বিশেষ সাক্ষাত্কারে যুবলীগ নেতা ইব্রাহিমের স্ত্রী রীনা : এমপি শাওনই আমার স্বামীর খুনি
নাছির উদ্দিন শোয়েব
আমার স্বামী যুবলীগ নেতা ইব্রাহিমকে এমপি শাওনই খুন করেছেন। এই খুনের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য শাওন টাকা ছড়াচ্ছেন। শাওন আমার বাসায় এসে আমাকেও ২৫ লাখ টাকা দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে এই টাকা আমার মেয়ের নামে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে দিতে চেয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ আমার দু’পা জড়িয়ে ধরে রেখেছেন। কিন্তু তার প্রস্তাবে আমি রাজি হইনি। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। পুলিশের কাছে আমার দাবি শাওনকে গ্রেফতার করুন। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। আমার স্বামীর প্রকৃত খুনি শাওনই।
গতকাল দৈনিক আমার দেশ-এর সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে ইব্রাহিমের স্ত্রী যুবলীগ নেত্রী রীনা ইসলাম সেগুনবাগিচা ২৭/১১/১-এ নম্বর বাসার তৃতীয়তলায় তার স্বামীর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এ বক্তব্য দেন।
রীনা ইসলাম অভিযোগ করেন, ইব্রাহিম হত্যা মামলা নিয়ে টাকার খেলা চলছে। আওয়ামী লীগের এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে কোটি টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তিনি বলেন, ঘটনার দিন ১৩ আগস্ট তিনি গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীতে ছিলেন। স্বামী হত্যার খবর তিনি দলীয় কোনো লোকের কাছ থেকে পাননি। ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি দলীয় কমিশনার সীমা আক্তার রাত ৮টার দিকে ফোন করে ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর তাকে জানান। রাতেই তিনি ঢাকায় এসে আত্মীয়স্বজন নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে গিয়ে স্বামীর লাশ দেখতে পান। এমপি শাওনের ক্যাডাররা তখনও হাসপাতালের আশপাশে ছিল বলে জানান রীনা। রীনা ইসলাম বলেন, শাওন যদি আমার শুভাকাঙ্ক্ষিই হতো তাহলে কেন আমাকে ফোন করলেন না? অন্য লোকজনের কাছ থেকে কেন আমি খবর পেলাম? তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর শাওন লাশ গুম করে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি টাকা দিয়ে আমাদের কিনতে চেয়েছিলেন।
২৫ লাখ টাকার প্রস্তাব : রীনা ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের দু’দিন পর ১৫ আগস্ট দুপুরে এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ছাত্রলীগ নেতা শেখ রাসেলসহ দুই ক্যাডারকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসেন। রীনা বাসায় না থাকায় তারা চলে যান। রাসেল ফোন করে রীনাকে বাসায় আসতে বললে দুপুর ২টার দিকে রীনা বাসায় আসেন। পরে শাওন আবার ওই বাসায় যান। শাওন রীনাকে উদ্দেশ করে বলেন—‘আপনাকে তো নেত্রী হিসেবে জানি। মিছিলে-মিটিংয়ে সবসময় আপনি থাকেন। কিন্তু আপনি যে ইব্রাহিমের স্ত্রী তা জানতাম না। ভাবি যা কিছু হয়েছে এগুলো ভুলে যান। একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, এটা থেকে আমাকে বাঁচান। আমি আপনার যাবতীয় বিষয় দেখব। তখন রীনা ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনা নয়, আমার স্বামীকে খুন করা হয়েছে। আপনি ঘটনার মূল হোতা। আপনার গাড়িচালক, দেহরক্ষীদের দিয়ে ইব্রাহিমকে খুন করিয়েছেন। আপনি হত্যার দায় থেকে পার পাবেন কীভাবে?’ একথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন শাওন। এরপর বলেন, আমি আপনাকে ২৫ লাখ টাকা দিতে চাই। আপনি চাইলে আপনার মেয়ের ব্যাংক একাউন্টে এ টাকা এফডিআর করে দিব। এছাড়াও আপনাদের পরিবারের সারাজীবনের দায়িত্ব আমি বহন করব। শুধু আমাকে রক্ষা করেন। নির্বাচনী এলাকায় মুখ দেখাতে পারব না। রীনা ইসলাম বলেন, একপর্যায়ে শাওন একটি কক্ষে গিয়ে আমার দু’পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। নানাভাবে সে আমার অনুকম্পা চান; কিন্তু আমি কিছুতেই তার মন ভুলানো কথায় কান না দেয়ায় মুখ গোমরা করে চলে যান। বাসায় ফিরে যাওয়ার পরও শাওন রীনার মোবাইলে ফোন করে টাকার প্রস্তাব দেয়। রীনা ফোন কেটে দেন। রীনা ও ইব্রাহিমের পরিবারকে কোনোভাবে ম্যানেজ করতে না পারায় অন্য পথ বেছে নেন শাওন।
