শাওনের উত্থান যেভাবে
আলাউদ্দিন আরিফ
জাতীয় সংসদের ১১৭ (ভোলা-৩) আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের উত্থান রীতিমতো বিস্ময়কর। কিছু দিন আগেও তার পরিচিতি ছিল ক্যাডার টেন্ডারবাজ হিসেবে। ঢাকার মালিবাগে এইচবিএম ইকবালের মিছিল থেকে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের মিছিলে গুলি করে ৪ জনকে হত্যা করার মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিলেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর নেতা শাওন। তাকেই গত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে মো. জসিম উদ্দিনের পাশাপাশি মনোনয়নের তালিকায় দ্বিতীয় নাম হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। বিতর্কিত নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর শাওনের সশস্ত্র ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি ও টেন্ডার চাঁদাবাজি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে টেন্ডারের বিরোধকে কেন্দ্র করে শাওনের লাইসেন্স করা পিস্তলের গুলিতেই খুন হন তারই ঘনিষ্ঠ ক্যাডার যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম আহমদ। এরপর থেকে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।
প্রশ্ন আসে কে এই শাওন। হত্যা মামলা থেকে তাকে আড়াল করতে কেন এত তত্পরতা? শাওন সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, আদালতের রায়ে ভোলা-৩ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি জসিম উদ্দিনের এমপি পদ বাতিল হওয়ায় গত ২৪ এপ্রিল উপনির্বাচন হয়। এতে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনকে। চরম কারচুপি ও দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে শাওন ৯৩ হাজার ৮৭৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। মেজর হাফিজ পান ৪৩ হাজার ১৫৮ ভোট। প্রায় ৫০ হাজার ৭১৫ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন শাওন। খুন হওয়া যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম আহমদ ওই সময় শাওনের সশস্ত্র ক্যাডার হিসেবে লালমোহন এলাকায় কাজ করেছিলেন।
নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের পৈতৃক বাড়ি ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার পঞ্চায়েত বাড়ি এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গ্রামের বাড়িতে তাদের ভিটেমাটিও নেই। সবাই থাকেন ঢাকার মগবাজারের মিরবাগ এলাকায়। গত উপনির্বাচনের আগে শাওন লালমোহনের কলেজপাড়া এলাকায় একটি বাড়ি কেনেন। শাওনের ঢাকার বাসা রমনা থানাধীন ১/বি, মিরবাগ মগবাজার এলাকায়। তার বাবা নূরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। মা হোসনে আরা বেগম গৃহিণী। সাধারণ পরিবারের সন্তান শাওনের উত্থান শুরু নব্বইয়ের দশকের পর। তিনি রমনা এলাকার এমপি এইচবিএম ইকবালের ক্যাডার হিসেবে কাজ করতেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি সিদ্ধেশ্বরী কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেন। ওই নির্বাচনে পুরো প্যানেল ছাত্রদল জয়ী হলেও ভিপি হিসেবে জয়লাভ করেন শাওন। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে শাওন ছাত্রলীগ ছেড়ে যুবলীগে যোগ দেন। ওই সময় শাওনকে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। পরে সাধারণ সম্পাদক পদ পান। যুবলীগে যোগ দেয়ার পর থেকেই সরকারি উন্নয়ন কাজের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ বা টেন্ডারবাজচক্রের সঙ্গে শাওনের সখ্য গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি হরতালবিরোধী মিছিল থেকে গুলি করে বহুল আলোচিত মালিবাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের নাম আসে। তিনি এ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিও। মালিবাগ হত্যাকাণ্ডের সময় অস্ত্র হাতে যে যুবকের ছবি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়, সেই যুবক শাওনের দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে জানা গেছে। অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার দ্রুত বিচার আদালত নুরুন্নবীসহ ১৪ জনকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
