Amardesh
আজঃ ঢাকা, শনিবার ৪ সেপ্টেম্বর ২০১০, ২০ ভাদ্র ১৪১৭, ২৪ রমজান ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ রাত ১.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

দেশের প্রথম হাতি অভয়াশ্রম ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মিত হচ্ছে শেরপুরে

শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুর
জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় পাহাড়ি বাঙালি ও উপজাতিদের মধ্যে এখন বছরজুড়েই ভারতীয় বন্যহাতির আতঙ্ক বিরাজ করে। ফলে এ সীমান্ত ও পাহাড়ি জনপদে সন্ধ্যা নামে হাতি আতঙ্কে। ভারতীয় ওই বন্যহাতির আক্রমণে জানমালের ক্ষতির পাশাপাশি শতাধিক পরিবার পৈতৃক ভিটেমাটি ও আবাদি জমাজমি ফেলে রেখে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। গত ২০ বছরে সরকারি হিসেবে সর্বোচ্চ ৩০ ব্যক্তির প্রাণহানির খবর পাওয়া গেলেও স্থানীয় সূত্রে মৃতের ঘটনা অর্ধ শতাধিক বলে জানা গেছে। সেইসঙ্গে পঙ্গু ও আহত হয়েছে দুই শতাধিক ব্যক্তি। ভিটেমাটি ছাড়ার কারণে সীমান্তের অনেক প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষী পরিবার হয়ে গেছে বেকার ও দিনমজুর। ফলে ওইসব এলাকার প্রায় ৮ হাজার একর আবাদি জমি বছরজুড়ে অনাবাদি হয়ে পড়ে থাকে। বন্যহাতির আক্রমণে বিগত দশ বছরে ঘরবাড়ি, ক্ষেতের ফসল, আম-কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলের বাগান, গোলার ধানসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে।
কিন্তু এমনটি যদি হয়, হাতি আসবে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করবে কিন্তু মানুষের কোনো ক্ষতি তো করবেই না বরং উপকারে আসবে। একথা শুনে প্রথমে অনেকে হয়তো চোখ কপালে তুলবে বা বিশ্বাস করতে চাইবে না। তবে হ্যাঁ, বাস্তবেই হাতি-মানুষের সহাবস্থানসহ হাতির অভয়াশ্রম করে তা থেকে পর্যটকদের হাতি দেখিয়ে বাড়তি আয়ের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, শেরপুরেই দেশের একমাত্র হাতি অভয়াশ্রম ও পর্যটকদের ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ হবে। একটি বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে এ ব্যাপারে প্রকল্প গ্রহণ করে দ্রুত এ প্রকল্প তৈরি ও চলতি বছরে কার্যক্রম বরাদ্দ দেয়ার জন্য বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে গত ২০ জুন বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী জিএম কাদের শেরপুরের সীমান্তবর্তী গজনী গারো পাহাড় এলাকায় পরিদর্শনে এলে শেরপুরের জেলা প্রশাসক হাতির আক্রমণ থেকে সীমান্তবর্তী মানুষকে বাঁচাতে হাতি-মানুষের সহাবস্থান ও হাতির অভয়াশ্রম এবং পর্যটকদের জন্য ওয়াচ টাওয়ার তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান। এ পরিকল্পনায় জানানো হয়, জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তজুড়ে বিশেষ করে যেসব এলাকায় হাতির বিচরণ সে সব এলাকায় শক্ত লোহার গ্রিল বা বেড়া নির্মাণ এবং গ্রিলসংলগ্ন পেছনে কলাগাছসহ হাতির খাবারের গাছ লাগানো হবে। যাতে হাতিগুলো সীমান্তবাসীর কোনো ক্ষতি না করে। সেইসঙ্গে ওই গ্রিলের বেড়াসংলগ্ন পর্যটকদের জন্য ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হলে ওই ওয়াচ টাওয়ার থেকে আয় করে হাতির খাদ্য তৈরির জোগান দেয়া হবে। এতে হাতিগুলো খাদ্য পেয়ে যেমন মানুষের ক্ষতি করবে না তেমনি এখানেই তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করবে। ফলে পর্যটকরাও বছরজুড়ে হাতি দেখতে পাবে। এছাড়া শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী ইউনিয়নের গারো পাহাড় এলাকার মধুটিলায় ‘ইকোপার্ক’ এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের গজনী এলাকায় ‘অবকাশ’ নামে পৃথক দুটি পর্যটন কেন্দ্র থাকায় এমনিতেই শীত মৌসুমসহ বছরজুড়ে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও ভ্রমণ পিপাসুদের আনাগোনা রয়েছে।
