Amardesh
আজঃ ঢাকা, শুক্রবার ২০ আগস্ট ২০১০, ৫ ভাদ্র ১৪১৭, ৯ রমজান ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ রাত ১.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

স্ম র ণ : মাওলানা আবু সাঈদ মোহাম্মদ ওমর আলী

শরীফ মুহাম্মদ
কালজয়ী কিছু ইসলামী গ্রন্থের অনুবাদক, লেখক, ইসলামী চিন্তাবিদ ও দাঈ অধ্যাপক মাওলানা আবু সাঈদ মোহাম্মদ ওমর আলী ১৪ আগস্ট রাত ২টায় ঢাকা লালমাটিয়ার একটি ক্লিনিকে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। কিছুদিন যাবত্ তিনি হৃদরোগে ভুগছিলেন। ওই ক্লিনিকে তার এনজিওগ্রাম ও হৃদযন্ত্রের ছোট্ট অপারেশন করা হয়েছিল। অপারেশন-পরবর্তী জটিলতায় তার ইন্তেকাল হয়। পরদিন রোববার খুব সকালে ঢাকার বাসস্থান মাতুয়াইলে জানাজা শেষে তার লাশ গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার আলমডাঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। রমজান মাসের সাহরি ও সাহরি-পরবর্তী বিশ্রামের কারণে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার ঘনিষ্ঠ ও পরিচিত বহু ইসলামী ব্যক্তিত্ব, আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের দুঃসংবাদটি পেতে পেতে পরদিন দুপুর হয়ে যায়। ততক্ষণে তার লাশবাহী গাড়ি কুষ্টিয়ার পথে। এ জন্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশবরেণ্য অনেক সুধীজন তাকে শেষ দেখা ও তার জানাজায় শরিক হতে পারেননি। ওইদিন বহু মসজিদ-মাদ্রাসায় তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষভাবে দোয়া করা হয়।
আবু সাঈদ মোহাম্মদ ওমর আলী ছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইসলামী বিশ্বকোষ বিভাগের পরিচালক। ইসলামী বিশ্বকোষ বিভাগটি শুরুতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি প্রকল্প ছিল, স্বতন্ত্র বিভাগ ছিল না। এ প্রকল্পের অধীনে ইসলামী বিশ্বকোষের দুই-তিনটি ভলিউম প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তিনি এ বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পান গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। এরপর থেকে ২০০৬ সালে অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বেই ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ৩০ খণ্ডের ইসলামী বিশ্বকোষ সেট পূর্ণ করা হয়। এরপর স্বতন্ত্র সিরাত বিশ্বকোষেরও ১৪-১৫টি খণ্ড তৈরি হয়ে প্রকাশিত হয়। তার কর্মতত্পরতা ও অভিব্যক্তিতে বোঝা যেত, ইসলামী বিশ্বকোষ বিষয়ক কাজ তার পেশার কাজ হলেও তার স্বপ্ন ও মিশনেও সেটি পরিণত হয়েছিল। তাই সব প্রশাসনের আমলেই বিশ্বকোষের জন্য তাকেই অনিবার্য মনে করা হতো।
দীর্ঘ সময় বিশ্বকোষ বিভাগের পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় দেশের নবীন-প্রবীণ বহু ইসলামী পণ্ডিত, প্রাজ্ঞ প্রাবন্ধিক, লেখক ও অনুবাদকের সঙ্গে তার আন্তরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। সদালাপী, সজ্জন ও সহজ এই মানুষটির সঙ্গে শুধু দেখা করার জন্যও বহু বিশিষ্ট ও সাধারণ জনকে তার অফিসে আসতে দেখা যেত। উপযোগিতা বিবেচনা করে ছোট-বড় বহু জায়গায় তিনি নিজেও যেতেন এবং আক্ষেপ ও উজ্জীবন মেশানো কিছু ‘কথা’ রাখতেন। তার মুখের ভাষায় ব্যাকুলতা ও উদ্দীপনা দুটোই পাশাপাশি ঝরত। দ্বীনের জন্য কিছু লেখা, কিছু করা ও কিছু বলার স্বপ্ন তিনি মানুষের অন্তরে ঢুকিয়ে দিতে চাইতেন। প্রত্যাশা ও প্রত্যয়ের গল্প তিনি একসঙ্গে বলতেন এবং দ্বীনের চর্চা ও সাধনায় নিবেদিত হওয়ার প্রেরণা দিতে পারতেন।