শাওনই খুনি : রীনা ইসলাম বলেন, এক বছর আগে থেকে আমার স্বামীকে খুন করার চেষ্টা চলে। ২০০৯ সালের ১ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ৫৬ নম্বর যুবলীগ কর্মী ফারুক, আজাদ ও বাবু ইব্রাহিমকে গুলি করার চেষ্টা করে। ইব্রাহিম তখন পালিয়ে রক্ষা পান। এ ঘটনায় যুবলীগ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় একটি জিডি করা হয়। সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়। কিন্তু তখনও শাওনের কারণে সন্ত্রাসীরা রক্ষা পায়। পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। রীনা বলেন, শাওনের সঙ্গে ভোলায় যাওয়ার পর ইব্রাহিমকে একসঙ্গে আসতে দিতেন না। শাওন লঞ্চে এলে ইব্রাহিমকে কালার সঙ্গে তার পাজেরো জীপে পাঠিয়ে দিতেন। সুবিধামতো স্থানে কালাকে দিয়ে ইব্রাহিমকে খুন করার ফন্দি আরও কয়েকবার করেন শাওন; কিন্তু আমরা এতদিন বুঝতে পারিনি। কারণ শাওন বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশনের টেন্ডারের কাজে ইব্রাহিমকে ব্যবহার করতেন। ইব্রাহিম নিজেও ১০ লাখ টাকা দিয়েছে শাওনকে। ভোলা-৩ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর শাওন অনেক টেন্ডারের কাজ পান। এসব কাজের লভ্যাংশের টাকাও শাওনের কাছ থেকে বুঝে নেননি ইব্রাহিম। টেন্ডারের প্রায় ৫০ লাখ টাকা জমা আছে শাওনের কাছে। ওই টাকা মেরে দিতেও পরিকল্পিতভাবে ইব্রাহিমকে হত্যা করা হতে পারে। তবে ঠিক কি কারণে ইব্রাহিমকে হত্যা করা হয়েছে, এ ব্যাপারে রীনা নিশ্চিত হতে পারেননি বলে জানান। রীনা বলেন, হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর শাওন ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের যুবমহিলা লীগ সভানেত্রী কল্পনার কাছে আমার ব্যাপারে জানতে চান। শাওন তাকে বলেছেন, পারিবারিক একটি বিষয়ে ইব্রাহিমকে বাসায় যেতে নিষেধ করার পরও তিনি তা শোনেননি। শাওন কল্পনার কাছে এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন, পারিবারিক গোপন কোনো একটি বিষয় সে সহ্য করতে না পেরে ইব্রাহিমকে তা থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু নিষেধ করা সত্ত্বেও তার বাসায় ইব্রাহিমের অবাধ যাতায়াতে শাওন বিরক্ত হয়ে ওঠেন। রীনা বলেন, শাওনের এই অভিযোগেই প্রমাণিত হয় যে কারণেই হোক হত্যাকাণ্ডটি তার নির্দেশেই হয়েছে।
ফাঁসি চাই শাওনের : রীনা বলেন, ইব্রাহিমকে যে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছে তার মালিক শাওন, ঘটনা ঘটেছে শাওনের গাড়িতে অথবা ন্যাম ভবনের ভেতরে। খুনি হচ্ছে শাওনের গাড়িচালক, দেহরক্ষী ও এপিএস এবং তাদের সহযোগীরা। এর দায়-দায়িত্ব থেকে কোনো অবস্থাতেই শাওন রক্ষা পায় না। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, ঘটনাটি ঘটেছে ১৩ আগস্ট বিকাল ৫টার দিকে। অথচ ঘটনা প্রকাশ করা হয় রাত ৮টার পর। ঘটনার সময় এমপি শাওন ন্যাম ভবনেই ছিলেন। তার পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছে, বিকট শব্দ হয়েছে। এরপরও সে ঘাতকদের পুলিশের হাতে তুলে দেননি কেন? শাওন যদি নিজেই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা না হয়ে থাকে তবে কেন তিনি নিজের অফিসের কম্পিউটারে অপমৃত্যু মামলার এজাহার লিখলেন। ইব্রাহিমের পরিবারকে না জানিয়ে ওই এজাহার নিয়ে তিনি কেন তার গাড়িচালক কামাল হোসেন কালাকে বাদী করে শেরেবাংলা নগর থানায় পাঠালেন? শাওন কেন বিষয়টি ইব্রাহিমের স্বজনদের জানালেন না? ইব্রাহিম তো শাওনেরই ঘনিষ্ঠজন এবং যুবলীগ নেতা। শাওনের পরিবারের সঙ্গে ইব্রাহিমের ব্যাপক পরিচিতি থাকার পরও কেন শাওন তাকে না চেনার ভান করলেন? গুলিবিদ্ধ ইব্রাহিমকে কেন দ্রুত হাসপাতালে না পাঠিয়ে ৩ ঘণ্টা গোপন করেন। রীনা ইসলাম বলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শাওনকে প্রধান আসামি করে হত্যারহস্য বের করা সম্ভব। তিনি বলেন, শাওন একজন ক্যাডার। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বহু অভিযোগ আছে। মালিবাগের চার খুন থেকে তিনি রক্ষা পেলেও আমার স্বামীর খুনের বিচার করেই ছাড়ব। রীনা প্রশ্ন তুলে বলেন, এতবড় একজন খুনি কীভাবে আইনের হাত থেকে রক্ষা পায়? ইব্রাহিমের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীকে হাত-পা বেঁধে গুলি করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। লাশ গ্রহণের পর তার দু’পায়ে কালো দাগের চিহ্ন দেখা গেছে। মনে হয়েছে রশি দিয়ে বেঁধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়াও মাথায় গুলি করার পর তাকে মারধর করা হয়েছে। ইব্রাহিমের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোলা জখম ছিল বলে জানান রীনা। তিনি বলেন, গুলি করার সময় ঘাতকদের কাছে তাকে প্রাণে রক্ষার জন্য অনেক কাকুতি-মিনতি করেছিলেন ইব্রাহিম। কিন্তু ঘাতকরা তাকে গুলি করার পরও মারধর করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। রীনা বলেন, ইব্রাহিমকে গুলি করার পর রাতে ঘাতকরা সদরঘাটে আওয়ামী লীগ সমর্থকের মালিকানাধীন সুমানা ক্লিনিকে নিয়ে লাশ রাখার চেষ্টা করেছিল। পরে সেখান থেকে লাশ বস্তাবন্দি করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। রীনা বলেন, ঘাতকরা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে ইব্রাহিমের লাশ আমরা পেতাম না।
পরিবারটি এখন অবরুদ্ধ : রিনা বলেন, তার স্বামী হত্যার পর ২৩ দিন পার হলো। ঘটনার শুরুর দিকে এটিকে অপমৃত্যু মামলা বলেই চালিয়ে দেয়া হচ্ছিল। আমি সোচ্চার হওয়ায় এবং মিডিয়ায় ঘটনা বড় করে আসায় পুলিশের টনক নড়ে। এরপর থেকেই আমাকে এবং ইব্রাহিমের স্বজনদের একের পর এক হুমকি দেয়া হয়। হুমকির কারণে কেউ বাসা থেকে বের হওয়ার সাহস পাইনি। স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ায় এখন আমি দলীয় অনেক নেতার চক্ষুশূল। ঘটনার পর আওয়ামী লীগের কোনো নেতা আমার বাসায় আসেননি। কেউ আমাকে ফোন করে সান্ত্বনাও দেননি। দু’একজন নেতার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। তিনি বলেন, শুধু এমপি শাওনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় দলীয় লোকজনের কাছেও আমার স্থান নেই। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের ভয়ে এখন সপরিবারে বাসার বাইরে যাওয়ার সাহস পাই না। সারাদিন বাসার ভেতরে থাকি। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাব কিনা জানি না। রিনা ইসলাম বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ইন্সপেক্টর মশিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ব্যর্থ হয়েছি। আমি ফোন করলে তিনি ফোন ধরেন না। ফোন না ধরায় তাকে মোবাইলে এসএমএস করেছি, তাতেও কাজ হয়নি।
রিনা বলেন, তদন্তকারী সংস্থা একদিনই আমার বক্তব্য নিয়েছে। এরপর আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি। আমাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে এ বিষয়েও পুলিশকে জানাতে পারছি না। আমাদের না জানিয়েই পুলিশ বাদী হয়ে আরও একটি মামলা করেছে। সবকিছু ঘোলাটে করার জন্য এসব করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন রিনা ইসলাম।
