Amardesh
আজঃ ঢাকা, শুক্রবার ২৩ এপ্রিল ২০১০, ১০ বৈশাখ ১৪১৭, ৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ১.৩০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

আমার দেশ-এর খবরে ফরিদপুরে তোলপাড় : রাজাকার আত্মীয়ের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সাফাইয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ : জোরালো হচ্ছে রাজাকারের নামে নামফলক ভেঙে ফেলার দাবি

আরিফ ইসলাম, ফরিদপুর
বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বাবা ফরিদপুরের ১৪ নম্বর লিস্টেড রাজাকার খন্দকার নূরুল হোসেন নূরু মিয়ার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছাফাই গাওয়ায় জেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। গণভবনে গত সোমবার রাতে শেখ হাসিনার সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের ৬০ জন নেতার বৈঠক চলাকালে শেখ হাসিনা তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের শ্বশুর শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বাবা রাজাকার খন্দকার নূরুল হোসেনের পক্ষে এ ধরনের অবস্থান নেয়ায় সেখানে উপস্থিত নেতারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর কন্যার এই ভূমিকায় তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাজনীতি করা ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের অনেকে অবাক হয়েছেন। একই সঙ্গে তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। শুধু আওয়ামী লীগ নয় বরং ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধারাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগ নেত্রীর। যদিও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ তার সামনে জানানোর মতো সাহস বা শক্তি কোনো আওয়ামী লীগ নেতার নেই তাই শুধু মনের কষ্ট মনেই রাখতে হলো ত্যাগী রাজনীতিবিদদের। সোমবার গণভবনের বৈঠকে শ্রমমন্ত্রীর বাবার বিরুদ্ধে আনা একজন জেলা আওয়ামী লীগের নেতার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তার আত্মীয় নুরু মিয়া রাজাকার হলেও যুদ্ধাপরাধী ছিলেন না। ফরিদপুরে আরও রাজাকার থাকলেও সবাই কেন শুধু তার আত্মীয় নূরু মিয়াকে রাজাকার বলে সেটিও তিনি জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন।
এদিকে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় গতকাল শেখ হাসিনার সঙ্গে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের গণভবনে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হওয়ায় গোটা ফরিদপুরসহ সারাদেশে তোলপাড় হয়েছে। এ কারণে গতকাল ফরিদপুরে আমার দেশের তীব্র সঙ্কট সৃষ্টি হয়। দ্রুত পত্রিকাগুলো ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেকেই পত্রিকার স্টলে আমার দেশ না পেয়ে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে রক্ষিত কপি থেকে সংবাদটির ফটোকপি করে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। আমার দেশের এজেন্ট মোঃ কামরুল ইসলাম সুমন মোবাইল ফোনে এ প্রতিনিধিকে জানান, তার কাছে আসা আমার দেশ পত্রিকাগুলো সকালেই শেষ হয়ে গেছে। তারপর অনেক পাঠক পত্রিকা চাওয়া সত্ত্বেও কাউকে আমার দেশ পত্রিকা দেয়া সম্ভব হয়নি।
গণভবনের বৈঠকে উপস্থিত দায়িত্বশীল একজন সিনিয়র নেতা প্রকাশিত সংবাদটির বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, আমার দেশে প্রকাশিত সংবাদটি হান্ড্রেড পার্সেন্ট সঠিক হয়েছে। সব সাংবাদিকের উচিত এ ধরনের সঠিক সংবাদ পরিবেশন করা। যাতে করে সারাদেশের মানুষ সত্য সংবাদটি জানতে পারেন। ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিতীয়বার আরও একটি বৈঠকের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে ওই নেতা জানান। আরও কি কথা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, নূরু মিয়ার পক্ষে কথা বললেও নেত্রী তাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন, অনেক কষ্টে ফরিদপুরের আসনটি উদ্ধার করেছিলাম; কিন্তু বেয়াই সাহেবের কারণে এ আসনটি আর আমরা পাচ্ছি না সেটি আমি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছি। ক্ষোভের সঙ্গে শেখ হাসিনা বলেছেন, ’৯৬-এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর ছবি ও আমার ছবি ফরিদপুরের যে বাড়িতে ভাংচুর এবং ছবিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল সেই বাড়ির লোকেরা কেমন আওয়ামী লীগ করেন সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। বেয়াই মোশাররফ হোসেনের আচার-ব্যবহার মোটেও ভালো না উল্লেখ করে নেত্রী নিজেই বলেছেন, বেয়াই সাহেবের ব্যবহারে একটা খন্দকারী ভাব আছে। ওনাদের পরিবারে সাত-আট ভাইবোন, অথচ ভাইবোনদের কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। তিনি শ্রমমন্ত্রীর ছোট ভাই এবং বর্তমান সময়ে ফরিদপুরের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি স্বঘোষিত রাজা খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবরের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, তার সব খবরই আমি রাখি, বাবর সাহেব জাতীয় পার্টির সময় জাতীয় পার্টি, বিএনপির সময় বিএনপি করেছে। সে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ কেন করবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ফরিদপুর থেকে বাবরকে প্রত্যাহার করা হবে।
অপরদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীর গ্রুপের হাতে নির্যাতিত নেতারা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এক সপ্তাহ সময় পর্যন্ত দেখবেন নেত্রী কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তারপর তারা পরবর্তী পদক্ষেপের মাধ্যমে কর্মসূচি হাতে নেবেন বলে এ প্রতিবেদককে জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠকে শ্রমমন্ত্রীর বাবাকে নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের পর জেলা আওয়ামী লীগের ৯৫ শতাংশ নেতারা ফরিদপুর শহরের বিভিন্ন রাস্তার নাম রাজাকার নূরু মিয়ার নামে যে নামকরণ করা হয়েছে তা অবিলম্বে ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়ে বলেছেন, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে রাজাকারের নামে কোনো সড়কের নামকরণ থাকতে পারে না। তাই অবিলম্বে সরকারিভাবে প্রধানমন্ত্রীর উচিত এসব বিতর্কিত ব্যক্তিদের নামফলক ভেঙে ফেলা। কারণ ক্রমেই নূরু মিয়াসহ রাজাকারদের নামফলক ভেঙে ফেলে সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লেখার দাবি জোরালো হয়ে উঠছে।
গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সামনে জ্বালাময়ী ও সাহসী বক্তব্য প্রদানকারী ফরিদপুর সদর উপজেলার চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের সহ- সভাপতি অ্যাডভোকেট সামছুল হক ভোলা মাস্টার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আবারও বলেছেন, মৃত্যু হচ্ছে একজন মানুষের সবচেয়ে নিকটতম বন্ধু। তাই আমি কখনও মৃত্যুকে পরোয়া করি না। রাজাকারের নামে করা রাস্তার নামফলক ভেঙে ফেলার দাবি শুধু আমার নয়, এ দাবি মুক্তিযোদ্ধা এবং জেলার সব মানুষের দাবি। শ্রমমন্ত্রীর বাবা একজন রাজাকার ছিলেন এটি সবারই জানা। বর্তমানে তার ছেলে ফরিদপুরের মন্ত্রী সেই কারণে এখন তার বাবার নামফলক ভেঙে ফেলা সম্ভব না হলেও যখন তিনি মন্ত্রী থাকবেন না তখন ঠিকই এসব রাস্তার নামফলক ভেঙে দেয়া হবে। সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট বুঝতে হবে। সম্প্রতি ফরিদপুর শহরের জনতা ব্যাংকের মোড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি প্রতিবাদ সমাবেশে ভোলা মাস্টারের মৃত্যু হলে এই মৃত্যুর জন্য শ্রমমন্ত্রী ও তার ভাই বাবর দায়ী থাকবেন বলে যে বক্তব্য তিনি দিয়েছেন সে প্রসঙ্গে ভোলা মাস্টার বলেন, ‘সব সময় সত্য কথা বলি বলে মন্ত্রী ও তার ভাই আমার ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। আমার ওপর তাদের যথেষ্ট আক্রোশ রয়েছে। তাদের হাতে এরই মধ্যে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা নূর মোঃ বাবুল এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক শওকত আলী জাহিদ মারাত্মক আহত হয়েছেন। কিন্তু আমি এখনও অক্ষত রয়েছি। আমার ওপরেও সন্ত্রাসী হামলা হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে। সে কারণে আমি যদি থানায় জিডি করতে যাই, তবে পুলিশ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে জিডি নেবে না। তাই আমি জনতার আদালতে জিডি করেছি।’
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জায়নুল আবেদিন নেত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে বলেন, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নূর মোঃ বাবুল এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক শওকত আলী জাহিদের ওপর হামলাকারীদের আমরা দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছি এবং তাদের ধরা হবে ও বিচার করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী কথা দিয়েছেন। কিন্তু এখনও কেন বা কি কারণে এই সন্ত্রাসী হামলার আসামিদের ধরা হচ্ছে না তা আমরা বুঝতে পারছি না। জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে একসঙ্গে বসে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জায়নুল আবেদিন জানান।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বাবা নূরু মিয়া রাজাকার হলেও যুদ্ধাপরাধী ছিলেন না বলে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন তার কড়া সমালোচনা করেন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হাসান নসরু। অন্তত বঙ্গবন্ধুর কন্যার মুখে এ বক্তব্য শোভা পায় না বলে নসরু মনে করেন। ফরিদপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোদাররেছ আলী ইছা এ প্রসঙ্গে বলেন, দিনের আলোতে কেউ যদি রাতের অন্ধকার দেখে তবে বলার কিছুই নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফরিদপুরের একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায়। তাই সরকার প্রধানের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি পূরণ হবে বলেই আমরা আশা করতে পারি। এক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারা অন্যকিছু চায় না।
ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ফরিদপুরের মানুষ শ্রমমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন ও তার ভাই বাবরের অপশাসন থেকে মুক্তি চায়।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?