সরকারি তদন্ত রিপোর্টের অপ্রকাশিত তথ্য
জাহেদ চৌধুরী
বিডিআর বিদ্রোহের অপ্রকাশিত সরকারি তদন্ত রিপোর্টের চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন তথ্য সম্প্রতি জানা গেছে। রিপোর্টে ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন জওয়ানদের পিলখানা বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করে ওই ব্যাটালিয়ন কমান্ডারসহ অন্যান্য অফিসারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং এ নিয়ে অধিকতর তদন্তের কথা বলা হয়েছে। অপ্রকাশিত ওই রিপোর্টে তদন্ত কমিটি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ২৫ ফেব্রুয়ারি সাক্ষাত্কারী ১৪ বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যের নামের তালিকা তদন্ত কমিটি জানতে পারেনি। কমিটি তাদের রিপোর্টে বলেছে, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২ মাস আগে থেকে বিদ্রোহের পরিকল্পনা চলে। পরিকল্পনার বিভিন্ন পর্যায়ে ষড়যন্ত্রকারীরা বেশ কিছু বৈঠক করে। আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপসের অফিস ও তার বাসভবন ‘স্কাই স্টার’-এর বৈঠকে উপস্থিত বিডিআর জওয়ানদের ক’জনের নামও উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। বিদ্রোহের কিছুদিন আগে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বর্তমান এমপি শেখ সেলিমের সঙ্গে বিডিআর সদস্যদের বৈঠক ও তাদের দাবি-দাওয়াসংবলিত কপি হস্তান্তর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করার জন্য বিডিআর জওয়ানরা সচেষ্ট ছিল বলে তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত কমিটি বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা, অস্ত্র জমা দেয়া এবং আটককৃত শিশু ও মহিলাদের মুক্তি দেয়ার শর্ত ছাড়া আর কোনো শর্ত আরোপ করা হয়েছিল কিনা জানা যায়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার সময় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বৈঠক সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাছে যে বিবৃতি পাঠ করেন তাতে বলা হয়েছিল, ‘বিডিআর প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনাক্রমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিদ্রোহী সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন এবং অস্ত্র জমা দিয়ে তাদের ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া তিনি আটক শিশু ও মহিলাদের ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানান।’ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বিবৃতিতে মহাপরিচালক বা অন্যান্য অফিসারের পরিণতি বা তাদের ছাড়ার ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি। ২০০৯ সালে পিলখানা ট্র্যাডেজির শিকার হয়ে বিডিআরের ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল, ডেপুটেশনে বিডিআরে কর্মরত ৫৭ চৌকস সেনা অফিসারসহ ৭৪ জন নৃশংসভাবে খুন হন। বাংলাদেশ তথা বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের ঘৃণ্য ঘটনা দেশবাসীকে মর্মাহত, বেদনাহত করে। বিদ্রোহের দিন সকাল ১১টা নাগাদ বিদ্রোহীরা তাজা গোলাবারুদ লুট করে। তার আগে বিদ্রোহীদের হাতে তাজা গোলাবারুদ তেমন কিছুই ছিল না। বাইতুল ইজ্জত বিডিআর ট্রেনিং সেন্টারে ব্যবহৃত হয় এমন কিছু ব্ল্যাঙ্ক কার্তুজ এর আগ পর্যন্ত বিদ্রোহীরা ব্যবহার করেছিল বলে তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, সকাল সাড়ে ৯টায় ঘটনার সূত্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে পিলখানা বিদ্রোহের খবর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে র্যাবের প্রথম দল পিলখানা পৌঁছায়। সকাল সোয়া ১০টা নাগাদ র্যাব-এর একটি করে দল পিলখানার ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গেটে পৌঁছায়। এর ঘণ্টাখানেকের পর বেলা ১১টা নাগাদ সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের একটি দল ধানমন্ডি মেডিনোভা ক্লিনিকের সামনে অবস্থান নেয়। ব্রিগেড কমান্ডার ট্যাঙ্ক ও এপিসি ছাড়া পিলখানার অভ্যন্তরে কোনো অভিযান চালানো সম্ভব নয় বলে মূল্যায়ন করলে সে অনুযায়ী ৭টি এপিসি ডিপো থেকে দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে ক্যান্টনমেন্টে প্রস্তুতি নিলেও ঘটনাস্থলে অভিযানের জন্য আনা হয়নি। ডিএমপি কমিশনার ৯টা ৫০ মিনিটে ঘটনার খবর পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ফোর্স মোতায়েনের জন্য রমনা জোনের ডিসি এবং লালবাগ থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। সকাল ১০টা নাগাদ আকাশে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার টহল শুরু করে। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, জিম্মি অফিসার ও তাদের পরিবার-পরিজনদের উদ্ধারে কোনো উদ্ধার অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হয়নি। তারা আরও জানান, তাত্ক্ষণিক অভিযান পরিচালনা না করার কারণ এ জন্য কোনো নির্দেশ না পাওয়া।
বিদ্রোহের প্রথমদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টায় পিলখানা ৩ নম্বর গেটে সামনে ‘জয় বাংলা-জয় বিডিআর, বিডিআর-জনতা ভাই ভাই’ বলে স্লোগান দিয়ে শতাধিক মানুষ মিছিল করে।
পিলখানা ট্র্যাজেডির পর সাবেক সচিব আনিস-উজ-জামান খানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। সামরিক ও বেসামরিক লোকদের সমন্বয়ে এ তদন্ত কমিটি কয়েক দফা সময় নেয়ার পর সরকারের কাছে রিপোর্ট দেয়। প্রায় ৫০ পৃষ্ঠার মূল রিপোর্ট হলেও সরকারের তরফ থেকে তাদের পছন্দানুযায়ী রিপোর্টের কিছু অংশ বাছাই করে ৬ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করা হয়। ২০০৯ সালের ২৭ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের উপস্থিতিতে আনিস-উজ-জামান খান তদন্ত প্রতিবেদনের সরকারের বাছাইকৃত অংশ প্রকাশ করেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লিখিত এসব বিষয় ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি ‘ফেসবুকে’ সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে।
ফেসবুকে অনলাইনে পাওয়া তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে তদন্ত কমিটির প্রধান আনিস-উজ-জামান খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ নিয়ে কোনো বক্তব্য প্রদান করতে রাজি হননি। কয়েক দফা যোগাযোগের পর তার বক্তব্য ছিল ওই তদন্ত প্রতিবেদনে কী দিয়েছি, তা আমার মনে নেই। ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের প্রধান ও কর্মকর্তাদের ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত বক্তব্য নিয়ে তার অভিমত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি পুরোপুরি মনে করতে পারছি না, ওখানে কি লিখেছি। একইভাবে সরকারি দলের সঙ্গে বিদ্রোহী জওয়ানদের বিদ্রোহের আগে একাধিক বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব নিয়ে আমি এখন আর কথা বলতে চাই না। এছাড়া আমি বিদেশে চলে যাচ্ছি। আমার সময়ও হবে না। ফেসবুকে পাওয়া রিপোর্টটি তাদের দেয়া রিপোর্ট কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেসবুক কি আমি জানি না। অনলাইনের কথা বললে তিনি বলেন, আমি এসব এখন যাচাই করতে পারব না। ওই তদন্ত কমিটির সদস্য বিডিআরের নতুন ডিজি মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মোবাইল ফোনে গতকাল একাধিকবার যোগাযোগ করেও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায়নি। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আমরা তাদের বক্তব্য জানতে পারলে তুলে ধরব। কিছুদিন থেকে ফেসবুকে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও এ নিয়ে সরকার কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
পিলখানা বিদ্রোহের পর ২ মার্চ আনিস-উজ-জামান খানকে সভাপতি করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পাশাপাশি লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে পৃথক একটি সেনা তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। তখন সেনা তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত হয়ে ২০০৯ সালের ২৯ মে আমার দেশ ও পরে কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ হয়। কিন্তু বেসামরিক তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এ পর্যন্ত কোথাও প্রকাশ হয়নি। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে দুই তদন্ত প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিভিন্ন সময় আমার দেশসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে বিদ্রোহের আগে জওয়ানদের বৈঠকের বিষয় এবং পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে দায়ের করা মামলার তদন্ত পর্যায়ে সিআইডি সরকারি দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি স্থান পেয়েছে।