কোটি টাকার মিশন : রিনা ইসলাম জানান, ইব্রাহিমের মূল খুনিকে বাঁচাতে পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রথম থেকেই চেষ্টা করে আসছিলেন। এখন তারা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন। মূল হোতা শাওনকে বাদ দিয়ে তার গাড়িচালক ও পিএসকে দিয়ে একটি সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, শাওন কোটি টাকার বিনিময়ে তার গাড়িচালক কালাকে দিয়ে খুনের দায় স্বীকার করিয়েছেন। পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও শাওনকে বাঁচাতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এ জন্য পুলিশ বাদী হয়ে নিয়মিত হত্যা মামলা করার আগে তাদের কোনো কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি। এমপি শাওনের লাইসেন্সকৃত পিস্তল ও তার গাড়িতে ইব্রাহিম খুন হলেও পুলিশ তাকে একটিবারের মতো ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন মনে করেনি। রিনা বলেন, অভিযোগ রয়েছে, শাওনের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার তদন্ত চলছে। গ্রেফতারকৃত কালার ঘাড়ে হত্যার দায় চাপিয়ে মামলা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে শাওনকে। রিনা বলেন, কালাকে এমনও আশ্বাস দেয়া হয়েছে, সাজা হলেও কোটি টাকা খরচ করে মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়ার ব্যবস্থা করবেন শাওন। এ কারণেই কালা ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়ে ইব্রাহিম হত্যার দায় স্বীকার করেছে। রিনা বলেন, কালার সঙ্গে ইব্রাহিমের কোনো বিরোধ নেই, যে কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত ছিল তাদের সবাই পুলিশের খাতায় সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। শাওনের দেহরক্ষী দেলোয়ার, মাজহারুল ইসলাম মিঠু, মিজানুর রহমান মিজান, যুবলীগ কর্মী শিমুলসহ ওইসব সহযোগীর বিরুদ্ধে রয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। তারা শাওনের সার্বক্ষণিক সঙ্গীদের অন্যতম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শুধুই দুঃখ প্রকাশ : স্বামী হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের বাসায় গিয়েছিলেন রিনা ইসলাম; কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ঘটনায় শুধু দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমি সবই জানি। আমাকে কিছু বলতে হবে না। রিনা বলেন, ঘটনার পর দু’বার তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় যান। প্রথমবার এক ঘণ্টা ড্রইংরুমে বসিয়ে রেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে বলেন, এটি দুঃখজনক একটি ঘটনা। তিনি সবকিছু দেখবেন বলে আশ্বাস দেন। রিনা ইসলাম স্বামীর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বর্ণনা দেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও বলেছেন, শাওনের নির্দেশেই ইব্রাহিম খুন হয়েছেন। এর আগেও ইব্রাহিমকে হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও মামলা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত না হওয়ায় আবার মন্ত্রীর বাসায় যান রিনা। রিনা বলেন, বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় যাওয়ার পরও মন্ত্রী সাক্ষাত্ করেননি। বাসা থেকে বলা হয়েছে মন্ত্রী অসুস্থ। রিনা অভিযোগ করেন, এতবড় একটি ঘটনা; কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোরালো কোনো ভূমিকা নেননি। তিনি যদি আরও কঠোর হতেন তবে শাওনকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করত। রিনা বলেন, ইব্রাহিম হত্যা মামলা নিয়ে এখন টাকার খেলা চলছে। ইব্রাহিম হত্যার দায় থেকে এমপি শাওনকে বাঁচাতে সরকারের একজন প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী তোড়জোড় করছেন। তার প্রভাবেই তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মামলাটিকে প্রথমে সাধারণ একটি দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে মিডিয়ার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণে শাওনের গাড়িচালক ও পিএসকে দিয়ে একটি গল্প সাজানো হয়েছে। রিনা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার সব কথা শুনেছেন। জানি না তিনি পুলিশকে কী নির্দেশ দিয়েছেন।