মালিবাগ হত্যাকাণ্ড ছাড়াও শাওনের বিরুদ্ধে শুধু ২০০৬ সালে ঢাকার পল্টন থানায় কমপক্ষে সাতটি ফৌজদারি মামলা হয়েছে। মামলাগুলো হলো ৪৩(৩)০৬, ৩৪(৪)০৬, ১(১১)০৬, ২৭(৪)০৬, ৩১(১)০৬, ২৫(৫)০৬, ২২(৬)০৬। এর মধ্যে ৪৩(৩)০৬ মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে। অপর মামলাগুলো এখনও বিচারাধীন। শাওন নিজেও এ ৭ মামলার কথা স্বীকার করে নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামায় বলেছেন, জোট আমলে রাজনৈতিকভাবে এসব মামলা দেয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক যুবলীগ নেতা ও বর্তমান এমপি শাওনের ইশারা ছাড়া ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) কোনো টেন্ডারেরই ফয়সালা হয় না। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রকাশ্যে কিংবা নেপথ্যে থেকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন শাওন। আগে ছাত্রলীগ যুবলীগের রাজনীতি করলেও ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি আওয়ামী লীগের মূল স্রোতের বাইরে ছিলেন। ওই সময় তিনি কিংস পার্টি খ্যাত ফেরদৌস আহমেদ কোরোশীর গঠন করা প্রগেসিভ ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে (পিডিবি) যোগদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই সময়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। তখন যুবলীগ নেতারা তাকে দল থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেয়। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ও বিরাট অংকের টাকার কাছে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায় বলে যুবলীগের এক নেতা জানান। ওয়ান ইলেভেনে কিংস পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় সে সময় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিতে তিনি ভূমিকা রাখেন।
বর্তমান মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর যুবলীগ ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাওন ও তার সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন মহি ডিসিসির সব ধরনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। মহিউদ্দিন মহি সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ায় অনেক সময় দাফতরিক কাজে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। আর এ কারণে ডিসিসির টেন্ডারের পুরো নিয়ন্ত্রণই শাওন নিজের হাতে তুলে নেন বলে ডিসিসির তালিকাভুক্ত একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন। এছাড়াও শাওনের ঠিকাদারি কাজে প্রধান সহযোগী হিসেবে একজন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সহকারীর (এপিএস) নাম শোনা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে নগর ভবনে যতগুলো অঘটন ঘটেছে, তার সবক’টিতেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাওন জড়িত ছিলেন। শাওন ও তার ক্যাডাররা যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক বিএনপি সমর্থিত, তাদেরকে নগর ভবনে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দেয়।
শাওনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স নওয়াল কনস্ট্রাকশন। শাওনের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সূত্র জানায়, নওয়াল কনস্ট্রাকশনের নামে শাওন কাজ নেন খুবই কম। পছন্দনীয় লাভজনক দু’একটি কাজ ছাড়া অন্যগুলো নয়। অন্য কাজগুলো তিনি আর্থিক কমিশনের বিনিময়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে মীম, মাহমুদা, মালিহাসহ বেশ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ারও খবর রয়েছে।
শাওন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বর্তমান সরকারের সময় যেসব কাজ হাতিয়ে নিয়েছেন, তার মধ্যে গতবছর মোহাম্মদপুরে রাস্তাঘাট উন্নয়নে ৬০ কোটি টাকার দরপত্র এবং পুরনো ঢাকার নাজিরা বাজারে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে হানিফ কমিউনিটি সেন্টারের ঠিকাদারির কাজ ভাগবাটোয়ারার ঘটনা বহুল আলোচিত হয়। শাওনের মালিকানাধীন নওয়াল কনস্ট্রাকশন সিটি কর্পোরেশনের অধীনস্থ মতিঝিল এলাকার কার পার্কিংয়ের কাজ নিয়েছে। এখানে আগে পার্কিংয়ের জন্য গাড়িপ্রতি ১০ টাকা টোল নেয়া হলেও শাওনের প্রতিষ্ঠান ২০ টাকা করে নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, মতিঝিলের নির্দিষ্ট কিছু এলাকার টোল আদায়ের কাজ পেলেও গোটা মতিঝিল, দিলকুশা, দৈনিক বাংলা এলাকায় তার কর্মীবাহিনী রশিদ নিয়ে চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিসিসি ছাড়াও পিডব্লিউডি, বাংলাদেশ রেলওয়ে ভবন, খাদ্য ভবন, ক্রীড়া পরিষদ, টিঅ্যান্ডটি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ভবনসহ মতিঝিল, সেগুনবাগিচা ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকার বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডারবাজির সঙ্গে শাওনের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় টেন্ডারবাজির পাশাপাশি শাওন গংয়ের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। জানা যায়, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, বঙ্গবাজারসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থিত ডিসিসির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন মার্কেট ও দোকান থেকে শাওন নিয়মিত মাসোহারা পান। এছাড়া বিজয়নগর, মতিঝিল, দিলকুশা, আরামবাগ এলাকার কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
এমপি শাওনের টেন্ডার ও চাঁদাবাজি সম্পর্কে সাধারণ ঠিকাদাররা মুখ খুলতে সাহস পান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঠিকাদার বলেন, নুরুন্নবী শাওন এখন আর নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ নেন না। কে কোন দরপত্রে অংশ নিতে পারবেন বা কে কোন কাজ পাবেন—এ বিষয়ে সমঝোতা ও কমিশন আদায় এবং তা ভাগবাটোয়ারা তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। এমপি হওয়ার পর তিনি নগর ভবনে যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছেন। টেলিফোনেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। ওই ঠিকাদার আরও বলেন, নুরুন্নবী শাওন ও ওই প্রতিমন্ত্রীর এপিএসের সঙ্গে সমঝোতা না করে নগর ভবনে ঠিকাদারি করা সম্ভব নয়। এছাড়া গণপূর্ত অধিদফতর ও সড়ক ভবনের ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণেও তার বড় ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ ও টাকার ভাগবাটোয়ারার বিরোধের জের ধরেই ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম আহমদকে খুন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইব্রাহিম খুন হওয়ার পর তার ভাই মাসুম আহমদ বাদী হয়ে শাওনসহ ৮ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেছেন। ওই মামলার আরজি থেকে জানা যায়, ইব্রাহিম ঢাকা মহানগর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে যুবলীগের দলীয় কাজ করার পাশাপাশি ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ভোলা-৩ উপনির্বাচনের সময় নুরুন্নবী শাওনের সঙ্গে ইব্রাহিমের ঘনিষ্ঠতা হয়। উপনির্বাচনে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনের বিপক্ষে এবং শাওনের পক্ষে ক্যাডার হিসেবে কাজ করেন ইব্রাহিম। শাওন এবং ইব্রাহিমের মধ্যে ব্যবসায়িক ও আর্থিক লেনদেনও রয়েছে। অপরিচিত মোবাইল ফোন থেকে ইব্রাহিমকে প্রায়ই হত্যার হুমকি দেয়া হতো। ঢাকা সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিলে সংসদ সদস্য নুরুন্নবী শাওন এতে বাধা দেন। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। ১৩ আগস্ট রাত ৮টার দিকে আসামি দেলোয়ার হোসেন মোবাইল ফোনে ইব্রাহিমের বিষয়ে জানতে পারেন এবং হাসপাতালে যান। ওই সময় শাওন পালিয়ে যান। তার গাড়িচালক কামাল ওরফে কালা ইব্রাহিম হত্যার বিষয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। ডিবি পুলিশ মামলাটির তদন্ত করে পুনরায় শাওনকে বাদ দিয়ে কালাকে প্রধান আসামি করে আরও একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। ইব্রাহিমের স্বজনদের অভিযোগ, মূলত শাওনকে বাঁচানোর জন্যই ডিবি পুলিশ বাদী হয়ে তৃতীয় মামলাটি করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মহাজোট সরকারের ১৮ মাসের মধ্যে শাওন শতকোটি টাকা কামিয়েছেন। কোটি টাকা মূল্যের প্রাডো গাড়িসহ তার ব্যক্তিগত ৩-৪টি গাড়ি রয়েছে। গুলশান, বারিধারায় একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন। টঙ্গীতে নার সোয়েটার্সের পরিচালকসহ একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তিনি। টাকার বিনিময়ে তিনি কিছু মাস্তান ও ক্যাডার পোষেন।
