Amardesh
আজঃ ঢাকা, শুক্রবার ৩ সেপ্টেম্বর ২০১০, ১৯ ভাদ্র ১৪১৭, ২৩ রমজান ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ রাত ১.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 তারেক রহমানের কারামুক্তি দিবস
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

জনশক্তি রফতানিতে ধস ঠেকাতে সরকার ব্যর্থ

কাদের গনি চৌধুরী
জনশক্তি রফতানিতে ধস ঠেকাতে সরকারের কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানিকারী দেশগুলো ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ফলে শ্রমিক রফতানির ধারা ক্রমেই রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। নতুন বাজারের সন্ধানও মিলছে না। এ কারণে বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যা যেমন কমছে, তেমনি রেমিট্যান্সেও টান পড়ছে। জনশক্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স ধস ঠেকানো না গেলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। মন্দা কেটে গেলেও জনশক্তি রফতানি খাত চাঙ্গা হয়নি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৯৭৬ সালের পর প্রতি বছরই রেমিট্যান্স বেড়েছে। কিন্তু হঠাত্ করে গত ক’মাস ধরে রেমিট্যান্স আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, গত ৭ বছরের মধ্যে এ বছরই সবচেয়ে কম বাংলাদেশী শ্রমিক চাকরি নিয়ে বিদেশ গেছেন। ২০০৭ সালে ৮ লাখ ৩২ হাজার ৬০৮ বাংলাদেশী চাকরি নিয়ে বিদেশ যান। ২০০৮ সালে গেছেন ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গতবছর হঠাত্ করে জনশক্তি রফতানিতে ধস নামে। ২০০৯ সালে জনশক্তি রফতানি কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জন। এ বছর চাকরি নিয়ে বিদেশ গেছেন মাত্র ২ লাখ ৩১ হাজার ১৭২ জন।
গত বছরের জানুয়ারিতে ৫০ হাজার ৬৩২ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এ বছরের জানুয়ারিতে তা কমে হয়েছে ৩৩ হাজার ৮৪৭ জন। অর্থাত্ গত বছরের তুলনায় ৩৩ দশমিক ১৫ ভাগ জনশক্তি রফতানি কমেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গিয়েছিলেন ৪৩ হাজার ৮৫৬ জন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে গেছেন ২৭ হাজার ৪৯ জন। গত বছরের মার্চে গিয়েছিলেন ৪২ হাজার ৯৪৫ জন। এ মার্চে গেছেন ৩৮ হাজার ২৪৪ জন। গত এপ্রিলে গিয়েছিলেন ৩৯ হাজার ৪৯ জন। এ এপ্রিলে গেছেন ৩৫ হাজার ৬৪৭ জন। গত জুনে গেছেন ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। এ জুনে গেছেন ৩৪ হাজার ৭৯৮ জন। গত জুলাইয়ে গিয়েছিলেন ৩৮ হাজার ২৫ জন। এ জুলাইয়ে গেছেন ২৮ হাজার ৩৪৭ জন।
এ বছরের জানুয়ারিতে ৬ হাজার ৫৮৭ দশমিক ৬৮ কোটি টাকার রেমিট্যান্স আসে। পরের মাসে তা কমে গিয়ে হয় ৫ হাজার ৭৩৬ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা। এরপর মার্চে কিছুটা বাড়লেও এপ্রিল থেকে রেমিট্যান্স কমতে শুরু করে। মার্চে ৬ হাজার ৬২৩ দশমিক ৬৯ কোটি, এপ্রিলে ৬ হাজার ৩৮৬ দশমিক ৮৮ কোটি, মে মাসে ৬ হাজার ২৫৮ কোটি দশমিক ১৪ কোটি, জুনে ৬ হাজার ১৮৭ দশমিক ৯৫ কোটি এবং জুলাইয়ে আরও কমে ৫ হাজার ৮৭৯ দশমিক ২ কোটি টাকার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের জুনের তুলনায় এ বছরের জুনে ২ দশমিক ৫০ ভাগ এবং গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ বছরের জুলাইয়ে ৩ দশমিক ৮৫ ভাগ রেমিট্যান্স কম এসেছে।
বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার সৌদি আরব। বর্তমান সরকারের ২০ মাসে সৌদি আরব গেছেন মাত্র ১৯ হাজার ৬৬৭ বাংলাদেশী কর্মী। একই সময় সেখান থেকে ফিরেছেন ৩৩ হাজার ৬০৬ জন। আগের বছরগুলোতে গড়ে দেড় থেকে ২ লাখ লোক সৌদি আরবে গেছেন। একই অবস্থা কুয়েতেও। গত ২০ মাসে কুয়েতে গেছেন মাত্র ৩৭ জন কর্মী। অথচ দেশটিতে গড়ে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার বাংলাদেশী যেতেন। মধ্যপ্রাচ্যের বাকি ৪ দেশের মধ্যে কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও জনশক্তি রফতানি কমেছে।
৬৯ লাখ ৭২ হাজার ৩৫৮ প্রবাসী বাংলাদেশীর মধ্যে ৪০ লাখই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। এর মধ্যে সৌদি আরবে আছেন ২৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৩০ জন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৭ লাখ ১০ হাজার ২৮৫ জন। ওমানে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৫৭ জন। কুয়েতে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন। বাহরাইনে ২ লাখ লাখ ৪ হাজার ১৩৮ জন, কাতারে ১ লাখ ৬২ হাজার ১৩৮ জন। মালেশিয়ায় আছেন ৬ লাখ ৯৯ হাজার ১২৩ জন।
২০০১ সালের পর কুয়েতে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪৭ হাজার লোক যেতে থাকেন। তবে ২০০৯ সালে এসে ধস নামে। ২০০৯ সালে মাত্র ১০ জন লোক কুয়েতে গেছেন। আর এ বছর গেছেন মাত্র ২৭ জন। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুয়েত সফরের সময় সে দেশের আমিরের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার অনুরোধ জানান। তবে এখনও ইতিবাচক কোনো সাড়া মেলেনি।
২০০৮ সালে ২৫ হাজার ৫৪৮ কর্মী কাতারে, ৫২ হাজার ৮৯৬ কর্মী ওমানে এবং ৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ কর্মী সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন। আর গত ২০ মাসে ১৮ হাজার ২২৭ জন কাতারে, ৬২ হাজার ৭৩৭ জন ওমানে ও ৩ লাখ ৮১ হাজার ২৫০ জন সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন। আগের বছরের তুলনায় এ ৩ দেশে জনশক্তি রফতানি ২০ মাসে দেড় লাখ কমেছে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ২০০৯ সালে জনশক্তি রফতানিতে ধস নামে। মন্দা কেটে গেলেও জনশক্তি রফতানি খাত চাঙ্গা হয়নি। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে মালয়েশিয়ায় অতিরিক্ত ৪ লাখ শ্রমিক যান। অনুমোদন ছাড়া ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে একশ্রেণীর জনশক্তি রফতানিকারক ও সরকারি কর্মকর্তার যোগসাজশে অতিরিক্ত ৪ লাখ শ্রমিক যাওয়ায় মালয়েশিয়ার রাস্তা বাংলাদেশের জন্য ২০০৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়। যা বহু চেষ্টার পরও খোলা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব সেখানেও শ্রমিক রফতানির সুযোগ কমে আসছে। কুয়েত শ্রমবাজার বন্ধ আছে এক দশক ধরে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতে শ্রমিক শ্রেণীর জনশক্তির চাহিদা কমে আসছে। দুই বছর আগে বিশ্বব্যাপী মন্দার সময়ে শ্রমিক আমদানিকারী দেশগুলোতে নির্মাণ খাত বড় বাধার মুখে পড়ে। ফলে বড় ধরনের নির্মাণ কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়। নতুন নির্মাণও হয়নি বলা চলে। ফলে সে পরিস্থিতি এখনও অব্যাহত রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন বাজারের সন্ধানে নেমেছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আসন্ন ঈদুল ফিতরের পর পরই ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পাঁচটি টিম পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব টিম নতুন শ্রমবাজার সন্ধান করবে। টিম নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান ছাড়াও রফতানি ও রেমিট্যান্সের ধারা বাড়াতে সুপারিশ করবে। সরেজমিন বাজার পরিদর্শন করে সমস্যা নিরূপণ ও সমাধানের কৌশল প্রণয়ন করবে। পাঁচটি টিম যথাক্রমে হংকং, জাপান ও তাইওয়ান, ইতালি, বেলজিয়াম, জার্মানি ও স্পেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, বোত-সোয়ানা ও জিম্বাবুয়ে এবং রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভিয়া ও পোলান্ড সফর করবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক, মন্ত্রণালয়ের দুজন যুগ্ম সচিব এবং বোয়েসলের এমডি পাঁচটি টিমের নেতৃত্ব দেবেন। প্রতিটি টিমে পাঁচজন করে সদস্য থাকবেন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে বাংলাদেশী মিশন টিমগুলোর জন্য কর্মসূচি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়কে জানাবে।
সিঙ্গাপুরে জনশক্তির রফতানিতে নতুন ফাঁদ : একদিকে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, অন্যদিকে দালালদের জালিয়াতির কারণে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে অনেক শ্রমিককে। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার রয়েছে সিঙ্গাপুরে। কিন্তু সিঙ্গাপুরে জনশক্তি রফতানিতে ‘নতুন ফাঁদ’ পেতেছে আদম ব্যবসায়ীরা। ফাঁদ অনুযায়ী ঠিকঠাকমতো ভিসা হচ্ছে, দু’মাস কোম্পানিতে লোভনীয় বেতন পাচ্ছে, তারপরই চাকরি চলে যাচ্ছে। এরপর বেকারত্ব। এই বেকারত্ব নিয়েই প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক এখন সিঙ্গাপুরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর এক কর্মকর্তা আমার দেশকে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। নতুন ফাঁদে পড়ে অনেক শ্রমিক এখন বেকার হয়ে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা প্রতিদিনই হাইকমিশনে তাদের সমস্যার কথা জানাতে আসছে। কিন্তু সহানুভূতি জানানো ছাড়া হাইকমিশনের আর কিছুই করার নেই।
জানা গেছে, সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের কিছু দালাল যৌথভাবে এই ফাঁদ পেতেছে। সিঙ্গাপুরের কিছু কিছু কোম্পানি প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত লোক চেয়ে বাংলাদেশে চিঠি পাঠায়। এই চিঠির বিপরীতে লোক নিয়োগ দেয়া হয়। আর এখানেই প্রতারিত হয় শ্রমিকরা। যেমন কোনো কোম্পানিতে ৫০ শ্রমিকের প্রয়োজন হলে ৫০০ জনের চাহিদার কথা বলা হয়। বাংলাদেশী দালালরা তাদের কাছ থেকে ৭ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার নিয়ে থাকে। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ সাড়ে ৩ লাখ টাকা। সিঙ্গাপুরের কোম্পানি থেকে ঠিকঠাকমতো কাগজপত্র আসায় ভিসা পেতে কোনো সমস্যা হয় না। এরপর ভালোয় ভালোয় তাদের সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে নিয়ে চাকরি দেয়া হয়। ভালো চাকরি পেয়ে তারা আত্মীয়স্বজন সবাইকে খবরটি জানায়। কিন্তু এ চাকরি থাকে মাত্র দু’মাস। এই দু’মাস মূলত শ্রমিকদের কাছ থেকে নেয়া টাকা থেকেই বেতন দেয়া হয়। অর্থাত্ সিঙ্গাপুরে যেতে এবং দু’মাসের বেতন দিতে খরচ হয় মাত্র দেড় লাখ টাকা। এরপরই অতিরিক্ত শ্রমিকদের জানিয়ে দেয়া হয় আপাতত কোনো কাজ নেই। মূলত তখন থেকেই বেকার হয়ে পড়ে শ্রমিকরা। দু’লাখ টাকা দু’দেশের প্রতারক আদম বেপারিরা ভাগ করে নেয়।
চাকরি হারিয়ে এসব শ্রমিক চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। খেয়ে-না খেয়ে এদের অনেকে এখন জঙ্গলেও বসবাস করছে।