গতকাল দৈনিক আমার দেশ-এর সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে ইব্রাহিমের স্ত্রী যুবলীগ নেত্রী রীনা ইসলাম সেগুনবাগিচা ২৭/১১/১-এ নম্বর বাসার তৃতীয়তলায় তার স্বামীর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এ বক্তব্য দেন।
রীনা ইসলাম অভিযোগ করেন, ইব্রাহিম হত্যা মামলা নিয়ে টাকার খেলা চলছে। আওয়ামী লীগের এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে কোটি টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তিনি বলেন, ঘটনার দিন ১৩ আগস্ট তিনি গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীতে ছিলেন। স্বামী হত্যার খবর তিনি দলীয় কোনো লোকের কাছ থেকে পাননি। ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি দলীয় কমিশনার সীমা আক্তার রাত ৮টার দিকে ফোন করে ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর তাকে জানান। রাতেই তিনি ঢাকায় এসে আত্মীয়স্বজন নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে গিয়ে স্বামীর লাশ দেখতে পান। এমপি শাওনের ক্যাডাররা তখনও হাসপাতালের আশপাশে ছিল বলে জানান রীনা। রীনা ইসলাম বলেন, শাওন যদি আমার শুভাকাঙ্ক্ষিই হতো তাহলে কেন আমাকে ফোন করলেন না? অন্য লোকজনের কাছ থেকে কেন আমি খবর পেলাম? তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর শাওন লাশ গুম করে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি টাকা দিয়ে আমাদের কিনতে চেয়েছিলেন।
২৫ লাখ টাকার প্রস্তাব : রীনা ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের দু’দিন পর ১৫ আগস্ট দুপুরে এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ছাত্রলীগ নেতা শেখ রাসেলসহ দুই ক্যাডারকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসেন। রীনা বাসায় না থাকায় তারা চলে যান। রাসেল ফোন করে রীনাকে বাসায় আসতে বললে দুপুর ২টার দিকে রীনা বাসায় আসেন। পরে শাওন আবার ওই বাসায় যান। শাওন রীনাকে উদ্দেশ করে বলেন—‘আপনাকে তো নেত্রী হিসেবে জানি। মিছিলে-মিটিংয়ে সবসময় আপনি থাকেন। কিন্তু আপনি যে ইব্রাহিমের স্ত্রী তা জানতাম না। ভাবি যা কিছু হয়েছে এগুলো ভুলে যান। একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, এটা থেকে আমাকে বাঁচান। আমি আপনার যাবতীয় বিষয় দেখব। তখন রীনা ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনা নয়, আমার স্বামীকে খুন করা হয়েছে। আপনি ঘটনার মূল হোতা। আপনার গাড়িচালক, দেহরক্ষীদের দিয়ে ইব্রাহিমকে খুন করিয়েছেন। আপনি হত্যার দায় থেকে পার পাবেন কীভাবে?’ একথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন শাওন। এরপর বলেন, আমি আপনাকে ২৫ লাখ টাকা দিতে চাই। আপনি চাইলে আপনার মেয়ের ব্যাংক একাউন্টে এ টাকা এফডিআর করে দিব। এছাড়াও আপনাদের পরিবারের সারাজীবনের দায়িত্ব আমি বহন করব। শুধু আমাকে রক্ষা করেন। নির্বাচনী এলাকায় মুখ দেখাতে পারব না। রীনা ইসলাম বলেন, একপর্যায়ে শাওন একটি কক্ষে গিয়ে আমার দু’পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। নানাভাবে সে আমার অনুকম্পা চান; কিন্তু আমি কিছুতেই তার মন ভুলানো কথায় কান না দেয়ায় মুখ গোমরা করে চলে যান। বাসায় ফিরে যাওয়ার পরও শাওন রীনার মোবাইলে ফোন করে টাকার প্রস্তাব দেয়। রীনা ফোন কেটে দেন। রীনা ও ইব্রাহিমের পরিবারকে কোনোভাবে ম্যানেজ করতে না পারায় অন্য পথ বেছে নেন শাওন।