আনিস-উজ-জামান খানের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ৬.১ (ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, “নির্বাচনের পূর্বে বিডিআরের বেশ কিছু সদস্য ব্যারিস্টার তাপসের (বর্তমান এমপি) অফিসে যান। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাবিলদার মনির, সিপাহী তারেক, সিপাহী আইয়ুব, ল্যা. না. সহকারী সাইদুরসহ ২৫/২৬ জওয়ান ও জনৈক জাকির হোসেন সেখানে উপস্থিত ছিল। (খ) নির্বাচনের ক’দিন পর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিডিআর সদস্য এমপি তাপসের বাসভবন স্কাই স্টার-এ যায়। সেখানে তাকে দাবি পূরণের কথা বলা হলে তিনি রেশনের বিষয়টি ছাড়া অন্য কোনো বিষয় বিবেচনায় আনা সম্ভব হবে না বলে জানান। (গ) ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সংসদ সদস্য শেখ সেলিমের বাসায় ২ জন ডিএডি এবং বেসামরিক জাকিরের নেতৃত্বে ১০/১২ জন বিডিআর সদস্য যায়। এমপি সেলিম জানান, এসব দাবি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়, তবে তিনি একটি লিখিত কপি চান। (ঘ) পরবর্তীতে এ দলটি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করার জন্য সচেষ্ট হয় বলে জানা যায়।”
তদন্ত প্রতিবেদনের ৪১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবেই ডিজি মহোদয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদেরকে মোবাইলে কথা বলার সময় ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ান বিদ্রোহ করেছে বলে উল্লেখ করেন। আরো জানা যায়, বিদ্রোহ পূর্ববর্তীতে বিডিআর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অর্পিত বিভিন্ন দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে ২৪ ফেব্রুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে চিফ সিকিউরিটি অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল লে. কর্নেল শামসকে, যিনি ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি দরবারের নিরাপত্তাসহ সকল প্রশাসনিক আয়োজনের দায়িত্বও ছিল ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের ওপর। অপরদিকে দেখা যায়, এ বিদ্রোহের পর ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের মোট ৪ জন কর্মকর্তার মধ্যে অধিনায়ক লে. কর্নেল শামসসহ সকলেই প্রাণে বেঁচে যান, যা আপাতদৃষ্টিতে কাকতালীয় মনে হলেও ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিটি মনে করে। উল্লেখ্য, এদের মধ্যে লে. কর্নেল শামস নিজে সৈনিকদের হাতে ধরা পড়ার পর বিদ্রোহের ২ দিন জনৈক সুবেদার মেজর সিরাজের বাসায় নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন। উপরোক্ত তথ্যসমূহ পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয়, এ বিদ্রোহের ঘটনায় অধিনায়কসহ ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ান সদস্যদের ভূমিকা সন্দেহজনক। এ ব্যাপারে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিটি মনে করে।”
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে ১৪ সদস্যের বিডিআর বিদ্রোহী প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনায় প্রবেশ করে। বিদ্রোহী প্রতিনিধিদল সব চাকরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বেরিয়ে না গেলে আলোচনা করবে না বলে শর্তারোপ করে। এ পর্যায়ে সেখানে অবস্থানরত তিন বাহিনীর প্রধানসহ নিরাপত্তা উপদেষ্টা বের হয়ে যান। তবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য এসএসএফ-এর ৪ জন সদস্য রয়ে যায়। প্রতিনিধিদল তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “জনাব জাহাঙ্গীর কবির নানক ও জনাব মির্জা আজম বিডিআর বিদ্রোহীদের সাথে অনেক আলোচনার পর তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের রাজি করান। পরে তারা ১৪ সদস্যের বিডিআর প্রতিনিধিদকে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার জন্য যমুনায় রওনা হন। কিন্তু এই ১৪ জনের কোনো নামের তালিকা এ পর্যন্ত তদন্ত কমিশন পায়নি।’
বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আগামীকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে আমার দেশ-এ প্রকাশিত হবে।
বিদ্রোহের প্রথমদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টায় পিলখানা ৩ নম্বর গেটে সামনে ‘জয় বাংলা-জয় বিডিআর, বিডিআর-জনতা ভাই ভাই’ বলে স্লোগান দিয়ে শতাধিক মানুষ মিছিল করে।
পিলখানা ট্র্যাজেডির পর সাবেক সচিব আনিস-উজ-জামান খানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। সামরিক ও বেসামরিক লোকদের সমন্বয়ে এ তদন্ত কমিটি কয়েক দফা সময় নেয়ার পর সরকারের কাছে রিপোর্ট দেয়। প্রায় ৫০ পৃষ্ঠার মূল রিপোর্ট হলেও সরকারের তরফ থেকে তাদের পছন্দানুযায়ী রিপোর্টের কিছু অংশ বাছাই করে ৬ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করা হয়। ২০০৯ সালের ২৭ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের উপস্থিতিতে আনিস-উজ-জামান খান তদন্ত প্রতিবেদনের সরকারের বাছাইকৃত অংশ প্রকাশ করেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লিখিত এসব বিষয় ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি ‘ফেসবুকে’ সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে।
ফেসবুকে অনলাইনে পাওয়া তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে তদন্ত কমিটির প্রধান আনিস-উজ-জামান খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ নিয়ে কোনো বক্তব্য প্রদান করতে রাজি হননি। কয়েক দফা যোগাযোগের পর তার বক্তব্য ছিল ওই তদন্ত প্রতিবেদনে কী দিয়েছি, তা আমার মনে নেই। ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের প্রধান ও কর্মকর্তাদের ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত বক্তব্য নিয়ে তার অভিমত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি পুরোপুরি মনে করতে পারছি না, ওখানে কি লিখেছি। একইভাবে সরকারি দলের সঙ্গে বিদ্রোহী জওয়ানদের বিদ্রোহের আগে একাধিক বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব নিয়ে আমি এখন আর কথা বলতে চাই না। এছাড়া আমি বিদেশে চলে যাচ্ছি। আমার সময়ও হবে না। ফেসবুকে পাওয়া রিপোর্টটি তাদের দেয়া রিপোর্ট কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেসবুক কি আমি জানি না। অনলাইনের কথা বললে তিনি বলেন, আমি এসব এখন যাচাই করতে পারব না। ওই তদন্ত কমিটির সদস্য বিডিআরের নতুন ডিজি মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মোবাইল ফোনে গতকাল একাধিকবার যোগাযোগ করেও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায়নি। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আমরা তাদের বক্তব্য জানতে পারলে তুলে ধরব। কিছুদিন থেকে ফেসবুকে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও এ নিয়ে সরকার কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
পিলখানা বিদ্রোহের পর ২ মার্চ আনিস-উজ-জামান খানকে সভাপতি করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পাশাপাশি লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে পৃথক একটি সেনা তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। তখন সেনা তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত হয়ে ২০০৯ সালের ২৯ মে আমার দেশ ও পরে কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ হয়। কিন্তু বেসামরিক তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এ পর্যন্ত কোথাও প্রকাশ হয়নি। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে দুই তদন্ত প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিভিন্ন সময় আমার দেশসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে বিদ্রোহের আগে জওয়ানদের বৈঠকের বিষয় এবং পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে দায়ের করা মামলার তদন্ত পর্যায়ে সিআইডি সরকারি দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি স্থান পেয়েছে।