সূত্রমতে, হাতির অভয়াশ্রম তৈরিতে সবার আগে এলাকাবাসীর সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন এবং তাদের সচেতনমূলক প্রচারণাসহ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। গত বছরের ২৭ জুন ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া জু আউটরিচ অর্গানাইজেশনের যৌথ উদ্যোগে শেরপুর জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে ৩ দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কার হাতি ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। গারো পাহাড়ে মানুষ ও বন্যহাতি সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য এ কর্মশালার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এছাড়া বন্যহাতির আক্রমণ থেকে বাঁচতে গত ১৪ মার্চ ঝিনাইগাতী উপজেলায় স্থানীয় সামাজিক সংগঠন স্টেকনেক কমিটির উদ্যোগে শত শত উপজাতি-বাঙালি, নারী- পুরুষ শহরে মানববন্ধন, র্যালি ও ইউএনও’র কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পিদিমসহ আরও কয়েকটি সংগঠন এ কর্মসূচি পালন করে। অবশেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকার সীমান্তবাসীকে হাতির কবল থেকে বাঁচানোর পরিকল্পনায় ওই প্রকল্প গ্রহণে আশার আলো দেখছে সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার প্রায় ২০ হাজার মানুষ। জানা গেছে, জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ৩০টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার লোক বন্যহাতির ভয়ে আতঙ্কিত জীবনযাপন করছে। ওইসব এলাকার একাধিক গ্রামে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সীমান্তের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে মশাল আর ভোগাবাতি (বাঁশ ও পাট দিয়ে তৈরি মশাল) তৈরি করে রেখে দিয়েছে এবং পাহাড়ের টিলা, শাল-গজারি বাগানের ফাঁকে ফাঁকে গ্রামবাসী ডেরা তৈরি করে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাত জেগে পাহারার ব্যবস্থা করেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে ভোর রাত পর্যন্ত শুকনো বাঁশের মশাল জ্বালিয়ে পাহারা দিচ্ছে বাঙালি ও উপজাতি কৃষকরা। ফসলের মৌসুমে প্রতি ডেরায় ৫-৬ জন করে ছোট ছোট গ্রুপ ক্ষেতের চারপাশে অবস্থান নেয়। যে দল প্রথমে হাতির উপস্থিতি টের পায় সে দল চিত্কার করে ওঠে। এ সময় আশপাশের সব দলের সদস্য ছুটে আসে হাতি তাড়াতে। এ ব্যাপারে শেরপুর জেলা প্রশাসক মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, আমাদের শেরপুর জেলা সীমান্ত এলাকায় প্রায় শতাধিক হাতির সন্ধান আমরা পেয়েছি। হাতি আগ বাড়িয়ে মানুষকে কখনোই ক্ষতি করে না। আমাদের এই জেলার সীমান্ত এলাকায় যে হাতির বিচরণ দেখা যায় তা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে খাদ্যের অভাবে এদেশে প্রবেশ করে। এ সময় বাংলাদেশ অভ্যন্তরে ফসলের ক্ষেত, ফলদ গাছ এবং ঘরের ধানের গোলায় হামলা চালায়। এ সময় মানুষও হাতির হাত থেকে বাঁচতে তাদের ওপর মশাল বা ভোগাবাতি নিয়ে প্রতিরোধ তৈরি করে। একপর্যায়ে হাতি-মানুষ যুদ্ধের ফলে হতাহত হয় মানুষ। তাই আমি চিন্তা করেছি, যদি এই ক্ষুধার্থ হাতির খাবারের ব্যবস্থা করা যায় তবে তারা মানুষের যেমন ক্ষতি করবে না এবং মানুষেরও হাতি তাড়ানোর মাথাব্যথা থাকবে না। আর এ থেকে আমরা জেলার পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতে পারব। এসব চিন্তা থেকেই আমি প্রথমে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীকে বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হই। এরপর থেকেই আমি জেলার নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও থেকে শ্রীবরদী উপজেলার কর্ণঝোড়া পর্যন্ত বিশেষ করে যেসব এলাকায় হাতির বিচরণ বেশি সে সব এলাকায় চিড়িয়াখানার হাতি গারদের মতো লোহার গ্রিল তৈরি করে হাতি যাতে একেবারে লোকালয়ে না আসতে পাড়ে সে ব্যবস্থা করতে হবে।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?