অনেক সময় এরা না খেয়ে থাকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাইকমিশনের সামনে বসে থাকে। কোনো কোনোদিন আন্তর্জাতিক কোনো মানবাধিকার সংস্থা একবেলা খাবার দেয়। অনেকদিন আবার কেউ খোঁজই নেয় না। এভাবে চলছে তাদের জীবন। এ অবস্থার অবশ্যই অবসান হওয়া উচিত।
অর্থ রোজগারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের জন্য সিঙ্গাপুর আকর্ষণীয় দেশ। এশিয়ার যে কোনো দেশের চেয়ে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশী শ্রমিকরা শ্রম বিক্রিতে বেশি আগ্রহী। এ কারণে হাজার হাজার শ্রমিক সিঙ্গাপুর গিয়ে থাকে।
জনশক্তি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ব্যুরো জানায়, গতবছর সিঙ্গাপুরে ৩৯ হাজার ৫৮১ শ্রমিক রফতানি হয়েছিল। তার বিপরীতে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ১৩৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। বর্তমানে সেদেশে ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক রয়েছে। বিভিন্ন নির্মাণ শিল্প, শিপইয়ার্ড, হাসপাতাল, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় কাজ করছে তারা। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার শ্রমিকের কাজ করার বৈধতা রয়েছে। বাকিরা বিভিন্ন উপায়ে কাজ করছে। পক্ষান্তরে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক রয়েছে যাদের সিঙ্গাপুরে কাজ করার বৈধ কাগজপত্র নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিবছর সিঙ্গাপুর থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ বেড়ে চললেও সেদেশে যাওয়ার ঝামেলা কমছে না। বর্তমানে দালালের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে যেতে শ্রমিকপ্রতি আড়াই থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়। এ টাকা ওঠাতে তাদের দু’থেকে তিন বছর লেগে যায়। অনেকের জন্য এ টাকা দীর্ঘ সময়েও তুলে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
যারা বর্তমানে সিঙ্গাপুরে গ্রেফতার আতঙ্কে রয়েছে, তাদের বেশিরভাগই প্রথমে এক মাসের টুরিস্ট ভিসায় গিয়েছিল। সিঙ্গাপুরের অভিবাসন নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিদেশির ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি দেশটিতে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হন। অবৈধ অভিবাসীরা পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।
মাঝে মাঝে পুলিশ অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতারে অভিযান চালায়। আবার কেউ পুুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তাকে জেল-জরিমানা ও শাস্তি দেয়া হয়। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা দেশে ফেরেনি। তারা সিঙ্গাপুরে কর্মরত অন্যান্য বাংলাদেশীর সঙ্গে মিলেমিশে বিভিন্ন কারখানায় কাজ করে চলেছে। অনেকে গোপনে কম পারিশ্রমিকেও কাজ করে। সিঙ্গাপুরের আইনে সরকার নির্ধারিত বেতনের কম দিলে সেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। কিন্তু এসব বাংলাদেশীর বৈধ কাগজপত্র না থাকায় রাষ্ট্রীয় সেসব সুযোগ-সুবিধা তারা পায় না। আর তাদের এসব দুর্বলতার কারণে বৈধভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগও অনেক সময় হাতছাড়া হয়ে যায়।
সূত্র জানায়, কর্মঠ ও দক্ষ হওয়ার কারণে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কদর রয়েছে। কিন্তু সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়োগে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় দালালচক্র নিজেদের ইচ্ছেমত টাকা-পয়সা নিয়ে সেখানে লোক পাঠিয়ে থাকে।