শাওনই খুনি : রীনা ইসলাম বলেন, এক বছর আগে থেকে আমার স্বামীকে খুন করার চেষ্টা চলে। ২০০৯ সালের ১ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ৫৬ নম্বর যুবলীগ কর্মী ফারুক, আজাদ ও বাবু ইব্রাহিমকে গুলি করার চেষ্টা করে। ইব্রাহিম তখন পালিয়ে রক্ষা পান। এ ঘটনায় যুবলীগ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় একটি জিডি করা হয়। সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়। কিন্তু তখনও শাওনের কারণে সন্ত্রাসীরা রক্ষা পায়। পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। রীনা বলেন, শাওনের সঙ্গে ভোলায় যাওয়ার পর ইব্রাহিমকে একসঙ্গে আসতে দিতেন না। শাওন লঞ্চে এলে ইব্রাহিমকে কালার সঙ্গে তার পাজেরো জীপে পাঠিয়ে দিতেন। সুবিধামতো স্থানে কালাকে দিয়ে ইব্রাহিমকে খুন করার ফন্দি আরও কয়েকবার করেন শাওন; কিন্তু আমরা এতদিন বুঝতে পারিনি। কারণ শাওন বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশনের টেন্ডারের কাজে ইব্রাহিমকে ব্যবহার করতেন। ইব্রাহিম নিজেও ১০ লাখ টাকা দিয়েছে শাওনকে। ভোলা-৩ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর শাওন অনেক টেন্ডারের কাজ পান। এসব কাজের লভ্যাংশের টাকাও শাওনের কাছ থেকে বুঝে নেননি ইব্রাহিম। টেন্ডারের প্রায় ৫০ লাখ টাকা জমা আছে শাওনের কাছে। ওই টাকা মেরে দিতেও পরিকল্পিতভাবে ইব্রাহিমকে হত্যা করা হতে পারে। তবে ঠিক কি কারণে ইব্রাহিমকে হত্যা করা হয়েছে, এ ব্যাপারে রীনা নিশ্চিত হতে পারেননি বলে জানান। রীনা বলেন, হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর শাওন ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের যুবমহিলা লীগ সভানেত্রী কল্পনার কাছে আমার ব্যাপারে জানতে চান। শাওন তাকে বলেছেন, পারিবারিক একটি বিষয়ে ইব্রাহিমকে বাসায় যেতে নিষেধ করার পরও তিনি তা শোনেননি। শাওন কল্পনার কাছে এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন, পারিবারিক গোপন কোনো একটি বিষয় সে সহ্য করতে না পেরে ইব্রাহিমকে তা থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু নিষেধ করা সত্ত্বেও তার বাসায় ইব্রাহিমের অবাধ যাতায়াতে শাওন বিরক্ত হয়ে ওঠেন। রীনা বলেন, শাওনের এই অভিযোগেই প্রমাণিত হয় যে কারণেই হোক হত্যাকাণ্ডটি তার নির্দেশেই হয়েছে।
ফাঁসি চাই শাওনের : রীনা বলেন, ইব্রাহিমকে যে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছে তার মালিক শাওন, ঘটনা ঘটেছে শাওনের গাড়িতে অথবা ন্যাম ভবনের ভেতরে। খুনি হচ্ছে শাওনের গাড়িচালক, দেহরক্ষী ও এপিএস এবং তাদের সহযোগীরা। এর দায়-দায়িত্ব থেকে কোনো অবস্থাতেই শাওন রক্ষা পায় না। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, ঘটনাটি ঘটেছে ১৩ আগস্ট বিকাল ৫টার দিকে। অথচ ঘটনা প্রকাশ করা হয় রাত ৮টার পর। ঘটনার সময় এমপি শাওন ন্যাম ভবনেই ছিলেন। তার পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছে, বিকট শব্দ হয়েছে। এরপরও সে ঘাতকদের পুলিশের হাতে তুলে দেননি কেন? শাওন যদি নিজেই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা না হয়ে থাকে তবে কেন তিনি নিজের অফিসের কম্পিউটারে অপমৃত্যু মামলার এজাহার লিখলেন। ইব্রাহিমের পরিবারকে না জানিয়ে ওই এজাহার নিয়ে তিনি কেন তার গাড়িচালক কামাল হোসেন কালাকে বাদী করে শেরেবাংলা নগর থানায় পাঠালেন? শাওন কেন বিষয়টি ইব্রাহিমের স্বজনদের জানালেন না? ইব্রাহিম তো শাওনেরই ঘনিষ্ঠজন এবং যুবলীগ নেতা। শাওনের পরিবারের সঙ্গে ইব্রাহিমের ব্যাপক পরিচিতি থাকার পরও কেন শাওন তাকে না চেনার ভান করলেন? গুলিবিদ্ধ ইব্রাহিমকে কেন দ্রুত হাসপাতালে না পাঠিয়ে ৩ ঘণ্টা গোপন করেন। রীনা ইসলাম বলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শাওনকে প্রধান আসামি করে হত্যারহস্য বের করা সম্ভব। তিনি বলেন, শাওন একজন ক্যাডার। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বহু অভিযোগ আছে। মালিবাগের চার খুন থেকে তিনি রক্ষা পেলেও আমার স্বামীর খুনের বিচার করেই ছাড়ব। রীনা প্রশ্ন তুলে বলেন, এতবড় একজন খুনি কীভাবে আইনের হাত থেকে রক্ষা পায়? ইব্রাহিমের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীকে হাত-পা বেঁধে গুলি করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। লাশ গ্রহণের পর তার দু’পায়ে কালো দাগের চিহ্ন দেখা গেছে। মনে হয়েছে রশি দিয়ে বেঁধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়াও মাথায় গুলি করার পর তাকে মারধর করা হয়েছে। ইব্রাহিমের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোলা জখম ছিল বলে জানান রীনা। তিনি বলেন, গুলি করার সময় ঘাতকদের কাছে তাকে প্রাণে রক্ষার জন্য অনেক কাকুতি-মিনতি করেছিলেন ইব্রাহিম। কিন্তু ঘাতকরা তাকে গুলি করার পরও মারধর করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। রীনা বলেন, ইব্রাহিমকে গুলি করার পর রাতে ঘাতকরা সদরঘাটে আওয়ামী লীগ সমর্থকের মালিকানাধীন সুমানা ক্লিনিকে নিয়ে লাশ রাখার চেষ্টা করেছিল। পরে সেখান থেকে লাশ বস্তাবন্দি করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। রীনা বলেন, ঘাতকরা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে ইব্রাহিমের লাশ আমরা পেতাম না।
পরিবারটি এখন অবরুদ্ধ : রিনা বলেন, তার স্বামী হত্যার পর ২৩ দিন পার হলো। ঘটনার শুরুর দিকে এটিকে অপমৃত্যু মামলা বলেই চালিয়ে দেয়া হচ্ছিল। আমি সোচ্চার হওয়ায় এবং মিডিয়ায় ঘটনা বড় করে আসায় পুলিশের টনক নড়ে। এরপর থেকেই আমাকে এবং ইব্রাহিমের স্বজনদের একের পর এক হুমকি দেয়া হয়। হুমকির কারণে কেউ বাসা থেকে বের হওয়ার সাহস পাইনি। স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ায় এখন আমি দলীয় অনেক নেতার চক্ষুশূল। ঘটনার পর আওয়ামী লীগের কোনো নেতা আমার বাসায় আসেননি। কেউ আমাকে ফোন করে সান্ত্বনাও দেননি। দু’একজন নেতার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। তিনি বলেন, শুধু এমপি শাওনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় দলীয় লোকজনের কাছেও আমার স্থান নেই। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের ভয়ে এখন সপরিবারে বাসার বাইরে যাওয়ার সাহস পাই না। সারাদিন বাসার ভেতরে থাকি। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাব কিনা জানি না। রিনা ইসলাম বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ইন্সপেক্টর মশিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ব্যর্থ হয়েছি। আমি ফোন করলে তিনি ফোন ধরেন না। ফোন না ধরায় তাকে মোবাইলে এসএমএস করেছি, তাতেও কাজ হয়নি।
রিনা বলেন, তদন্তকারী সংস্থা একদিনই আমার বক্তব্য নিয়েছে। এরপর আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি। আমাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে এ বিষয়েও পুলিশকে জানাতে পারছি না। আমাদের না জানিয়েই পুলিশ বাদী হয়ে আরও একটি মামলা করেছে। সবকিছু ঘোলাটে করার জন্য এসব করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন রিনা ইসলাম।