আনিস-উজ-জামান খানের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ৬.১ (ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, “নির্বাচনের পূর্বে বিডিআরের বেশ কিছু সদস্য ব্যারিস্টার তাপসের (বর্তমান এমপি) অফিসে যান। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাবিলদার মনির, সিপাহী তারেক, সিপাহী আইয়ুব, ল্যা. না. সহকারী সাইদুরসহ ২৫/২৬ জওয়ান ও জনৈক জাকির হোসেন সেখানে উপস্থিত ছিল। (খ) নির্বাচনের ক’দিন পর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিডিআর সদস্য এমপি তাপসের বাসভবন স্কাই স্টার-এ যায়। সেখানে তাকে দাবি পূরণের কথা বলা হলে তিনি রেশনের বিষয়টি ছাড়া অন্য কোনো বিষয় বিবেচনায় আনা সম্ভব হবে না বলে জানান। (গ) ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সংসদ সদস্য শেখ সেলিমের বাসায় ২ জন ডিএডি এবং বেসামরিক জাকিরের নেতৃত্বে ১০/১২ জন বিডিআর সদস্য যায়। এমপি সেলিম জানান, এসব দাবি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়, তবে তিনি একটি লিখিত কপি চান। (ঘ) পরবর্তীতে এ দলটি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করার জন্য সচেষ্ট হয় বলে জানা যায়।”
তদন্ত প্রতিবেদনের ৪১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবেই ডিজি মহোদয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদেরকে মোবাইলে কথা বলার সময় ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ান বিদ্রোহ করেছে বলে উল্লেখ করেন। আরো জানা যায়, বিদ্রোহ পূর্ববর্তীতে বিডিআর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অর্পিত বিভিন্ন দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে ২৪ ফেব্রুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে চিফ সিকিউরিটি অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল লে. কর্নেল শামসকে, যিনি ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি দরবারের নিরাপত্তাসহ সকল প্রশাসনিক আয়োজনের দায়িত্বও ছিল ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের ওপর। অপরদিকে দেখা যায়, এ বিদ্রোহের পর ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের মোট ৪ জন কর্মকর্তার মধ্যে অধিনায়ক লে. কর্নেল শামসসহ সকলেই প্রাণে বেঁচে যান, যা আপাতদৃষ্টিতে কাকতালীয় মনে হলেও ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিটি মনে করে। উল্লেখ্য, এদের মধ্যে লে. কর্নেল শামস নিজে সৈনিকদের হাতে ধরা পড়ার পর বিদ্রোহের ২ দিন জনৈক সুবেদার মেজর সিরাজের বাসায় নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন। উপরোক্ত তথ্যসমূহ পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয়, এ বিদ্রোহের ঘটনায় অধিনায়কসহ ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ান সদস্যদের ভূমিকা সন্দেহজনক। এ ব্যাপারে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিটি মনে করে।”
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে ১৪ সদস্যের বিডিআর বিদ্রোহী প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনায় প্রবেশ করে। বিদ্রোহী প্রতিনিধিদল সব চাকরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বেরিয়ে না গেলে আলোচনা করবে না বলে শর্তারোপ করে। এ পর্যায়ে সেখানে অবস্থানরত তিন বাহিনীর প্রধানসহ নিরাপত্তা উপদেষ্টা বের হয়ে যান। তবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য এসএসএফ-এর ৪ জন সদস্য রয়ে যায়। প্রতিনিধিদল তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “জনাব জাহাঙ্গীর কবির নানক ও জনাব মির্জা আজম বিডিআর বিদ্রোহীদের সাথে অনেক আলোচনার পর তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের রাজি করান। পরে তারা ১৪ সদস্যের বিডিআর প্রতিনিধিদকে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার জন্য যমুনায় রওনা হন। কিন্তু এই ১৪ জনের কোনো নামের তালিকা এ পর্যন্ত তদন্ত কমিশন পায়নি।’
বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আগামীকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে আমার দেশ-এ প্রকাশিত হবে।
-
প্রথম পাতা


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া



