Amardesh
আজঃ ঢাকা, রোববার ২১ মার্চ ২০১০, ৭ চৈত্র ১৪১৬, ৪ রবিউসসানি ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ রাত ১.৩০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 হুদার কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৪০ ফুট নিচে নেমেছে : ভয়াবহ সেচ ঝুঁকিতে হাজার হাজার হেক্টর জমি

রাজশাহী অফিস
বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন ও মরণ ফাঁদ ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবসহ গভীর নলকূপের সাহায্যে নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং বৃষ্টি কমে যাওয়াসহ নানা কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ছে এ অঞ্চল। সেচ ঝুঁকিতে রয়েছে এ অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য মতে, গত ২৫ বছরে এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩৫ থেকে ৪০ ফুট নিচে নেমে গেছে। এ স্তর আর ২৫ ফুট নিচে নামলেই পানির বদলে গভীর নলকূপের পাইপ পাথরে ঠেকবে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যেই পানির স্তর গড়ে আরও ২৫ ফুট নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের প্রকৌশলীরা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা বর্ষাকালে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থাসহ ভারত থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পরামর্শ দিয়েছেন।
রাজশাহী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোফাজ্জল হক জানান, সাধারণভাবে এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মাটি সমতল থেকে সর্বোচ্চ ১৩০ ফুটের মধ্যে অবস্থান করে। উচ্চ বরেন্দ্র (হার্ড বারিন্দ) অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ১০৫ ফুট নিচে নেমে গেছে। বর্তমানে পানির স্তর রয়েছে মাত্র ২৫ ফুট। এই ২৫ ফুটের মধ্যে পানির স্তর যদি ২০ ফুটও নিচে নামে তাহলে নলকূপ স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যাবে। এরই মধ্যে এ অঞ্চলে হাজার হাজার হস্তচালিত নলকূপ অকেজো হয়ে গেছে। প্রকৌশলী মোফাজ্জল হক তানোর উপজেলায় তার সাম্প্রতিক এক অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, তানোরে গত ডিসেম্বরে পানির স্তর পরীক্ষা করতে গিয়ে গর্ত করার পর ১৩০ ফুট নিচে গিয়ে দেখতে পান শক্ত পাথরের স্তর। সেখানে পানি নেই। তিনি বলেন, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ এলাকায় সবচেয়ে বেশি ধান উত্পন্ন হয়ে থাকে। ধানের ক্ষেতে সেচ সুবিধা পেতে কৃষকদের অতিরিক্ত পানির চাহিদা সব সময় থাকে। বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে সেচ সুবিধা দিতে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) কাজ করলেও তাদের চালিত গভীর নলকূপগুলো এখন এ অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সঙ্কট ধীরে ধীরে এগিয়ে আসলেও তার বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মাটির ওপরে যে গাছ আছে তার পানি টানার ক্ষমতা আছে। পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে সে ক্ষমতা কমে যায়। ধীরে ধীরে গাছ মরতে শুরু করে। যেভাবে পানির স্তর নামছে, তাতে শিগগির রাজশাহী ও তার আশপাশের জেলাগুলো মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমের তথ্য অনুযায়ী রাজশাহী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর জানায়, ১৯৮৫ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলে গড়ে পানির স্তর ছিল ৪৪ দশমিক ৬৭ ফুট নিচে। ১৯৯১ সালে উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় পানির স্তর ছিল ৪৮ ফুট নিচে। এই ৬ বছরে পানির স্তর নেমেছে ৩ দশমিক ৩৩ ফুট। ২০০০ সালে তা ৬২ ফুটে নামে। অর্থাত্ ৯ বছরে নেমেছে ১৪ ফুট। মধ্য বরেন্দ্র এলাকায় ১৯৯১ সালে পানির স্তর ছিল ২৭ ফুট নিচে, ২০০০ সালে নামে ৪০ ফুটে। নিম্ন বরেন্দ্র এলাকায় পানির স্তর ছিল ২০ ফুট নিচে, ২০০০ সালে নামে ২৯ ফুটে। ২০০৬ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলে সর্বনিম্ন পানির স্তর ছিল ৮৫ ফুট। ২০০৭ সালে উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় ৯৩ দশমিক ৩৪ ফুট এবং নিম্ন বরেন্দ্র এলাকায় ৬০ দশমিক ০৪ ফুট নিচে নেমেছে পানির স্তর। ২০০৯ সালে ৯৫ ফুট নিচে নামে পানির স্তর।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৮৫ সাল থেকে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর কেবল সমান গতিতে নিম্নগামী হয়েছে। গত বছর সবচেয়ে খারাপ আলামত দেখা গেছে উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চলে গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নে। ২০০৮ সালে এখানে ৯০ ফুট নিচে ছিল পানির স্তর। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতেই তা দাঁড়ায় ১০০ ফুটে। মার্চে ১০৫ ফুট নিচে নামে পানির স্তর এবং তা অপরিবর্তিত ছিল জুন মাস পর্যন্ত। ডিসেম্বরেও এখানে পানির স্তর ৮২ ফুট নিচে ছিল। একই অবস্থা এখন পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলে, বিশেষ করে রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, নওগাঁর সাপাহার, নিয়ামতপুর, পোরশা, মান্দা ও পত্নীতলা এলাকায়।
এ প্রেক্ষিতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর নিচের দিকে নেমে যাবে। চলনবিল অঞ্চলে গত ৪ বছরে পানির স্তর নেমেছে ১৭ দশমিক ৩ ফুট নিচে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিএমডিএর নওগাঁ জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রশিদ জানান, পানির স্তর ওঠা-নামা করে বৃষ্টির ওপর। দীর্ঘদিন এ অঞ্চলে বৃষ্টি না হওয়ায় পানির স্তর নামতে শুরু করেছে। বর্তমানে তা আশঙ্কাজনক অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বরেন্দ্র অঞ্চল অচিরেই মরুভূমিতে পরিণত হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. সারওয়ার জাহান বলেন, আষাঢ়েও যেখানে পদ্মায় পানি থাকে না, সেখানে ভূগর্ভস্থ পানি নিচে নেমে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনই কোনো ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই বরেন্দ্র অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে। এজন্য চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে। অন্যদিকে বর্ষাকালে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?