তার একান্ত আলাপচারিতা থেকে জানা গেছে, আলমডাঙ্গার দ্বীনদার, সম্ভ্রান্ত ও সাধারণ একটি পরিবার থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন। আলিয়া মাদ্রাসায় কামিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। সত্তরের দশকে সন্তোষে মওলানা ভাসানী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন কয়েক বছর। এরপর যোগ দিয়েছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনে। ‘ঈমান যখন জাগলো’ সম্ভবত তার প্রথম অনূদিত বই। বালাকোট সংগ্রামী ঊনবিংশ শতকের জিহাদের সিপাহসালার হজরত সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর জীবনের ওপর রচিত এ বইটির মূল লেখক ছিলেন প্রখ্যাত মনীষী আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)। ইতিহাস, তত্ত্ব, দর্শন ও সাহিত্যের অপূর্ব মিশেল এ বইটির অনুবাদের মধ্য দিয়ে আল্লামা নদভীর সঙ্গে আবু সাঈদ মোহাম্মদ ওমর আলীর যোগাযোগ গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি মূল লেখকের আরও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিখ্যাত বই বাংলায় অনুবাদ করেন। পত্র মারফত ও সরাসরি যোগাযোগের একপর্যায়ে তিনি আল্লামা নদভীর হাতে বাইআত হন। কয়েক বছর পর খেলাফতও লাভ করেন। আল্লামা নদভীর জীবনের শেষ ৮-১০ বছরে প্রায় প্রতি রমজানে ওমর আলী চলে যেতেন লক্ষেষ্টৗর নদওয়াতুল উলামায় তার অনুসরণীয় মনীষীর সঙ্গে রমজান কাটাতে, ইতিকাফ করতে। ১৯৯৯-এর ৩১ ডিসেম্বর রমজানের যে শুক্রবারে আল্লামা নদভীর ইন্তেকাল হয়, তখন ওমর আলী তার কাছেই ছিলেন। পরবর্তী সময়ে রমজানে তার শায়খের ইন্তেকালের চোখভেজা বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। এগার বছর পর সেই রমজানেই ওমর আলী নিজেও চলে গেলেন।
জীবনের শেষ ১০-১২ বছর তিনি নির্দিষ্ট কর্মব্যস্ততা ও লেখালেখির পাশাপাশি প্রত্যক্ষভাবে ইসলামের দাওয়াতি কাজ করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের উপজাতি অধ্যুষিত বেশ কিছু অঞ্চলে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যাগে ইসলামের প্রচার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তার হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণকারী নওমুসলিমের সংখ্যা শতাধিক। গায়র মুসলিমদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটিকে মিশন বানিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি ভারতের প্রখ্যাত দাঈ কলীম সিদ্দিকী (রহ.)-এর জীবন সাধনার কথা উদ্ধৃত করে বলতেন, ‘বিপুলসংখ্যক আল্লাহর বান্দার পরকালকে আবাদুল আবাদ জাহান্নামের আগুনের হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চেষ্ট থাকলে আল্লাহর কাছে কী জবাব দেব আমরা? আজকের মুসলমানদের অবস্থা যাই থাকুক, ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য তো গায়র মুসলিম ভাইদের কান পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা আমাদের করা উচিত।’ প্রায় দুই বছর পর এই শবেবরাতে ঢাকার বাইরে একটি প্রোগ্রামে তার সঙ্গে দেখা হলে তিনি আলাপচারিতার একপর্যায়ে অধম লেখককে বললেন, ‘আমার বিবির সঙ্গে কথা হয়েছে, সর্বশেষ কন্যা-সন্তানটির বিয়ে হয়ে গেলে সংসার বিবির হাতে দিয়ে ইনশাআল্লাহ আমি আল্লাহর পথে বের হয়ে যাব।’
ওমর আলী একটু আগেই আল্লাহর পথে বের হয়ে গেলেন। আল্লাহর সান্নিধ্যে হঠাত্ করেই চলে গেলেন। আল্লাহর বান্দাদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর ফিকির যার হৃদয়কে তপ্ত রাখত, আল্লাহ! আপনি তার জন্য জান্নাতে জায়গা দিন। ষ
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?