে দেশে ভয়ঙ্কর রক্তবন্যা বইয়ে দেন। কিছুদিন পর তিনি রাষ্ট্রপতি সুকর্নোকে অপসারণ করে নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। ১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়া দারুণ অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ার পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার অভিযোগে সুহার্তোর বিচার হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক শাসকরাও ক্ষমতা দখলের জন্য কোনো বিচারের মুখোমুখি হননি।
পানামার নরিয়েগাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধরে নিয়ে গিয়ে মাদক চালানের জন্য বিচার করেছে; কিন্তু জোর করে ক্ষমতা দখলের জন্য তার শাস্তি হয়নি। সাইপ্রাসে যে সামরিক কর্মকর্তারা আর্চবিশপ মাকারিয়সকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ক্যু করে সরিয়ে দিয়েছিল, তাদেরও বিচার হয়নি। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে ঘৃণিত অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী ও সেনাশাসক চিলির পিনোশের কোনো বিচার হয়নি সেদেশে। আর্জেন্টিনার সাবেক সেনাশাসক রাফায়েল ভিদেলার ২৫ বছর কারাদণ্ড হয়েছে সম্প্রতি, কিন্তু তা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য নয়। বরং তার শাসনামলে যে বিরুদ্ধ মতাবলম্বীরা গুপ্তহত্যা ও গুম হয়ে যাওয়ার শিকার হন সরকারের গোপন বাহিনীদের হাতে, সেই অপরাধে তার সাজা হয়েছে। একই পন্থায় এরশাদেরও বিচার করা সম্ভব।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