সিঙ্গাপুর পুলিশের হাতে সম্প্রতি গ্রেফতার হয়ে দেশে ফিরে আসা এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, যারা টুরিস্ট ভিসা নিয়ে দেশে ফিরে আসেনি, তাদের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছে।
তারা উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠায় হুন্ডির মাধ্যমে। অনেকেই সিঙ্গাপুরে অবস্থান করার জন্য নিজেদের পাসপোর্ট স্বেচ্ছায় হারিয়ে ফেলে। আবার কিছু কিছু লোকের পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ আটকে রাখে। বর্তমানে এসব লোকই পুলিশি অভিযানের ভয়ে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে জীবনযাপন করছে। অনেক অবৈধ শ্রমিক রাতে পালিয়ে বেড়ায়। পুলিশের আগমন টের পেলে জঙ্গলে আত্মগোপন করে। পরদিন ভোর হলে আবার নির্দিষ্ট কাজে চলে যায়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, অবৈধভাবে জনশক্তি রফতানি ও বিনা পারমিশনে অবস্থান করায় সিঙ্গাপুর সরকার গত কয়েক মাসে বেশকিছু বাংলাদেশীকে গ্রেফতার করেছে। গত ১১ আগস্ট সিঙ্গাপুরের সৈয়দ আলভি রোড থেকে অবৈধভাবে বসবাসকারী ৩৫ বাংলাদেশীকে গ্রেফতার করে সিঙ্গাপুর পুলিশ। পরে তাদের জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। এদের প্রত্যেকেই কিছুসংখ্যক বাংলাদেশী দালালের মাধ্যমে সেখানে অবৈধভাবে নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করছিল। এর আগে আরও ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছিল সিঙ্গাপুর পুলিশ। গত ১৭ জুন সিঙ্গাপুর এমওএম অফিসের কর্মকর্তারা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সিঙ্গাপুরের উডল্যান্ড এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে শ্রমিক রফতানি সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রসহ ছয়জনকে আটক করে। তাদের এমওএম অফিসে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্যমতে দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলার অভিযোগে ভিক্টর লি ও জেমস লয় নামে দুই সিঙ্গাপুরিকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এছাড়াও শ্রমিক রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়া শতাধিক বাংলাদেশী সাব-এজেন্ট সিঙ্গাপুর সরকারের কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকের পাসপোর্ট সিঙ্গাপুর জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরো (এমওএম) জব্দ করে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নষ্ট করার পেছনে যে চক্রটি কাজ করছে, তাদের অন্যতম রাজু ওরফে নানদু বলে জানা গেছে। এ চক্রটি সম্পর্কে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়েও প্রচুর অভিযোগ এসেছে বলে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এ চক্রটিকে সিঙ্গাপুর পুলিশ পাকড়াও করে। এদের কয়েকজন মুচলেকা দিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এলেও রাজু জামিন নিয়ে সেখানে অবস্থান এবং পুনরায় তার অবৈধ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করছে। সূত্র জানায়, রাজুকে সিঙ্গাপুর সরকার নজরদারিতে রাখার পর তার ছেলে হারুনকে টুরিস্ট ভিসায় সিঙ্গাপুরে আনা হয়েছে। এখন হারুনই বাবার অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে। সূত্র জানায়, জনশক্তি রফতানির কোনো রিক্রুটিং লাইসেন্স রাজুর না থাকার পরও সাভারের নরসিংহপুরে বিএসটিসি নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে অবৈধভাবে সিঙ্গাপুরে লোক পাঠাচ্ছে।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?