অবশ্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন এসব অভিযোগ আগেই অস্বীকার করে বলেছিলেন, ‘টেন্ডারবাজি আমি করি না। আগে ঠিকাদারি ব্যবসা করতাম। সংসদ সদস্য হওয়ার পর সময় দিতে পারি না। মাসে ১৫-২০ দিন থাকি নির্বাচনী এলাকায়।’ গতকাল এ রিপোর্ট প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য মিরবাগের বাসায় বা ন্যাম ভবনের এমপি হোস্টেলে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইলও বন্ধ পাওয়া গেছে।
প্রশ্ন আসে কে এই শাওন। হত্যা মামলা থেকে তাকে আড়াল করতে কেন এত তত্পরতা? শাওন সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, আদালতের রায়ে ভোলা-৩ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি জসিম উদ্দিনের এমপি পদ বাতিল হওয়ায় গত ২৪ এপ্রিল উপনির্বাচন হয়। এতে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনকে। চরম কারচুপি ও দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে শাওন ৯৩ হাজার ৮৭৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। মেজর হাফিজ পান ৪৩ হাজার ১৫৮ ভোট। প্রায় ৫০ হাজার ৭১৫ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন শাওন। খুন হওয়া যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম আহমদ ওই সময় শাওনের সশস্ত্র ক্যাডার হিসেবে লালমোহন এলাকায় কাজ করেছিলেন।
নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের পৈতৃক বাড়ি ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার পঞ্চায়েত বাড়ি এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গ্রামের বাড়িতে তাদের ভিটেমাটিও নেই। সবাই থাকেন ঢাকার মগবাজারের মিরবাগ এলাকায়। গত উপনির্বাচনের আগে শাওন লালমোহনের কলেজপাড়া এলাকায় একটি বাড়ি কেনেন। শাওনের ঢাকার বাসা রমনা থানাধীন ১/বি, মিরবাগ মগবাজার এলাকায়। তার বাবা নূরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। মা হোসনে আরা বেগম গৃহিণী। সাধারণ পরিবারের সন্তান শাওনের উত্থান শুরু নব্বইয়ের দশকের পর। তিনি রমনা এলাকার এমপি এইচবিএম ইকবালের ক্যাডার হিসেবে কাজ করতেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি সিদ্ধেশ্বরী কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেন। ওই নির্বাচনে পুরো প্যানেল ছাত্রদল জয়ী হলেও ভিপি হিসেবে জয়লাভ করেন শাওন। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে শাওন ছাত্রলীগ ছেড়ে যুবলীগে যোগ দেন। ওই সময় শাওনকে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। পরে সাধারণ সম্পাদক পদ পান। যুবলীগে যোগ দেয়ার পর থেকেই সরকারি উন্নয়ন কাজের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ বা টেন্ডারবাজচক্রের সঙ্গে শাওনের সখ্য গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি হরতালবিরোধী মিছিল থেকে গুলি করে বহুল আলোচিত মালিবাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের নাম আসে। তিনি এ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিও। মালিবাগ হত্যাকাণ্ডের সময় অস্ত্র হাতে যে যুবকের ছবি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়, সেই যুবক শাওনের দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে জানা গেছে। অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার দ্রুত বিচার আদালত নুরুন্নবীসহ ১৪ জনকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
মালিবাগ হত্যাকাণ্ড ছাড়াও শাওনের বিরুদ্ধে শুধু ২০০৬ সালে ঢাকার পল্টন থানায় কমপক্ষে সাতটি ফৌজদারি মামলা হয়েছে। মামলাগুলো হলো ৪৩(৩)০৬, ৩৪(৪)০৬, ১(১১)০৬, ২৭(৪)০৬, ৩১(১)০৬, ২৫(৫)০৬, ২২(৬)০৬। এর মধ্যে ৪৩(৩)০৬ মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে। অপর মামলাগুলো এখনও বিচারাধীন। শাওন নিজেও এ ৭ মামলার কথা স্বীকার করে নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামায় বলেছেন, জোট আমলে রাজনৈতিকভাবে এসব মামলা দেয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক যুবলীগ নেতা ও বর্তমান এমপি শাওনের ইশারা ছাড়া ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) কোনো টেন্ডারেরই ফয়সালা হয় না। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রকাশ্যে কিংবা নেপথ্যে থেকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন শাওন। আগে ছাত্রলীগ যুবলীগের রাজনীতি করলেও ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি আওয়ামী লীগের মূল স্রোতের বাইরে ছিলেন। ওই সময় তিনি কিংস পার্টি খ্যাত ফেরদৌস আহমেদ কোরোশীর গঠন করা প্রগেসিভ ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে (পিডিবি) যোগদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই সময়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। তখন যুবলীগ নেতারা তাকে দল থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেয়। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ও বিরাট অংকের টাকার কাছে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায় বলে যুবলীগের এক নেতা জানান। ওয়ান ইলেভেনে কিংস পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় সে সময় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিতে তিনি ভূমিকা রাখেন।
বর্তমান মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর যুবলীগ ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাওন ও তার সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন মহি ডিসিসির সব ধরনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। মহিউদ্দিন মহি সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ায় অনেক সময় দাফতরিক কাজে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। আর এ কারণে ডিসিসির টেন্ডারের পুরো নিয়ন্ত্রণই শাওন নিজের হাতে তুলে নেন বলে ডিসিসির তালিকাভুক্ত একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন। এছাড়াও শাওনের ঠিকাদারি কাজে প্রধান সহযোগী হিসেবে একজন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সহকারীর (এপিএস) নাম শোনা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে নগর ভবনে যতগুলো অঘটন ঘটেছে, তার সবক’টিতেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাওন জড়িত ছিলেন। শাওন ও তার ক্যাডাররা যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক বিএনপি সমর্থিত, তাদেরকে নগর ভবনে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দেয়।
শাওনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স নওয়াল কনস্ট্রাকশন। শাওনের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সূত্র জানায়, নওয়াল কনস্ট্রাকশনের নামে শাওন কাজ নেন খুবই কম। পছন্দনীয় লাভজনক দু’একটি কাজ ছাড়া অন্যগুলো নয়। অন্য কাজগুলো তিনি আর্থিক কমিশনের বিনিময়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে মীম, মাহমুদা, মালিহাসহ বেশ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ারও খবর রয়েছে।
শাওন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বর্তমান সরকারের সময় যেসব কাজ হাতিয়ে নিয়েছেন, তার মধ্যে গতবছর মোহাম্মদপুরে রাস্তাঘাট উন্নয়নে ৬০ কোটি টাকার দরপত্র এবং পুরনো ঢাকার নাজিরা বাজারে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে হানিফ কমিউনিটি সেন্টারের ঠিকাদারির কাজ ভাগবাটোয়ারার ঘটনা বহুল আলোচিত হয়। শাওনের মালিকানাধীন নওয়াল কনস্ট্রাকশন সিটি কর্পোরেশনের অধীনস্থ মতিঝিল এলাকার কার পার্কিংয়ের কাজ নিয়েছে। এখানে আগে পার্কিংয়ের জন্য গাড়িপ্রতি ১০ টাকা টোল নেয়া হলেও শাওনের প্রতিষ্ঠান ২০ টাকা করে নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, মতিঝিলের নির্দিষ্ট কিছু এলাকার টোল আদায়ের কাজ পেলেও গোটা মতিঝিল, দিলকুশা, দৈনিক বাংলা এলাকায় তার কর্মীবাহিনী রশিদ নিয়ে চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিসিসি ছাড়াও পিডব্লিউডি, বাংলাদেশ রেলওয়ে ভবন, খাদ্য ভবন, ক্রীড়া পরিষদ, টিঅ্যান্ডটি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ভবনসহ মতিঝিল, সেগুনবাগিচা ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকার বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডারবাজির সঙ্গে শাওনের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় টেন্ডারবাজির পাশাপাশি শাওন গংয়ের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। জানা যায়, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, বঙ্গবাজারসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থিত ডিসিসির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন মার্কেট ও দোকান থেকে শাওন নিয়মিত মাসোহারা পান। এছাড়া বিজয়নগর, মতিঝিল, দিলকুশা, আরামবাগ এলাকার কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