কোটি টাকার মিশন : রিনা ইসলাম জানান, ইব্রাহিমের মূল খুনিকে বাঁচাতে পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রথম থেকেই চেষ্টা করে আসছিলেন। এখন তারা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন। মূল হোতা শাওনকে বাদ দিয়ে তার গাড়িচালক ও পিএসকে দিয়ে একটি সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, শাওন কোটি টাকার বিনিময়ে তার গাড়িচালক কালাকে দিয়ে খুনের দায় স্বীকার করিয়েছেন। পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও শাওনকে বাঁচাতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এ জন্য পুলিশ বাদী হয়ে নিয়মিত হত্যা মামলা করার আগে তাদের কোনো কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি। এমপি শাওনের লাইসেন্সকৃত পিস্তল ও তার গাড়িতে ইব্রাহিম খুন হলেও পুলিশ তাকে একটিবারের মতো ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন মনে করেনি। রিনা বলেন, অভিযোগ রয়েছে, শাওনের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার তদন্ত চলছে। গ্রেফতারকৃত কালার ঘাড়ে হত্যার দায় চাপিয়ে মামলা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে শাওনকে। রিনা বলেন, কালাকে এমনও আশ্বাস দেয়া হয়েছে, সাজা হলেও কোটি টাকা খরচ করে মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়ার ব্যবস্থা করবেন শাওন। এ কারণেই কালা ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়ে ইব্রাহিম হত্যার দায় স্বীকার করেছে। রিনা বলেন, কালার সঙ্গে ইব্রাহিমের কোনো বিরোধ নেই, যে কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত ছিল তাদের সবাই পুলিশের খাতায় সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। শাওনের দেহরক্ষী দেলোয়ার, মাজহারুল ইসলাম মিঠু, মিজানুর রহমান মিজান, যুবলীগ কর্মী শিমুলসহ ওইসব সহযোগীর বিরুদ্ধে রয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। তারা শাওনের সার্বক্ষণিক সঙ্গীদের অন্যতম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শুধুই দুঃখ প্রকাশ : স্বামী হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের বাসায় গিয়েছিলেন রিনা ইসলাম; কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ঘটনায় শুধু দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমি সবই জানি। আমাকে কিছু বলতে হবে না। রিনা বলেন, ঘটনার পর দু’বার তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় যান। প্রথমবার এক ঘণ্টা ড্রইংরুমে বসিয়ে রেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে বলেন, এটি দুঃখজনক একটি ঘটনা। তিনি সবকিছু দেখবেন বলে আশ্বাস দেন। রিনা ইসলাম স্বামীর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বর্ণনা দেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও বলেছেন, শাওনের নির্দেশেই ইব্রাহিম খুন হয়েছেন। এর আগেও ইব্রাহিমকে হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও মামলা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত না হওয়ায় আবার মন্ত্রীর বাসায় যান রিনা। রিনা বলেন, বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় যাওয়ার পরও মন্ত্রী সাক্ষাত্ করেননি। বাসা থেকে বলা হয়েছে মন্ত্রী অসুস্থ। রিনা অভিযোগ করেন, এতবড় একটি ঘটনা; কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোরালো কোনো ভূমিকা নেননি। তিনি যদি আরও কঠোর হতেন তবে শাওনকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করত। রিনা বলেন, ইব্রাহিম হত্যা মামলা নিয়ে এখন টাকার খেলা চলছে। ইব্রাহিম হত্যার দায় থেকে এমপি শাওনকে বাঁচাতে সরকারের একজন প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী তোড়জোড় করছেন। তার প্রভাবেই তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মামলাটিকে প্রথমে সাধারণ একটি দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে মিডিয়ার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণে শাওনের গাড়িচালক ও পিএসকে দিয়ে একটি গল্প সাজানো হয়েছে। রিনা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার সব কথা শুনেছেন। জানি না তিনি পুলিশকে কী নির্দেশ দিয়েছেন।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