এমপি শাওনের টেন্ডার ও চাঁদাবাজি সম্পর্কে সাধারণ ঠিকাদাররা মুখ খুলতে সাহস পান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঠিকাদার বলেন, নুরুন্নবী শাওন এখন আর নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ নেন না। কে কোন দরপত্রে অংশ নিতে পারবেন বা কে কোন কাজ পাবেন—এ বিষয়ে সমঝোতা ও কমিশন আদায় এবং তা ভাগবাটোয়ারা তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। এমপি হওয়ার পর তিনি নগর ভবনে যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছেন। টেলিফোনেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। ওই ঠিকাদার আরও বলেন, নুরুন্নবী শাওন ও ওই প্রতিমন্ত্রীর এপিএসের সঙ্গে সমঝোতা না করে নগর ভবনে ঠিকাদারি করা সম্ভব নয়। এছাড়া গণপূর্ত অধিদফতর ও সড়ক ভবনের ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণেও তার বড় ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ ও টাকার ভাগবাটোয়ারার বিরোধের জের ধরেই ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম আহমদকে খুন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইব্রাহিম খুন হওয়ার পর তার ভাই মাসুম আহমদ বাদী হয়ে শাওনসহ ৮ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেছেন। ওই মামলার আরজি থেকে জানা যায়, ইব্রাহিম ঢাকা মহানগর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে যুবলীগের দলীয় কাজ করার পাশাপাশি ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ভোলা-৩ উপনির্বাচনের সময় নুরুন্নবী শাওনের সঙ্গে ইব্রাহিমের ঘনিষ্ঠতা হয়। উপনির্বাচনে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনের বিপক্ষে এবং শাওনের পক্ষে ক্যাডার হিসেবে কাজ করেন ইব্রাহিম। শাওন এবং ইব্রাহিমের মধ্যে ব্যবসায়িক ও আর্থিক লেনদেনও রয়েছে। অপরিচিত মোবাইল ফোন থেকে ইব্রাহিমকে প্রায়ই হত্যার হুমকি দেয়া হতো। ঢাকা সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিলে সংসদ সদস্য নুরুন্নবী শাওন এতে বাধা দেন। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। ১৩ আগস্ট রাত ৮টার দিকে আসামি দেলোয়ার হোসেন মোবাইল ফোনে ইব্রাহিমের বিষয়ে জানতে পারেন এবং হাসপাতালে যান। ওই সময় শাওন পালিয়ে যান। তার গাড়িচালক কামাল ওরফে কালা ইব্রাহিম হত্যার বিষয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। ডিবি পুলিশ মামলাটির তদন্ত করে পুনরায় শাওনকে বাদ দিয়ে কালাকে প্রধান আসামি করে আরও একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। ইব্রাহিমের স্বজনদের অভিযোগ, মূলত শাওনকে বাঁচানোর জন্যই ডিবি পুলিশ বাদী হয়ে তৃতীয় মামলাটি করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মহাজোট সরকারের ১৮ মাসের মধ্যে শাওন শতকোটি টাকা কামিয়েছেন। কোটি টাকা মূল্যের প্রাডো গাড়িসহ তার ব্যক্তিগত ৩-৪টি গাড়ি রয়েছে। গুলশান, বারিধারায় একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন। টঙ্গীতে নার সোয়েটার্সের পরিচালকসহ একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তিনি। টাকার বিনিময়ে তিনি কিছু মাস্তান ও ক্যাডার পোষেন।
অবশ্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন এসব অভিযোগ আগেই অস্বীকার করে বলেছিলেন, ‘টেন্ডারবাজি আমি করি না। আগে ঠিকাদারি ব্যবসা করতাম। সংসদ সদস্য হওয়ার পর সময় দিতে পারি না। মাসে ১৫-২০ দিন থাকি নির্বাচনী এলাকায়।’ গতকাল এ রিপোর্ট প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য মিরবাগের বাসায় বা ন্যাম ভবনের এমপি হোস্টেলে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইলও বন্ধ পাওয়া গেছে।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


